পরীক্ষার পড়ায় মন বসছে না ২১ বছর বয়সী আলিনা বি কে-র। পোখরার এই বনবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টকে জানিয়েছেন, নেপাল ও তিব্বত সীমান্তের বন্যার খবর তাঁকে বারবার ভবিষ্যতের প্রশ্নের মুখে ফেলছে। তিনি নেপালিজ ইয়ুথ ফর ক্লাইমেট অ্যাকশনের পোখরা নেটওয়ার্কের সমন্বয়ক। তাঁর ভাষায়, চারপাশে বন্যা আর মৃত্যুর খবরের মধ্যে উদ্বেগ ও মানসিক চাপ এড়ানো সত্যিই কঠিন। নেপালের তরুণদের জলবায়ু উদ্বেগ এভাবেই এখন শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবনেও ঢুকে পড়ছে। জলবায়ু উদ্বেগ বলতে বোঝানো হয় জলবায়ু ঝুঁকি নিয়ে ক্রমাগত দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপ, যা ঘুম ও মনোযোগেও প্রভাব ফেলতে পারে।
গত ২৬ আগস্ট নেপাল ও তিব্বত সীমান্তের কাছে বরফ ও শিলার ধস থেকে ভোটেকোশী নদীতে আকস্মিক বন্যা হয়। দ্য হিন্দুর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এতে দেশটির উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের বহু শহর ও গ্রাম বিধ্বস্ত হয়েছে। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট জানিয়েছে, নুয়াকোট জেলা, ত্রিশূলী নদী অঞ্চল ও ত্রিশূলী বাজার এলাকা বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। শিশুরা বাস্তুচ্যুত হয়েছে, আর স্কুলগুলোতে খোলা হয়েছে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র। সংবাদমাধ্যমগুলোর বর্ণনায় দুর্যোগের কারণ সামান্য আলাদা। দ্য হিন্দু একে বরফ ও শিলার ধস বলেছে, আর সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট বলেছে হিমবাহ ধসের কথা। এসব এলাকায় এখনো ত্রাণ পাঠানোর কাজ চলছে। এই দুর্যোগের ধাক্কা তাই শুধু নদীর তীরে সীমাবদ্ধ থাকেনি, পৌঁছেছে ঘরে ঘরে।
নেপালের তরুণরা এখন সহানুভূতির চেয়ে বেশি চাইছেন ন্যায়বিচার। তাঁদের দাবি, জলবায়ু সংকটের দায় ও প্রস্তুতি নিয়ে জবাবদিহি দরকার। সরকারের দিক থেকেও সেই চাপ টের পাওয়া যাচ্ছে। নেপালের তরুণদের জলবায়ু উদ্বেগ তাই শুধু ব্যক্তিগত মানসিক চাপ নয়, নীতিগত দাবিও। দ্য হিন্দুর খবর অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী শাহ বলেছেন, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থাই এখন সরকারের শীর্ষ অগ্রাধিকার। ভারত বায়ুসেনার সি-১৩০ বিমানে নেপালে নতুন ত্রাণের চালান পাঠিয়েছে বলেও দ্য হিন্দু জানিয়েছে। সরকারি প্রতিশ্রুতি ও মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতির মধ্যে ফারাক কতটা কমে, তরুণরা সেটাই খতিয়ে দেখছেন। আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা ঠিকমতো দাঁড়ালে ভবিষ্যতের দুর্যোগে প্রাণহানি কমানো সম্ভব, এই বিশ্বাসই তরুণদের সরকারি প্রতিশ্রুতির দিকে তাকিয়ে রাখছে।
আল জাজিরা তাদের বিশ্লেষণে প্রশ্ন তুলেছে, হিমালয় ধসে পড়লে কাকে সতর্ক করা হবে। সীমান্ত পেরোনো সতর্কবার্তার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ সেখানে উঠে এসেছে। ভোটেকোশীর উৎস যেহেতু সীমান্তের ওপারে, তাই আগাম সতর্কতা একটি দেশের একার কাজ হতে পারে না। এই প্রশ্নের উত্তর না মিললে পরের দুর্যোগেও তরুণদের আতঙ্ক কমবে না।
বাংলাদেশের পাঠকের জন্য এটি দূরের খবর নয়। ভোটেকোশীর পানি সুনকোশী ও কোশি নদী হয়ে গঙ্গায় মেশে, যা বাংলাদেশে পদ্মা নামে বইছে। বাংলাদেশ নিজেও জলবায়ু ঝুঁকির সামনের সারিতে, আর এখানকার তরুণরাও বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও লবণাক্ততার চাপে বড় হচ্ছে। ফলে আলিনার উদ্বেগ এখানকার অনেক শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতার সঙ্গেই মিলে যায়। নেপালের তরুণদের জলবায়ু উদ্বেগ তাই আমাদের তরুণদের কথাও মনে করিয়ে দেয়। পরীক্ষার খাতার সামনে বসেও আলিনা যে প্রশ্নটি এড়াতে পারছেন না, তার উত্তর এখনো কারও কাছে নেই।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















