০৮:৩১ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
নতুন খোঁড়া পুকুরে খেলতে গিয়ে ডুবে গেল দুই ভাই-বোন জুবিন গার্গ: মৃত্যু যেখানে শেষ নয়, সুর যেখানে অমর মানিকগঞ্জে একই পরিবারের তিনজনের মরদেহ উদ্ধার, শিশুকন্যাসহ স্ত্রীকে হত্যার পর স্বামীর আত্মহত্যার সন্দেহ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন হলে ৩০ ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন শিক্ষার্থীরা, তীব্র গরমে ভোগান্তি মক্কা চুক্তির প্রথম বড় পরীক্ষা: সৌদি নিরাপত্তা, হুতিদের উত্থান ও পাকিস্তানের কঠিন সমীকরণ মিরপুরে চলন্ত বাসে আগুন, নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে ফায়ার সার্ভিস জেন জেডের একাংশ কেন সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজমের দিকে ঝুঁকছে? ভারতের শুল্কনীতি নিয়ে ‘ট্যারিফ কিং’ তকমা কতটা সত্য? প্রিন্স নাসিমের উত্তরসূরি হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হলেন না ড্যানিয়েল টিসডেল সাঁতার কাটতে গিয়ে হাঙরের হামলায় নিহত গ্রেগ, পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ায় বিরল ‘মেরে ফেলার’ নির্দেশ

যে গাছকে ‘দাদু’ ডাকেন বাসিন্দারা, সেটিই কি বিষ দিয়ে মেরে ফেলার চেষ্টা?

দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলের বুয়াম-দং এলাকায় শতবর্ষী একটি গাছকে ঘিরে তৈরি হয়েছে রহস্য, উদ্বেগ ও আবেগের এক অদ্ভুত গল্প। স্থানীয় বাসিন্দাদের অত্যন্ত প্রিয় সেই গিঙ্কো গাছটি কয়েক মাস ধরে ধীরে ধীরে শুকিয়ে যেতে শুরু করেছে। গাছটির বয়স একশ বছরেরও বেশি বলে মনে করেন স্থানীয়রা। ভালোবেসে তারা গাছটির নাম দিয়েছেন ‘দাদু গিঙ্কো’।

গ্রীষ্মের শুরুতে গাছটির সবুজ পাতা অস্বাভাবিকভাবে ঝরে পড়তে দেখে স্থানীয়দের সন্দেহ হয়। সাধারণত যে সময়ে সিউলের চারপাশ সবুজে ভরে ওঠে, সেই সময়েই গাছটির পাতা শুকিয়ে মাটিতে পড়তে থাকে। বিষয়টি প্রথমে কৌতূহলের জন্ম দিলেও দ্রুত তা উদ্বেগে পরিণত হয়।

এরপর স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেরাই যেন গোয়েন্দার ভূমিকায় নামেন। গাছটির গোড়ার কাছে তারা ১০টি সাদা প্লাস্টিকের ফানেলের মতো বস্তু দেখতে পান। প্রথমে এগুলো গাছে প্রয়োজনীয় পুষ্টি দেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে বলে ধারণা করেছিলেন অনেকে। কিন্তু পরে বিষয়টি নিয়ে তাদের সন্দেহ বাড়তে থাকে।

স্থানীয় একটি বাড়ির নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজ খতিয়ে দেখতে গিয়ে তারা আরও অস্বাভাবিক দৃশ্য দেখতে পান। এপ্রিলের শেষ দিকে এক সকালে দুই ব্যক্তিকে সাদা গ্লাভস পরে গাছটির গোড়ার কাছে বসে ড্রিল ব্যবহার করতে দেখা যায়। তারা ঠিক কী করছিলেন, ফুটেজ দেখে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে বাসিন্দাদের সন্দেহ আরও গভীর হয়।

এরই মধ্যে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তারা জানতে পারেন, কাছের হোয়াঙ্কি জাদুঘর আগে ওই এলাকার কয়েকজন জমির মালিকের কাছে গাছটি সরিয়ে নেওয়ার অনুমতি চেয়েছিল।

