০১:২৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ফাঁদে আমেরিকা: দ্রুত বিজয়ের ধারণা কি বদলাতে হবে? শত বছর পর নতুন বন্য বিড়ালের সন্ধান, বলিভিয়ার জঙ্গলে মিলল ক্ষুদ্র প্রজাতি টানা বৃষ্টিতে ঢাকার সড়কে জলাবদ্ধতা, চরম দুর্ভোগে অফিসগামী ও শিক্ষার্থীরা বৃষ্টিতে ঢাকার বাতাসে স্বস্তি, নামল দূষণের মাত্রা দুবাইয়ের নতুন জলশহরে বদলে যাচ্ছে বিলাসী জীবনের ধারণা, ৩ বেডরুমের অ্যাপার্টমেন্টে তারই ইঙ্গিত জাঞ্জিবারে দ্বিতীয় ‘রাশিদ ভিলেজ’ প্রকল্প চালুর নির্দেশ শেখ হামদানের মস্কো অঞ্চলে ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় নিহত ২, রুশ রাজধানীর তেল শোধনাগারেও আঘাত ভারত-আমিরাত সম্পর্ক আরও জোরদারে মোদি-শেখ মোহামেদের আলোচনা দুবাইয়ের ফ্যাশনে নতুন মোড়, শোর চেয়ে এখন বড় হচ্ছে ব্যবসা ম্যাকলমোর বিতর্কে অবস্থান বদল, কনসার্টে ক্ষমা চাইলেন এড শিরান

নিখোঁজের পর ৩৬ শিশুর মরদেহ উদ্ধার, সাত মাসে এখনো নিখোঁজ ২ হাজারের বেশি

বাংলাদেশে শিশু নিখোঁজ ও হত্যার ঘটনায় উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে নিখোঁজ হওয়া ৩৬ শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে নানা ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে অন্তত ১৫৫ শিশু। এর মধ্যে ধর্ষণের পর হত্যা, শারীরিক নির্যাতনে মৃত্যু, পারিবারিক সহিংসতা এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে শিশু হত্যার ঘটনাও রয়েছে।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন ঘটনায় ১৫৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ বিশ্লেষণ করে সংগঠনটি এসব তথ্য সংগ্রহ করেছে।

সম্প্রতি কুমিল্লায় নিখোঁজ হওয়া ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাও এই উদ্বেগজনক চিত্রকে সামনে এনেছে। এর আগে বছরের বিভিন্ন সময়ে নিখোঁজ শিশুদের মরদেহ মাটি চাপা অবস্থায় কিংবা নদী থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।

আসকের হিসাব অনুযায়ী, প্রথম আট মাসে শারীরিক নির্যাতনের পর ৬৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। পরিবারের ভেতরের নির্যাতনে মারা গেছে ৪৯ শিশু। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২৬ শিশুকে, যাদের মধ্যে দুইজন ছেলে। ধর্ষণের চেষ্টা করার পর হত্যা করা হয়েছে আরও চার শিশুকে।

এ ছাড়া গুলিতে তিন শিশু নিহত হয়েছে। শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে দুই গৃহকর্মী শিশুর মৃত্যু হয়েছে। অনুসরণকারী বা পিছু নেওয়া ব্যক্তিদের হাতে দুই শিশু নিহত হয়েছে এবং অপহরণের পর একজন শিশুকে হত্যা করা হয়েছে।

এ সময় আত্মহত্যা, রহস্যজনক মৃত্যু এবং শিশুদের মরদেহ উদ্ধারের ৯৯টি ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে।

নিখোঁজের পর হত্যা

সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় নিখোঁজ হওয়ার পর শিশুদের মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি বিশেষভাবে সামনে এসেছে।

জামালপুরের মাদারগঞ্জে ৭ বছরের এক শিশু ১০ সেপ্টেম্বর স্কুলে যাওয়ার পর আর বাড়ি ফেরেনি। দুই দিন পর, ১২ সেপ্টেম্বর, এক সহপাঠীর বাড়ির মেঝের নিচ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

পুলিশ সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছে, সহপাঠীর বাবা ওই শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

পাবনা সদরেও ১০ বছর বয়সী এক শিশু ৯ সেপ্টেম্বর নিখোঁজ হয়। সাত দিন পর ১৬ সেপ্টেম্বর একটি ডোবা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

শিশু হত্যার পাশাপাশি দেশে সামগ্রিক হত্যাকাণ্ডের সংখ্যাও কম নয়। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে আগস্ট—এই আট মাসে সারা দেশে ২ হাজার ৩৬২টি হত্যা মামলা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ২৯৫টি হত্যা মামলা হয়েছে।

