নিউইয়র্কে জন্ম ও বেড়ে ওঠা এক মার্কিন মা ১২ বছরেরও বেশি সময় ধরে ইতালিতে বসবাস করছেন। সেখানে তিনি গড়ে তুলেছেন নিজের সংসার এবং দুই সন্তানকে বড় করছেন। তাঁর ৮ বছরের মেয়ে ও ৩ বছরের ছেলে—দুজনেরই জন্ম ও বেড়ে ওঠা ইতালিতে। আর সন্তান পালনের এই অভিজ্ঞতা তাঁকে বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইতালির পারিবারিক সংস্কৃতির মধ্যে পার্থক্য কতটা গভীর।
কারোলিন চিরিচেল্লা ২৪ বছর বয়সে ইতালিতে চলে আসেন। নিজের শৈশব কেটেছে নিউইয়র্ক শহরে। ফলে সন্তান পালনের ক্ষেত্রে তিনি একদিকে নিজের বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা বহন করছেন, অন্যদিকে ইতালির পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছেন। তাঁর মতে, ইতালিতে সন্তান লালন-পালনের বেশ কিছু দিক তাঁর কাছে একেবারেই নতুন এবং কখনো কখনো বিস্ময়কর।
স্কুলের খাবারে বড় পার্থক্য
নিউইয়র্কের সরকারি স্কুলে পড়ার সময় কারোলিনের মা তাঁকে বাড়ি থেকে স্বাস্থ্যকর খাবার দিয়ে দিতেন। কারণ স্কুলের ক্যাফেটেরিয়ার খাবার তাঁর কাছে খুব একটা আকর্ষণীয় ছিল না।
কিন্তু ইতালিতে তাঁর মেয়ের স্কুলের দুপুরের খাবারের চিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। প্রতিদিনের খাবারে সাধারণত প্রথম পদ হিসেবে থাকে সবজি বা শিমজাতীয় উপকরণ দিয়ে তৈরি পাস্তা। এরপর দেওয়া হয় মিটবল, মুরগির কাটলেট কিংবা সেদ্ধ মাছের মতো দ্বিতীয় পদ। সঙ্গে থাকে গাজর, শিম বা সালাদের মতো সবজি। কোনো কোনো দিন খাবারের শেষে চকোলেট কেকের মতো মিষ্টান্নও থাকে।
খাবারের মানও তাঁকে মুগ্ধ করেছে। স্কুলের খাবার স্থানীয় রাঁধুনিরা তৈরি করেন। তাঁদের অনেকেই ওই স্কুলের শিশুদের মা কিংবা পরিবারের সদস্য। পুরো খাবার ব্যবস্থাপনার ওপর আবার স্থানীয় একটি রেস্তোরাঁ নজর রাখে।
অর্থাৎ শিশুদের স্কুলের খাবার শুধু পেট ভরানোর বিষয় নয়, বরং স্থানীয় খাবারের সংস্কৃতি ও পারিবারিক অংশগ্রহণের সঙ্গেও যুক্ত।
শিশুদের সময় নিয়ে এত চাপ নেই
যুক্তরাষ্ট্রে অনেক পরিবারের শিশুদের দৈনন্দিন জীবন নানা কর্মকাণ্ডে ভরা থাকে। খেলাধুলার অনুশীলন, গান শেখা, বাড়তি পড়াশোনা, বিভিন্ন ক্লাস—সব মিলিয়ে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তাদের সময়সূচি ব্যস্ত হয়ে ওঠে।
ইতালিতে কারোলিন সেই একই ধরনের চাপ দেখতে পান না। সেখানে শিশুরা অবশ্যই স্কুলের পর বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অংশ নেয়। তবে তাদের প্রতিটি মুহূর্ত কোনো না কোনো কাজে ব্যস্ত রাখার প্রবণতা তুলনামূলক কম।
কোনো শিশু খেলাধুলা করতে চাইলে সে খেলাধুলা করে, বাদ্যযন্ত্র শিখতে চাইলে শেখে। কিন্তু সে যদি কোনো অতিরিক্ত কর্মকাণ্ডে আগ্রহী না হয়, তাহলেও সমস্যা হিসেবে দেখা হয় না।
কারোলিনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এখানে শিশুর নিজের আগ্রহকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ভবিষ্যতের জন্য একটি নিখুঁত জীবনবৃত্তান্ত তৈরির মতো বিষয়কে কেন্দ্র করে ছোটবেলা থেকেই অতিরিক্ত চাপ দেওয়ার প্রবণতা তিনি কম দেখেছেন।

শিশুদের স্বাধীনতাও বেশি
ইতালিতে বসবাসের সময় কারোলিনের সবচেয়ে বড় পার্থক্যগুলোর একটি মনে হয়েছে শিশুদের স্বাধীনতা। তাঁর চোখে, ইতালির অনেক বাবা-মা সন্তানদের চলাফেরা নিয়ে তুলনামূলক কম নজরদারি করেন।
তবে এই বিষয়টি তাঁর নিজের জন্য সহজ নয়।
নিউইয়র্কে বেড়ে ওঠার সময় নিরাপত্তা ছিল তাঁর পরিবারের বড় উদ্বেগ। সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে বাবা-মায়েরা সচেতন থাকতেন এবং শিশুদের সুরক্ষায় নানা ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করতেন। সেই মানসিকতা তাঁর মধ্যেও গভীরভাবে তৈরি হয়েছে।
ইতালিতে এসে তিনি দেখেছেন, পার্কে শিশুরা এমন কিছু ঝুঁকিপূর্ণ খেলা করছে, যা তাঁকে উদ্বিগ্ন করে। কেউ খেলনার কাঠামোয় ঝুঁকিপূর্ণভাবে উঠছে বা নানা কসরত করছে, অথচ তাদের বাবা-মায়েরা পাশে বসে বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলছেন কিংবা ফোন দেখছেন।
কারোলিন মনে করেন, এমন স্বাধীনতা শিশুদের আত্মবিশ্বাস ও স্বনির্ভরতা বাড়াতে পারে। বাস্তব জীবনের ঝুঁকি সম্পর্কে তাদের নিজেদের অভিজ্ঞতাও তৈরি হয়। কিন্তু একজন মা হিসেবে নিজের সন্তানের ক্ষেত্রে তিনি পুরোপুরি এমন পদ্ধতি গ্রহণ করতে পারেননি।
সন্তান পালনে দাদা-দাদিদের বড় ভূমিকা
ইতালির পরিবারব্যবস্থায় বর্ধিত পরিবারের অংশগ্রহণও কারোলিনকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছে।

তাঁর পর্যবেক্ষণ, শিশু লালন-পালনের দায়িত্ব অনেক সময় শুধু মা-বাবার ওপর থাকে না। একাধিক প্রজন্ম মিলে এই দায়িত্ব ভাগ করে নেয়। বিশেষ করে দাদি বা ‘নন্না’ অনেক পরিবারে যেন সন্তানের দ্বিতীয় মা হয়ে ওঠেন।
শিশু দেখাশোনার জন্য সবসময় বাইরের আয়া বা পরিচর্যাকারীর ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন পড়ে না। দাদা-দাদি, নানা-নানি, চাচা-মামা, খালা-ফুফু এবং চাচাতো-মামাতো ভাইবোন—সবাই কোনো না কোনোভাবে শিশুর জীবনের অংশ হয়ে থাকেন।
কারোলিনের নিজের ক্ষেত্রেও এই পারিবারিক সহায়তা রয়েছে। তাঁর বাবা-মা কয়েক বছর আগে ইতালিতে চলে এসেছেন। এখন তাঁরা নিয়মিত নাতি-নাতনিদের জীবনের অংশ এবং প্রতিদিনই পরিবারের সঙ্গে যুক্ত থাকেন।
প্রতিবেশীরাও যেন পরিবারের অংশ
ইতালির ছোট সম্প্রদায়ের সামাজিক পরিবেশও তাঁর কাছে যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা থেকে আলাদা মনে হয়েছে।
তিনি যে এলাকায় বসবাস করেন, সেখানে মানুষ একে অপরকে চেনেন। প্রতিবেশীদের মধ্যে যোগাযোগ ও ঘনিষ্ঠতা বেশি। শিশুদের দেখভালের ক্ষেত্রেও একটি সম্মিলিত দায়িত্ববোধ কাজ করে।
