০১:২০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ফাঁদে আমেরিকা: দ্রুত বিজয়ের ধারণা কি বদলাতে হবে? শত বছর পর নতুন বন্য বিড়ালের সন্ধান, বলিভিয়ার জঙ্গলে মিলল ক্ষুদ্র প্রজাতি টানা বৃষ্টিতে ঢাকার সড়কে জলাবদ্ধতা, চরম দুর্ভোগে অফিসগামী ও শিক্ষার্থীরা বৃষ্টিতে ঢাকার বাতাসে স্বস্তি, নামল দূষণের মাত্রা দুবাইয়ের নতুন জলশহরে বদলে যাচ্ছে বিলাসী জীবনের ধারণা, ৩ বেডরুমের অ্যাপার্টমেন্টে তারই ইঙ্গিত জাঞ্জিবারে দ্বিতীয় ‘রাশিদ ভিলেজ’ প্রকল্প চালুর নির্দেশ শেখ হামদানের মস্কো অঞ্চলে ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় নিহত ২, রুশ রাজধানীর তেল শোধনাগারেও আঘাত ভারত-আমিরাত সম্পর্ক আরও জোরদারে মোদি-শেখ মোহামেদের আলোচনা দুবাইয়ের ফ্যাশনে নতুন মোড়, শোর চেয়ে এখন বড় হচ্ছে ব্যবসা ম্যাকলমোর বিতর্কে অবস্থান বদল, কনসার্টে ক্ষমা চাইলেন এড শিরান

ইউক্রেন যুদ্ধে যৌন সহিংসতার ভয়াবহ চিত্র, জাতিসংঘের নথিতে ৮৯% অভিযোগ রাশিয়ার বিরুদ্ধে

ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে যৌন সহিংসতার ভয়াবহ ও বিস্তৃত চিত্র উঠে এসেছে জাতিসংঘের নতুন এক প্রতিবেদনে। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর (ওএইচসিএইচআর) জানিয়েছে, ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত তারা সংঘাত-সংশ্লিষ্ট যৌন সহিংসতার ১ হাজার ৪টি ঘটনা যাচাই করেছে। এর মধ্যে ৮৯ শতাংশ ঘটনার জন্য রুশ কর্তৃপক্ষকে দায়ী করা হয়েছে। বাকি ১১ শতাংশ ঘটনার সঙ্গে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষের সদস্যদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে।

জাতিসংঘের ১৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নথিভুক্ত ঘটনাগুলো পূর্ণাঙ্গ চিত্র নয়। যুদ্ধের সময় যৌন সহিংসতার ঘটনা ব্যাপকভাবে প্রকাশের বাইরে থেকে যাওয়ায় প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। বিশেষ করে রাশিয়ার দখলে থাকা ইউক্রেনীয় ভূখণ্ড, রাশিয়ার ভেতরের আটককেন্দ্র এবং যুদ্ধবন্দীদের বিষয়ে জাতিসংঘের পর্যবেক্ষকদের সরাসরি প্রবেশাধিকার সীমিত থাকায় সব ঘটনা নথিবদ্ধ করা সম্ভব হয়নি।

নির্যাতনের নানা ভয়াবহ ধরন

প্রতিবেদন অনুযায়ী, রুশ বাহিনী ও রুশ কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন সংস্থার সদস্যদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ, দলবদ্ধ ধর্ষণ, ধর্ষণের চেষ্টা, যৌন নির্যাতন, যৌনাঙ্গে বৈদ্যুতিক শক দেওয়া, যৌনাঙ্গে মারধর, জোর করে নগ্ন করা এবং যৌন প্রকৃতির অপমানজনক আচরণের অভিযোগ নথিবদ্ধ হয়েছে।

ইউক্রেনীয় যুদ্ধবন্দী ও আটক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে যৌন সহিংসতা অনেক সময় নির্যাতন ও ভয় দেখানোর পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে বলে জাতিসংঘ জানিয়েছে। কিছু পুরুষ বন্দীকে যৌনাঙ্গে বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হয়েছে। এ কাজে সোভিয়েত আমলের সামরিক ফিল্ড টেলিফোন, স্থানীয়ভাবে ‘টাপিক’ নামে পরিচিত একটি যন্ত্র, ব্যবহারের কথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

