চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে তাইওয়ানের কাছে মার্কিন অস্ত্র বিক্রি বন্ধের দাবি তুলতে পারেন। বিষয়টি নিয়ে আলোচনার সঙ্গে পরিচিত তিনটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, ওয়াশিংটনে ট্রাম্প-শি বৈঠকে বেইজিং ১৯৮২ সালের চীন-যুক্তরাষ্ট্রের একটি যৌথ বিবৃতির ব্যাখ্যা সামনে আনতে পারে।
শি বুধবার ওয়াশিংটনে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। বৃহস্পতিবার দুই নেতার আনুষ্ঠানিক বৈঠক হওয়ার কথা এবং শুক্রবার তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল আর্কাইভসে যাবেন। সূত্রগুলোর মতে, ন্যাশনাল আর্কাইভসেও তাইওয়ান ইস্যুতে চীনের অবস্থান তুলে ধরার সম্ভাবনা রয়েছে।
তাইওয়ান প্রশ্নকে চীন তার সবচেয়ে সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করে। বেইজিং তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে এবং দ্বীপটির কাছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রির দীর্ঘদিন ধরে বিরোধিতা করে আসছে। অন্যদিকে তাইওয়ানের সরকার চীনের সার্বভৌমত্বের দাবি প্রত্যাখ্যান করে।
১৯৮২ সালের চুক্তি নিয়ে চীনের যুক্তি
চীন-যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৮২ সালের তৃতীয় যৌথ বিবৃতিতে ওয়াশিংটন বলেছিল, তারা তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রি ধীরে ধীরে কমানোর পরিকল্পনা করছে এবং তাইওয়ানে দীর্ঘমেয়াদি অস্ত্র সরবরাহের নীতি অনুসরণ করতে চায় না।
তবে ওই সময়কার মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের একটি পৃথক স্মারকে বলা হয়েছিল, অস্ত্র বিক্রি কমানোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ চীনের পক্ষ থেকে তাইওয়ান-সংক্রান্ত বিরোধ শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের ধারাবাহিক অঙ্গীকারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের তাইওয়ানে অস্ত্র বিক্রির ‘দৃঢ় বিরোধিতা’ করে। তিনটি যৌথ বিবৃতি এবং তাইওয়ান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের আগের প্রতিশ্রুতি মেনে চলাকে দুই দেশের সম্পর্কের স্থিতিশীল ও সুস্থ বিকাশের জন্য ‘প্রয়োজনীয় পূর্বশর্ত’ বলেও উল্লেখ করেছে বেইজিং।
নতুন ১৪ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র চুক্তি আটকে আছে
তাইওয়ানকে অস্ত্র সরবরাহের বিষয়টি এমনিতেই ওয়াশিংটন-বেইজিং সম্পর্কের অন্যতম বড় বিরোধের জায়গা। গত ডিসেম্বরে ট্রাম্প প্রশাসন তাইওয়ানের জন্য প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলারের একটি অস্ত্র প্যাকেজ অনুমোদন করেছিল, যা তখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় মার্কিন অস্ত্র বিক্রির প্যাকেজ হিসেবে বিবেচিত হয়।
এরপর আরও প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের একটি অস্ত্র প্যাকেজের বিষয়টি সামনে আসে। তবে সেটি কয়েক মাস ধরে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
মে মাসে বেইজিংয়ে শির সঙ্গে বৈঠকের পর ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, তিনি ওই প্যাকেজটি আপাতত স্থগিত রেখেছেন এবং এটিকে আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ‘দর-কষাকষির হাতিয়ার’ হিসেবে দেখছেন।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নতুন অস্ত্র বিক্রির বিষয়ে ট্রাম্প অল্প সময়ের মধ্যেই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
ইতোমধ্যে কেনা অস্ত্রের সরবরাহও বন্ধ চায় চীন
রয়টার্সের সূত্রগুলোর দাবি, চীন শুধু নতুন অস্ত্র বিক্রি বন্ধের বিষয়েই নয়, তাইওয়ান ইতোমধ্যে যেসব অস্ত্র কিনেছে সেগুলোর সরবরাহ বন্ধ করার বিষয়েও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অনুরোধ করেছে।

এক সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, শি ট্রাম্পকে বোঝানোর চেষ্টা করতে পারেন যে তাইওয়ানই উসকানির উৎস এবং যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের অস্থিতিশীলতার প্রধান কারণ। চীনের দৃষ্টিতে তাইওয়ানই বর্তমান পরিস্থিতি বা ‘স্থিতাবস্থা’ পরিবর্তন করছে—এমন বক্তব্যও আলোচনায় আসতে পারে।
