ইউরোপের বিলাসবহুল ফ্যাশনজগতের অনেক পরিচিত নামের পেছনে দীর্ঘদিন ধরেই কাজ করে আসছেন ভারতের দক্ষ কারুশিল্পীরা। জটিল সূচিকর্ম, ঐতিহ্যবাহী বয়ন, অলংকরণ ও হাতে তৈরি নকশায় তাঁদের অবদান থাকলেও আন্তর্জাতিক ফ্যাশন দুনিয়ায় তাঁদের পরিচয় অনেক সময় আড়ালেই থেকে গেছে। এখন সেই চিত্র বদলাতে চাইছে ভারতের অন্যতম পরিচিত কারুশিল্প প্রতিষ্ঠান চানাকিয়া ইন্টারন্যাশনাল।
মুম্বাইভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠানটি গত চার দশকে ফেন্ডি, ডিওর, গুচি, প্রাডাসহ বিশ্বের ৫০টির বেশি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ করেছে। প্রতিষ্ঠানটির মূল লক্ষ্য শুধু আন্তর্জাতিক বিলাসবহুল ফ্যাশন ব্র্যান্ডের জন্য কাজ করা নয়; বরং ভারতীয় কারুশিল্পের নিজস্ব ইতিহাস, দক্ষতা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে বিশ্বের সামনে তুলে ধরা।
চানাকিয়ার ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে মুম্বাইয়ে আয়োজিত হয়েছে একাধিক প্রদর্শনী। এর মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের কাজের পাশাপাশি ভারতের বিস্তৃত কারুশিল্প ঐতিহ্য নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি করতে চাইছে।
মুম্বাইয়ে ৪০ বছর পূর্তির আয়োজন
মুম্বাইয়ের ঐতিহ্যবাহী ড. ভাউ দাজি লাড জাদুঘরে ‘এন রুট’ নামের একটি প্রদর্শনীতে চানাকিয়ার অলাভজনক ‘স্কুল অব ক্র্যাফট’-এর কারিগরদের হাতে তৈরি সূচিকর্ম করা মানচিত্র প্রদর্শন করা হয়েছে। এই স্কুলে সুবিধাবঞ্চিত নারীদের শতাব্দীপ্রাচীন বস্ত্র ও কারুশিল্পের বিভিন্ন কৌশল শেখানো হয়।
অন্যদিকে চানাকিয়ার প্রধান কার্যালয়ে ‘গার্ডেন অব জেসচার্স’ নামে আরেকটি প্রদর্শনীতে হিন্দু ধর্মের সাত মাতৃদেবী বা সপ্তমাতৃকার বিশালাকৃতির লাল ভাস্কর্য প্রদর্শিত হয়েছে। বাঁশ, রাফিয়া ও তুলা ব্যবহার করে সম্পূর্ণ হাতে তৈরি হয়েছে এসব শিল্পকর্ম।
চানাকিয়ার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা মারিয়া গ্রাজিয়া কিয়ুরি, যিনি বর্তমানে ফেন্ডির প্রধান সৃজনশীল কর্মকর্তা, প্রতিষ্ঠানটির এই উদ্যোগে সমর্থন জানিয়েছেন। ২০২৩ সালে ডিওরের মুম্বাই শোতে চানাকিয়ার কারিগরদের কাজ আন্তর্জাতিকভাবে সামনে আসার পর থেকেই এই সম্পর্ক আরও দৃশ্যমান হয়।
কিয়ুরি সিএনএনকে দেওয়া এক ই-মেইলে বলেন, তাঁদের যৌথ বিভিন্ন প্রকল্পে তিনি দেখেছেন, চানাকিয়া কীভাবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভারতীয় কারুশিল্পের গভীরতা, পরিশীলন ও সৃজনশীল সম্ভাবনাকে তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি সেই কারুশিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষ ও জ্ঞানকে সংরক্ষণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

২২ কারিগর নিয়ে শুরু
চানাকিয়ার বর্তমান সৃজনশীল পরিচালক করিশমা স্বালি প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতার মেয়ে। তাঁর বাবা বিনোদ শাহ ছিলেন লোহা ও ইস্পাত ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত উদ্যোক্তা। ১৯৮৬ সালে তিনি গুজরাট থেকে মুম্বাইয়ে আসেন ২২ জন দক্ষ কারিগরকে সঙ্গে নিয়ে। তাঁদের ‘উস্তাদ’ বলা হতো।
