০১:১৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ফাঁদে আমেরিকা: দ্রুত বিজয়ের ধারণা কি বদলাতে হবে? শত বছর পর নতুন বন্য বিড়ালের সন্ধান, বলিভিয়ার জঙ্গলে মিলল ক্ষুদ্র প্রজাতি টানা বৃষ্টিতে ঢাকার সড়কে জলাবদ্ধতা, চরম দুর্ভোগে অফিসগামী ও শিক্ষার্থীরা বৃষ্টিতে ঢাকার বাতাসে স্বস্তি, নামল দূষণের মাত্রা দুবাইয়ের নতুন জলশহরে বদলে যাচ্ছে বিলাসী জীবনের ধারণা, ৩ বেডরুমের অ্যাপার্টমেন্টে তারই ইঙ্গিত জাঞ্জিবারে দ্বিতীয় ‘রাশিদ ভিলেজ’ প্রকল্প চালুর নির্দেশ শেখ হামদানের মস্কো অঞ্চলে ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় নিহত ২, রুশ রাজধানীর তেল শোধনাগারেও আঘাত ভারত-আমিরাত সম্পর্ক আরও জোরদারে মোদি-শেখ মোহামেদের আলোচনা দুবাইয়ের ফ্যাশনে নতুন মোড়, শোর চেয়ে এখন বড় হচ্ছে ব্যবসা ম্যাকলমোর বিতর্কে অবস্থান বদল, কনসার্টে ক্ষমা চাইলেন এড শিরান

মরক্কোর রাজা ষষ্ঠ মুহাম্মদের দুর্বল হচ্ছে শাসন, বাড়ছে অনাস্থা

মরক্কোর রাজা ষষ্ঠ মুহাম্মদ দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে দেশ শাসন করছেন। এই সময়ে দেশটি অর্থনীতি, অবকাঠামো ও শিল্পায়নের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখিয়েছে। কিন্তু রাজপরিবারের জৌলুশের আড়ালে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা বাড়ছে। একই সঙ্গে রাজতন্ত্রের ভেতরের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং রাজার শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে নানা আলোচনা তাঁর শাসনকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।

এর সবচেয়ে নাটকীয় উদাহরণ দেখা যায় গত ৩০ জুলাই ‘সিংহাসন দিবস’-এ। ওই দিন রাজা মদিনা শহরের কাছাকাছি উপকূলীয় অবকাশকেন্দ্র মদিক থেকে একটি প্রায় জনশূন্য মহাসড়ক দিয়ে রাজকীয় বহরে করে অনুষ্ঠানে যান। সেখানে অভিজাত শ্রেণির সদস্যরা তাঁর হাতে চুম্বন করে আনুগত্য প্রদর্শন করেন। অথচ একই সময়ে বিপরীত দিকে হাজার হাজার দরিদ্র মরক্কোর নাগরিক ইউরোপে যাওয়ার আশায় স্পেনের নিয়ন্ত্রিত সেউতা অঞ্চলের দিকে ছুটছিলেন।

অনলাইনে সেউতার প্রবেশদ্বার খুলে দেওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সেখানে মানুষের ঢল নামে। ৭০ হাজারের বেশি মানুষ, যাদের অধিকাংশই মরক্কোর নাগরিক, ইউরোপে যাওয়ার জন্য ঝুঁকি নেন। এ যাত্রায় প্রায় ১০০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। রাজতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক জাঁকজমক আর সাধারণ মানুষের দেশ ছাড়ার আকাঙ্ক্ষার এই বৈপরীত্য মরক্কোর বর্তমান বাস্তবতার একটি কঠিন ছবি তুলে ধরে।

