প্রতিদিন কত পা হাঁটছেন, সেই হিসাব রাখেন অনেকেই। স্বাস্থ্য ভালো রাখতে দীর্ঘদিন ধরে দিনে ১০ হাজার পা হাঁটার লক্ষ্যটিকেই একটি প্রচলিত মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয়। তবে নতুন এক গবেষণা বলছে, শুধু মোট কত পা হাঁটা হচ্ছে তা নয়, কতটা দ্রুত হাঁটা হচ্ছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
‘ব্রিটিশ জার্নাল অব স্পোর্টস মেডিসিন’-এ প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, তুলনামূলক কমসংখ্যক পদক্ষেপ দ্রুত গতিতে হাঁটার সঙ্গে অকালমৃত্যুর ঝুঁকি কমার যে সম্পর্ক দেখা গেছে, ধীরগতিতে বেশি পা হাঁটার ক্ষেত্রেও তার কাছাকাছি সুবিধা পাওয়া যেতে পারে।
গবেষণার সহলেখক ও অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নের মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক কর্মকাণ্ড, জীবনযাপন ও জনস্বাস্থ্য বিভাগের অধ্যাপক ইমানুয়েল স্টামাটাকিস বলেন, দিনে ১০ হাজার পা হাঁটার লক্ষ্যটি কোনো নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফল নয়। এর সূত্রপাত ১৯৬০-এর দশকে জাপানে চালানো একটি পেডোমিটার বা পদক্ষেপ গণনাকারী যন্ত্রের প্রচারণা থেকে।
অর্থাৎ, প্রতিদিন ঠিক ১০ হাজার পা হাঁটতেই হবে—এমন বৈজ্ঞানিক নিয়ম নেই। বরং একজন মানুষের শারীরিক সক্ষমতা, বয়স, সময় ও হাঁটার সামর্থ্য অনুযায়ী পদক্ষেপের সংখ্যা এবং গতি—দুটিই বিবেচনায় নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
গবেষক স্টামাটাকিসের ভাষায়, অনেকের কাছে দিনে ১০ হাজার পা হাঁটার লক্ষ্যটি উৎসাহের বদলে নিরুৎসাহের কারণ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে হাঁটুর সমস্যা নিয়ে চলা ৬৫ বছর বয়সী কেউ, খণ্ডিত সময়ে অন্যের যত্ন নেওয়া কোনো ব্যক্তি কিংবা পালাক্রমে কাজ করা শ্রমিকের কাছে এই লক্ষ্যটি কঠিন মনে হতে পারে।

তার মতে, কেউ যদি প্রতিদিন ৪ হাজার পা হাঁটেন কিন্তু তুলনামূলকভাবে বেশি উদ্দেশ্যপূর্ণ ও দ্রুত গতিতে হাঁটেন, তবুও সেটি অর্থবহ শারীরিক কর্মকাণ্ড। আবার কেউ দ্রুত হাঁটতে না পারলেও ধীরগতিতে বেশি পদক্ষেপ জমা করার মাধ্যমে উপকার পেতে পারেন।
এক লাখের বেশি মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ
পদক্ষেপের সংখ্যা ও হাঁটার গতি কীভাবে একসঙ্গে স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত, তা বোঝার জন্য গবেষকেরা যুক্তরাজ্যের ‘ইউকে বায়োব্যাংক’ গবেষণায় অংশ নেওয়া এক লাখের বেশি মধ্যবয়সী মানুষের শারীরিক কর্মকাণ্ডের তথ্য বিশ্লেষণ করেন।
গবেষণায় ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসের অংশগ্রহণকারীরা ছিলেন। ২০১৩ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে প্রত্যেকে টানা সাত দিন একটি কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণকারী যন্ত্র পরেছিলেন। এর মাধ্যমে গবেষকেরা দিনে কত পা হাঁটছেন এবং কী গতিতে হাঁটছেন—দুই ধরনের তথ্যই সংগ্রহ করতে সক্ষম হন।
এরপর অংশগ্রহণকারীদের দৈনিক পদক্ষেপের ভিত্তিতে চারটি ভাগে ভাগ করা হয়—৫ হাজারের কম, ৫ হাজার থেকে ৭ হাজার ৫০০, ৭ হাজার ৫০০ থেকে ১০ হাজার এবং ১০ হাজারের বেশি পদক্ষেপ।
গবেষকেরা একই সঙ্গে ‘পিক-৩০ ক্যাডেন্স’ নামে একটি পরিমাপ ব্যবহার করেন। এর মাধ্যমে দিনের সবচেয়ে সক্রিয় ৩০ মিনিটে একজন ব্যক্তি যে সর্বোচ্চ ধারাবাহিক পদক্ষেপের গতি বজায় রাখতে পেরেছেন, তা হিসাব করা হয়।
অংশগ্রহণকারীদের প্রায় আট বছর ধরে অনুসরণ করা হয়। এই সময়ে সব ধরনের কারণে মৃত্যু এবং হৃদ্রোগজনিত মৃত্যুর তথ্যও পর্যবেক্ষণ করা হয়।

কম পা হাঁটলেও গতি বাড়ানোর সুফল
গবেষণায় সবচেয়ে স্পষ্ট পার্থক্য দেখা যায় দিনে ৫ হাজারের কম পদক্ষেপ নেওয়া মানুষের মধ্যে।
দেখা যায়, এই দলের যারা তাদের সবচেয়ে সক্রিয় ৩০ মিনিটে প্রতি মিনিটে অন্তত ৮০টি পদক্ষেপের গতি অর্জন করতে পেরেছেন, তাদের মৃত্যুর ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম ছিল। এই ঝুঁকি কমার মাত্রা প্রায় এমন মানুষের কাছাকাছি ছিল, যারা দিনে ৫ হাজার থেকে ৭ হাজার ৫০০ পা হাঁটেছেন, তবে তাদের হাঁটার গতি ছিল তুলনামূলক কম—প্রতি মিনিটে প্রায় ৬০টি পদক্ষেপ।
গবেষণার সামগ্রিক ফলাফল থেকে গবেষকেরা বলছেন, বেশি হাঁটা এবং দ্রুত হাঁটা—দুটিই মৃত্যুর ঝুঁকি কমার সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে হাঁটার উপকার পাওয়ার জন্য সবার ক্ষেত্রে একই ‘জাদুকরী সংখ্যা’ পূরণ করতেই হবে, এমন ধারণা পুরোপুরি যথাযথ নয়।
বরং নিজের সক্ষমতা অনুযায়ী নিয়মিত হাঁটার অভ্যাস তৈরি করা এবং সম্ভব হলে হাঁটার গতিতে কিছুটা গতি যোগ করা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তবে গবেষণাটি মূলত পদক্ষেপ, হাঁটার গতি ও মৃত্যুঝুঁকির মধ্যকার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেছে। তাই দ্রুত হাঁটার কারণেই নির্দিষ্টভাবে মৃত্যুঝুঁকি কমেছে—এমন সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক এই গবেষণা থেকে নিশ্চিত করা যায় না।
সব মিলিয়ে গবেষণার বার্তা হলো, প্রতিদিন ১০ হাজার পা পূরণ করতে না পারলেও হাঁটা বন্ধ করার কারণ নেই। কেউ কম পদক্ষেপে কিছুটা দ্রুত হাঁটতে পারেন, আবার কেউ ধীরে ধীরে বেশি পদক্ষেপ জমাতে পারেন। নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে নিজের বাস্তব সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি টেকসই অভ্যাস গড়ে তোলাই গুরুত্বপূর্ণ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















