০২:৫৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রাচীন দাবানল থেকেই কি মৃৎপাত্র তৈরির ধারণা? আগুন ও ভূমিধসের নতুন রহস্য ঘোলা পানিতে মাছের আচরণে চমক, খাবার খুঁজতে আরও কাছাকাছি হয় দল প্রতিদিন ১০ হাজার পা হাঁটা জরুরি নয়, গতি বাড়ালেও মিলতে পারে বড় উপকার রিফর্ম ইউকে বলছে ব্রিটেন ভেঙে পড়েছে, কিন্তু বার্মিংহাম বলছে অন্য গল্প উচ্চ খরচ, কম উচ্চাকাঙ্ক্ষা—রপ্তানি বাঁচাতে পাকিস্তানের সামনে দুই দিকের লড়াই পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তে দ্বিতীয় স্তরের বেড়া কেন চাইছে ইসলামাবাদ? ভালুকের আঁচড়ে ক্ষতবিক্ষত গাছেই নতুন জীবন, সেই কাঠে তৈরি হচ্ছে সার্ফবোর্ড-স্কেটবোর্ড সরে যাচ্ছে পাকিস্তানের সিন্ধু নদ, তবু কেন নীরব সরকার? এক দশকে বদলে গেছে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের সমীকরণ, ওয়াশিংটনে আরও আত্মবিশ্বাসী শি ৯/১১-এর ২৫ বছর পর সামনে আসছে ক্যানসারের নতুন ঢেউ

শোকের পাঁচ ধাপ: প্রিয়জন হারানোর পর মন কীভাবে সামলায়, কীভাবে এগোনো যায়

প্রিয়জনের মৃত্যু মানুষের পরিচিত পৃথিবীটাকেই যেন হঠাৎ বদলে দেয়। শোকের সেই সময়ে অনেকের মনে হতে পারে, এই কষ্টের কোনো শেষ নেই। কেউ হতবাক হয়ে যান, কেউ রাগে ভেঙে পড়েন, কেউ বারবার ভাবেন—আর একটু আগে কিছু করলে হয়তো মানুষটিকে বাঁচানো যেত। আবার কেউ গভীর বিষণ্নতায় ডুবে যান, কিংবা ধীরে ধীরে নতুন বাস্তবতাকে মেনে নিতে শেখেন।

শোকের এই অভিজ্ঞতাকে বোঝাতে সবচেয়ে পরিচিত ধারণাগুলোর একটি হলো ‘শোকের পাঁচ ধাপ’। ১৯৬৯ সালে সুইস-আমেরিকান মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এলিজাবেথ কুবলার-রস তার On Death and Dying বইয়ে মৃত্যুপথযাত্রী রোগীদের মৃত্যুকে মেনে নেওয়ার অভিজ্ঞতা ব্যাখ্যা করতে এই কাঠামো তুলে ধরেন। পাঁচটি ধাপ হলো—অস্বীকার, রাগ, দর-কষাকষি, বিষণ্নতা ও গ্রহণযোগ্যতা।

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শোকের এই পাঁচ ধাপকে সবার জন্য নির্দিষ্ট বা ধারাবাহিক নিয়ম হিসেবে দেখা ঠিক নয়। গবেষক ও শোক-বিশেষজ্ঞদের অনেকেই এই মডেলের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ও সরলীকরণের সমালোচনা করেছেন। কুবলার-রস নিজেও এটিকে সবার শোকের অভিজ্ঞতার কঠোর নিয়ম হিসেবে উপস্থাপন করতে চাননি।

শোক বিশেষজ্ঞ ডেভিড কেসলারের ব্যাখ্যায়, মানুষ কখনো অস্বীকার থেকে রাগে, আবার রাগ থেকে গভীর বিষণ্নতায় যেতে পারেন; পরে আবার আগের কোনো অনুভূতিতে ফিরে আসতে পারেন। একটি অনুভূতি কয়েক মিনিট বা কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হতে পারে, আবার দীর্ঘ সময়ও থাকতে পারে।

অস্বীকার: বাস্তবতাকে মেনে নিতে না পারা

প্রিয়জনের মৃত্যুর পর প্রথম প্রতিক্রিয়াগুলোর একটি হতে পারে অস্বীকার বা অবিশ্বাস। মানুষটি সত্যিই আর নেই—এই বাস্তবতাটি মন একবারে পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারে না।

