জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন ঘিরে নিউইয়র্কে যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে বসেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি, ঠিক সেই সময়ই ইউক্রেনের বিভিন্ন এলাকায় বড় ধরনের রুশ হামলার খবর এসেছে। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) চালানো এসব হামলায় অন্তত আটজন নিহত এবং আরও বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।
ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশটির শিল্পাঞ্চল, বন্দর ও সম্মুখসারির বিভিন্ন এলাকায় রুশ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা হয়েছে। গ্রীষ্মজুড়ে রাশিয়া ইউক্রেনের ওপর বিমান হামলা বাড়িয়েছে। এসব হামলায় শুধু সামরিক স্থাপনা নয়, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বন্দর, পণ্য পরিবহনকেন্দ্র, জ্বালানি অবকাঠামোসহ গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে কিয়েভের দাবি।
ইউক্রেনের প্রধানমন্ত্রী সের্হি কোরেতস্কি অভিযোগ করেছেন, রাশিয়া পরিকল্পিতভাবে দেশটির ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, খামার, গুদাম, রেলপথ, জ্বালানি স্থাপনা এবং আবাসিক ভবনকে হামলার লক্ষ্য বানাচ্ছে। এর ফলে যুদ্ধের সামরিক ক্ষতির পাশাপাশি ইউক্রেনের অর্থনীতি ও সরবরাহব্যবস্থার ওপরও চাপ বাড়ছে।
শিল্পাঞ্চলে বড় আঘাত
দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় দনিপ্রোপেত্রোভস্ক অঞ্চলের দনিপ্রো, ক্রিভি রিহ ও পাভলোহরাদ শহরের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে হামলার খবর পাওয়া গেছে। দনিপ্রো শহরে ইউক্রেনের অন্যতম বড় পাইপ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ইন্টারপাইপের একটি স্থাপনায় রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় চারজন নিহত এবং সাতজন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

খেরসন অঞ্চলেও রুশ হামলায় আরও দুজন নিহত হয়েছেন। কৃষ্ণসাগরীয় বন্দরনগরী ওদেসার কাছে হামলায় একজন নিহত হওয়ার কথা জানিয়েছেন স্থানীয় কর্মকর্তারা।
পূর্বাঞ্চলীয় দোনেৎস্ক অঞ্চলের ক্রামাতোরস্কেও রুশ বিমান হামলায় একজন নিহত হয়েছেন। সম্মুখসারির কাছাকাছি অবস্থানের কারণে যুদ্ধের সময় শহরটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় খারকিভ অঞ্চলের ইজিয়ুম শহরেও বড় ধরনের বিমান হামলা হয়েছে। এতে অন্তত সাতজন আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
ইউক্রেনের বিমানবাহিনী জানিয়েছে, রাতভর হামলায় রাশিয়া বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি ২১২টি ড্রোন ব্যবহার করেছে। এত বিপুলসংখ্যক ড্রোনের ব্যবহার ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপরও বড় চাপ তৈরি করেছে।
রাশিয়ার ভেতরেও ইউক্রেনের পাল্টা হামলা
তবে ইউক্রেনও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রাশিয়ার ভূখণ্ডে দূরপাল্লার হামলা বাড়িয়েছে। বিশেষ করে রুশ তেলশিল্প ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলা চালানো হচ্ছে।
ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, মঙ্গলবার রাশিয়ার উফা শহরের একটি তেল শোধনাগারে হামলা চালানো হয়েছে। ইউক্রেন সীমান্ত থেকে উফার দূরত্ব ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটারেরও বেশি। একই দিনে সামারা অঞ্চলের ভলগা নদীর তীরে অবস্থিত কুইবিশেভ তেল শোধনাগারেও হামলা চালানোর দাবি করেছে কিয়েভ।
সামারা অঞ্চলের গভর্নর জানিয়েছেন, ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় একজন নিহত ও চারজন আহত হয়েছেন।
যুদ্ধের দুই পক্ষই অবশ্য বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। রাশিয়ার দাবি, তাদের হামলার লক্ষ্য মূলত ইউক্রেনের সামরিক ও কৌশলগত অবকাঠামো। অন্যদিকে কিয়েভের অভিযোগ, রুশ বাহিনী পরিকল্পিতভাবে ইউক্রেনের অর্থনৈতিক ও বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করছে।
রাশিয়ার দাবি কী
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের বাহিনী ইউক্রেনের শিল্প ও সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। মস্কোর ভাষ্য অনুযায়ী, এসব হামলায় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত, বন্দর অবকাঠামো এবং ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত জাহাজ ও অন্যান্য সমুদ্রযানকে লক্ষ্য করা হয়েছে।
ফলে একদিকে নিউইয়র্কে ট্রাম্প ও জেলেনস্কির বৈঠকে যুদ্ধের ভবিষ্যৎ, সম্ভাব্য শান্তি আলোচনা ও যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা চলছিল, অন্যদিকে ইউক্রেনের মাটিতে হামলা-পাল্টা হামলা অব্যাহত ছিল।
ট্রাম্পের সঙ্গে জেলেনস্কির বৈঠকের সময়ই নতুন করে প্রাণহানি ও অবকাঠামোতে হামলার ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে, যুদ্ধ বন্ধের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পাশাপাশি ইউক্রেন ও রাশিয়ার সামরিক সংঘাতও এখনো তীব্র অবস্থায় রয়েছে। যুদ্ধের ময়দানে হামলার মাত্রা কমানোর কোনো স্পষ্ট লক্ষণ না থাকায় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















