যুক্তরাষ্ট্রে এখনো ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে। কিন্তু রাজনৈতিক অঙ্গনে ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রস্তুতি। ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—দুই দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরাই এমন কিছু পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছেন, যা সাধারণত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দীর্ঘ প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দেখা যায়।
সম্ভাব্য প্রার্থীরা মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারে এমন সব অঙ্গরাজ্যে যাচ্ছেন, যেগুলো ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রাথমিক বাছাইপর্বে গুরুত্বপূর্ণ। তারা নীতি ও জাতীয় ইস্যু নিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছেন, স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করছেন এবং ভোটারদের মনোভাব বোঝার চেষ্টা করছেন। কেউ প্রকাশ্যে হোয়াইট হাউসে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষার কথা বলছেন, আবার কেউ সম্ভাবনার দরজা পুরোপুরি বন্ধ করছেন না।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে এ সময় এমন তৎপরতা অস্বাভাবিক নয়। মধ্যবর্তী নির্বাচন সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের জন্য নিজেদের রাজনৈতিক ভিত্তি শক্ত করার একটি সুযোগ তৈরি করে। তবে এবার ২০২৮ সালের প্রতিযোগিতার আভাস তুলনামূলকভাবে আগেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
এর একটি কারণ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের রাজনৈতিক পরিস্থিতি। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে তাঁর প্রশাসনকে ঘিরে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক চলছে। এর পাশাপাশি ডেমোক্র্যাটদের মধ্যেও ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পরের হতাশা কাটিয়ে নতুন নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা জোরালো হয়েছে।
মঙ্গলবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া বক্তব্যেও ট্রাম্প নিজের মেয়াদের সময়সীমার কথা উল্লেখ করেছেন। ইরানের উদ্দেশে তিনি বলেন, “আমি আরও আড়াই বছর এখানে থাকব।” এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি নিজের বর্তমান মেয়াদের সময়ের কথাই স্মরণ করিয়ে দেন।
ডেমোক্র্যাটদের সামনে নতুন নেতৃত্বের প্রশ্ন
২০২৪ সালের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের পরাজয়ের পর দলটির সামনে এখন বড় প্রশ্ন—২০২৮ সালে নেতৃত্ব দেবেন কে?
সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কমালা হ্যারিস ইতিমধ্যে রাজনৈতিক মঞ্চে আবারও সক্রিয় হয়েছেন। মঙ্গলবার তিনি মিশিগানে গিয়ে ডেমোক্র্যাটদের সিনেট প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদের পক্ষে দলকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করেন। তবে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি আবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন কি না, সে সিদ্ধান্ত এখনো জানাননি।
হ্যারিস ছাড়াও নিউইয়র্কের প্রতিনিধি আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজের নাম আলোচনায় রয়েছে। প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাট রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব গত কয়েক বছরে বেড়েছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের সময় বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে তাঁর সক্রিয় উপস্থিতিও তাঁকে জাতীয় রাজনীতির আলোচনায় রেখেছে।
সম্প্রতি নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ওকাসিও-কর্টেজ ২০২৮ সালের সম্ভাবনা নিয়ে সরাসরি কোনো সিদ্ধান্ত জানাননি। তবে তিনি বলেছেন, রাজনীতিতে কখনো কখনো একটি বিশেষ সুযোগ মাত্র একবার আসে—এমন যুক্তি রয়েছে।
একই সঙ্গে নিজের প্রার্থিতা নিয়ে আরেকটি বাস্তব প্রশ্নও তুলেছেন তিনি। তাঁর ভাষায়, তিনি একজন নারী এবং লাতিনা; ফলে প্রার্থীর নির্বাচনে জয়ের সম্ভাবনা নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনায় এসব পরিচয়ও বিবেচনায় আসে।
ওকাসিও-কর্টেজের মন্তব্যে ডেমোক্র্যাটদের সামনে থাকা আরেকটি প্রশ্নও স্পষ্ট হয়—দলটি ভবিষ্যতে প্রগতিশীল ও মধ্যপন্থী ভোটারদের কীভাবে একই রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে আনবে।
গভর্নরদেরও তৎপরতা
ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় কয়েকজন গভর্নরও নিজেদের জাতীয় পরিচিতি বাড়ানোর চেষ্টা করছেন।
পেনসিলভানিয়ার গভর্নর জশ শাপিরো সম্প্রতি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার ও এর সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে জাতীয় পর্যায়ের বিতর্কে অবস্থান নিয়েছেন। এআই প্রযুক্তির ওপর কিছু নিয়ন্ত্রণ বা নিরাপত্তা কাঠামোর প্রয়োজনীয়তার পক্ষে তিনি কথা বলেছেন এবং ট্রাম্পের এআই নিয়ে উদ্বেগকে ‘ভিত্তিহীন’ বলার বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন।
কেন্টাকির গভর্নর অ্যান্ডি বেসিয়ার মঙ্গলবার তাঁর নতুন বই প্রকাশ করেছেন। বইটির নাম ‘গো অ্যান্ড ডু লাইকওয়াইজ: হাউ উই হিল আ ব্রোকেন কান্ট্রি’। জাতীয় পর্যায়ে নিজের রাজনৈতিক পরিচিতি বাড়াতে বই প্রকাশ করা মার্কিন রাজনীতিতে নতুন কোনো কৌশল নয়।
২০২৮ সালে প্রেসিডেন্ট পদে লড়বেন কি না জানতে চাইলে বেসিয়ার বলেছেন, তিনি এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেননি। তবে তিনি জাতীয় রাজনীতিতে বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
