সংযুক্ত আরব আমিরাতে গাড়ি কেনার বাজারে ধীরে ধীরে বদল আসছে। পেট্রোলচালিত গাড়ির পাশাপাশি হাইব্রিড ও পুরোপুরি বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়ছে। বিশেষ করে ২০২৬ সালের আগস্টে অনলাইন গাড়ির বাজারে হাইব্রিড ও বৈদ্যুতিক গাড়ির বিজ্ঞাপন দেখার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ প্রবণতায় টয়োটা, টেসলা ও বিওয়াইডি ছিল সবচেয়ে আলোচিত ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে।
অনলাইন গাড়ি বিক্রির প্ল্যাটফর্ম দুবিজলের আগস্টের তথ্য অনুযায়ী, হাইব্রিড সেডান, স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিকল বা এসইউভি, উচ্চক্ষমতার গাড়ি এবং ব্যাটারিচালিত বৈদ্যুতিক গাড়ি—বিভিন্ন শ্রেণিতেই ক্রেতাদের আগ্রহ বেড়েছে। হাইব্রিড গাড়ির ক্ষেত্রে টয়োটা সবচেয়ে বড় অগ্রগতি দেখিয়েছে। অন্যদিকে বৈদ্যুতিক গাড়ির মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিজ্ঞাপন দেখা হয়েছে টেসলার মডেলগুলোর।
এই সময়ে দুবাইয়ে বৈদ্যুতিক গাড়ির চার্জিং অবকাঠামোও দ্রুত বাড়ছে। দুবাই বিদ্যুৎ ও পানি কর্তৃপক্ষের (ডিইডব্লিউএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকের শেষে আমিরাতটিতে বৈদ্যুতিক গাড়ির চার্জিং পয়েন্টের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২২৩টিতে।
হাইব্রিড গাড়িতে টয়োটার দাপট
আগস্টে হাইব্রিড গাড়ির বিজ্ঞাপন দেখার ক্ষেত্রে টয়োটার পাঁচটি মডেলই শীর্ষ পাঁচটি অবস্থান দখল করেছে। এর মধ্যে টয়োটা ক্যামরির বিজ্ঞাপন ১ লাখ ২ হাজারের বেশি বার দেখা হয়েছে, যা আগের সময়ের তুলনায় ২৫ শতাংশ বেশি।
টয়োটা করোলা ক্রসের বিজ্ঞাপন দেখা হয়েছে ৮১ হাজারের বেশি বার। এ মডেলের প্রতি আগ্রহ বেড়েছে ২০ শতাংশ। টয়োটা করোলার বিজ্ঞাপন দেখা হয়েছে ৫৩ হাজারের বেশি বার, যেখানে আগ্রহ বেড়েছে ৩৫ শতাংশ।
অন্যদিকে টয়োটা হাইল্যান্ডারের বিজ্ঞাপন ৫১ হাজারের বেশি বার দেখা হয়েছে, যা ২১ শতাংশ বৃদ্ধির প্রতিনিধিত্ব করে। পাঁচটি মডেলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হারে বেড়েছে টয়োটা ক্রাউনের প্রতি আগ্রহ। আগস্টে এর বিজ্ঞাপন দেখার সংখ্যা ৫৪ শতাংশ বেড়ে ২৯ হাজার ছাড়িয়েছে।
এই তথ্য থেকে বোঝা যায়, হাইব্রিড গাড়ির প্রতি আগ্রহ শুধু একটি নির্দিষ্ট ধরনের গাড়িতে সীমাবদ্ধ নেই। ক্যামরি ও করোলা মূলত সেডান শ্রেণির, করোলা ক্রস ও হাইল্যান্ডার এসইউভি শ্রেণির এবং ক্রাউন তুলনামূলক বেশি দামের গাড়ির বাজারে অবস্থান করছে।
অর্থাৎ, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ক্রেতারা পারিবারিক ব্যবহার, বড় গাড়ি কিংবা তুলনামূলক বিলাসবহুল গাড়ি—বিভিন্ন প্রয়োজনের ক্ষেত্রেই হাইব্রিড প্রযুক্তি বিবেচনা করছেন। জ্বালানি খরচ কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদে গাড়ি ব্যবহারের ব্যয় নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও তাদের সিদ্ধান্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।
বৈদ্যুতিক গাড়িতে টেসলা ও বিওয়াইডির বিস্তার
পুরোপুরি বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারেও প্রতিযোগিতা বাড়ছে। দুবিজলের বিশ্লেষণে টেসলা মডেল ওয়াই সবচেয়ে বেশি বিজ্ঞাপন দেখা বৈদ্যুতিক গাড়ি হিসেবে উঠে এসেছে। আগস্টে এ মডেলের বিজ্ঞাপন ৮৮ হাজারের বেশি বার দেখা হয়েছে।
এ ছাড়া অডি আরএস ই-ট্রন জিটি, বিওয়াইডি সিল, বিওয়াইডি অ্যাটো ৩ এবং টেসলা মডেল এক্সের প্রতিও ক্রেতাদের আগ্রহ বেড়েছে।
মডেলগুলোর বৈচিত্র্য থেকেই বোঝা যায়, বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজার এখন শুধু একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির ক্রেতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। টেসলা মডেল ওয়াই বৈদ্যুতিক এসইউভি হিসেবে অবস্থান করছে। বিওয়াইডি সিল ও অ্যাটো ৩ তুলনামূলকভাবে সাধারণ সেডান ও ক্রসওভার বাজারে জায়গা করে নিচ্ছে। অডির আরএস ই-ট্রন জিটি উচ্চক্ষমতার বিলাসবহুল গাড়ির ক্রেতাদের লক্ষ্য করছে। আর টেসলা মডেল এক্স বড় আকারের বৈদ্যুতিক এসইউভি খুঁজছেন এমন ক্রেতাদের জন্য বিকল্প তৈরি করছে।