শাহের লক্ষ্য ছিল ভারতের নিজস্ব নকশা, কারুশিল্প ও সাংস্কৃতিক ভাষাকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরা এবং একই সঙ্গে এসব ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করা।
প্রথম দিকের আন্তর্জাতিক অংশীদারদের মধ্যে ছিল ইতালীয় ফ্যাশন ব্র্যান্ড আলবার্টা ফেরেত্তি। পরে তাঁর সন্তান করিশমা ও তাঁর ভাই প্রতিষ্ঠানটির কাজে যুক্ত হন। দুজনেই ইতালিতে এবং ভারতের বিভিন্ন কারুশিল্প সম্প্রদায়ের সঙ্গে কাজ করে প্রশিক্ষণ নেন।
বর্তমানে চানাকিয়ার প্রধান কার্যালয় মুম্বাইয়ে। ইতালির বোলোনিয়াতেও প্রতিষ্ঠানটির একটি কার্যালয় রয়েছে। সেখানে ৫০ জনের বেশি ডিজাইনার এবং ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি কারিগর কাজ করেন। তাঁদের কয়েকটি পরিবারে কারুশিল্পের ঐতিহ্য ১৩ প্রজন্ম পর্যন্ত বিস্তৃত।
১ লাখ ৫০ হাজার নমুনার বিশাল সংগ্রহ
চানাকিয়ার কাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো পুরোনো কারুশিল্পকে শুধু হুবহু পুনরুৎপাদন না করে আধুনিক নকশার ভাষায় নতুন করে উপস্থাপন করা।
প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা সংগ্রহশালায় রয়েছে ১ লাখ ৫০ হাজারের বেশি নমুনা উপকরণ এবং ১০ হাজার ঐতিহাসিক বস্ত্র ও শিল্পকর্ম। সেখান থেকে হারিয়ে যেতে বসা বা ব্যবহারের বাইরে চলে যাওয়া বিভিন্ন কৌশল ও নকশাকে খুঁজে বের করা হয়।
করিশমা স্বালির পছন্দের একটি ঐতিহ্যবাহী কৌশল হলো ১৬ শতকের মুঘল আমলের ‘চাঁদ জাল’। এতে খাঁটি রুপার সুতো ব্যবহার করে কোনো ভিত্তি ছাড়াই দাঁড়িয়ে থাকা সূক্ষ্ম জালের মতো নকশা তৈরি করা হয়।
এ ছাড়া রাফিয়া নামের উদ্ভিজ্জ আঁশ ব্যবহার করে লেস তৈরি, অ্যাপ্লিকে ও কুইল্টিংয়ের মতো কৌশলেও পোশাক ও শিল্পকর্ম তৈরি করা হয়। বর্জ্য উপকরণ সম্পূর্ণভাবে ব্যবহার করে তৈরি চানাকিয়ার পরিবেশবান্ধব কিছু সংগ্রহও ডিওর ও মাইসন মারজিয়েলার মতো ব্র্যান্ড ব্যবহার করেছে।
স্বালির ভাষায়, ভারতীয় উপকরণের নিজস্ব শক্তি ও বৈশিষ্ট্য বোঝার পর সেগুলোকে কুতুর বা বিলাসবহুল পোশাকের উপযোগী করে নতুনভাবে কাজে লাগানো হয়।

হারিয়ে যেতে বসা ‘রাফুগারি’ও ফিরছে
চানাকিয়ার একটি শিল্পকর্ম ২০২৪ সালে ভেনিস বিয়েনালে প্রদর্শিত হয়েছিল। সেটি তৈরি হয়েছিল ‘রাফুগারি’ নামের দক্ষিণ এশিয়ার একটি দ্রুত হারিয়ে যেতে বসা কারুশিল্প কৌশল ব্যবহার করে।
রাফুগারি মূলত ছিঁড়ে যাওয়া বা ফুটো হয়ে যাওয়া কাপড় সেলাই করে মেরামত করার প্রাচীন পদ্ধতি। এর মাধ্যমে একটি বস্ত্রকে দীর্ঘদিন ব্যবহারযোগ্য রাখা যায়।
স্বালির মতে, এই কৌশল শুধু মেরামতের বিষয় নয়, বরং ঐতিহ্যকে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে নিয়ে যাওয়ারও একটি পদ্ধতি। তাঁর বক্তব্য, এই ধরনের কারুশিল্পের পৃষ্ঠপোষকতা না থাকলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দক্ষতা ও জ্ঞান হারিয়ে যেতে পারে।
কারুশিল্পের স্বীকৃতি নিয়ে বিতর্ক
আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো ভারতীয় কারুশিল্প ব্যবহার করলেও কারিগর বা ঐতিহ্যের যথাযথ স্বীকৃতি না দেওয়ার অভিযোগ নতুন নয়।