জাতিসংঘের পর্যবেক্ষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, আটক বা বন্দিত্বের পুরো প্রক্রিয়াজুড়েই এসব নির্যাতন ঘটেছে—গ্রেপ্তার বা আটক করার সময়, এক স্থান থেকে অন্যত্র নেওয়ার সময়, জিজ্ঞাসাবাদে, কারাগারে অবস্থানের সময় এমনকি মুক্তি বা বন্দিবিনিময়ের আগেও।

সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী পুরুষ

যুদ্ধের যৌন সহিংসতার শিকার সাধারণত নারী—এমন প্রচলিত ধারণার বিপরীত একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। জাতিসংঘ বলছে, নথিভুক্ত ঘটনাগুলোর মধ্যে বিশেষ করে আটককেন্দ্র ও যুদ্ধবন্দীদের ক্ষেত্রে অধিকাংশ ভুক্তভোগী ছিলেন পুরুষ। তবে রাশিয়ার দখল করা ইউক্রেনীয় এলাকায় নারী ও শিশুরাও যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন।

জাতিসংঘের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ মিশনের ইউক্রেনবিষয়ক প্রধান ড্যানিয়েল বেল বলেছেন, ইউক্রেন যুদ্ধের বাস্তবতায় যৌন সহিংসতার অধিকাংশ নথিভুক্ত ভুক্তভোগী পুরুষ। ফলে পুরুষ ও নারী—উভয়ের জন্য তাদের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী আলাদা ধরনের পুনর্বাসন ও সহায়তা প্রয়োজন।

প্রতিবেদনে নথিভুক্ত ভুক্তভোগীদের বয়সেও বড় ব্যবধান রয়েছে। সবচেয়ে কম বয়সী নথিভুক্ত ধর্ষণের শিকার একজনের বয়স ছিল চার বছর। অন্যদিকে সবচেয়ে বেশি বয়সী ভুক্তভোগীর বয়স ছিল ৮২ বছর। জাতিসংঘ জানিয়েছে, এই দুটি ঘটনাতেই রুশ কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে।

দখলকৃত এলাকায় নারী ও মেয়েদের ওপর নির্যাতন

রাশিয়ার দখলে থাকা ইউক্রেনীয় এলাকায় আটকাবস্থার বাইরে নারী ও মেয়েদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ, দলবদ্ধ ধর্ষণ, ধর্ষণের চেষ্টা, যৌন হামলা, জোরপূর্বক নগ্ন করা এবং যৌন সহিংসতার হুমকির ঘটনা নথিবদ্ধ করেছে জাতিসংঘ।

প্রতিবেদনে এমন ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে যেখানে বাড়িতে ঢুকে নারীকে বারবার ধর্ষণ করা হয়েছে এবং আটক স্বামী বা পরিবারের সদস্যের সঙ্গে ভালো আচরণের বিনিময়ে তাকে যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। কিছু ঘটনায় প্রতিরোধ করলে পরিবারের সদস্যদের সামনে হত্যা করার হুমকিও দেওয়া হয়েছে।

ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধেও অভিযোগ

জাতিসংঘের প্রতিবেদনে শুধু রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ নেই। ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধেও নথিভুক্ত ১১ শতাংশ ঘটনার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে।

ইউক্রেন নিয়ন্ত্রিত এলাকায় রুশ ও তৃতীয় দেশের যুদ্ধবন্দী এবং সংঘাত-সংশ্লিষ্ট আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষের দায়ী করা ঘটনাগুলোর প্রায় অর্ধেকের মধ্যে যৌন সহিংসতার হুমকি ছিল। এছাড়া ধর্ষণের চেষ্টা, যৌন হামলা, যৌনাঙ্গে বৈদ্যুতিক শক, যৌনাঙ্গে মারধর, জোর করে নগ্ন করা এবং নগ্ন অবস্থায় মারধরের ঘটনাও নথিবদ্ধ হয়েছে।