ইলিনয়ের গভর্নর জেবি প্রিটজকারও ট্রাম্পবিরোধী রাজনীতিতে নিজেকে দৃশ্যমান করেছেন। তবে তাঁর সাম্প্রতিক আলোচনার একটি বড় অংশ ছিল ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ও ওজন কমানোর বিষয়কে ঘিরে। প্রিটজকার জানিয়েছেন, তিনি পুনর্নির্বাচনের প্রচারেই এখন মনোযোগ দিচ্ছেন এবং ভবিষ্যতে কী করবেন, সে বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেননি।
অ্যারিজোনার সিনেটর মার্ক কেলিও সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থিতা নিয়ে দরজা খোলা রেখেছেন। তিনি বলেছেন, তিনি হয়তো প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন, তবে এখনো সিদ্ধান্ত নেননি।
রিপাবলিকান শিবিরে ভ্যান্সকে ঘিরে আলোচনা
রিপাবলিকানদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি নজর ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে ঘিরে। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে ভ্যান্সের নাম রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।
তবে ভ্যান্সের সামনে রয়েছে একটি জটিল রাজনৈতিক সমীকরণ। তাঁকে একই সঙ্গে ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ধরে রাখার সম্ভাবনা এবং নিজের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় তৈরির প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে।
সম্প্রতি তিনি আইওয়ায় সফর করেছেন। আইওয়া রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট প্রার্থী বাছাইয়ের প্রাথমিক পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্য। সেখানে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার কারণে সিনেট ও গভর্নর নির্বাচনের প্রতিযোগিতাও প্রত্যাশার তুলনায় কঠিন হয়ে উঠেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভ্যান্সের নিজস্ব নির্বাচনী অভিজ্ঞতাও তুলনামূলকভাবে সীমিত। সিনেটর হিসেবে তিনি মাত্র দুই বছর দায়িত্ব পালন করার পর ভাইস প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। ফলে ২০২৮ সালের মনোনয়ন দৌড়ে তাঁর সামনে অন্য রিপাবলিকান প্রার্থীদের চ্যালেঞ্জ থাকার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর নামও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আসে। তবে তিনি প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পরিকল্পনা করছেন—এমন কোনো ইঙ্গিত এখনো প্রকাশ্যে দেননি।
টেড ক্রুজ থেকে র্যান্ড পল
রিপাবলিকানদের সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় টেক্সাসের সিনেটর টেড ক্রুজও রয়েছেন। ২০১৬ সালের রিপাবলিকান মনোনয়ন প্রতিযোগিতায় ট্রাম্পের পর দ্বিতীয় হয়েছিলেন তিনি এবং ১১টি অঙ্গরাজ্যের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় পেয়েছিলেন।
আগস্টে এক পডকাস্টে ক্রুজ বলেন, প্রেসিডেন্ট হতে চান—এটি কোনো গোপন বিষয় নয়। তবে তিনিও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেননি।
সম্ভাব্য অন্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন টেক্সাসের গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট, ফ্লোরিডার সাবেক গভর্নর ও ২০২৪ সালের রিপাবলিকান প্রার্থী রন ডেস্যান্টিস এবং ফ্লোরিডার সিনেটর রিক স্কট।
কেন্টাকির সিনেটর র্যান্ড পলও সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আলোচনায় আছেন। তিনি ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাবাদী অর্থনৈতিক নীতির বিপরীতে মুক্তবাজার ও শুল্কবিরোধী অবস্থানকে সামনে আনতে চাইছেন। পল নিজেই বলেছেন, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়ার বিষয়ে তাঁর সিদ্ধান্ত এখনো ৫০-৫০।
ট্রাম্প-পরবর্তী রিপাবলিকান পার্টি কোন পথে?
২০২৮ সালের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের সামনে একটি বড় নীতিগত প্রশ্ন থাকবে—ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বা ‘মাগা’ রাজনৈতিক ধারা কতটা অব্যাহত থাকবে, নাকি দলটি তার ঐতিহ্যগত রক্ষণশীল রাজনৈতিক অবস্থানের দিকে আরও বেশি ফিরবে।
অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটদের সামনে রয়েছে দলীয় ঐক্যের প্রশ্ন। প্রগতিশীল ও মধ্যপন্থী—দুই ধারার ভোটারকে এক প্ল্যাটফর্মে রাখার মতো নেতৃত্ব খুঁজে বের করা তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
২০২৪ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের পর ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে নতুন নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে শুধু ট্রাম্পবিরোধী অবস্থান ২০২৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে যথেষ্ট হবে কি না, সেটিও দলটির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রশ্ন।
বর্তমানে অবশ্য ২০২৮ সালের সম্ভাব্য প্রার্থীর চেয়ে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতসহ আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিই মার্কিন রাজনীতিতে বেশি তাৎক্ষণিক গুরুত্ব বহন করছে।
তবু নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর রাজনৈতিক দৃশ্যপট আরও পরিষ্কার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রস্তুতিও আরও প্রকাশ্য হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তখন দুই প্রধান দলের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের জন্য শুরু হবে আরও স্পষ্ট প্রতিযোগিতা।
২০২৮ সালের নির্বাচনে দুই দলেরই নতুন নেতৃত্ব সামনে আসার সম্ভাবনা থাকায় সেটি ট্রাম্প-পরবর্তী মার্কিন রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