উন্নয়নের আড়ালে বাড়ছে হতাশা

কাগজে-কলমে মরক্কো আরব বিশ্বের স্থিতিশীলতা ও আধুনিকায়নের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। দেশটিতে গাড়ি শিল্প দ্রুত বাড়ছে। উচ্চগতির রেলপথ সম্প্রসারিত হচ্ছে। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের সবচেয়ে বড় বন্দরও মরক্কোতে গড়ে উঠেছে। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে দেশটি সফল হয়েছে এবং ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কের ফলে দেশটির অস্ত্রশিল্পও সম্প্রসারিত হচ্ছে।

Morocco's King Muhammad VI faces crisis as thousands flee to Ceuta

মরক্কোর রাজতন্ত্রের ইতিহাসও দীর্ঘ। প্রায় চার শতাব্দী ধরে একই রাজপরিবারের শাসন টিকে আছে। উত্তরাধিকারও নির্ধারিত। ফলে বাইরে থেকে দেশটিকে রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল মনে হতে পারে।

কিন্তু বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে। মরক্কোর প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষের একটি বড় অংশ মনে করছে, রাজা ষষ্ঠ মুহাম্মদের অধীনে তাদের ভবিষ্যৎ আগের মতো আশাব্যঞ্জক নয়। রাজা ২০৩০ সালের বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য স্টেডিয়ামের মতো বড় প্রকল্পে বিপুল অর্থ ব্যয় করছেন, কিন্তু হাসপাতাল ও স্কুলের মতো মৌলিক সেবায় একই মাত্রার মনোযোগ নেই—এমন অভিযোগ রয়েছে।

তরুণদের বেকারত্ব পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তরুণ কর্মহীন। ফলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সরকারি চিত্রের সঙ্গে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতার ব্যবধান ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।

দুর্বল হয়ে পড়ছে রাজনৈতিক ব্যবস্থা

মরক্কোর সংবাদমাধ্যমও আগের মতো স্বাধীনভাবে সরকারের সমালোচনা করতে পারছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের প্রভাবের কারণে একসময় তুলনামূলকভাবে সমালোচনামুখর সংবাদমাধ্যম অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছে। সরকারের সমালোচকদের বিরুদ্ধে যৌন অপরাধের অভিযোগ আনা এবং তাদের কারাগারে পাঠানোর ঘটনাও বিতর্ক তৈরি করেছে।

রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থাও দুর্বল। ২৩ সেপ্টেম্বরের সংসদীয় নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ খুব কম—এমনকি অনেক নাগরিক নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা দলগুলোর পরিচয়ও ভালোভাবে জানেন না। এর পেছনে একটি বড় কারণ হলো, দেশের প্রকৃত ক্ষমতার কেন্দ্র সংসদের বাইরে অবস্থান করছে বলে অনেকের ধারণা।

ফলে ভোটের মাধ্যমে পরিবর্তন আনার পরিবর্তে অনেকে দেশ ছেড়ে যাওয়ার পথ বেছে নিচ্ছেন। মানুষের এই ‘পা দিয়ে ভোট দেওয়া’ মরক্কোর রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে উঠেছে।

রাজার অসুস্থতা ঘিরে অনিশ্চয়তা

ষষ্ঠ মুহাম্মদ বরাবরই অনেকটা অন্তর্মুখী জীবনযাপন করেছেন। কয়েক বছর আগে তিনি রাজধানী রাবাতের রাজদরবার থেকে দূরে উত্তরের দিকে চলে যান। সেখানে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও কিকবক্সার আবুবকর আবু আজাইতার সঙ্গে সময় কাটানোর কথাও উঠে এসেছে।

King Muhammad VI (Facebook/Tetouan Regional Council)

৬৩ বছর বয়সী রাজাকে সাম্প্রতিক সময়ে শারীরিকভাবে দুর্বল দেখাচ্ছে বলে তাঁর সঙ্গে দেখা করা ব্যক্তিদের উদ্ধৃত করে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তাঁর হাত নীলচে, আঙুলের গঠন অস্বাভাবিক এবং চোখের চারপাশ ফোলা—এমন বর্ণনাও এসেছে। এসব দাবির স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন হলেও রাজার দীর্ঘ সময়ের অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

