চাঁদের বুকে নতুন একটি বিশাল গর্তের সন্ধান পেয়েছেন নাসার এক গবেষক। বিজ্ঞানীদের মতে, এ ধরনের বড় আঘাতে তৈরি গর্ত চাঁদের পৃষ্ঠে গড়ে এক শতাব্দীতে একবার, এমনকি তারও বেশি সময় পরপর তৈরি হতে পারে। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো—গর্তটি কয়েক বছর আগে তৈরি হলেও এত দিন বিজ্ঞানীদের নজর এড়িয়ে ছিল।
নতুন আবিষ্কৃত গর্তটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘ম্যাকগেটচিন’। এর ব্যাস প্রায় ৭৩০ ফুট বা ২২২ মিটার। নাসার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের বসন্তে একটি ধূমকেতু বা গ্রহাণু চাঁদের পৃষ্ঠে আছড়ে পড়ার ফলে এই গর্ত তৈরি হয়ে থাকতে পারে। যে মহাজাগতিক বস্তুটি চাঁদে আঘাত করেছিল, সেটি আনুমানিক তিন থেকে ছয়তলা ভবনের সমান বড় ছিল বলে ধারণা করছেন গবেষকেরা।
কীভাবে খুঁজে পাওয়া গেল গর্তটি
চাঁদের পৃষ্ঠে নতুন এই গর্তটি আবিষ্কার করেন নাসার লুনার রিকনেসাঁ অরবিটার বা এলআরও মিশনের গবেষক রবার্ট ওয়াগনার। চাঁদের নতুন একটি স্ক্যান বিশ্লেষণ করার সময় তিনি অস্বাভাবিক একটি দাগ দেখতে পান। এলআরওর ছবিতে জায়গাটি দেখা যাচ্ছিল একটি বড় উজ্জ্বল অংশ হিসেবে, যার চারপাশে ছিল গাঢ় রঙের একটি বলয়।
পরে আরও বিশদভাবে পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হন, সেটি কোনো সাধারণ উজ্জ্বল দাগ নয়; বরং সাম্প্রতিক সময়ে তৈরি হওয়া একটি বিশাল আঘাতের গর্ত।
&imwidth=800&imheight=600&format=webp&quality=medium)
চাঁদকে পর্যবেক্ষণকারী এলআরও মহাকাশযানটি ২০০৯ সাল থেকে চাঁদের পৃষ্ঠের ছবি ও বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করছে। এত দীর্ঘ সময় ধরে চাঁদকে পর্যবেক্ষণ করার ফলে বিজ্ঞানীরা এর পৃষ্ঠে পরিবর্তন শনাক্ত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ পেয়েছেন।
সৌরজগতের সবচেয়ে বড় নতুন গর্ত
বুধবার প্রকাশিত একটি গবেষণায় ম্যাকগেটচিন গর্তটিকে সৌরজগতের এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে বড় ‘নতুন’ গর্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’ সাময়িকীতে।
চাঁদের পৃষ্ঠে অবশ্য অসংখ্য গর্ত রয়েছে। এর অনেকগুলোর আকার ম্যাকগেটচিনের চেয়েও বহুগুণ বড়। কিন্তু সেগুলোর অধিকাংশই কোটি কোটি বছর আগে বিভিন্ন মহাজাগতিক বস্তুর আঘাতে তৈরি হয়েছে। নতুন গর্তটির গুরুত্ব এখানেই—এটি তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক সময়ে তৈরি হয়েছে এবং বিজ্ঞানীরা এর সৃষ্টি সম্পর্কে প্রায় বাস্তব সময়ের কাছাকাছি তথ্য বিশ্লেষণের সুযোগ পাচ্ছেন।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, এ ধরনের বড় আকারের সংঘর্ষ চাঁদে খুবই বিরল। নাসার ভাষ্য অনুযায়ী, এত বড় আঘাত প্রায় এক শতাব্দীতে একবার অথবা তারও বেশি সময় পরপর ঘটতে পারে।
চাঁদের ভূতত্ত্ব বুঝতে নতুন সুযোগ
নতুন এই গর্ত শুধু একটি মহাজাগতিক ঘটনা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ নয়। এর মাধ্যমে চাঁদের ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও মহাজাগতিক বস্তুর আঘাতে চাঁদের পৃষ্ঠ কীভাবে বদলে যায়, সে সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা আরও পরিষ্কার ধারণা পেতে পারেন।

