বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে কম দামের ছোট গাড়ির চাহিদা বাড়ছে। এই বাজারে এবার নতুন প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আসছে নিসানের নতুন পিক্সো। ইউরোপের বাজারকে সামনে রেখে তৈরি এই ছোট বৈদ্যুতিক গাড়িটি ২০২৭ সালের শুরুতে যুক্তরাজ্যের রাস্তায় নামার কথা। গাড়িটির সম্ভাব্য দাম ধরা হচ্ছে ১৮ হাজার থেকে ২০ হাজার পাউন্ডের মধ্যে, যা যুক্তরাজ্যের বাজারে তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী বৈদ্যুতিক গাড়ির তালিকায় এটিকে রাখতে পারে।
মাত্র ৩ দশমিক ৮ মিটারের কাছাকাছি দৈর্ঘ্যের পিক্সোর লক্ষ্য মূলত শহুরে পরিবহন। ছোট আকার, বৈদ্যুতিক মোটর, ব্যবহারিক অভ্যন্তরীণ নকশা এবং তুলনামূলক কম দাম—এই চার বৈশিষ্ট্যকে কেন্দ্র করেই গাড়িটিকে তৈরি করেছে নিসান।
পিক্সোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, এটি পুরোপুরি নিসানের নিজস্ব প্ল্যাটফর্মে তৈরি নয়। ফরাসি অংশীদার রেনোর নতুন টুইঙ্গোর সঙ্গে এর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। নিসানের সাম্প্রতিক মাইক্রার মতো এখানেও ইউরোপীয় বাজারের জন্য রেনোর প্রযুক্তি ও প্রকৌশল ব্যবহারের পথ বেছে নিয়েছে জাপানি নির্মাতা।
টুইঙ্গোর সঙ্গে মিল, তবে আলাদা চেহারা
পিক্সোর দরজা, জানালা এবং পেছনের পাশের কিছু অংশ রেনো টুইঙ্গোর সঙ্গে ভাগ করা হয়েছে। তবে গাড়িটিকে শুধু টুইঙ্গোর আরেকটি সংস্করণ হিসেবে দেখাতে চায়নি নিসান। তাই সামনের অংশে নিজেদের আলাদা নকশা ব্যবহার করা হয়েছে।
সামনে রয়েছে সরু ও শরীরের সঙ্গে মিশে থাকা এলইডি হেডলাইট, অপেক্ষাকৃত ধারালো রেখা এবং আলাদা ধরনের বোনেট। টুইঙ্গোর তুলনায় পিক্সোর নকশায় আধুনিক ও ভবিষ্যতমুখী ভাব বেশি। গাড়িটির আকৃতিও একেবারে একখণ্ড বাক্সের মতো নয়; বরং সামনের বোনেটকে কিছুটা স্পষ্ট করে আলাদা অবস্থান তৈরি করা হয়েছে।
পেছনের অংশে আবার পুরোনো নিসান মাইক্রার ছাপ দেখা যায়। বিশেষ করে ২০০২ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে বাজারে থাকা তৃতীয় প্রজন্মের মাইক্রার সঙ্গে এর পেছনের নকশার কিছু মিল রয়েছে। নতুন বাম্পার, অপেক্ষাকৃত চওড়া পেছনের বাতি এবং নতুন ধরনের পেছনের কাচের চারপাশের নকশা গাড়িটিকে আলাদা পরিচয় দিয়েছে।
পেছনের প্লাস্টিক অংশে জাপানি ‘নি-সান’ লেখা নকশার মতো ছোট কিছু নান্দনিক সংযোজনও রাখা হয়েছে। নতুন রঙের মধ্যে উজ্জ্বল বেগুনি ও হালকা নীলের মতো বিকল্প থাকছে। ১৬ ও ১৮ ইঞ্চির নতুন নকশার চাকাও পাওয়া যাবে।
ভেতরে ছোট গাড়ির মধ্যে বড় ব্যবহারিকতা
পিক্সোর ভেতরের মূল ড্যাশবোর্ড কাঠামোর সঙ্গে টুইঙ্গোর মিল থাকলেও ওপরের অংশটি নিসানের নিজস্ব নকশায় তৈরি। ড্যাশবোর্ডটি তুলনামূলক উঁচু এবং বিভিন্ন ছোটখাটো জিনিস রাখার জন্য বেশ কিছু জায়গা রয়েছে।