জাদুঘরটির বাইরের ইটের দেয়ালটি গাছটির শিকড়ের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে—এমন দাবি করা হয়েছিল বলে জানান স্থানীয়রা। এরপর বাসিন্দাদের একটি অংশের ধারণা হয়, গাছটির গোড়ায় বসানো ফানেলগুলোর মাধ্যমে কোনো ধরনের আগাছানাশক বা গাছ মেরে ফেলার রাসায়নিক দেওয়া হয়ে থাকতে পারে।

গাছটি পরীক্ষা করতে আসা কয়েকজন গাছ বিশেষজ্ঞও বাসিন্দাদের সন্দেহের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখেন বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

একপর্যায়ে নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজ দেখার দিনই কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা চার পুলিশ কর্মকর্তাকে সঙ্গে নিয়ে হোয়াঙ্কি জাদুঘরে যান। বাসিন্দাদের দাবি, সেখানে এক কর্মী গাছটির সঙ্গে জাদুঘরের পক্ষের কোনো কর্মকাণ্ডের কথা স্বীকার করেছিলেন। তবে জাদুঘরটি পরে প্রকাশ্যে গাছটিতে আগাছানাশক প্রয়োগের অভিযোগ স্বীকার বা অস্বীকার—কোনোটিই করেনি এবং বিবিসির প্রশ্নেরও জবাব দেয়নি।

তবে মে মাসে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জাদুঘরটি জানায়, গিঙ্কো গাছটির শিকড়ের কারণে তাদের প্রাঙ্গণের দেয়াল ধসে পড়ার মতো অবস্থায় পৌঁছেছিল। এ বিষয়ে সমাধান চেয়ে ৪০টির বেশি সম্পত্তির মালিককে চিঠি পাঠানো হয়েছিল বলেও জানায় তারা। জাদুঘরের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো সাড়া না পাওয়ার পর তাদের কর্মীরা পরিস্থিতি সমাধানের চেষ্টা করেছিলেন। তবে ঠিক কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, তা তারা বিস্তারিত জানায়নি।

অন্যদিকে স্থানীয় পরিষদের এক প্রতিনিধি বিবিসিকে জানান, গত বছর করা পরিদর্শনে গিঙ্কো গাছটির সঙ্গে জাদুঘরের দেয়ালের ক্ষতির ‘অর্থপূর্ণ কোনো সম্পর্ক’ পাওয়া যায়নি। এমন কোনো সমস্যা থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যথাযথ ব্যবস্থা নিত এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে জানাত বলেও জানান তিনি।

স্থানীয় বাসিন্দারা এখন ফানেলগুলোর ভেতরে আসলে কী ছিল, তা জানতে চান। তাদের বিশ্বাস, সেখানে কোনো রাসায়নিক দেওয়া হয়ে থাকলে তা শনাক্ত করা গেলে গাছটিকে বাঁচানোর চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হতে পারে। এ ঘটনায় তারা জাদুঘরের পরিচালকের বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে অভিযোগও করেছেন। পুলিশ তদন্ত করছে বলে জানানো হলেও তদন্তের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

সবার ‘দাদু’ গিঙ্কো

বুয়াম-দং সিউলের ব্যস্ত নগরজীবনের মাঝেও তুলনামূলক শান্ত ও সবুজ একটি এলাকা। পাহাড়ঘেরা এই এলাকায় শিল্পকলা, ছোট ক্যাফে ও মনোরম পরিবেশের কারণে স্থানীয়দের পাশাপাশি পর্যটকদেরও যাতায়াত রয়েছে।

এলাকার এই গিঙ্কো গাছটি ব্যক্তিগত বাগান বা বনের গাছ নয়। রাস্তার পাশে সবার চোখের সামনে বেড়ে ওঠা এই গাছটিকে তাই স্থানীয়রা নিজেদের সম্পদ হিসেবে দেখেন।

