রাশিয়ায় তিন দিনব্যাপী সংসদ নির্বাচন রোববার শেষ দিনে পৌঁছেছে। ক্ষমতাসীন ইউনাইটেড রাশিয়া পার্টি এবারও স্টেট ডুমায় বড় ধরনের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এই নির্বাচন শুধু সংসদের আসন নির্ধারণের ভোট নয়। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এটিকে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রতি রুশ জনগণের সমর্থনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে তুলে ধরেছেন।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর এটিই রাশিয়ার প্রথম সংসদ নির্বাচন। এরই মধ্যে যুদ্ধ পঞ্চম বছরে গড়িয়েছে। সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার কোনো স্পষ্ট লক্ষণ নেই। দীর্ঘ যুদ্ধের প্রভাব এখন রাশিয়ার অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনেও অনুভূত হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে নির্বাচনের ফলাফল পুতিন সরকারের জন্য বিশেষ রাজনৈতিক গুরুত্ব বহন করছে। ইউনাইটেড রাশিয়া বড় ব্যবধানে জয়ী হলে ক্রেমলিন সেটিকে সরকারের নীতি এবং ইউক্রেন যুদ্ধে রুশ সেনাদের প্রতি জনগণের সমর্থনের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরতে পারে।
বিরোধীদের জন্য কতটা সুযোগ?
এবারের নির্বাচনে অধিকাংশ যুদ্ধবিরোধী প্রার্থী ব্যালটে জায়গা পাননি। উদারপন্থী ইয়াবলোকো পার্টির কিছু প্রার্থী অবশ্য নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। তবে নির্বাচনের আগে দলটির দুই জ্যেষ্ঠ নেতাকে যুদ্ধ নিয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে অবৈধ হিসেবে বিবেচিত মন্তব্যের কারণে দীর্ঘ কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় দলটির প্রার্থীদের মধ্যেও নিরাপত্তা ও স্বাধীনভাবে প্রচার চালানো নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।

রাশিয়ায় সেনাবাহিনীকে ‘অসম্মান’ করা কিংবা কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর জন্য দীর্ঘ কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। ক্রেমলিনের বক্তব্য, ইউক্রেন যুদ্ধের সময় জাতীয় ঐক্য বজায় রাখা জরুরি। মস্কো এই সংঘাতকে রাশিয়া ও পশ্চিমাদের মধ্যে বৃহত্তর অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে তুলে ধরে আসছে।
তবে সমালোচকদের মতে, যুদ্ধের বিরোধিতা করা রাজনৈতিক শক্তিগুলোর জন্য সীমিত সুযোগ থাকায় এবারের নির্বাচনে প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিসরও সংকুচিত হয়েছে।
যুদ্ধের ক্লান্তি কি ভোটে দেখা যাবে?
ফলাফল নিয়ে বড় ধরনের চমকের সম্ভাবনা কম হলেও ভোটের ভেতরের ছোট পরিবর্তনও ক্রেমলিনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
বার্লিনভিত্তিক নেস্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মতে, দীর্ঘ যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব রাশিয়ার মানুষের মধ্যে ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। অর্থনৈতিক চাপ, উদ্বেগ এবং যুদ্ধ নিয়ে জমে থাকা হতাশা কিছু ভোটারকে ক্ষমতাসীন দলের বাইরে নিয়ে যেতে পারে।
বিশেষ করে কমিউনিস্ট পার্টি এবং নিউ পিপল পার্টি কিছু অতিরিক্ত ভোট পেতে পারে বলে প্রতিষ্ঠানটি মনে করছে। তবে বড় ইস্যুগুলোতে এই দুই দলই সাধারণত ইউনাইটেড রাশিয়ার সঙ্গে ভোট দেয়।
তাই তাদের ভোট বাড়লেও সেটিকে সরাসরি পুতিনবিরোধী রাজনৈতিক পরিবর্তন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে রুশ ভোটারদের মনোভাবের কিছু পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে।
পুতিনের কাছে ভোটের আলাদা অর্থ
নির্বাচনের আগে জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক টেলিভিশন ভাষণে পুতিন ভোটকে সরাসরি ইউক্রেন যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত করেন।