তবে জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর জানিয়েছে, ইউক্রেন সরকার এসব ধরনের নির্যাতন প্রতিরোধ ও মোকাবিলায় কিছু বাস্তব পদক্ষেপ নিয়েছে। আইন সংস্কার, সামরিক ও প্রশাসনিক নির্দেশনা এবং জাতিসংঘের পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে সহযোগিতার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে জবাবদিহির ক্ষেত্রে অগ্রগতি এখনো সীমিত; জাতিসংঘ জানিয়েছে, তাদের জানা অনুযায়ী কোনো ঘটনাই তদন্ত পর্যায় অতিক্রম করে বিচারের পর্যায়ে পৌঁছায়নি 

রাশিয়ার বিরুদ্ধে জবাবদিহির ঘাটতির অভিযোগ

জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়া তার বাহিনী বা সংশ্লিষ্ট কর্মীদের মাধ্যমে সংঘটিত যৌন সহিংসতা প্রতিরোধ, তদন্ত বা বিচারের জন্য দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। পাশাপাশি জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের তথ্য চাওয়ার অনুরোধেও রাশিয়া সহযোগিতা করেনি।

জেনেভায় রাশিয়ার স্থায়ী কূটনৈতিক মিশন প্রতিবেদনের বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে।

অন্যদিকে ইউক্রেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রতিবেদন প্রকাশকে স্বাগত জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, প্রতিবেদনটি রাশিয়ার সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ব্যাপকতা তুলে ধরেছে এবং যৌন সহিংসতা প্রতিরোধ ও ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণে ইউক্রেনের নেওয়া পদক্ষেপও সামনে এনেছে। তবে ইউক্রেনীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে তারা সরাসরি মন্তব্য করেনি।

যুদ্ধের আড়ালে থেকে যাচ্ছে আরও অনেক ঘটনা

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক বলেছেন, প্রতিবেদনে নথিবদ্ধ যৌন সহিংসতার ব্যাপকতা তাকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। চলমান যুদ্ধের মধ্যে এসব ঘটনা এখনো ঘটে চলার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন তিনি। জাতিসংঘের প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতাগুলোর একটি হলো—১ হাজার ৪টি ঘটনা কোনোভাবেই ইউক্রেন যুদ্ধের যৌন সহিংসতার মোট সংখ্যা নয়। এগুলো কেবল এমন ঘটনা, যেগুলো জাতিসংঘের পর্যবেক্ষকরা যাচাই করতে পেরেছেন। যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশের সীমাবদ্ধতা, ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিয়ে ভয়, সামাজিক ও মানসিক চাপ এবং অভিযোগ প্রকাশে অনীহার কারণে আরও বহু ঘটনা অজানা থেকে যেতে পারে।জাতিসংঘ বলছে, এসব তথ্যের উদ্দেশ্য শুধু অপরাধের নথি তৈরি করা নয়; বরং ভুক্তভোগীদের জন্য বিচার, ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধের ব্যবস্থা জোরদার করা।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ফাঁদে আমেরিকা: দ্রুত বিজয়ের ধারণা কি বদলাতে হবে?

ইউক্রেন যুদ্ধে যৌন সহিংসতার ভয়াবহ চিত্র, জাতিসংঘের নথিতে ৮৯% অভিযোগ রাশিয়ার বিরুদ্ধে

১২:০৪:৩৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে যৌন সহিংসতার ভয়াবহ ও বিস্তৃত চিত্র উঠে এসেছে জাতিসংঘের নতুন এক প্রতিবেদনে। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর (ওএইচসিএইচআর) জানিয়েছে, ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত তারা সংঘাত-সংশ্লিষ্ট যৌন সহিংসতার ১ হাজার ৪টি ঘটনা যাচাই করেছে। এর মধ্যে ৮৯ শতাংশ ঘটনার জন্য রুশ কর্তৃপক্ষকে দায়ী করা হয়েছে। বাকি ১১ শতাংশ ঘটনার সঙ্গে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষের সদস্যদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে।

জাতিসংঘের ১৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নথিভুক্ত ঘটনাগুলো পূর্ণাঙ্গ চিত্র নয়। যুদ্ধের সময় যৌন সহিংসতার ঘটনা ব্যাপকভাবে প্রকাশের বাইরে থেকে যাওয়ায় প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। বিশেষ করে রাশিয়ার দখলে থাকা ইউক্রেনীয় ভূখণ্ড, রাশিয়ার ভেতরের আটককেন্দ্র এবং যুদ্ধবন্দীদের বিষয়ে জাতিসংঘের পর্যবেক্ষকদের সরাসরি প্রবেশাধিকার সীমিত থাকায় সব ঘটনা নথিবদ্ধ করা সম্ভব হয়নি।

