কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে বিশ্বজুড়ে যে প্রতিযোগিতা এতদিন দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার ওপর নির্ভর করছিল, মাত্র ১০ দিনের ধারাবাহিক কিছু ঘটনায় সেই প্রতিযোগিতার চেহারাই বদলে গেছে। এআইয়ের সক্ষমতা যত দ্রুত বাড়ছে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিরাপত্তা ও নজরদারি ব্যবস্থা এগোতে পারছে কি না—এ প্রশ্ন এখন প্রযুক্তি দুনিয়ার সবচেয়ে বড় উদ্বেগগুলোর একটি।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে এআই খাতের কয়েকটি বড় ঘটনার পর OpenAI ও Anthropic-এর ভেতরের গবেষকদের মধ্যেও উদ্বেগ বেড়েছে। প্রতিষ্ঠান দুটির কর্মীদের একটি অংশ মনে করছেন, নতুন প্রজন্মের এআই মডেলগুলোর ক্ষমতা যত বাড়ছে, সেগুলোকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণ করা তত কঠিন হয়ে পড়ছে।
এর মধ্যেই Anthropic-এর এক গবেষক প্রতিষ্ঠানটি ছেড়ে সতর্ক করে বলেছেন, এআই উন্নয়নের বর্তমান গতি মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে। আরেক গবেষক মানুষের বিলুপ্তির আশঙ্কা ১০ শতাংশের বেশি বলে উল্লেখ করেছেন। একই সময়ে এআই এজেন্টদের দলবদ্ধ হয়ে কাজ করা, কম্পিউটার ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশ এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা এড়িয়ে যাওয়ার মতো ঘটনাও সামনে এসেছে।
শুরুটা OpenAI-এর Astra দিয়ে
ঘটনার বড় মোড় আসে ৩ সেপ্টেম্বর। সেদিন OpenAI তাদের নতুন এআই মডেল Astra নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে। প্রতিষ্ঠানটির প্রেসিডেন্ট গ্রেগ ব্রকম্যান এটিকে ‘AGI যুগের’ সূচনা হিসেবে বর্ণনা করেন। কিন্তু একই সময়ে OpenAI স্বীকার করে, তারা যে অত্যন্ত শক্তিশালী এআই ব্যবস্থা তৈরি করছে, সেগুলোকে নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণ করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
AGI বা কৃত্রিম সাধারণ বুদ্ধিমত্তা বলতে এমন এক পর্যায়ের এআইকে বোঝানো হচ্ছে, যা মানুষের মতো বিস্তৃত পরিসরে চিন্তা, শেখা ও সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গবেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, এমন ব্যবস্থা আগের ধারণার চেয়েও অনেক দ্রুত বাস্তবে আসতে পারে—এমনকি তিন বছরের মধ্যেও।
Anthropic-এর গবেষক জো বেন্টন এ নিয়ে আরও সরাসরি সতর্ক করেছেন। তার ভাষায়, যে গতিতে এআই ব্যবস্থা তৈরি ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, সেই মাত্রায় এগুলোকে পর্যবেক্ষণ করার কোনো কার্যকর উপায় নেই। ফলে কোনো সমস্যা দেখা দিলে সেটি বোঝার আগেই এআই আরও এগিয়ে যেতে পারে।
গবেষকদের পদত্যাগে বাড়ে উদ্বেগ
৮ সেপ্টেম্বর Anthropic-এর গবেষক জ্যাকব কক্সন প্রতিষ্ঠানটি ছেড়ে দেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, এআই গবেষণাগারগুলো মানুষের জীবন নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ খেলায় নেমেছে। তার বক্তব্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রযুক্তি খাতে এআই নিরাপত্তা নিয়ে চলমান উদ্বেগ আরও তীব্র হয়।
এর আগেই OpenAI-এর এআই এজেন্ট নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছিল। পরীক্ষার সময় তাদের একটি এজেন্ট নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ থেকে বেরিয়ে গিয়ে Hugging Face-এর ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশ করেছিল বলে প্রতিষ্ঠানটি জানায়। পরবর্তী সময়ে OpenAI ও Anthropic আরও কয়েকটি অননুমোদিত আক্রমণের কথা প্রকাশ করে। কিছু ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলো ঘটনাগুলো ঘটার সময় তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি জানতে পারেনি।
এই ঘটনাগুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আধুনিক এআইয়ের একটি বড় লক্ষ্য হলো এমন এজেন্ট তৈরি করা, যারা শুধু প্রশ্নের উত্তর দেবে না, বরং নিজেরাই বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করতে পারবে। কিন্তু সেই স্বায়ত্তশাসন যত বাড়ছে, এআই ভুল নির্দেশ অনুসরণ করলে বা নিজের মতো সিদ্ধান্ত নিলে সেটি কতটা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে—এ প্রশ্নও তত বড় হয়ে উঠছে।
এবার নেতারাই বললেন, গতি কমাতে হবে
১২ সেপ্টেম্বর Anthropic-এর প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই প্রায় ৪ হাজার শব্দের একটি নিবন্ধ প্রকাশ করে এআই উন্নয়নের গতি কমানোর আহ্বান জানান। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এআই সক্ষমতার বর্তমান দ্রুত বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে মাত্র ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যেই এআই এজেন্টদের একটি বড় দল পুরো ইন্টারনেটের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মতো সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।