চার বছর আগে এলাকায় এসে গাছটির প্রেমে পড়েছিলেন এক বাসিন্দা, যিনি প্রতিবেদনে ‘জুং’ নামে পরিচিত। নিরাপত্তার কারণে তার প্রকৃত নাম প্রকাশ করা হয়নি।

তার ভাষায়, বাড়ি ফেরার পথে তিনি গাছটির সঙ্গে কথা বলতেন—‘দাদু, আমি বাড়ি এসেছি’ কিংবা ‘দাদু, আমি বের হচ্ছি।’ তার কাছে গাছটি ছিল পুরো এলাকার একমাত্র এমন গাছ, যেটি যেন সবার।

এলাকার ৭৪ বছর বয়সী পার্ক জিওন-হির কাছে গাছটি আরও পুরোনো এক বন্ধুর মতো। ১০ বছর বয়সী কিম অন-ও প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার পথে গাছটির পাশ দিয়ে হাঁটে। তার জন্মের আগেও গাছটি সেখানে ছিল। গাছটি পড়ে যেতে পারে—এমন চিন্তাই তাকে কষ্ট দেয়।Cerbera odollam - Wikipedia

শিল্পীর স্মৃতির জাদুঘর ঘিরে অদ্ভুত অভিযোগ

হোয়াঙ্কি জাদুঘরটি ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি কোরিয়ার প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী ও বিমূর্ত শিল্পী কিম হোয়াঙ্কির স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত। অনেকেই তাকে ‘কোরিয়ার পিকাসো’ বলে অভিহিত করেন।

শিল্পী কিম হোয়াঙ্কির শিল্পে প্রকৃতি ছিল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জাদুঘরের স্থপতির ব্যাখ্যাতেও প্রকৃতির নানা উপাদান—চাঁদ, পাহাড়, মেঘ, পাথর ও গাছ—শিল্পীর কাজের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, কিম হোয়াঙ্কি ‘সু-হোয়া’ ছদ্মনামে প্রবন্ধ লিখতেন, যার অর্থ দাঁড়ায় ‘গাছের সঙ্গে কথোপকথন’।

এই কারণেই গাছটিকে ঘিরে তৈরি হওয়া অভিযোগ স্থানীয়দের কাছে আরও বেদনাদায়ক হয়ে উঠেছে। যে শিল্পীর স্মৃতিতে তৈরি জাদুঘর প্রকৃতির সৌন্দর্যকে ধারণ করে, সেই জাদুঘরের বিরুদ্ধেই এখন একটি গাছকে রাসায়নিক প্রয়োগ করে ধ্বংসের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। তবে অভিযোগটি এখনো প্রমাণিত হয়নি।

গাছ বাঁচাতে প্রার্থনা

গাছটির অবস্থা যত খারাপ হতে থাকে, স্থানীয়দের উদ্বেগও তত বাড়তে থাকে। প্রায় ২০ জন বাসিন্দা নিয়মিত গাছটির সামনে জড়ো হয়ে তার সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করেছেন।

কেউ কিম হোয়াঙ্কির লেখা পাঠ করেছেন, আবার স্থানীয় এক শামান গাছটির জন্য ‘নিরাময় আচার’ও পালন করেছেন। পরিবেশকর্মীরাও এই আন্দোলনে যুক্ত হয়েছেন। গাছটির সুরক্ষায় নাগরিকদের নগর গাছের অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার দাবিতে একটি আবেদনও শুরু হয়েছে।

গাছটি পরীক্ষা করা এক বৃক্ষবিশেষজ্ঞের মতে, গাছটি মৃত্যুর প্রায় ৯০ শতাংশ পথ এগিয়ে গেছে। ফলে গাছটিকে বাঁচানো এখন অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।

তবু আশা ছাড়েননি স্থানীয়রা। গাছের কাণ্ডে ঝুলছে শুভকামনার বার্তা, চলছে প্রার্থনা ও নানা প্রতীকী আয়োজন। কেউ কেউ হাত ধরে গাছের চারপাশে দাঁড়িয়ে পরিবেশগত নিরাময়ের প্রতীক হিসেবে একটি বিশেষ নৃত্যও করেছেন।