এর মধ্যে একের পর এক সংকট মোকাবিলা করতে হয়েছে মরক্কোকে। ২০১৬ সালে দেশের উত্তরে বড় ধরনের গণআন্দোলন হয়েছিল। ২০২৩ সালের ভূমিকম্পে কয়েক লাখ মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েন। সর্বশেষ সেউতামুখী মানুষের ব্যাপক যাত্রা আবারও সরকারের সক্ষমতা ও জনপ্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

কিন্তু সংকটের সময়ে রাজপ্রাসাদ থেকে স্পষ্ট নেতৃত্বের অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আর সেই শূন্যতায় নানা ধরনের ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ছড়িয়ে পড়ছে।

স্পেনকে ঘিরে রহস্য

সেউতার দিকে মানুষের ঢল নামার পর মরক্কোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নানা দাবি সামনে এসেছে। কেউ কেউ বলছেন, সীমান্তে দায়িত্ব পালনকারী নিরাপত্তা বাহিনীর একটি অংশকে সিংহাসন দিবসের অনুষ্ঠানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। আবার এমন দাবিও রয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্পেনের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে মরক্কোকে ব্যবহার করছেন।

আরও একটি তত্ত্ব হলো, মরক্কোর জাতীয়তাবাদীরা দেশের উত্তরে স্পেনের নিয়ন্ত্রণাধীন ভূখণ্ডগুলোর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কেউ কেউ মনে করেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছ থেকে আরও বেশি আর্থিক সহায়তা আদায়ের জন্য মরক্কো অভিবাসনকে চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।

তবে এসব দাবির অধিকাংশই যাচাই করা কঠিন। মরক্কোর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাঠামো, যাকে ‘মাখজেন’ নামে অভিহিত করা হয়, তার ভেতরের একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে সবচেয়ে গুরুতর যে অভিযোগটি উঠে এসেছে, তা হলো রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য ফাঁসকারী এক ব্যক্তিকে ঘিরে বিরোধ।

গোয়েন্দা সংস্থা ও ইসরায়েলি নজরদারির অভিযোগ

প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন ও মরক্কোর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার অভ্যন্তরের সূত্রের দাবি অনুযায়ী, দেশটির অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থার একজন কর্মী দেশ ছেড়ে পালানোর সময় সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের একটি তালিকা সঙ্গে নিয়ে যান। অভিযোগ রয়েছে, ইসরায়েলি নজরদারি প্রযুক্তি ব্যবহার করে ওই ব্যক্তিদের ওপর নজরদারি চালানো হয়েছিল।

‘বিউরো ২১’ নামে পরিচিত একটি অপারেশন কক্ষ থেকে মরক্কো ও ইউরোপের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মোবাইল ফোন ও নিরাপত্তা ক্যামেরায় নজরদারি চালানো হতো বলেও দাবি করা হয়েছে। ওই ব্যবস্থায় ইসরায়েলি এজেন্টদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে। এমনকি নজরদারির লক্ষ্যবস্তুদের মধ্যে রাজা নিজেও ছিলেন—এমন দাবিও করা হয়েছে।

‘সাফির’ বা ‘কূটনীতিক’ ছদ্মনামে পরিচিত ওই তথ্যফাঁসকারী প্রথমে তিউনিসিয়া, পরে ফ্রান্স হয়ে স্পেনে পৌঁছান। স্পেন তাঁকে সুরক্ষা দেওয়ায় মরক্কোর কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

