পাকিস্তানের সিন্ধু নদ গত ৩৫ বছরে লারকানার পূর্বদিকে প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার সরে গেছে। নদীর গতিপথের এই পরিবর্তন এখন বন্যা নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ বাঁধের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। মহাকাশ ও উচ্চতর বায়ুমণ্ডল গবেষণা কমিশন (SUPARCO)-এর স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে নদীর গতিপথ পরিবর্তন ও তীরভাঙনের ধারাবাহিক চিত্র উঠে এসেছে। বিশেষ করে আকিল ও মরিয়া লুপ বাঁধের আশপাশে নদীর ভাঙন পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।
স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সিন্ধুর বাম তীরে ইতোমধ্যে প্রায় ২ হাজার হেক্টর জমি নদীভাঙনে হারিয়ে গেছে। কয়েক দশকের ভাঙন ও পলি জমার ফলে নদীর সক্রিয় প্রবাহপথ ধীরে ধীরে বন্যা প্রতিরক্ষা অবকাঠামোর দিকে এগিয়ে এসেছে। ফলে নদীর পানি বাঁধ উপচে যাওয়ার আগেই ভাঙনের কারণে বাঁধের কোনো অংশ দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এ পরিস্থিতিকে শুধু নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, নদীর গতিপথ যত বন্যা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কাছে চলে আসছে, ততই ঝুঁকির পরিমাণ বাড়ছে। উচ্চ প্রবাহের সময় বাঁধের দুর্বল কোনো অংশ ভেঙে গেলে নদীর বিপরীত তীরে থাকা জনবসতির হাতে দ্রুত সরে যাওয়ার সময়ও খুব কম থাকতে পারে।
২০১০ সালের বন্যা থেকেও শিক্ষা নেওয়া হয়নি
পাকিস্তান ২০১০ সালের ভয়াবহ বন্যার সময় এমন ঝুঁকির ভয়াবহ পরিণতি দেখেছে। ওই সময় সুপ্রিম কোর্টের গঠিত বন্যা কমিশন নদী, বাঁধ, জলপ্রবাহ ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা বিষয় পরীক্ষা করেছিল। সিন্ধু প্রদেশে টোরি বাঁধ ভেঙে যাওয়ার ঘটনাও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সঙ্গে যুক্ত ছিল।

সেই বিপর্যয়ের পরও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহপথ ও বন্যাপ্রবাহের জায়গা নিয়ে যথেষ্ট শিক্ষা নেওয়া হয়নি বলে সমালোচনা রয়েছে। সংরক্ষিত এলাকায় বসতি ও মাছের ঘের গড়ে ওঠা, প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মানুষের বসতি স্থাপন—এসব সমস্যা এখনও বিভিন্ন জায়গায় দেখা যায়।
এর ফলে শুধু ঘরবাড়ি নয়, মানুষের জীবিকা, কৃষিজমি ও স্থানীয় অর্থনীতিও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। বন্যা হলে অনেক পরিবারকে ঘর ছাড়তে হয়, শিশুদের পড়াশোনা ব্যাহত হয় এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক হতে দীর্ঘ সময় লাগে।
নদীর জায়গা দখলে বাড়ছে ঝুঁকি
সিন্ধু নদীর তীরবর্তী এলাকায় নদীভূমি দখল এবং বন্যাপ্রবাহের জায়গায় অপরিকল্পিত নির্মাণও বড় উদ্বেগের বিষয়। হায়দরাবাদের আশপাশে যেসব এলাকা একসময় নদীর স্বাভাবিক জলপ্রবাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সেসব জায়গার কিছু অংশ ধীরে ধীরে স্থায়ী বসতি ও সড়কের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে।
নদীর পানি বাড়লে বন্যার পানি স্বাভাবিকভাবে ছড়িয়ে পড়ার জায়গা কমে যায়। এর ফলে বাঁধ ও আশপাশের জনবসতির ওপর পানির চাপ বাড়তে পারে। অর্থাৎ নদীর স্বাভাবিক গতিপথ সংকুচিত করার প্রবণতা শেষ পর্যন্ত মানুষের জন্যই বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করে।
লারকানার পরিস্থিতি সেই ঝুঁকিকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। কয়েক দশকের স্যাটেলাইট তথ্য নদীর সক্রিয় চ্যানেল কীভাবে ধীরে ধীরে সরে এসেছে, তার প্রমাণ দিচ্ছে। ফলে বিষয়টি কোনো ভবিষ্যৎ আশঙ্কার অনুমানমাত্র নয়; নদীর গতিপথের পরিবর্তন সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।
বিপর্যয়ের পর নয়, আগেই ব্যবস্থা দরকার
প্রশ্ন উঠছে, এত স্পষ্ট বৈজ্ঞানিক তথ্য থাকার পরও সরকারি পদক্ষেপে কেন একই ধরনের জরুরি ভাব দেখা যাচ্ছে না?
পাকিস্তানে বড় দুর্যোগের পর তদন্ত, কমিশন, প্রতিবেদন ও সুপারিশের দীর্ঘ প্রক্রিয়া দেখা যায়। কিন্তু বিপদ কেটে যাওয়ার পর দায়িত্ব বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে অনেক সময় বাস্তবায়নের গতি কমে যায়। ফলে পরবর্তী দুর্যোগের আগে আগের সুপারিশগুলোর কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
নদীর তীরবর্তী এলাকায় দখলদারত্ব বা নির্মাণের সঙ্গে প্রভাবশালী মহলের স্বার্থ জড়িয়ে থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। দুর্বল আইন প্রয়োগ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং দুর্নীতির মতো সমস্যা প্রাকৃতিক ঝুঁকিকে বড় মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত করতে পারে।