অসুস্থ গাছই যেন বদলে দিয়েছে মানুষগুলোকেও

এই পুরো ঘটনার মধ্যে আরেকটি মানবিক গল্পও তৈরি হয়েছে। গাছটিকে বাঁচানোর প্রচেষ্টায় এলাকার মানুষ একে অপরের আরও কাছাকাছি এসেছেন।

গাছটির জন্য কাজ করতে গিয়ে জুং প্রতিবেশীদের কাছ থেকে বাড়িতে রান্না করা খাবার পেয়েছেন। তিনিও অপরিচিত প্রতিবেশীদের জন্য সবজির স্যুপ রান্না করে দিয়েছেন।

জুং নিজেও গত শীতে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। হাঁটাচলা করতেও তার কষ্ট হতো। ভালো দিনগুলোতে তিনি গাছটির কাছে গিয়ে তার খসখসে কাণ্ড জড়িয়ে ধরতেন এবং মাটির গন্ধ নিতেন। তার ভাষায়, গাছটির অসুস্থতার মধ্য দিয়েই তিনি যেন আবার জীবনের দিকে ফিরতে শুরু করেন।

তিনি বলেন, গাছটির জন্য লড়াই করতে গিয়ে তার হতাশা ও অসহায়ত্বের অনুভূতি অনেকটাই দূর হয়ে গিয়েছিল। বরং গাছটি অসুস্থ হয়ে পড়ার কারণেই তিনি আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছিলেন।

শরৎ এসে সিউলের চারপাশ যখন হলুদ রঙে বদলে যাচ্ছে, তখন বুয়াম-দংয়ের একসময়ের গর্ব সেই গিঙ্কো গাছটির পাতাগুলো শুকিয়ে বাদামি হয়ে গেছে।

তারপরও স্থানীয়দের আশা—হয়তো কোনো অলৌকিকভাবে গাছটি আবার বেঁচে উঠবে। তারা এমন একটি শরৎ কল্পনা করতে পারছেন না, যখন এই গাছটির নিচে দাঁড়িয়ে তার সোনালি পাতায় ভরা সৌন্দর্য দেখবেন না।

একসময় যে গাছটি নীরবে তাদের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল, এখন সেই গাছের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে পুরো একটি neighbourhood—একটি পুরোনো গাছকে বাঁচানোর আশায়, আর নিজেদের মধ্যকার এক অদৃশ্য বন্ধনকে ধরে রাখার জন্য।

জনপ্রিয় সংবাদ

নতুন খোঁড়া পুকুরে খেলতে গিয়ে ডুবে গেল দুই ভাই-বোন

যে গাছকে ‘দাদু’ ডাকেন বাসিন্দারা, সেটিই কি বিষ দিয়ে মেরে ফেলার চেষ্টা?

০৭:১২:০৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলের বুয়াম-দং এলাকায় শতবর্ষী একটি গাছকে ঘিরে তৈরি হয়েছে রহস্য, উদ্বেগ ও আবেগের এক অদ্ভুত গল্প। স্থানীয় বাসিন্দাদের অত্যন্ত প্রিয় সেই গিঙ্কো গাছটি কয়েক মাস ধরে ধীরে ধীরে শুকিয়ে যেতে শুরু করেছে। গাছটির বয়স একশ বছরেরও বেশি বলে মনে করেন স্থানীয়রা। ভালোবেসে তারা গাছটির নাম দিয়েছেন ‘দাদু গিঙ্কো’।

গ্রীষ্মের শুরুতে গাছটির সবুজ পাতা অস্বাভাবিকভাবে ঝরে পড়তে দেখে স্থানীয়দের সন্দেহ হয়। সাধারণত যে সময়ে সিউলের চারপাশ সবুজে ভরে ওঠে, সেই সময়েই গাছটির পাতা শুকিয়ে মাটিতে পড়তে থাকে। বিষয়টি প্রথমে কৌতূহলের জন্ম দিলেও দ্রুত তা উদ্বেগে পরিণত হয়।