চলতি বছরের শুরুতে রালফ লরেনের বিরুদ্ধে ভারতের ‘বান্ধনি’ কৌশলকে একটি স্কার্টের নকশায় ব্যবহার করে যথাযথ স্বীকৃতি না দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ বিষয়ে ব্র্যান্ডটি প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৫ সালে প্রাডার একটি চামড়ার স্যান্ডেল নিয়েও ভারতে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। অনেকে সেটিকে মহারাষ্ট্রের ঐতিহ্যবাহী ‘কোলহাপুরি চপ্পল’-এর সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন। পরে প্রাডা স্বীকার করে যে স্যান্ডেলটি ভারতীয় পাদুকা ঐতিহ্য থেকে অনুপ্রাণিত ছিল এবং পশ্চিম ভারতের কারুশিল্প সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজ করে সীমিত সংস্করণের জুতা তৈরি করে।
চানাকিয়ার কাজ থাকা ফেন্ডির একটি ব্যাগ নিয়েও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পর্যাপ্ত স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে আলোচনা হয়। তবে ফেন্ডি এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চানাকিয়ার অবদানের কথা উল্লেখ করেছে। একই সঙ্গে লন্ডনের হ্যারডসের একটি আসন্ন অনুষ্ঠানে চানাকিয়ার কারিগরদের নিয়ে গিয়ে তাঁদের কারুশিল্প প্রদর্শনের পরিকল্পনাও রয়েছে।

২০২৩ সালের ডিওর শো ছিল গুরুত্বপূর্ণ বাঁক
করিশমা স্বালির মতে, ২০২৩ সালে মুম্বাইয়ে ডিওরের প্রি-ফল শোতে চানাকিয়ার কারিগরদের ভূমিকা প্রকাশ্যে তুলে ধরা একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মুহূর্ত ছিল।
তাঁর মতে, এর মাধ্যমে এই ধারণা কিছুটা বদলেছে যে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো শুধু কম খরচে কাজ করানোর জন্য ভারতে আসে। বরং ভারতের কারিগরদের দক্ষতা ও নকশার বৈচিত্র্যই আন্তর্জাতিক কুতুর শিল্পে তাদের গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
ডিওরের ওই অনুষ্ঠানে চানাকিয়ার কারিগররা তাঁদের তৈরি কাজ আন্তর্জাতিক দর্শকদের সামনে মঞ্চে দেখতে পান। স্বালির মতে, এর প্রভাব শুধু কারিগরদের ওপর নয়, তাঁদের পরিবার ও নিজ নিজ গ্রামের মানুষের ওপরও পড়ে। তাঁরা বুঝতে পারেন, তাঁদের কাজ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
তরুণ প্রজন্মকে কারুশিল্পে ফেরানোর চেষ্টা
ভারতের বহু তরুণ কারিগর এখন ঐতিহ্যবাহী পেশা ছেড়ে অন্য কাজে যাওয়ার কথা ভাবছেন। এই প্রবণতা নিয়ে উদ্বিগ্ন চানাকিয়া।
প্রতিষ্ঠানটি তাই কারুশিল্পকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অংশ করার লক্ষ্যে বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সহযোগিতার পরিকল্পনা করছে। পাশাপাশি করিশমা স্বালির নিজস্ব প্রস্তুত পোশাক ও জীবনধারাভিত্তিক ব্র্যান্ড ‘কোরাস’-এর মাধ্যমে ভারতের নকশার ভাষাকে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যও রয়েছে।
চার দশক আগে বিনোদ শাহ যে উদ্দেশ্যে চানাকিয়া প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, করিশমা স্বালির মতে, সেটি এখনো অপরিবর্তিত। ভারতের কারিগররা হয়তো তাঁদের দেশ ছেড়ে কাজ করতে যাবেন না, কিন্তু তাঁদের হাতে তৈরি শিল্প ও কারুশিল্প বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে যেতে পারে।
এই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যেই চানাকিয়ার ৪০ বছরের যাত্রার অন্যতম বড় বার্তা—ভারতীয় কারুশিল্প শুধু আন্তর্জাতিক ফ্যাশনের জন্য একটি উপকরণ নয়, বরং নিজস্ব ইতিহাস, দক্ষতা, জ্ঞান ও সাংস্কৃতিক পরিচয় বহনকারী একটি সৃজনশীল ঐতিহ্য।



সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















