সৌদি আরবে আকাশপথে হামলার আশঙ্কা ঘিরে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ শহরে জরুরি সতর্কতা জারি করা হয়েছে। ১৮ সেপ্টেম্বর গভীর রাত থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর ভোর পর্যন্ত দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলের বাসিন্দাদের মোবাইলে ‘শত্রুতাপূর্ণ আকাশপথের হুমকি’ সম্পর্কে সতর্কবার্তা পাঠায় কর্তৃপক্ষ। রিয়াদ ছাড়াও জেদ্দা, তাইফ, খামিস মুশাইত, আলউলা এবং আরও কয়েকটি জনবহুল এলাকায় এই সতর্কতা জারি করা হয়।
সৌদি বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে ‘অল ক্লিয়ার’ বা বিপদ কেটে যাওয়ার বার্তা পাঠায়। তবে সতর্কতার মাত্রা এবং একাধিক শহরে একই সময়ে নিরাপত্তা বার্তা জারি হওয়ায় দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর নতুন করে গুরুত্ব তৈরি হয়েছে।
রিয়াদে সতর্কতার পর ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত
১৯ সেপ্টেম্বর ভোরে রাজধানী রিয়াদ এবং এর পূর্বদিকে অবস্থিত আল খারজ এলাকায় বাসিন্দাদের মোবাইলে জরুরি সতর্কবার্তা পৌঁছে যায়। সতর্কতার সময় রিয়াদের কিছু অংশে বিস্ফোরণের শব্দও শোনা যায়।
এরপর সৌদি নেতৃত্বাধীন ইয়েমেনবিষয়ক জোট জানায়, একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রিয়াদের দিকে আসার সময় সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষা বাহিনী সেটি শনাক্ত করে ধ্বংস করেছে।

সৌদি প্রেস এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্ষেপণাস্ত্রটি রাজধানীতে পৌঁছানোর আগেই রয়্যাল সৌদি এয়ার ডিফেন্স বাহিনী তা intercept করে ধ্বংস করে। জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুরকি আল-মালিকি জানান, ১৯ সেপ্টেম্বর ভোরে এই প্রতিহত করার ঘটনা ঘটে।
জোটের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, বিশ, তাইফ, ফারাসান ও ইয়ানবুকে লক্ষ্য করে চালানোর চেষ্টা করা হামলাও প্রতিহত করা হয়েছে। প্রাথমিক সতর্কতার পর সৌদি কর্তৃপক্ষ কোনো হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির খবর জানায়নি।
মক্কা ও অন্যান্য শহরেও সতর্কতা
সৌদি আরবের সতর্কতা ব্যবস্থা শুধু রাজধানী রিয়াদে সীমাবদ্ধ ছিল না। মক্কা প্রদেশের জেদ্দা ও তাইফ, আসির প্রদেশের খামিস মুশাইত এবং মদিনা প্রদেশের আলউলাও নিরাপত্তা সতর্কতার আওতায় ছিল।
এর আগে ১৫ সেপ্টেম্বর মক্কার দক্ষিণে আরেকটি ড্রোন শনাক্ত করে সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষা বাহিনী। জোটের দাবি, ড্রোনটি পবিত্র নগরীর চারপাশের নিয়ন্ত্রিত আকাশসীমায় প্রবেশের আগেই ধ্বংস করা হয়।
সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে সৌদি কর্তৃপক্ষ বড় শহর, বিমানবন্দর, পরিবহনকেন্দ্র এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর আশপাশে আকাশ প্রতিরক্ষা নজরদারি জোরদার করেছে।
ইয়ানবুর গুরুত্ব কেন বেশি
সৌদি আরবের পশ্চিম উপকূলের ইয়ানবু শুধু একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী নয়, দেশটির জ্বালানি রপ্তানি ব্যবস্থারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। লোহিত সাগরের তীরে অবস্থিত এই অঞ্চলের অবকাঠামোর মাধ্যমে সৌদি আরব পশ্চিম উপকূল দিয়ে অপরিশোধিত তেলসহ বিভিন্ন জ্বালানি পণ্য পরিবহনের সুযোগ পায়।
আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে চাপ বাড়লে সৌদি আরবের পশ্চিম উপকূলের বন্দর ও পাইপলাইন অবকাঠামোর গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। ফলে ইয়ানবু ও আশপাশের জ্বালানি স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা এখন কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
মোবাইল সতর্কবার্তায় দ্রুত পৌঁছাচ্ছে নির্দেশনা
সৌদি বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ মোবাইল ফোনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকার বাসিন্দাদের কাছে সরাসরি সতর্কবার্তা পাঠাচ্ছে। এর ফলে কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় আকাশপথে হুমকি শনাক্ত হলে দ্রুত মানুষকে নিরাপদ স্থানে থাকার নির্দেশ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।

আকাশ প্রতিরক্ষা বাহিনী যখন সম্ভাব্য হুমকি শনাক্ত ও প্রতিহত করার কাজ করছে, তখন বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগ বাসিন্দাদের বাইরে না যাওয়ার বা নিরাপদ স্থানে থাকার নির্দেশ দিতে পারছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে আবার ‘অল ক্লিয়ার’ বার্তা পাঠানো হচ্ছে।
রিয়াদ সৌদি আরবের রাজধানী হওয়ার পাশাপাশি দেশটির অন্যতম প্রধান বিমান ও পরিবহনকেন্দ্র। কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রাজধানীকে দেশের অন্যান্য অঞ্চল এবং আন্তর্জাতিক গন্তব্যের সঙ্গে যুক্ত করেছে। একই সঙ্গে রিয়াদ থেকে দেশের শিল্প, জ্বালানি ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ রয়েছে।
লোহিত সাগরের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ আকাশ প্রতিরক্ষার পাশাপাশি ইয়েমেন ও লোহিত সাগর ঘিরে সামুদ্রিক নিরাপত্তাও আঞ্চলিক উদ্বেগের বড় কারণ হয়ে উঠেছে।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা ইয়েমেন ও লোহিত সাগর ঘিরে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের আশঙ্কা, হামলা ও পাল্টা হামলা অব্যাহত থাকলে আঞ্চলিক অস্থিরতা আরও বিস্তৃত হতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সামুদ্রিক নিরাপত্তায় বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। হুথি বাহিনীর ওপর আরোপিত জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার বিষয়েও নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা গুরুত্ব দিয়েছেন।
লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের মধ্যবর্তী বাব আল-মান্দাব বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। এ পথ দিয়ে এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পণ্য পরিবহন হয়।
সৌদি আরবের পশ্চিম উপকূলের বন্দর ও জ্বালানি টার্মিনালগুলো এই সামুদ্রিক বাণিজ্য ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই আকাশপথের হুমকির পাশাপাশি লোহিত সাগরের নিরাপত্তা পরিস্থিতিও সৌদি আরবের পরিবহন, জ্বালানি রপ্তানি এবং সরবরাহব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সাম্প্রতিক সতর্কতাগুলো দেখাচ্ছে, আঞ্চলিক সংঘাতের প্রভাব এখন শুধু যুদ্ধক্ষেত্র বা সীমান্ত এলাকায় সীমাবদ্ধ নেই। সৌদি আরবের রাজধানীসহ জনবহুল শহর, বন্দর, জ্বালানি অবকাঠামো ও গুরুত্বপূর্ণ পরিবহনকেন্দ্রগুলোকেও সম্ভাব্য আকাশপথের হুমকির বিষয়টি বিবেচনায় রেখে নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিচালনা করতে হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