এরপর স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেরাই যেন গোয়েন্দার ভূমিকায় নামেন। গাছটির গোড়ার কাছে তারা ১০টি সাদা প্লাস্টিকের ফানেলের মতো বস্তু দেখতে পান। প্রথমে এগুলো গাছে প্রয়োজনীয় পুষ্টি দেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে বলে ধারণা করেছিলেন অনেকে। কিন্তু পরে বিষয়টি নিয়ে তাদের সন্দেহ বাড়তে থাকে।

স্থানীয় একটি বাড়ির নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজ খতিয়ে দেখতে গিয়ে তারা আরও অস্বাভাবিক দৃশ্য দেখতে পান। এপ্রিলের শেষ দিকে এক সকালে দুই ব্যক্তিকে সাদা গ্লাভস পরে গাছটির গোড়ার কাছে বসে ড্রিল ব্যবহার করতে দেখা যায়। তারা ঠিক কী করছিলেন, ফুটেজ দেখে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে বাসিন্দাদের সন্দেহ আরও গভীর হয়।

এরই মধ্যে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তারা জানতে পারেন, কাছের হোয়াঙ্কি জাদুঘর আগে ওই এলাকার কয়েকজন জমির মালিকের কাছে গাছটি সরিয়ে নেওয়ার অনুমতি চেয়েছিল।

জাদুঘরটির বাইরের ইটের দেয়ালটি গাছটির শিকড়ের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে—এমন দাবি করা হয়েছিল বলে জানান স্থানীয়রা। এরপর বাসিন্দাদের একটি অংশের ধারণা হয়, গাছটির গোড়ায় বসানো ফানেলগুলোর মাধ্যমে কোনো ধরনের আগাছানাশক বা গাছ মেরে ফেলার রাসায়নিক দেওয়া হয়ে থাকতে পারে।

গাছটি পরীক্ষা করতে আসা কয়েকজন গাছ বিশেষজ্ঞও বাসিন্দাদের সন্দেহের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখেন বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

একপর্যায়ে নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজ দেখার দিনই কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা চার পুলিশ কর্মকর্তাকে সঙ্গে নিয়ে হোয়াঙ্কি জাদুঘরে যান। বাসিন্দাদের দাবি, সেখানে এক কর্মী গাছটির সঙ্গে জাদুঘরের পক্ষের কোনো কর্মকাণ্ডের কথা স্বীকার করেছিলেন। তবে জাদুঘরটি পরে প্রকাশ্যে গাছটিতে আগাছানাশক প্রয়োগের অভিযোগ স্বীকার বা অস্বীকার—কোনোটিই করেনি এবং বিবিসির প্রশ্নেরও জবাব দেয়নি।

তবে মে মাসে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জাদুঘরটি জানায়, গিঙ্কো গাছটির শিকড়ের কারণে তাদের প্রাঙ্গণের দেয়াল ধসে পড়ার মতো অবস্থায় পৌঁছেছিল। এ বিষয়ে সমাধান চেয়ে ৪০টির বেশি সম্পত্তির মালিককে চিঠি পাঠানো হয়েছিল বলেও জানায় তারা। জাদুঘরের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো সাড়া না পাওয়ার পর তাদের কর্মীরা পরিস্থিতি সমাধানের চেষ্টা করেছিলেন। তবে ঠিক কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, তা তারা বিস্তারিত জানায়নি।

অন্যদিকে স্থানীয় পরিষদের এক প্রতিনিধি বিবিসিকে জানান, গত বছর করা পরিদর্শনে গিঙ্কো গাছটির সঙ্গে জাদুঘরের দেয়ালের ক্ষতির ‘অর্থপূর্ণ কোনো সম্পর্ক’ পাওয়া যায়নি। এমন কোনো সমস্যা থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যথাযথ ব্যবস্থা নিত এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে জানাত বলেও জানান তিনি।