তার বক্তব্য, ভোটারদের সিদ্ধান্ত আবারও দেখাবে যে রাশিয়ার লাখ লাখ মানুষ ইউক্রেনে লড়াইরত রুশ সেনাদের পাশে রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি রুশ জনগণকে অভিন্ন মূল্যবোধ, ইতিহাস ও দেশপ্রেমের মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।
এর মাধ্যমে ক্রেমলিন নির্বাচনের ফলকে শুধু সংসদীয় সংখ্যার হিসাব হিসেবে নয়, যুদ্ধের প্রতি জাতীয় সমর্থনের একটি রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছে।
যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, এই বার্তাটির গুরুত্বও তত বাড়ছে। কারণ দীর্ঘ সংঘাতের অর্থনৈতিক চাপ এবং মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে এর প্রভাবের মধ্যেও সরকারকে দেখাতে হবে যে দেশের বৃহৎ অংশ এখনো তার নীতির পেছনে রয়েছে।
নির্বাচন ঘিরে ইউক্রেনের অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ
ভোটের মধ্যেই ইউক্রেনের বিরুদ্ধে নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলেছেন পুতিন। তিনি দাবি করেন, ইউক্রেনের হামলায় রাশিয়ার নিয়ন্ত্রিত জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলে একজন নির্বাচনী কর্মকর্তা এলেনা আস্তানিনা নিহত হয়েছেন।
তবে হামলার বিস্তারিত তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স। কিয়েভের পক্ষ থেকেও তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
এর পাশাপাশি রুশ নির্বাচনী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মস্কোর অনলাইন ভোটিং ব্যবস্থাও সাইবার হামলার শিকার হয়েছে।
ইউক্রেন সামরিক আইন জারি থাকায় নিজ দেশে নির্বাচন স্থগিত রেখেছে। কিয়েভ রাশিয়ার এই ভোটকে ‘ছদ্ম নির্বাচন’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
এসব ঘটনা দেখিয়ে দেয়, রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও ইউক্রেন যুদ্ধ কতটা গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে। নির্বাচন, নিরাপত্তা, সাইবার হামলা এবং বিরোধী রাজনীতি—সবকিছুই এখন বৃহত্তর যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে দেখা হচ্ছে।
ফলের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে ভোটের বার্তা
রোববার গ্রিনিচ মান সময় অনুযায়ী প্রায় সন্ধ্যা ৬টা থেকে প্রাথমিক ফল প্রকাশ শুরু হওয়ার কথা। সোমবার আরও পূর্ণাঙ্গ ফল পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ইউনাইটেড রাশিয়া প্রত্যাশিতভাবেই বড় জয় পেলে সংসদে পুতিন সরকারের অবস্থান শক্ত থাকবে। কিন্তু এই নির্বাচনের রাজনৈতিক অর্থ শুধু কে কতটি আসন পেল, তা দিয়ে বোঝা যাবে না।
ভোটারদের অংশগ্রহণ কতটা হলো, ইউনাইটেড রাশিয়া কত শতাংশ ভোট পেল এবং অন্য দলগুলো কতটা ভোট টানতে পারল—এসব তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বিশেষ করে দীর্ঘ যুদ্ধের পঞ্চম বছরে এসে রুশ সমাজে অর্থনৈতিক চাপ ও যুদ্ধক্লান্তি কতটা তৈরি হয়েছে, তার কিছু ইঙ্গিত মিলতে পারে ভোটের ফল ও অংশগ্রহণের পরিসংখ্যানে।
অর্থাৎ, রাশিয়ার এবারের সংসদ নির্বাচন একদিকে স্টেট ডুমার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামো নির্ধারণ করবে, অন্যদিকে ক্রেমলিনের জন্য এটি ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে জনগণের মনোভাব তুলে ধরার একটি মঞ্চ।
ইউনাইটেড রাশিয়ার জয় প্রত্যাশিত হলেও, ভোটের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ছোট পরিবর্তনগুলোই হয়তো বলে দেবে—যুদ্ধের দীর্ঘ ছায়ার নিচে রুশ জনগণের মন কতটা একই জায়গায় রয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