কোনো গর্ত তৈরি হওয়ার পর তার চারপাশের মাটি ও পাথর কীভাবে ছড়িয়ে পড়ে, পৃষ্ঠে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটে এবং সময়ের সঙ্গে সেই চিহ্ন কীভাবে বদলে যায়—এসব বিষয় পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি হয়েছে ম্যাকগেটচিনের মাধ্যমে।
চাঁদের পৃষ্ঠে এমন সাম্প্রতিক পরিবর্তন শনাক্ত করা ভবিষ্যতের গবেষণার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে মহাকাশ থেকে আসা গ্রহাণু, ধূমকেতু ও অন্যান্য বস্তুর আঘাত চাঁদের মতো বায়ুমণ্ডলহীন কোনো জগতে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, তা বোঝার ক্ষেত্রে এটি একটি মূল্যবান উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।
পৃথিবীর সঙ্গে চাঁদের বড় পার্থক্য
পৃথিবীর তুলনায় চাঁদের পৃষ্ঠে মহাজাগতিক বস্তুর আঘাতের প্রক্রিয়া অনেকটাই আলাদা। পৃথিবীর চারপাশে ঘন বায়ুমণ্ডল থাকায় মহাকাশ থেকে আসা অনেক ছোট বস্তু বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় ধীর হয়ে যায় বা ঘর্ষণের কারণে পুড়ে যায়। ফলে সেগুলোর সবগুলো পৃথিবীর মাটিতে পৌঁছাতে পারে না।
চাঁদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। চাঁদের কার্যত কোনো উল্লেখযোগ্য বায়ুমণ্ডল নেই। ফলে মহাকাশ থেকে আসা ধূমকেতু, গ্রহাণু বা অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ চাঁদের পৃষ্ঠের দিকে ছুটে এলে তা ধীর করার মতো ঘন বায়ুর স্তর পায় না। তাই সরাসরি পৃষ্ঠে আঘাত করার সম্ভাবনা অনেক বেশি।

এই কারণেই চাঁদের মাটিতে তৈরি হওয়া গর্তগুলো মহাজাগতিক সংঘর্ষের ইতিহাস ধরে রাখে। নতুন ম্যাকগেটচিন গর্ত সেই ইতিহাসেরই একটি বিরল ও সাম্প্রতিক অধ্যায় সামনে এনেছে।
ভবিষ্যৎ চন্দ্র অভিযানের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ
চাঁদের ভূতত্ত্ব ও পৃষ্ঠের পরিবর্তন সম্পর্কে এমন গবেষণা ভবিষ্যতের মানব অভিযানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন—দুই দেশই আগামী দিনে চাঁদে নতুন মানব মিশনের পরিকল্পনা করছে।
ভবিষ্যতে মানুষ চাঁদের পৃষ্ঠে দীর্ঘ সময় অবস্থান করলে মহাজাগতিক বস্তুর আঘাতের ঝুঁকি, চাঁদের মাটির আচরণ এবং পৃষ্ঠের পরিবর্তন সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জ্ঞান প্রয়োজন হবে। নতুন গর্তের মতো ঘটনাগুলো বিজ্ঞানীদের সেই প্রস্তুতিতে সহায়তা করতে পারে।
একটি তিন থেকে ছয়তলা ভবনের সমান মহাজাগতিক বস্তু চাঁদের পৃষ্ঠে আঘাত করে ২২২ মিটার প্রশস্ত গর্ত তৈরি করেছে—এই ঘটনাই দেখিয়ে দিচ্ছে, পৃথিবীর নিকটতম মহাজাগতিক প্রতিবেশী চাঁদ এখনো কতটা সক্রিয় ও রহস্যময় গবেষণাক্ষেত্র। আর বহুদিন পর তৈরি হওয়া এই গর্তের সন্ধান প্রমাণ করছে, চাঁদের পৃষ্ঠকে যতই পর্যবেক্ষণ করা হোক, সেখানে নতুন কিছু আবিষ্কারের সম্ভাবনা এখনো শেষ হয়ে যায়নি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