মোবাইল রাখার জন্য মাঝখানে একটি ছোট তাক আছে। এর ওপরে আরও একটি সরু তাক রাখা হয়েছে। দুই আসনের মাঝখানে ঢাকনাযুক্ত বড় স্টোরেজ নেই, তবে কাপ রাখার সুবিধাসহ একটি ট্রে রয়েছে। এতে প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত কিছু সরঞ্জাম যুক্ত করার সুযোগও রাখা হয়েছে।
অভ্যন্তরের উপকরণ খুব বিলাসবহুল না হলেও কমপ্যাক্ট গাড়ির জায়গা বেশ ভালোভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। পেছনে দুটি আসন রয়েছে এবং দুটিই আলাদাভাবে সামনে-পেছনে সরানো যায়। ফলে যাত্রীরা চাইলে পেছনের পায়ের জায়গা বাড়াতে পারেন, আবার প্রয়োজন হলে পেছনের লাগেজ রাখার জায়গাও বাড়ানো যায়।
পেছনের আসন ব্যবহার করা অবস্থায় বুটে সর্বোচ্চ ৩৫৬ লিটার মালপত্র রাখা যাবে। আসন ভাঁজ করলে ধারণক্ষমতা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ২২১ লিটারে। মেঝের নিচেও একটি জায়গা রয়েছে, যেখানে চার্জিংয়ের তার রাখার সুবিধা থাকবে। তবে ডেসিয়ার স্প্রিংয়ের মতো বিভক্ত বুটমেঝে এখানে নেই। গাড়ির সামনের বোনেটের নিচে অতিরিক্ত লাগেজ রাখার জায়গা থাকবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত করেনি নিসান।
প্রযুক্তিতেও থাকছে নতুন সংযোজন
প্রযুক্তির দিক থেকেও পিক্সোকে আধুনিক রাখার চেষ্টা করেছে নিসান। গাড়িতে মানসম্মতভাবে ১০ ইঞ্চির কেন্দ্রীয় স্পর্শনির্ভর পর্দা থাকবে। এতে গুগলের নেভিগেশন ব্যবস্থা যুক্ত থাকবে।
নিসানের গাড়িতে প্রথমবারের মতো গুগলের জেমিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সহকারী ব্যবহারের সুযোগও থাকছে। এর মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা নিজেদের গুগল অ্যাকাউন্টে যুক্ত হয়ে সংরক্ষিত অবস্থান, অনুষ্ঠান, ক্যালেন্ডার ও বার্তার মতো তথ্য ব্যবহার করতে পারবেন।
গাড়ির সঙ্গে ক্লাউডভিত্তিক সংযোগ থাকায় মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে দূর থেকেই কিছু সুবিধা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। গাড়িতে ওঠার আগেই ভেতরের তাপমাত্রা বাড়ানো বা কমানো, আবার উপযুক্ত চার্জিং ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত থাকলে চার্জ চালু বা বন্ধ করার সুবিধাও থাকবে।
তবে সবকিছুর জন্য স্পর্শপর্দার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে না। শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার জন্য নিচে তিনটি প্রচলিত ঘূর্ণায়মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। স্টিয়ারিং হুইলের বোতাম দিয়ে চালকের সামনে থাকা ৭ ইঞ্চির পর্দাও নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। সেখানে নেভিগেশন বা বিভিন্ন গণমাধ্যম-সংক্রান্ত তথ্য দেখা সম্ভব।
১৬১ মাইল পর্যন্ত সম্ভাব্য পাল্লা
নিসান পিক্সোতে সামনে বসানো হয়েছে ৭৮ অশ্বশক্তির বৈদ্যুতিক মোটর। সর্বোচ্চ টর্ক ১৭৫ নিউটন-মিটার। শূন্য থেকে ঘণ্টায় ৬২ মাইল গতিতে পৌঁছাতে সময় লাগবে ১২ দশমিক ১ সেকেন্ড।