King Mohammed VI reaffirms Morocco's unity and sovereignty over the Sahara

উত্তরাধিকার ঘিরে ক্ষমতার লড়াই

রাজা ষষ্ঠ মুহাম্মদের শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগের সঙ্গে সঙ্গে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে রাজতন্ত্রের উত্তরাধিকার প্রশ্ন। মরক্কোর নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর ভেতরে ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়েও টানাপোড়েন বাড়ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এই দ্বন্দ্বের একটি বড় অংশ পুরোনো ক্ষমতাকেন্দ্রের সঙ্গে রাজপরিবারের পরবর্তী প্রজন্মকে ঘিরে। রাজা ষষ্ঠ মুহাম্মদের শৈশবের বন্ধু ও প্রধান উপদেষ্টা ফুয়াদ আলি এল হিম্মার নেতৃত্বাধীন পুরোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সঙ্গে রাজপুত্র হাসান ও তাঁর মা সালমার সম্পর্ক টানাপোড়েনপূর্ণ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

রাজা ও সালমার ২০১৮ সালে বিচ্ছেদের পর হিম্মা রাজার নির্দেশে সালমাকে প্রায় গৃহবন্দি অবস্থায় রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু তাঁর ছেলে হাসান ভবিষ্যতে রাজা হলে সালমা রাজমাতা হবেন। তখন পুরোনো ক্ষমতাকেন্দ্রের বিরুদ্ধে তিনি প্রতিশোধ নিতে পারেন—এমন আশঙ্কা হিম্মার রয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

সামনে বড় পরীক্ষা

মরক্কোর রাজতন্ত্র এখন এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাফল্য, সামাজিক বৈষম্য, তরুণদের বেকারত্ব, রাজনৈতিক অনাস্থা, সংবাদমাধ্যমের ওপর চাপ এবং রাজপরিবারের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব—সবকিছু একই সঙ্গে সামনে আসছে।

দেশটির রাজতন্ত্র এখনো শক্তিশালী এবং উত্তরাধিকার কাঠামোও স্পষ্ট। কিন্তু সাধারণ মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা বাড়তে থাকলে শুধু রাজকীয় অনুষ্ঠান ও বড় অবকাঠামো প্রকল্প দিয়ে সেই আস্থার সংকট সামাল দেওয়া কঠিন হতে পারে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই রাজা ষষ্ঠ মুহাম্মদের ব্যক্তিগত শাসনক্ষমতা নয়, বরং তাঁর পর মরক্কোর ক্ষমতার কাঠামো কোন পথে যাবে। রাজপ্রাসাদের ভেতরের প্রতিদ্বন্দ্বিতা যদি আরও তীব্র হয় এবং সাধারণ মানুষের অনাস্থা বাড়তে থাকে, তাহলে দীর্ঘদিনের স্থিতিশীলতার জন্য পরিচিত মরক্কোর রাজতন্ত্র নতুন এক অনিশ্চিত অধ্যায়ে প্রবেশ করতে পারে।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ফাঁদে আমেরিকা: দ্রুত বিজয়ের ধারণা কি বদলাতে হবে?

মরক্কোর রাজা ষষ্ঠ মুহাম্মদের দুর্বল হচ্ছে শাসন, বাড়ছে অনাস্থা

১১:৩৮:০৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মরক্কোর রাজা ষষ্ঠ মুহাম্মদ দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে দেশ শাসন করছেন। এই সময়ে দেশটি অর্থনীতি, অবকাঠামো ও শিল্পায়নের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখিয়েছে। কিন্তু রাজপরিবারের জৌলুশের আড়ালে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা বাড়ছে। একই সঙ্গে রাজতন্ত্রের ভেতরের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং রাজার শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে নানা আলোচনা তাঁর শাসনকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।

এর সবচেয়ে নাটকীয় উদাহরণ দেখা যায় গত ৩০ জুলাই ‘সিংহাসন দিবস’-এ। ওই দিন রাজা মদিনা শহরের কাছাকাছি উপকূলীয় অবকাশকেন্দ্র মদিক থেকে একটি প্রায় জনশূন্য মহাসড়ক দিয়ে রাজকীয় বহরে করে অনুষ্ঠানে যান। সেখানে অভিজাত শ্রেণির সদস্যরা তাঁর হাতে চুম্বন করে আনুগত্য প্রদর্শন করেন। অথচ একই সময়ে বিপরীত দিকে হাজার হাজার দরিদ্র মরক্কোর নাগরিক ইউরোপে যাওয়ার আশায় স্পেনের নিয়ন্ত্রিত সেউতা অঞ্চলের দিকে ছুটছিলেন।

