পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের কোহাট শহরের কাছে আফগান তালেবান সরকারের পাঠানো দুটি ‘অপরিণত ড্রোন’ ভূপাতিত করার দাবি করেছে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) কোহাট শহর থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দূরে ড্রোন দুটি শনাক্ত করে প্রতিহত করা হয় বলে নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে।
নিরাপত্তা সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ২৩ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী ‘সফট কিল’ পদ্ধতি ব্যবহার করে দুটি ড্রোন ভূপাতিত করে। ‘সফট কিল’ বলতে সাধারণত এমন প্রতিরোধব্যবস্থাকে বোঝায়, যেখানে সরাসরি বিস্ফোরণ ঘটিয়ে লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করার পরিবর্তে ইলেকট্রনিক বা অন্যান্য প্রযুক্তিগত উপায়ে সেটির নিয়ন্ত্রণ ও কার্যক্ষমতা নষ্ট করা হয়।
পাকিস্তানি নিরাপত্তা সূত্রগুলো বলেছে, আফগানিস্তান থেকে আসা হুমকি মোকাবিলায় দেশটির বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিন-রাত সতর্ক রয়েছে। তবে ড্রোন দুটির নির্দিষ্ট মডেল, আকার বা এগুলো কী ধরনের সরঞ্জাম বহন করছিল—এসব বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের মধ্যে নিরাপত্তা ও সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে উত্তেজনা বাড়ছে। মাত্র দুই দিন আগে পাকিস্তান আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী এলাকায় ‘সন্ত্রাসীদের আস্তানা ও নিরাপদ আশ্রয়স্থল’ লক্ষ্য করে কথিত ‘পরিমিত’ বিমান হামলা চালানোর কথা জানিয়েছিল।

পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় তখন দাবি করে, ওই হামলায় ২৮ জনের বেশি সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে। মন্ত্রণালয় আফগানিস্তানকে পাকিস্তানে সন্ত্রাসবাদের উৎস হিসেবে উল্লেখ করে উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং অভিযোগ করে, দেশটি এখনো সন্ত্রাসীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের জায়গা হয়ে আছে।
এর আগে খাইবার পাখতুনখোয়ার কোহাটে পুরোনো পুলিশ লাইন এলাকায় বড় ধরনের হামলার ঘটনা ঘটে। ওই হামলায় ২৩ জন নিহত এবং প্রায় ১০০ জন আহত হন। পরে এলাকাটি নিরাপদ করতে রাতভর পরিচালিত অভিযানে আটজন সন্ত্রাসী নিহত হওয়ার কথা জানায় পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ।
আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তানের আকাশসীমায় ড্রোন প্রবেশের ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। চলতি বছরের জুলাইয়ে আফগান তালেবান সরকারের পাঠানো চারটি ‘অপরিণত ড্রোন’ বেলুচিস্তানের দিকে প্রবেশ করলে পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনী সেগুলো ভূপাতিত করার দাবি করেছিল। এর আগে জুন মাসেও বেলুচিস্তানের কিলা আবদুল্লাহ ও চাগাই জেলায় দুটি ড্রোন ভূপাতিত করার কথা জানানো হয়।
পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে আফগান তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে দেশটির মাটিতে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ঘাঁটি ও আশ্রয়স্থল বন্ধ করার দাবি জানিয়ে আসছে। বিশেষ করে নিষিদ্ধ তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ইসলামাবাদ বারবার কাবুলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের অভিযোগ, এসব আহ্বানে প্রত্যাশিত সাড়া পাওয়া যায়নি।

২০২১ সালে আফগানিস্তানে তালেবান আবার ক্ষমতায় ফেরার পর পাকিস্তানে সন্ত্রাসী হামলা বেড়েছে বলে বিভিন্ন সময়ে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে। সর্বশেষ ২০ সেপ্টেম্বর হাঙ্গুতে নিরাপত্তা বাহিনীর একটি বহরের সঙ্গে সশস্ত্র ব্যক্তিদের সংঘর্ষে দুই কর্মকর্তা ও আরও চারজন নিহত হন। ওই ঘটনায় আটজন সন্ত্রাসী নিহত হওয়ার কথা জানিয়েছিল পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর গণমাধ্যম শাখা।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের নির্দেশনায় তৈরি একটি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ৯ জুন পর্যন্ত সময়ের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফগান তালেবানের পক্ষ থেকে টিটিপির প্রতি অব্যাহত সমর্থন পাকিস্তানে সন্ত্রাসী হামলার সংখ্যা ও প্রাণঘাতী মাত্রা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। তবে প্রতিবেদনে একই সঙ্গে বলা হয়েছে, কাবুল টিটিপিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে কিছু প্রাথমিক পদক্ষেপও নিয়েছে।
সাম্প্রতিক ড্রোন ভূপাতিতের ঘটনাটি তাই পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তে নিরাপত্তা উত্তেজনার আরেকটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সন্ত্রাসী হামলা, পাকিস্তানের সীমান্তপারের বিমান হামলা এবং আফগানিস্তান থেকে ড্রোন প্রবেশের অভিযোগ—সব মিলিয়ে দুই দেশের মধ্যে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