নির্যাতনের নানা ভয়াবহ ধরন

প্রতিবেদন অনুযায়ী, রুশ বাহিনী ও রুশ কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন সংস্থার সদস্যদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ, দলবদ্ধ ধর্ষণ, ধর্ষণের চেষ্টা, যৌন নির্যাতন, যৌনাঙ্গে বৈদ্যুতিক শক দেওয়া, যৌনাঙ্গে মারধর, জোর করে নগ্ন করা এবং যৌন প্রকৃতির অপমানজনক আচরণের অভিযোগ নথিবদ্ধ হয়েছে।

ইউক্রেনীয় যুদ্ধবন্দী ও আটক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে যৌন সহিংসতা অনেক সময় নির্যাতন ও ভয় দেখানোর পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে বলে জাতিসংঘ জানিয়েছে। কিছু পুরুষ বন্দীকে যৌনাঙ্গে বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হয়েছে। এ কাজে সোভিয়েত আমলের সামরিক ফিল্ড টেলিফোন, স্থানীয়ভাবে ‘টাপিক’ নামে পরিচিত একটি যন্ত্র, ব্যবহারের কথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

জাতিসংঘের পর্যবেক্ষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, আটক বা বন্দিত্বের পুরো প্রক্রিয়াজুড়েই এসব নির্যাতন ঘটেছে—গ্রেপ্তার বা আটক করার সময়, এক স্থান থেকে অন্যত্র নেওয়ার সময়, জিজ্ঞাসাবাদে, কারাগারে অবস্থানের সময় এমনকি মুক্তি বা বন্দিবিনিময়ের আগেও।

সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী পুরুষ

যুদ্ধের যৌন সহিংসতার শিকার সাধারণত নারী—এমন প্রচলিত ধারণার বিপরীত একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। জাতিসংঘ বলছে, নথিভুক্ত ঘটনাগুলোর মধ্যে বিশেষ করে আটককেন্দ্র ও যুদ্ধবন্দীদের ক্ষেত্রে অধিকাংশ ভুক্তভোগী ছিলেন পুরুষ। তবে রাশিয়ার দখল করা ইউক্রেনীয় এলাকায় নারী ও শিশুরাও যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন।

জাতিসংঘের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ মিশনের ইউক্রেনবিষয়ক প্রধান ড্যানিয়েল বেল বলেছেন, ইউক্রেন যুদ্ধের বাস্তবতায় যৌন সহিংসতার অধিকাংশ নথিভুক্ত ভুক্তভোগী পুরুষ। ফলে পুরুষ ও নারী—উভয়ের জন্য তাদের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী আলাদা ধরনের পুনর্বাসন ও সহায়তা প্রয়োজন।

প্রতিবেদনে নথিভুক্ত ভুক্তভোগীদের বয়সেও বড় ব্যবধান রয়েছে। সবচেয়ে কম বয়সী নথিভুক্ত ধর্ষণের শিকার একজনের বয়স ছিল চার বছর। অন্যদিকে সবচেয়ে বেশি বয়সী ভুক্তভোগীর বয়স ছিল ৮২ বছর। জাতিসংঘ জানিয়েছে, এই দুটি ঘটনাতেই রুশ কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে।

দখলকৃত এলাকায় নারী ও মেয়েদের ওপর নির্যাতন

রাশিয়ার দখলে থাকা ইউক্রেনীয় এলাকায় আটকাবস্থার বাইরে নারী ও মেয়েদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ, দলবদ্ধ ধর্ষণ, ধর্ষণের চেষ্টা, যৌন হামলা, জোরপূর্বক নগ্ন করা এবং যৌন সহিংসতার হুমকির ঘটনা নথিবদ্ধ করেছে জাতিসংঘ।