অনলাইনে সেউতার প্রবেশদ্বার খুলে দেওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সেখানে মানুষের ঢল নামে। ৭০ হাজারের বেশি মানুষ, যাদের অধিকাংশই মরক্কোর নাগরিক, ইউরোপে যাওয়ার জন্য ঝুঁকি নেন। এ যাত্রায় প্রায় ১০০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। রাজতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক জাঁকজমক আর সাধারণ মানুষের দেশ ছাড়ার আকাঙ্ক্ষার এই বৈপরীত্য মরক্কোর বর্তমান বাস্তবতার একটি কঠিন ছবি তুলে ধরে।

উন্নয়নের আড়ালে বাড়ছে হতাশা

কাগজে-কলমে মরক্কো আরব বিশ্বের স্থিতিশীলতা ও আধুনিকায়নের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। দেশটিতে গাড়ি শিল্প দ্রুত বাড়ছে। উচ্চগতির রেলপথ সম্প্রসারিত হচ্ছে। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের সবচেয়ে বড় বন্দরও মরক্কোতে গড়ে উঠেছে। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে দেশটি সফল হয়েছে এবং ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কের ফলে দেশটির অস্ত্রশিল্পও সম্প্রসারিত হচ্ছে।

Morocco's King Muhammad VI faces crisis as thousands flee to Ceuta

মরক্কোর রাজতন্ত্রের ইতিহাসও দীর্ঘ। প্রায় চার শতাব্দী ধরে একই রাজপরিবারের শাসন টিকে আছে। উত্তরাধিকারও নির্ধারিত। ফলে বাইরে থেকে দেশটিকে রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল মনে হতে পারে।

কিন্তু বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে। মরক্কোর প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষের একটি বড় অংশ মনে করছে, রাজা ষষ্ঠ মুহাম্মদের অধীনে তাদের ভবিষ্যৎ আগের মতো আশাব্যঞ্জক নয়। রাজা ২০৩০ সালের বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য স্টেডিয়ামের মতো বড় প্রকল্পে বিপুল অর্থ ব্যয় করছেন, কিন্তু হাসপাতাল ও স্কুলের মতো মৌলিক সেবায় একই মাত্রার মনোযোগ নেই—এমন অভিযোগ রয়েছে।

তরুণদের বেকারত্ব পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তরুণ কর্মহীন। ফলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সরকারি চিত্রের সঙ্গে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতার ব্যবধান ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।

দুর্বল হয়ে পড়ছে রাজনৈতিক ব্যবস্থা

মরক্কোর সংবাদমাধ্যমও আগের মতো স্বাধীনভাবে সরকারের সমালোচনা করতে পারছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের প্রভাবের কারণে একসময় তুলনামূলকভাবে সমালোচনামুখর সংবাদমাধ্যম অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছে। সরকারের সমালোচকদের বিরুদ্ধে যৌন অপরাধের অভিযোগ আনা এবং তাদের কারাগারে পাঠানোর ঘটনাও বিতর্ক তৈরি করেছে।

রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থাও দুর্বল। ২৩ সেপ্টেম্বরের সংসদীয় নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ খুব কম—এমনকি অনেক নাগরিক নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা দলগুলোর পরিচয়ও ভালোভাবে জানেন না। এর পেছনে একটি বড় কারণ হলো, দেশের প্রকৃত ক্ষমতার কেন্দ্র সংসদের বাইরে অবস্থান করছে বলে অনেকের ধারণা।