কারোলিনের মতে, নিউইয়র্কে বেড়ে ওঠার সময় তিনি এমন সামাজিক পরিবেশ খুব একটা অনুভব করেননি। কিন্তু ইতালির ছোট ও ঘনিষ্ঠ সম্প্রদায়ে শিশু শুধু তার নিজের পরিবারের সন্তান নয়—তাকে ঘিরে থাকা সমাজেরও একজন সদস্য।
বড় হলেও সন্তান পরিবার থেকে দূরে নয়
সন্তান বড় হওয়ার পর তাদের স্বাধীন হয়ে আলাদা জীবন শুরু করার ধারণাতেও দুই দেশের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান কলেজে যাওয়ার পর বাড়ি ছেড়ে নিজস্ব জীবন শুরু করবে—এমন প্রত্যাশা অনেক পরিবারের মধ্যেই শক্তিশালী। নিজের পায়ে দাঁড়ানো, ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া, স্থায়ী চাকরি পাওয়া এবং দ্রুত আলাদা বাসা নেওয়াকে বড় হওয়ার স্বাভাবিক ধাপ হিসেবে দেখা হয়।
ইতালিতে চিত্রটি অনেকটাই ভিন্ন। অনেক তরুণ-তরুণী বিয়ের আগ পর্যন্ত বাবা-মায়ের সঙ্গে বসবাস করেন। এমনকি বিয়ের পরও স্থায়ী চাকরি ও পর্যাপ্ত আয় না হওয়া পর্যন্ত পরিবারের সঙ্গে থাকা অস্বাভাবিক বলে বিবেচিত হয় না।
এখানে পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘদিন থাকা ব্যর্থতার প্রতীক নয়। বরং পরিবার একজন মানুষের জীবনের স্থায়ী অংশ—এই ধারণাই বেশি শক্তিশালী।
কারোলিন জানেন না ভবিষ্যতে তাঁর নিজের সন্তানরা যখন বড় হবে, তখন তাঁদের পরিবার কীভাবে এই পর্যায়টি সামলাবে। তবে তাঁর বাবা-মা এখন যেভাবে সন্তানদের জীবনের নিয়মিত অংশ, ভবিষ্যতেও তাঁদের এই ঘনিষ্ঠতা বজায় থাকবে—এমনটাই তাঁর আশা।
দুই সংস্কৃতির সেরা দিক একসঙ্গে নেওয়ার চেষ্টা
ইতালিতে সন্তান বড় করতে গিয়ে কারোলিন শেষ পর্যন্ত কোনো একটি দেশের পদ্ধতিকে পুরোপুরি গ্রহণ করেননি। বরং তিনি দুই সংস্কৃতির ভালো দিকগুলো মিলিয়ে নিজের সন্তান পালনের পথ তৈরি করার চেষ্টা করছেন।
ইতালি থেকে তিনি নিচ্ছেন স্বাধীনতা, পারিবারিক বন্ধন এবং সম্প্রদায়ের প্রতি দায়িত্ববোধ। অন্যদিকে, নিউইয়র্কে বেড়ে ওঠার সময় যে নিরাপত্তাবোধ তাঁর মধ্যে তৈরি হয়েছে, সেটিও তিনি সন্তান পালনে ধরে রাখতে চান।
এই দ্বৈত অভিজ্ঞতা কখনো কখনো তাঁকে নিজের অবস্থান নিয়েই দ্বিধায় ফেলে। ইতালিতে সন্তান বড় করলেও নিজের মধ্যে তিনি একজন মার্কিন মায়ের মানসিকতা অনুভব করেন। তাঁর মনে হয়, পৃথিবীর যেখানেই সন্তান বড় করা হোক না কেন, বাবা-মায়ের জন্য সেটি সহজ নয়।
শেষ পর্যন্ত সন্তান পালনের ক্ষেত্রে একটিমাত্র ‘সঠিক’ পদ্ধতি নেই। সংস্কৃতি, পরিবার, সমাজ এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা—সবকিছু মিলিয়েই তৈরি হয় একজন বাবা-মায়ের নিজস্ব পদ্ধতি। কারোলিনের অভিজ্ঞতাও দেখিয়ে দেয়, ভিন্ন দেশে বসবাস শুধু জীবনযাত্রাই বদলায় না, সন্তানকে কীভাবে মানুষ করতে চাই—সেই ধারণাকেও নতুন করে ভাবতে শেখায়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