এর বিনিময়ে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান যুদ্ধের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ প্রয়োগে চীন সহযোগিতা করার প্রস্তাব দিতে পারে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। তবে এ বিষয়ে চীন বা যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সমঝোতার কথা প্রকাশ করেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘এক চীন নীতি’ ও তাইওয়ান
তাইওয়ান প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানও জটিল। ওয়াশিংটন ‘এক চীন নীতি’ অনুসরণ করে। এর আওতায় যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের সার্বভৌমত্বের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো অবস্থান নেয় না এবং তাইওয়ান চীনের অংশ—বেইজিংয়ের এই অবস্থানকে স্বীকার করে, তবে তা সমর্থন করে না।
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী, তাইওয়ানকে আত্মরক্ষার সক্ষমতা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম দেওয়ার নীতি রয়েছে।
চীন গত কয়েক বছরে তাইওয়ানকে ঘিরে সামরিক তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। এর মধ্যে বাস্তব ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষাসহ সামরিক মহড়াও রয়েছে। চীনা বাহিনী প্রায় প্রতিদিনই তাইওয়ানের আশপাশে কার্যক্রম চালায়।
‘সিক্স অ্যাস্যুরেন্স’ও আলোচনায় আসতে পারে
১৯৮২ সালেই যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানকে কয়েকটি পৃথক আশ্বাস দিয়েছিল, যা পরে ‘সিক্স অ্যাস্যুরেন্স’ নামে পরিচিত হয়। ২০২০ সালে এগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়।
এই আশ্বাসগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানে অস্ত্র বিক্রি বন্ধের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করেনি। একই সঙ্গে এ ধরনের অস্ত্র বিক্রির আগে বেইজিংয়ের সঙ্গে পরামর্শ করার প্রতিশ্রুতিও দেয়নি।
ফলে ১৯৮২ সালের যৌথ বিবৃতির ব্যাখ্যা নিয়ে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। শি এবার সেই পার্থক্যকে আলোচনার টেবিলে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরতে পারেন।
ট্রাম্পের ওপর তাইওয়ান নিয়ে চাপ বাড়ছে
ট্রাম্পের সঙ্গে শির বৈঠকের আগে যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান দলের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতাও তাইওয়ানের প্রতি ওয়াশিংটনের সমর্থন অব্যাহত রাখার পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন।
সিনেটের বৈদেশিক সম্পর্কবিষয়ক পূর্ব এশিয়া উপকমিটির রিপাবলিকান চেয়ারম্যান পিট রিকেটস বলেছেন, তাইওয়ান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি পরিবর্তন হয়নি—এটি স্পষ্ট করা উচিত।
হাউস সিলেক্ট কমিটি অন চায়নার রিপাবলিকান চেয়ারম্যান জন মুলেনারও ট্রাম্পকে লেখা এক চিঠিতে তাইওয়ান ও এশিয়ার মিত্রদের প্রসঙ্গে চীনের আপত্তির কারণে মার্কিন অস্ত্র বিক্রি বা নিরাপত্তা সহযোগিতা বন্ধ না করার আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে ট্রাম্পের প্রথম প্রশাসনের সাবেক উপ-জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ম্যাট পটিঙ্গার মনে করেন, এবারের বৈঠকে তাইওয়ান নিয়ে বড় কোনো বাস্তব পরিবর্তন নাও আসতে পারে। তার মতে, শি আগের বৈঠকগুলোর মতো এবারও ট্রাম্পের সামনে তাইওয়ান প্রসঙ্গ দীর্ঘ সময় ধরে তুলে ধরতে পারেন।
তাইওয়ানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগও অব্যাহত রেখেছে।
ট্রাম্প-শি বৈঠকে তাইওয়ান ইস্যু কতটা গুরুত্ব পায় এবং যুক্তরাষ্ট্রের আটকে থাকা প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র প্যাকেজের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত আসে—সেদিকেই এখন নজর রয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