ফলে ভোটের মাধ্যমে পরিবর্তন আনার পরিবর্তে অনেকে দেশ ছেড়ে যাওয়ার পথ বেছে নিচ্ছেন। মানুষের এই ‘পা দিয়ে ভোট দেওয়া’ মরক্কোর রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে উঠেছে।

রাজার অসুস্থতা ঘিরে অনিশ্চয়তা

ষষ্ঠ মুহাম্মদ বরাবরই অনেকটা অন্তর্মুখী জীবনযাপন করেছেন। কয়েক বছর আগে তিনি রাজধানী রাবাতের রাজদরবার থেকে দূরে উত্তরের দিকে চলে যান। সেখানে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও কিকবক্সার আবুবকর আবু আজাইতার সঙ্গে সময় কাটানোর কথাও উঠে এসেছে।

King Muhammad VI (Facebook/Tetouan Regional Council)

৬৩ বছর বয়সী রাজাকে সাম্প্রতিক সময়ে শারীরিকভাবে দুর্বল দেখাচ্ছে বলে তাঁর সঙ্গে দেখা করা ব্যক্তিদের উদ্ধৃত করে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তাঁর হাত নীলচে, আঙুলের গঠন অস্বাভাবিক এবং চোখের চারপাশ ফোলা—এমন বর্ণনাও এসেছে। এসব দাবির স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন হলেও রাজার দীর্ঘ সময়ের অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

এর মধ্যে একের পর এক সংকট মোকাবিলা করতে হয়েছে মরক্কোকে। ২০১৬ সালে দেশের উত্তরে বড় ধরনের গণআন্দোলন হয়েছিল। ২০২৩ সালের ভূমিকম্পে কয়েক লাখ মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েন। সর্বশেষ সেউতামুখী মানুষের ব্যাপক যাত্রা আবারও সরকারের সক্ষমতা ও জনপ্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

কিন্তু সংকটের সময়ে রাজপ্রাসাদ থেকে স্পষ্ট নেতৃত্বের অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আর সেই শূন্যতায় নানা ধরনের ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ছড়িয়ে পড়ছে।

স্পেনকে ঘিরে রহস্য

সেউতার দিকে মানুষের ঢল নামার পর মরক্কোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নানা দাবি সামনে এসেছে। কেউ কেউ বলছেন, সীমান্তে দায়িত্ব পালনকারী নিরাপত্তা বাহিনীর একটি অংশকে সিংহাসন দিবসের অনুষ্ঠানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। আবার এমন দাবিও রয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্পেনের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে মরক্কোকে ব্যবহার করছেন।

আরও একটি তত্ত্ব হলো, মরক্কোর জাতীয়তাবাদীরা দেশের উত্তরে স্পেনের নিয়ন্ত্রণাধীন ভূখণ্ডগুলোর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কেউ কেউ মনে করেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছ থেকে আরও বেশি আর্থিক সহায়তা আদায়ের জন্য মরক্কো অভিবাসনকে চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।

তবে এসব দাবির অধিকাংশই যাচাই করা কঠিন। মরক্কোর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাঠামো, যাকে ‘মাখজেন’ নামে অভিহিত করা হয়, তার ভেতরের একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে সবচেয়ে গুরুতর যে অভিযোগটি উঠে এসেছে, তা হলো রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য ফাঁসকারী এক ব্যক্তিকে ঘিরে বিরোধ।

গোয়েন্দা সংস্থা ও ইসরায়েলি নজরদারির অভিযোগ

প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন ও মরক্কোর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার অভ্যন্তরের সূত্রের দাবি অনুযায়ী, দেশটির অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থার একজন কর্মী দেশ ছেড়ে পালানোর সময় সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের একটি তালিকা সঙ্গে নিয়ে যান। অভিযোগ রয়েছে, ইসরায়েলি নজরদারি প্রযুক্তি ব্যবহার করে ওই ব্যক্তিদের ওপর নজরদারি চালানো হয়েছিল।