স্থানীয় বাসিন্দারা এখন ফানেলগুলোর ভেতরে আসলে কী ছিল, তা জানতে চান। তাদের বিশ্বাস, সেখানে কোনো রাসায়নিক দেওয়া হয়ে থাকলে তা শনাক্ত করা গেলে গাছটিকে বাঁচানোর চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হতে পারে। এ ঘটনায় তারা জাদুঘরের পরিচালকের বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে অভিযোগও করেছেন। পুলিশ তদন্ত করছে বলে জানানো হলেও তদন্তের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

সবার ‘দাদু’ গিঙ্কো

বুয়াম-দং সিউলের ব্যস্ত নগরজীবনের মাঝেও তুলনামূলক শান্ত ও সবুজ একটি এলাকা। পাহাড়ঘেরা এই এলাকায় শিল্পকলা, ছোট ক্যাফে ও মনোরম পরিবেশের কারণে স্থানীয়দের পাশাপাশি পর্যটকদেরও যাতায়াত রয়েছে।

এলাকার এই গিঙ্কো গাছটি ব্যক্তিগত বাগান বা বনের গাছ নয়। রাস্তার পাশে সবার চোখের সামনে বেড়ে ওঠা এই গাছটিকে তাই স্থানীয়রা নিজেদের সম্পদ হিসেবে দেখেন।

চার বছর আগে এলাকায় এসে গাছটির প্রেমে পড়েছিলেন এক বাসিন্দা, যিনি প্রতিবেদনে ‘জুং’ নামে পরিচিত। নিরাপত্তার কারণে তার প্রকৃত নাম প্রকাশ করা হয়নি।

তার ভাষায়, বাড়ি ফেরার পথে তিনি গাছটির সঙ্গে কথা বলতেন—‘দাদু, আমি বাড়ি এসেছি’ কিংবা ‘দাদু, আমি বের হচ্ছি।’ তার কাছে গাছটি ছিল পুরো এলাকার একমাত্র এমন গাছ, যেটি যেন সবার।

এলাকার ৭৪ বছর বয়সী পার্ক জিওন-হির কাছে গাছটি আরও পুরোনো এক বন্ধুর মতো। ১০ বছর বয়সী কিম অন-ও প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার পথে গাছটির পাশ দিয়ে হাঁটে। তার জন্মের আগেও গাছটি সেখানে ছিল। গাছটি পড়ে যেতে পারে—এমন চিন্তাই তাকে কষ্ট দেয়।Cerbera odollam - Wikipedia

শিল্পীর স্মৃতির জাদুঘর ঘিরে অদ্ভুত অভিযোগ

হোয়াঙ্কি জাদুঘরটি ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি কোরিয়ার প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী ও বিমূর্ত শিল্পী কিম হোয়াঙ্কির স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত। অনেকেই তাকে ‘কোরিয়ার পিকাসো’ বলে অভিহিত করেন।

শিল্পী কিম হোয়াঙ্কির শিল্পে প্রকৃতি ছিল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জাদুঘরের স্থপতির ব্যাখ্যাতেও প্রকৃতির নানা উপাদান—চাঁদ, পাহাড়, মেঘ, পাথর ও গাছ—শিল্পীর কাজের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, কিম হোয়াঙ্কি ‘সু-হোয়া’ ছদ্মনামে প্রবন্ধ লিখতেন, যার অর্থ দাঁড়ায় ‘গাছের সঙ্গে কথোপকথন’।

এই কারণেই গাছটিকে ঘিরে তৈরি হওয়া অভিযোগ স্থানীয়দের কাছে আরও বেদনাদায়ক হয়ে উঠেছে। যে শিল্পীর স্মৃতিতে তৈরি জাদুঘর প্রকৃতির সৌন্দর্যকে ধারণ করে, সেই জাদুঘরের বিরুদ্ধেই এখন একটি গাছকে রাসায়নিক প্রয়োগ করে ধ্বংসের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। তবে অভিযোগটি এখনো প্রমাণিত হয়নি।