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে শিশুও হত্যার শিকার

শুধু নিখোঁজ হওয়ার পর হত্যা নয়, পরিবারের অন্য সদস্যদের হত্যার ঘটনাতেও শিশুরা প্রাণ হারাচ্ছে। সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত চারটি ঘটনায় পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে সাত শিশুর হত্যার তথ্য উঠে এসেছে।

২৫ জুন লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে ভাড়া বাসায় ঢুকে এক মা ও তাঁর তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। নিহত তিন মেয়ের মধ্যে সিপার বয়স ছিল ১০ বছর, ইকরার ১৭ এবং সাইমা আক্তারের ২১ বছর।

আগস্টে রংপুরে ১২ বছর বয়সী আয়ুশ তাঁর অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বাবা গণপতি চক্রবর্তী, মা ও বড় বোনের সঙ্গে হত্যার শিকার হয়।

একই মাসে মাদারীপুরের শিবচরে এক নারীর মরদেহ উদ্ধারের পাঁচ দিন পর ২৪ আগস্ট নদী থেকে তাঁর এক বছর বয়সী শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, মা ও শিশুকে হত্যা করা হয়েছিল।

সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে একই পরিবারের ১০, ৭ ও ২ বছর বয়সী তিন শিশুকে হত্যা করা হয়েছে বলে গণমাধ্যমে খবর এসেছে।

সাত মাসে নিখোঁজ ১৫ হাজারের বেশি শিশু

শিশু হত্যার পাশাপাশি নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ১৫ হাজারের বেশি শিশু নিখোঁজ হওয়ার খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

পরে ৩ সেপ্টেম্বর পুলিশ সদর দপ্তর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, বছরের প্রথম সাত মাসে মোট ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজ হয়েছিল। এর মধ্যে ৮৭ শতাংশের বেশি শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, উদ্ধার হওয়া শিশুর সংখ্যা ১৩ হাজার ৬৭৯। অর্থাৎ এখনো ২ হাজার ৩৮ শিশু নিখোঁজ রয়েছে। মোট নিখোঁজ শিশুর প্রায় ১৩ শতাংশ এখনো পরিবারের কাছে ফিরে আসেনি।

এই সংখ্যা শুধু নিখোঁজ শিশুদের হিসাব নয়; এর সঙ্গে শিশুদের নিরাপত্তা, পাচার, অপহরণ, নির্যাতন ও হত্যার মতো ঝুঁকির বিষয়গুলোও জড়িয়ে আছে।

শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

শিশুদের ওপর ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় চলতি বছরের ২২ মে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল ইউনিসেফ। সংস্থাটি এসব অপরাধে দায়মুক্তির অবসান এবং শিশুদের ঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজ—সব জায়গায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছিল।

শিশু নির্যাতনের অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা, শিশুবান্ধব পুলিশি কার্যক্রম, বিচারপ্রক্রিয়া, স্থানীয় পর্যায়ের শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং নির্যাতনের শিকার শিশুদের মানসিক সহায়তার ক্ষেত্রে যেসব ঘাটতি রয়েছে, সেগুলো দূর করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে ইউনিসেফ।

স্কুল, মাদ্রাসা ও কর্মক্ষেত্রেও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জবাবদিহি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে সংস্থাটি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ফাতেমা রেজিনা ইকবাল শিশু হত্যা ও শিশুদের ওপর সহিংসতার ঘটনাগুলো পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি বলেন, শিশুদের ওপর এমন নির্মমতা সমাজের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।

তাঁর মতে, এখন বড় প্রশ্ন হলো—শিশুরা আসলে কোথায় নিরাপদ? খেলার মাঠে, বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে কিংবা নিজের পরিবারের মধ্যেও যদি শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত না হয়, তাহলে তাদের সুরক্ষার বিষয়টি নতুন করে ভাবতে হবে।

অধ্যাপক ফাতেমা রেজিনা ইকবাল মনে করেন, অপরাধীদের বিকৃত মানসিকতার পাশাপাশি প্রতিশোধ, পারিবারিক বিরোধ এবং বড়দের পারস্পরিক দ্বন্দ্বের কারণেও অনেক শিশু সহিংসতার শিকার হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বড়দের বিরোধের মূল্য দিতে হচ্ছে শিশুদের।

শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের অপরাধ সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বাড়তে পারে এবং ভবিষ্যতে ঘটনা কমানোর ক্ষেত্রে তা ভূমিকা রাখতে পারে বলেও তিনি মনে করেন।