শহরের কম গতির রাস্তায় এই শক্তি যথেষ্ট হওয়ার পাশাপাশি মহাসড়কেও স্বাভাবিক গতিতে চলার জন্য গাড়িটি সক্ষম হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গাড়িতে ব্যবহার করা হয়েছে ২৭ দশমিক ৫ কিলোওয়াট-ঘণ্টার লিথিয়াম আয়রন ফসফেট বা এলএফপি ব্যাটারি। সর্বোচ্চ ৫০ কিলোওয়াট গতিতে দ্রুত চার্জ করা যাবে। ১০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত চার্জ হতে প্রায় ২৮ মিনিট লাগবে বলে নিসান জানিয়েছে।
গাড়িটির সম্ভাব্য সর্বোচ্চ ডব্লিউএলটিপি পাল্লা প্রায় ১৬১ মাইল বা ২৫৯ কিলোমিটার। পাশাপাশি সর্বোচ্চ ১১ কিলোওয়াট এসি চার্জিং এবং দ্বিমুখী ভেহিকল-টু-লোড বা ভি-টু-এল চার্জিংয়ের সুবিধাও থাকবে।
এই দামের ছোট বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্ষেত্রে এসব পরিসংখ্যান প্রতিযোগিতামূলক হলেও বড় আকারের কিছু চীনা গাড়িতে বড় ব্যাটারি থাকায় তুলনামূলক বেশি দূরত্ব অতিক্রমের সুযোগ পাওয়া যায়।

দামই হতে পারে সবচেয়ে বড় বিষয়
নিসান এখনো পিক্সোর আনুষ্ঠানিক দাম ঘোষণা করেনি। ডিসেম্বর নাগাদ মূল্য জানানো হতে পারে। তবে যুক্তরাজ্যের বাজারে প্রতিযোগিতামূলক থাকতে গাড়িটির প্রারম্ভিক দাম ১৮ হাজার থেকে ২০ হাজার পাউন্ডের মধ্যে রাখার প্রয়োজন হতে পারে।
ইউরোপে তৈরি হওয়ার কারণে যুক্তরাজ্য সরকারের বৈদ্যুতিক গাড়ি অনুদানের অন্তত প্রথম স্তরের সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। সে ক্ষেত্রে যোগ্য হলে ক্রেতারা ঘোষিত মূল্যের ওপর ১ হাজার ৫০০ পাউন্ড পর্যন্ত ছাড় পেতে পারেন।
পিক্সো যখন বাজারে আসবে, তখন তাকে রেনো টুইঙ্গো, ডেসিয়া স্প্রিং, হোন্ডা সুপার-এন এবং ভক্সওয়াগেনের আসন্ন আইডি.আপের মতো ছোট বৈদ্যুতিক গাড়ির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হবে। একই সঙ্গে চীনা নির্মাতাদের তুলনামূলক বড় আকারের কমদামি বৈদ্যুতিক গাড়িও বাজারে চাপ তৈরি করছে।
এখানেই নিসানের সামনে বড় প্রশ্ন—একই প্রযুক্তিগত ভিত্তির ওপর তৈরি টুইঙ্গোর তুলনায় একজন ক্রেতা কেন পিক্সো বেছে নেবেন? দাম, নকশা, রঙের বিকল্প এবং নিসানের ব্র্যান্ড পরিচিতি হয়তো সেই সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে ছোট আকারের শহুরে বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে পিক্সোর প্রবেশ নিসানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কমপ্যাক্ট আকার, প্রায় ২৫৯ কিলোমিটারের সম্ভাব্য পাল্লা, দ্রুত চার্জিং, ব্যবহারিক অভ্যন্তর এবং সম্ভাব্য ২০ হাজার পাউন্ডের নিচের দাম—সব মিলিয়ে ২০২৭ সালে গাড়িটি ইউরোপের সাশ্রয়ী বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে নতুন প্রতিযোগিতা তৈরি করতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