গাছ বাঁচাতে প্রার্থনা

গাছটির অবস্থা যত খারাপ হতে থাকে, স্থানীয়দের উদ্বেগও তত বাড়তে থাকে। প্রায় ২০ জন বাসিন্দা নিয়মিত গাছটির সামনে জড়ো হয়ে তার সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করেছেন।

কেউ কিম হোয়াঙ্কির লেখা পাঠ করেছেন, আবার স্থানীয় এক শামান গাছটির জন্য ‘নিরাময় আচার’ও পালন করেছেন। পরিবেশকর্মীরাও এই আন্দোলনে যুক্ত হয়েছেন। গাছটির সুরক্ষায় নাগরিকদের নগর গাছের অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার দাবিতে একটি আবেদনও শুরু হয়েছে।

গাছটি পরীক্ষা করা এক বৃক্ষবিশেষজ্ঞের মতে, গাছটি মৃত্যুর প্রায় ৯০ শতাংশ পথ এগিয়ে গেছে। ফলে গাছটিকে বাঁচানো এখন অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।

তবু আশা ছাড়েননি স্থানীয়রা। গাছের কাণ্ডে ঝুলছে শুভকামনার বার্তা, চলছে প্রার্থনা ও নানা প্রতীকী আয়োজন। কেউ কেউ হাত ধরে গাছের চারপাশে দাঁড়িয়ে পরিবেশগত নিরাময়ের প্রতীক হিসেবে একটি বিশেষ নৃত্যও করেছেন।

অসুস্থ গাছই যেন বদলে দিয়েছে মানুষগুলোকেও

এই পুরো ঘটনার মধ্যে আরেকটি মানবিক গল্পও তৈরি হয়েছে। গাছটিকে বাঁচানোর প্রচেষ্টায় এলাকার মানুষ একে অপরের আরও কাছাকাছি এসেছেন।

গাছটির জন্য কাজ করতে গিয়ে জুং প্রতিবেশীদের কাছ থেকে বাড়িতে রান্না করা খাবার পেয়েছেন। তিনিও অপরিচিত প্রতিবেশীদের জন্য সবজির স্যুপ রান্না করে দিয়েছেন।

জুং নিজেও গত শীতে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। হাঁটাচলা করতেও তার কষ্ট হতো। ভালো দিনগুলোতে তিনি গাছটির কাছে গিয়ে তার খসখসে কাণ্ড জড়িয়ে ধরতেন এবং মাটির গন্ধ নিতেন। তার ভাষায়, গাছটির অসুস্থতার মধ্য দিয়েই তিনি যেন আবার জীবনের দিকে ফিরতে শুরু করেন।

তিনি বলেন, গাছটির জন্য লড়াই করতে গিয়ে তার হতাশা ও অসহায়ত্বের অনুভূতি অনেকটাই দূর হয়ে গিয়েছিল। বরং গাছটি অসুস্থ হয়ে পড়ার কারণেই তিনি আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছিলেন।

শরৎ এসে সিউলের চারপাশ যখন হলুদ রঙে বদলে যাচ্ছে, তখন বুয়াম-দংয়ের একসময়ের গর্ব সেই গিঙ্কো গাছটির পাতাগুলো শুকিয়ে বাদামি হয়ে গেছে।

তারপরও স্থানীয়দের আশা—হয়তো কোনো অলৌকিকভাবে গাছটি আবার বেঁচে উঠবে। তারা এমন একটি শরৎ কল্পনা করতে পারছেন না, যখন এই গাছটির নিচে দাঁড়িয়ে তার সোনালি পাতায় ভরা সৌন্দর্য দেখবেন না।

একসময় যে গাছটি নীরবে তাদের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল, এখন সেই গাছের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে পুরো একটি neighbourhood—একটি পুরোনো গাছকে বাঁচানোর আশায়, আর নিজেদের মধ্যকার এক অদৃশ্য বন্ধনকে ধরে রাখার জন্য।