প্রতিবেদনে এমন ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে যেখানে বাড়িতে ঢুকে নারীকে বারবার ধর্ষণ করা হয়েছে এবং আটক স্বামী বা পরিবারের সদস্যের সঙ্গে ভালো আচরণের বিনিময়ে তাকে যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। কিছু ঘটনায় প্রতিরোধ করলে পরিবারের সদস্যদের সামনে হত্যা করার হুমকিও দেওয়া হয়েছে।

ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধেও অভিযোগ

জাতিসংঘের প্রতিবেদনে শুধু রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ নেই। ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধেও নথিভুক্ত ১১ শতাংশ ঘটনার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে।

ইউক্রেন নিয়ন্ত্রিত এলাকায় রুশ ও তৃতীয় দেশের যুদ্ধবন্দী এবং সংঘাত-সংশ্লিষ্ট আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষের দায়ী করা ঘটনাগুলোর প্রায় অর্ধেকের মধ্যে যৌন সহিংসতার হুমকি ছিল। এছাড়া ধর্ষণের চেষ্টা, যৌন হামলা, যৌনাঙ্গে বৈদ্যুতিক শক, যৌনাঙ্গে মারধর, জোর করে নগ্ন করা এবং নগ্ন অবস্থায় মারধরের ঘটনাও নথিবদ্ধ হয়েছে।

তবে জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর জানিয়েছে, ইউক্রেন সরকার এসব ধরনের নির্যাতন প্রতিরোধ ও মোকাবিলায় কিছু বাস্তব পদক্ষেপ নিয়েছে। আইন সংস্কার, সামরিক ও প্রশাসনিক নির্দেশনা এবং জাতিসংঘের পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে সহযোগিতার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে জবাবদিহির ক্ষেত্রে অগ্রগতি এখনো সীমিত; জাতিসংঘ জানিয়েছে, তাদের জানা অনুযায়ী কোনো ঘটনাই তদন্ত পর্যায় অতিক্রম করে বিচারের পর্যায়ে পৌঁছায়নি 

রাশিয়ার বিরুদ্ধে জবাবদিহির ঘাটতির অভিযোগ

জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়া তার বাহিনী বা সংশ্লিষ্ট কর্মীদের মাধ্যমে সংঘটিত যৌন সহিংসতা প্রতিরোধ, তদন্ত বা বিচারের জন্য দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। পাশাপাশি জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের তথ্য চাওয়ার অনুরোধেও রাশিয়া সহযোগিতা করেনি।

জেনেভায় রাশিয়ার স্থায়ী কূটনৈতিক মিশন প্রতিবেদনের বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে।

অন্যদিকে ইউক্রেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রতিবেদন প্রকাশকে স্বাগত জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, প্রতিবেদনটি রাশিয়ার সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ব্যাপকতা তুলে ধরেছে এবং যৌন সহিংসতা প্রতিরোধ ও ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণে ইউক্রেনের নেওয়া পদক্ষেপও সামনে এনেছে। তবে ইউক্রেনীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে তারা সরাসরি মন্তব্য করেনি।

যুদ্ধের আড়ালে থেকে যাচ্ছে আরও অনেক ঘটনা

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক বলেছেন, প্রতিবেদনে নথিবদ্ধ যৌন সহিংসতার ব্যাপকতা তাকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। চলমান যুদ্ধের মধ্যে এসব ঘটনা এখনো ঘটে চলার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন তিনি। জাতিসংঘের প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতাগুলোর একটি হলো—১ হাজার ৪টি ঘটনা কোনোভাবেই ইউক্রেন যুদ্ধের যৌন সহিংসতার মোট সংখ্যা নয়। এগুলো কেবল এমন ঘটনা, যেগুলো জাতিসংঘের পর্যবেক্ষকরা যাচাই করতে পেরেছেন। যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশের সীমাবদ্ধতা, ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিয়ে ভয়, সামাজিক ও মানসিক চাপ এবং অভিযোগ প্রকাশে অনীহার কারণে আরও বহু ঘটনা অজানা থেকে যেতে পারে।জাতিসংঘ বলছে, এসব তথ্যের উদ্দেশ্য শুধু অপরাধের নথি তৈরি করা নয়; বরং ভুক্তভোগীদের জন্য বিচার, ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধের ব্যবস্থা জোরদার করা।