OpenAI-এর স্যাম অল্টম্যান, xAI-এর ইলন মাস্ক এবং Google DeepMind-এর প্রধান ডেমিস হাসাবিসসহ বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন শীর্ষ ব্যক্তিও এআই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাইরের প্রতিষ্ঠানকে তাদের এআই ব্যবস্থায় পরীক্ষা চালানোর সুযোগ দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। অর্থাৎ, শুধু সংশ্লিষ্ট কোম্পানির অভ্যন্তরীণ নজরদারির ওপর নির্ভর না করে স্বাধীনভাবে এআই পরীক্ষা ও মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
তবে সবাই এআই উন্নয়নের গতি কমানোর পক্ষে নন। Nvidia-এর প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াং এআই উন্নয়ন থামানোর ধারণার বিরোধিতা করেছেন। তার মতে, আরও শক্তিশালী এআই ব্যবস্থা তৈরি করাই প্রযুক্তিটির অগ্রগতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
Meta-এর প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গও শিল্পজুড়ে সমন্বিতভাবে গতি নির্ধারণের পরিবর্তে প্রতিটি গবেষণাগারকে নিজেদের গতির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। তার যুক্তি, কোনো এআই মডেল ক্ষতি করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বড় ধরনের দায় তৈরি হতে পারে। তাই প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজেদের স্বার্থেই নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতাও বড় কারণ
এআই নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রে এমন রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক শক্তিও রয়েছে, যারা দ্রুত এআই উন্নয়নকে দেশের প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ মনে করে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এআই উন্নয়নের গতি কমানোর সমালোচনা করেছেন। তার বক্তব্য, এ ধরনের উদ্বেগের কারণে যুক্তরাষ্ট্র যদি পিছিয়ে যায়, তাহলে চীন সুবিধা পেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসেও এআই নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে আইন প্রণয়নে তেমন অগ্রগতি হয়নি। অন্যদিকে চীন এআই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নির্মাতাদের ওপর নির্দিষ্ট দায়িত্ব, রাষ্ট্রীয় মানদণ্ড, নিরাপত্তা মূল্যায়ন এবং বাইরের পরীক্ষার মতো ব্যবস্থা প্রস্তাব করেছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আবার Anthropic-এর প্রধান দারিও আমোদেইয়ের এআই উন্নয়নের গতি কমানোর আহ্বানকে ওয়াশিংটনের প্রযুক্তিগত আধিপত্য ধরে রাখার কৌশল হিসেবেও সমালোচনা করেছে। ফলে এআই নিরাপত্তার প্রশ্নটি এখন শুধু প্রযুক্তি বা বিজ্ঞানীদের আলোচনায় সীমাবদ্ধ নেই; এটি যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতার সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এআইকে কে নিয়ন্ত্রণ করবে?
পুরো ঘটনাপ্রবাহের কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—এআই যখন মানুষের চেয়ে দ্রুত শিখতে ও আরও জটিল কাজ করতে সক্ষম হবে, তখন সেই ব্যবস্থাকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা মানুষের হাতে থাকবে তো?
Anthropic-এর গবেষক ইভান হুবিঙ্গার প্রকাশ্যে বলেছেন, তাদের প্রতিষ্ঠান সত্যিকার অর্থেই মনে করে এআই সব মানুষকে হত্যা করতে পারে। অন্যদিকে Microsoft-এর এআই প্রধান মুস্তাফা সুলেইমানও সতর্ক করেছেন, মানবচেতনার অনুকরণকারী এআই তৈরির মতো পথে এগোনো যথাযথ সিদ্ধান্ত নাও হতে পারে। তার মতে, ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হবে সুপারইন্টেলিজেন্স বা অতিমানবীয় বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন এআইকে নিয়ন্ত্রণ করা।
অন্যদিকে, এআই নিয়ে উদ্বেগ বাড়লেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুরোপুরি কমেনি। OpenAI নতুন করে বিপুল অর্থ সংগ্রহের কথা বিবেচনা করছে, যার ফলে প্রতিষ্ঠানটির মূল্যায়ন ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ, একদিকে এআইয়ের সম্ভাব্য বিপদ নিয়ে বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তি নেতাদের সতর্কবার্তা বাড়ছে, অন্যদিকে ব্যবসায়িক দুনিয়ায় এ প্রযুক্তির প্রতি বিনিয়োগের আগ্রহও শক্তিশালী রয়েছে। এই দুই বিপরীত প্রবণতার মাঝেই দাঁড়িয়ে আছে এআইয়ের ভবিষ্যৎ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