‘বিউরো ২১’ নামে পরিচিত একটি অপারেশন কক্ষ থেকে মরক্কো ও ইউরোপের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মোবাইল ফোন ও নিরাপত্তা ক্যামেরায় নজরদারি চালানো হতো বলেও দাবি করা হয়েছে। ওই ব্যবস্থায় ইসরায়েলি এজেন্টদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে। এমনকি নজরদারির লক্ষ্যবস্তুদের মধ্যে রাজা নিজেও ছিলেন—এমন দাবিও করা হয়েছে।

‘সাফির’ বা ‘কূটনীতিক’ ছদ্মনামে পরিচিত ওই তথ্যফাঁসকারী প্রথমে তিউনিসিয়া, পরে ফ্রান্স হয়ে স্পেনে পৌঁছান। স্পেন তাঁকে সুরক্ষা দেওয়ায় মরক্কোর কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

King Mohammed VI reaffirms Morocco's unity and sovereignty over the Sahara

উত্তরাধিকার ঘিরে ক্ষমতার লড়াই

রাজা ষষ্ঠ মুহাম্মদের শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগের সঙ্গে সঙ্গে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে রাজতন্ত্রের উত্তরাধিকার প্রশ্ন। মরক্কোর নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর ভেতরে ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়েও টানাপোড়েন বাড়ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এই দ্বন্দ্বের একটি বড় অংশ পুরোনো ক্ষমতাকেন্দ্রের সঙ্গে রাজপরিবারের পরবর্তী প্রজন্মকে ঘিরে। রাজা ষষ্ঠ মুহাম্মদের শৈশবের বন্ধু ও প্রধান উপদেষ্টা ফুয়াদ আলি এল হিম্মার নেতৃত্বাধীন পুরোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সঙ্গে রাজপুত্র হাসান ও তাঁর মা সালমার সম্পর্ক টানাপোড়েনপূর্ণ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

রাজা ও সালমার ২০১৮ সালে বিচ্ছেদের পর হিম্মা রাজার নির্দেশে সালমাকে প্রায় গৃহবন্দি অবস্থায় রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু তাঁর ছেলে হাসান ভবিষ্যতে রাজা হলে সালমা রাজমাতা হবেন। তখন পুরোনো ক্ষমতাকেন্দ্রের বিরুদ্ধে তিনি প্রতিশোধ নিতে পারেন—এমন আশঙ্কা হিম্মার রয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

সামনে বড় পরীক্ষা

মরক্কোর রাজতন্ত্র এখন এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাফল্য, সামাজিক বৈষম্য, তরুণদের বেকারত্ব, রাজনৈতিক অনাস্থা, সংবাদমাধ্যমের ওপর চাপ এবং রাজপরিবারের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব—সবকিছু একই সঙ্গে সামনে আসছে।

দেশটির রাজতন্ত্র এখনো শক্তিশালী এবং উত্তরাধিকার কাঠামোও স্পষ্ট। কিন্তু সাধারণ মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা বাড়তে থাকলে শুধু রাজকীয় অনুষ্ঠান ও বড় অবকাঠামো প্রকল্প দিয়ে সেই আস্থার সংকট সামাল দেওয়া কঠিন হতে পারে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই রাজা ষষ্ঠ মুহাম্মদের ব্যক্তিগত শাসনক্ষমতা নয়, বরং তাঁর পর মরক্কোর ক্ষমতার কাঠামো কোন পথে যাবে। রাজপ্রাসাদের ভেতরের প্রতিদ্বন্দ্বিতা যদি আরও তীব্র হয় এবং সাধারণ মানুষের অনাস্থা বাড়তে থাকে, তাহলে দীর্ঘদিনের স্থিতিশীলতার জন্য পরিচিত মরক্কোর রাজতন্ত্র নতুন এক অনিশ্চিত অধ্যায়ে প্রবেশ করতে পারে।