ফলে ব্যবহৃত গাড়ির বাজারেও বৈদ্যুতিক গাড়ির ধরন বাড়ছে। গাড়ি কেনার আগে ক্রেতারা এখন ব্যাটারির সক্ষমতা, একবার চার্জে কত দূর যাওয়া যায়, চার্জিং সুবিধা, গাড়ির দাম এবং দৈনন্দিন যাতায়াতের দূরত্ব—এসব বিষয় পাশাপাশি বিবেচনা করছেন।
দুবিজল কারসের বিক্রয় বিভাগের পরিচালক শরিফ মাগদি বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে বৈদ্যুতিক ও হাইব্রিড গাড়ি এখন আর আলাদা কোনো বিশেষায়িত শ্রেণি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না। বরং ক্রেতারা এগুলোকে প্রচলিত পেট্রোলচালিত গাড়ির পাশাপাশি তুলনা করছেন।
বাড়ছে বৈদ্যুতিক গাড়ি, বাড়ছে চার্জিং পয়েন্টও
দুবাইয়ে বৈদ্যুতিক গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে চার্জিং অবকাঠামোও সম্প্রসারিত হচ্ছে। ডিইডব্লিউএর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ দুবাইয়ে নিবন্ধিত বৈদ্যুতিক গাড়ির সংখ্যা ছিল ৪৭ হাজার ৯৪৪টি। ২০২৪ সালের শেষে এই সংখ্যা ছিল ৩৭ হাজার ৪৮৬।
অর্থাৎ মাত্র এক বছরে বৈদ্যুতিক গাড়ির সংখ্যা ১০ হাজারের বেশি বেড়েছে। বৃদ্ধির হার ছিল ২৭ দশমিক ৯ শতাংশ।
গাড়ির সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি চার্জিং পয়েন্টও বেড়েছে। ২০২৫ সালের শেষে দুবাইয়ে পাবলিক চার্জিং পয়েন্ট ছিল ১ হাজার ৮৬৪টি। ডিইডব্লিউএ এবং অনুমোদিত তৃতীয় পক্ষের চার্জিং অপারেটররা এসব অবকাঠামো পরিচালনা করছে।
২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকের শেষে চার্জিং পয়েন্টের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ২২৩টিতে। অর্থাৎ মাত্র এক প্রান্তিকে ৩৫৯টি নতুন চার্জিং পয়েন্ট যুক্ত হয়েছে। এতে চার্জিং অবকাঠামোর সক্ষমতা প্রায় ১৯ শতাংশ বেড়েছে।
২০২৬ সালের জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে ডিইডব্লিউএর গ্রিন চার্জার ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২৩ হাজার ৬০০ ছাড়িয়ে যায়। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, বৈদ্যুতিক গাড়ি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চার্জিং সুবিধা ব্যবহারের প্রবণতাও বাড়ছে।

ব্যবহৃত গাড়ির বাজারেও বদল
হাইব্রিড গাড়ি সংযুক্ত আরব আমিরাতের চালকদের জন্য একটি মধ্যবর্তী বিকল্প তৈরি করছে। এসব গাড়ি তুলনামূলক কম জ্বালানি খরচের সুবিধা দিতে পারে, আবার পুরোপুরি বৈদ্যুতিক গাড়ির মতো শুধু চার্জিং অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করতে হয় না।
অন্যদিকে ব্যাটারিচালিত বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বাড়াতে চার্জিং নেটওয়ার্কের বিস্তার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে যেসব চালক বাড়িতে গাড়ি চার্জ দেওয়ার সুযোগ পান না, তাদের জন্য জনসাধারণের ব্যবহারের চার্জিং পয়েন্টের সংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ।
দুবিজলের আগস্টের তথ্য বলছে, হাইব্রিড ও বৈদ্যুতিক গাড়ি এখন সংযুক্ত আরব আমিরাতের ব্যবহৃত গাড়ির বাজারে সক্রিয়ভাবে বিবেচিত হচ্ছে। টয়োটার হাইব্রিড গাড়ির প্রতি ব্যাপক আগ্রহ যেমন প্রতিষ্ঠিত গাড়ি নির্মাতাদের শক্ত অবস্থান তুলে ধরছে, তেমনি টেসলা, বিওয়াইডি ও অডির মডেলগুলো বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে বিকল্পের সংখ্যা বাড়াচ্ছে।
ফলে দেশটির গাড়ির ক্রেতাদের সামনে এখন শুধু পেট্রোলচালিত গাড়ি নয়—পেট্রোল, হাইব্রিড ও পুরোপুরি বৈদ্যুতিক গাড়ির বিস্তৃত সমন্বয় তৈরি হয়েছে। তবে অনলাইনে বিজ্ঞাপন দেখার সংখ্যা সরাসরি গাড়ি বিক্রির হিসাব নয়। এটি মূলত দেখায়, কেনার আগে কোন গাড়িগুলো নিয়ে ক্রেতারা খোঁজখবর করছেন এবং তুলনা করছেন।
আগস্টের বাজারচিত্রে তাই একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত স্পষ্ট—সংযুক্ত আরব আমিরাতে হাইব্রিড ও বৈদ্যুতিক গাড়ি ধীরে ধীরে মূলধারার গাড়ি কেনার সিদ্ধান্তের অংশ হয়ে উঠছে। গাড়ির সরবরাহ বাড়া এবং চার্জিং অবকাঠামো বিস্তৃত হওয়ার সঙ্গে এই পরিবর্তন আরও দৃশ্যমান হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