সব মিলিয়ে নিখোঁজ শিশুর সংখ্যা, নিখোঁজের পর মরদেহ উদ্ধার এবং ধর্ষণ ও নির্যাতনের পর শিশু হত্যার ধারাবাহিক ঘটনা দেশের শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার সামনে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। শুধু অপরাধের পর ব্যবস্থা নেওয়া নয়, শিশু নিখোঁজ হওয়ার আগেই তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা তৈরি করা এবং পরিবার ও সমাজের প্রতিটি স্তরে নজরদারি ও জবাবদিহি বাড়ানো এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ফাঁদে আমেরিকা: দ্রুত বিজয়ের ধারণা কি বদলাতে হবে?

নিখোঁজের পর ৩৬ শিশুর মরদেহ উদ্ধার, সাত মাসে এখনো নিখোঁজ ২ হাজারের বেশি

১২:১৮:২৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশে শিশু নিখোঁজ ও হত্যার ঘটনায় উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে নিখোঁজ হওয়া ৩৬ শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে নানা ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে অন্তত ১৫৫ শিশু। এর মধ্যে ধর্ষণের পর হত্যা, শারীরিক নির্যাতনে মৃত্যু, পারিবারিক সহিংসতা এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে শিশু হত্যার ঘটনাও রয়েছে।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন ঘটনায় ১৫৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ বিশ্লেষণ করে সংগঠনটি এসব তথ্য সংগ্রহ করেছে।

সম্প্রতি কুমিল্লায় নিখোঁজ হওয়া ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাও এই উদ্বেগজনক চিত্রকে সামনে এনেছে। এর আগে বছরের বিভিন্ন সময়ে নিখোঁজ শিশুদের মরদেহ মাটি চাপা অবস্থায় কিংবা নদী থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।

আসকের হিসাব অনুযায়ী, প্রথম আট মাসে শারীরিক নির্যাতনের পর ৬৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। পরিবারের ভেতরের নির্যাতনে মারা গেছে ৪৯ শিশু। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২৬ শিশুকে, যাদের মধ্যে দুইজন ছেলে। ধর্ষণের চেষ্টা করার পর হত্যা করা হয়েছে আরও চার শিশুকে।

এ ছাড়া গুলিতে তিন শিশু নিহত হয়েছে। শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে দুই গৃহকর্মী শিশুর মৃত্যু হয়েছে। অনুসরণকারী বা পিছু নেওয়া ব্যক্তিদের হাতে দুই শিশু নিহত হয়েছে এবং অপহরণের পর একজন শিশুকে হত্যা করা হয়েছে।

এ সময় আত্মহত্যা, রহস্যজনক মৃত্যু এবং শিশুদের মরদেহ উদ্ধারের ৯৯টি ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে।

নিখোঁজের পর হত্যা

সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় নিখোঁজ হওয়ার পর শিশুদের মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি বিশেষভাবে সামনে এসেছে।

জামালপুরের মাদারগঞ্জে ৭ বছরের এক শিশু ১০ সেপ্টেম্বর স্কুলে যাওয়ার পর আর বাড়ি ফেরেনি। দুই দিন পর, ১২ সেপ্টেম্বর, এক সহপাঠীর বাড়ির মেঝের নিচ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

পুলিশ সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছে, সহপাঠীর বাবা ওই শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

পাবনা সদরেও ১০ বছর বয়সী এক শিশু ৯ সেপ্টেম্বর নিখোঁজ হয়। সাত দিন পর ১৬ সেপ্টেম্বর একটি ডোবা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

শিশু হত্যার পাশাপাশি দেশে সামগ্রিক হত্যাকাণ্ডের সংখ্যাও কম নয়। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে আগস্ট—এই আট মাসে সারা দেশে ২ হাজার ৩৬২টি হত্যা মামলা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ২৯৫টি হত্যা মামলা হয়েছে।

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে শিশুও হত্যার শিকার

শুধু নিখোঁজ হওয়ার পর হত্যা নয়, পরিবারের অন্য সদস্যদের হত্যার ঘটনাতেও শিশুরা প্রাণ হারাচ্ছে। সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত চারটি ঘটনায় পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে সাত শিশুর হত্যার তথ্য উঠে এসেছে।

২৫ জুন লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে ভাড়া বাসায় ঢুকে এক মা ও তাঁর তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। নিহত তিন মেয়ের মধ্যে সিপার বয়স ছিল ১০ বছর, ইকরার ১৭ এবং সাইমা আক্তারের ২১ বছর।