এ ধরনের বাঁধ ভেঙে গেলে ক্ষতির পরিমাণও বিপুল হতে পারে। বাড়িঘর, কৃষিজমি, সড়ক, সরকারি অবকাঠামো এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি পুনর্গঠনে বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয় হতে পারে। কোনো কোনো এলাকায় স্বাভাবিক জীবন ফিরতে কয়েক বছরও লেগে যেতে পারে।
তবে অর্থনৈতিক ক্ষতির চেয়েও বড় বিষয় মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা। বাঁধ ভেঙে গেলে বহু পরিবার ঘরবাড়ি, ফসল ও ব্যবসা হারাতে পারে। অনেক মানুষকে বাস্তুচ্যুত হতে হতে পারে। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতিতে প্রাণহানিও ঘটতে পারে।
এখন কী করা দরকার?
SUPARCO-এর পর্যবেক্ষণকে আরেকটি সাধারণ প্রতিবেদন হিসেবে ফেলে না রেখে জরুরি পরিকল্পনা ও দুর্যোগ প্রতিরোধের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা প্রয়োজন। ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলোর অংশগুলো দ্রুত কারিগরি পরীক্ষা করা দরকার। যেখানে প্রয়োজন, সেখানে বাঁধ শক্তিশালী করা বা অন্য সুরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
একই সঙ্গে নদীর স্বাভাবিক পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করছে এমন দখল ও অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। উচ্চ ঝুঁকির বন্যাপ্রবণ এলাকায় নতুন স্থায়ী বসতি ও নির্মাণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমি ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে শুধু বর্তমান মানচিত্র নয়, নদীর গত কয়েক দশকের আচরণও বিবেচনায় নিতে হবে। কারণ বন্যাপ্রবণ ভূমিকে সাধারণ আবাসন বা উন্নয়নযোগ্য জমি হিসেবে বিবেচনা করলে ভবিষ্যৎ ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

সরকারের পদক্ষেপ স্বচ্ছ করাও গুরুত্বপূর্ণ। কোন কোন এলাকা ঝুঁকিতে রয়েছে, কোথায় কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, কাজ শেষ করার সময়সীমা কী—এসব তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা হলে জবাবদিহি বাড়বে। নিয়মিত অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হলে দায়িত্ব কোন পর্যায়ে রয়েছে, সেটিও স্পষ্ট থাকবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এবার পাকিস্তানের হাতে দুর্যোগের আগে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। বিজ্ঞানীরা বিশ্লেষণ করেছেন, স্যাটেলাইট নদীর গতিপথের পরিবর্তন নথিবদ্ধ করেছে এবং দীর্ঘ সময়ের পর্যবেক্ষণে ঝুঁকির একটি স্পষ্ট চিত্র পাওয়া গেছে।
প্রকৃতি অনেক সময় দুর্যোগের আগে সংকেত দেয়। লারকানায় সিন্ধু নদীর গতিপথের পরিবর্তন তেমনই একটি সংকেত। বাঁধ ভেঙে জনবসতি প্লাবিত হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে তার আগেই ঝুঁকিপূর্ণ অংশ চিহ্নিত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া অনেক কম ব্যয়বহুল এবং কার্যকর হতে পারে।
এখন প্রশ্ন নদী কোথায় যাবে, তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো—নদীর গতিপথের পরিবর্তন এতদিন ধরে দৃশ্যমান হওয়ার পরও সরকার কত দ্রুত সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















