যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের আসন্ন বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্যিক উত্তেজনা কমিয়ে রাখা এবং বিদ্যমান সমঝোতা আরও দীর্ঘ করার বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে। তবে এই দুই নেতার রাজনৈতিক বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। ট্রাম্পকে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন ও চলমান যুদ্ধের তাৎক্ষণিক চাপ সামলাতে হচ্ছে। অন্যদিকে শি চীনা কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান হিসেবে সম্ভাব্য চতুর্থ মেয়াদের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
দুই নেতার ভিন্ন রাজনৈতিক সময়সূচিই শিকে আলোচনায় কিছুটা কৌশলগত সুবিধা দিচ্ছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
যুদ্ধবিরতি ধরে রাখাই শির লক্ষ্য
গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য উত্তেজনা কমাতে যে যুদ্ধবিরতি হয়েছিল, সেটি ধরে রাখাই শির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হতে পারে। কারণ নতুন করে বড় ধরনের শুল্কযুদ্ধ শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে, যা নির্বাচনের আগে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
অন্যদিকে চীনের অর্থনীতিও চাপের মধ্যে রয়েছে। আবাসন খাতের সংকট, তরুণদের মধ্যে উচ্চ বেকারত্ব এবং অতিরিক্ত উৎপাদন অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বড় সংঘাত এড়িয়ে শি দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে সময় নিতে চাইতে পারেন।
এ ছাড়া দুর্নীতি ও আনুগত্যের প্রশ্নে সামরিক নেতৃত্বের ওপর ব্যাপক পরিবর্তন আনার পর চীনের সামরিক কাঠামোর শীর্ষ পর্যায় পুনর্গঠনেও সময় প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিল্প, প্রযুক্তি ও সামরিক সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার সুযোগও তৈরি হবে।
শুল্কযুদ্ধে বদলে যায় শক্তির সমীকরণ
ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে চীন কিছু ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের সঙ্গে সমঝোতা করেছিল। ২০১৮ সালে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে অতিরিক্ত ২০০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য ও সেবা কেনার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল বেইজিং। তবে সেই চুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
গত বছর পরিস্থিতি বদলে যায়। ট্রাম্পের ব্যাপক শুল্ক আরোপের জবাবে শি পিছু না হটে পাল্টা শুল্ক আরোপ করেন। পরে চীনের গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও বিরল মৃত্তিকা উপাদানের রপ্তানিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। আধুনিক প্রযুক্তি ও শিল্প উৎপাদনে এসব উপাদানের গুরুত্ব থাকায় পদক্ষেপটি যুক্তরাষ্ট্রসহ বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি করে।
শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধবিরতির পথে যায়। বিশ্লেষকদের মতে, ওই পরিস্থিতি বেইজিংয়ের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শক্তির ভারসাম্যকে চীনের চোখে নতুনভাবে তুলে ধরেছে।
তাইওয়ান ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় অমীমাংসিত দ্বন্দ্ব
দুই দেশের সম্পর্কের বড় বিরোধগুলো অবশ্য এখনো রয়ে গেছে। তাইওয়ানের অবস্থান, চিপ ও প্রযুক্তি রপ্তানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং সামরিক প্রতিযোগিতা নিয়ে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মতপার্থক্য গভীর।
চীন ‘গঠনমূলক কৌশলগত স্থিতিশীলতা’ বজায় রাখার কথা বলছে। বেইজিংয়ের যুক্তি, দুই পরাশক্তির প্রতিযোগিতায় কিছু সীমারেখা থাকা প্রয়োজন, যাতে তা সরাসরি সংঘাতে রূপ না নেয়। তবে মার্কিন বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই ধারণার মাধ্যমে চীন মূলত ওয়াশিংটনকে চীনের প্রভাব মেনে নিয়ে কিছু ক্ষেত্রে পিছিয়ে আসতে উৎসাহিত করতে চাইছে।

বিরোধ কমলেও সম্পর্কের জন্য স্থায়ী কূটনৈতিক কাঠামো এখনো তৈরি হয়নি। ফলে বর্তমান যুদ্ধবিরতিকে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের চেয়ে কৌশলগত ও অস্থায়ী সমঝোতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শীর্ষ বৈঠকেই শির কৌশল
শি জিনপিংয়ের কৌশলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ট্রাম্পের সঙ্গে নিয়মিত সরাসরি বৈঠক বজায় রাখা। চলতি বৈঠকটি এক বছরেরও কম সময়ে দুই নেতার তৃতীয় মুখোমুখি সাক্ষাৎ হতে যাচ্ছে। নভেম্বরে শেনঝেনে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্মেলন এবং ডিসেম্বরে মিয়ামিতে জি-২০ সম্মেলনেও তাদের বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে।
এ ধরনের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বড় কোনো চুক্তি না হলেও সম্পর্কের উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে রাখার সুযোগ তৈরি হয়। ট্রাম্প যে ধরনের ব্যক্তিকেন্দ্রিক কূটনীতি পছন্দ করেন, শি সেই প্রবণতাকে কাজে লাগিয়ে সম্পর্কের বড় সংঘাত এড়িয়ে চলতে চাইছেন বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
বৈঠকটি শির জন্য অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে চীনা জনগণের সামনে নিজেকে একজন প্রভাবশালী বৈশ্বিক নেতা হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ পাবেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা এবং হোয়াইট হাউসে রাষ্ট্রীয় নৈশভোজও সেই ভাবমূর্তি জোরদার করতে পারে।
শেষ পর্যন্ত শির লক্ষ্য হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বড় সংঘাত এড়িয়ে যতটা সম্ভব সময় অর্জন করা—যাতে চীন তার অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও সামরিক সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার সুযোগ পায়।
ট্রাম্প-শি বৈঠক, যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক ও বাণিজ্য যুদ্ধবিরতি নিয়ে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসছে চীনের কৌশলগত অবস্থান।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