আগস্টে রংপুরে ১২ বছর বয়সী আয়ুশ তাঁর অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বাবা গণপতি চক্রবর্তী, মা ও বড় বোনের সঙ্গে হত্যার শিকার হয়।

একই মাসে মাদারীপুরের শিবচরে এক নারীর মরদেহ উদ্ধারের পাঁচ দিন পর ২৪ আগস্ট নদী থেকে তাঁর এক বছর বয়সী শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, মা ও শিশুকে হত্যা করা হয়েছিল।

সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে একই পরিবারের ১০, ৭ ও ২ বছর বয়সী তিন শিশুকে হত্যা করা হয়েছে বলে গণমাধ্যমে খবর এসেছে।

সাত মাসে নিখোঁজ ১৫ হাজারের বেশি শিশু

শিশু হত্যার পাশাপাশি নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ১৫ হাজারের বেশি শিশু নিখোঁজ হওয়ার খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

পরে ৩ সেপ্টেম্বর পুলিশ সদর দপ্তর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, বছরের প্রথম সাত মাসে মোট ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজ হয়েছিল। এর মধ্যে ৮৭ শতাংশের বেশি শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, উদ্ধার হওয়া শিশুর সংখ্যা ১৩ হাজার ৬৭৯। অর্থাৎ এখনো ২ হাজার ৩৮ শিশু নিখোঁজ রয়েছে। মোট নিখোঁজ শিশুর প্রায় ১৩ শতাংশ এখনো পরিবারের কাছে ফিরে আসেনি।

এই সংখ্যা শুধু নিখোঁজ শিশুদের হিসাব নয়; এর সঙ্গে শিশুদের নিরাপত্তা, পাচার, অপহরণ, নির্যাতন ও হত্যার মতো ঝুঁকির বিষয়গুলোও জড়িয়ে আছে।

শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

শিশুদের ওপর ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় চলতি বছরের ২২ মে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল ইউনিসেফ। সংস্থাটি এসব অপরাধে দায়মুক্তির অবসান এবং শিশুদের ঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজ—সব জায়গায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছিল।

শিশু নির্যাতনের অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা, শিশুবান্ধব পুলিশি কার্যক্রম, বিচারপ্রক্রিয়া, স্থানীয় পর্যায়ের শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং নির্যাতনের শিকার শিশুদের মানসিক সহায়তার ক্ষেত্রে যেসব ঘাটতি রয়েছে, সেগুলো দূর করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে ইউনিসেফ।

স্কুল, মাদ্রাসা ও কর্মক্ষেত্রেও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জবাবদিহি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে সংস্থাটি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ফাতেমা রেজিনা ইকবাল শিশু হত্যা ও শিশুদের ওপর সহিংসতার ঘটনাগুলো পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি বলেন, শিশুদের ওপর এমন নির্মমতা সমাজের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।

তাঁর মতে, এখন বড় প্রশ্ন হলো—শিশুরা আসলে কোথায় নিরাপদ? খেলার মাঠে, বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে কিংবা নিজের পরিবারের মধ্যেও যদি শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত না হয়, তাহলে তাদের সুরক্ষার বিষয়টি নতুন করে ভাবতে হবে।

অধ্যাপক ফাতেমা রেজিনা ইকবাল মনে করেন, অপরাধীদের বিকৃত মানসিকতার পাশাপাশি প্রতিশোধ, পারিবারিক বিরোধ এবং বড়দের পারস্পরিক দ্বন্দ্বের কারণেও অনেক শিশু সহিংসতার শিকার হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বড়দের বিরোধের মূল্য দিতে হচ্ছে শিশুদের।

শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের অপরাধ সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বাড়তে পারে এবং ভবিষ্যতে ঘটনা কমানোর ক্ষেত্রে তা ভূমিকা রাখতে পারে বলেও তিনি মনে করেন।

সব মিলিয়ে নিখোঁজ শিশুর সংখ্যা, নিখোঁজের পর মরদেহ উদ্ধার এবং ধর্ষণ ও নির্যাতনের পর শিশু হত্যার ধারাবাহিক ঘটনা দেশের শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার সামনে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। শুধু অপরাধের পর ব্যবস্থা নেওয়া নয়, শিশু নিখোঁজ হওয়ার আগেই তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা তৈরি করা এবং পরিবার ও সমাজের প্রতিটি স্তরে নজরদারি ও জবাবদিহি বাড়ানো এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।