Five Things About the 'Five Stages of Grief' - What's Your Grief

এটি সবসময় অসুস্থ বা ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া নয়। আকস্মিক ও তীব্র কষ্ট থেকে মনকে সাময়িকভাবে রক্ষা করার একটি উপায় হিসেবেও এটি কাজ করতে পারে। ধীরে ধীরে বাস্তবতাটি উপলব্ধি করার সুযোগ দেয়।

তবে কেউ যদি বাস্তবতাকে দীর্ঘদিন পুরোপুরি অস্বীকার করে দৈনন্দিন জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন, তখন কাছের মানুষের সহায়তা কিংবা পেশাদার সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে।

রাগ: কষ্টের আরেক প্রকাশ

মৃত্যুর পর রাগও খুব স্বাভাবিক অনুভূতি হতে পারে। এই রাগ কারও ওপর, নিজের ওপর, চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর, মৃত্যুর কারণের ওপর, এমনকি নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস বা ভাগ্যের ওপরও হতে পারে।

শোক বিশেষজ্ঞদের মতে, রাগ অনেক সময় গভীর কষ্ট প্রকাশের একটি মাধ্যম। প্রিয়জনকে হারানোর পর যে অসহায়ত্ব ও শূন্যতা তৈরি হয়, রাগ সেটিকে সাময়িকভাবে একটি নির্দিষ্ট দিকে কেন্দ্রীভূত করতে পারে।

এর সঙ্গে অপরাধবোধ ও নিজেকে দোষ দেওয়ার প্রবণতাও যুক্ত হতে পারে। ‘আমি যদি আরও আগে বুঝতাম’, ‘আরও কিছু করলে হয়তো মানুষটি বেঁচে যেত’—এ ধরনের চিন্তা শোকের মধ্যে খুব সাধারণ।

রাগ প্রকাশের ক্ষেত্রে নিজের বা অন্যের ক্ষতি না করে নিরাপদ উপায় বেছে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। হাঁটা বা দৌড়ানো, ব্যায়াম, লেখা, কারও সঙ্গে কথা বলা কিংবা শোক নিয়ে কাজ করা সহায়ক হতে পারে।

দর-কষাকষি: ‘যদি এমন হতো…’

শোকের আরেকটি পরিচিত অনুভূতি হলো দর-কষাকষি। এতে মানুষ বারবার অতীতের ঘটনা নিয়ে ভাবতে পারেন—‘যদি আমি সেদিন অন্য সিদ্ধান্ত নিতাম’, ‘যদি আরও আগে হাসপাতালে নিয়ে যেতাম’, ‘যদি শেষবার আরেকটু কথা বলতাম’।

OpenLeadership - Five stages of grief - Tom McCallum - UK Leadership

এই পর্যায়ে অনুশোচনা ও অপরাধবোধ প্রবল হতে পারে। মানুষ কখনো কখনো নিজের সঙ্গে এমন এক ধরনের মানসিক সমঝোতা করার চেষ্টা করেন, যাতে মনে হয় পরিস্থিতিটি হয়তো অন্যভাবে ঘটতে পারত।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, জীবনে অনেক ঘটনা আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে। অতীতের প্রতিটি সিদ্ধান্তকে নতুন করে বিচার করতে থাকলে শোক আরও ভারী হয়ে উঠতে পারে।

বিষণ্নতা: অনুপস্থিতির গভীর বাস্তবতা

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রিয়জনের অনুপস্থিতি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। তখন গভীর দুঃখ, একাকিত্ব, আগ্রহ হারিয়ে ফেলা কিংবা দৈনন্দিন জীবন থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার মতো অনুভূতি দেখা দিতে পারে।

শোকের গভীরতা সবার ক্ষেত্রে একই সময়ে আসে না। কেউ মৃত্যুর পরপরই ভেঙে পড়েন, আবার কেউ প্রথম কয়েক মাস তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক থাকার পর অনেক পরে তীব্র দুঃখ অনুভব করতে পারেন।

এর একটি কারণ হতে পারে, শুরুর দিকে বাস্তবতাকে পুরোপুরি উপলব্ধি না করা। পরে যখন ধীরে ধীরে বোঝা যায় যে প্রিয় মানুষটি আর ফিরে আসবেন না, তখন শোকের গভীরতা নতুন করে অনুভূত হতে পারে।

তবে শোকের সময় গভীর দুঃখ অনুভব করলেই সেটিকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অর্থে বিষণ্নতার রোগ হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। কেউ যদি দীর্ঘদিন ধরে তীব্র কষ্টে থাকেন, দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হয় বা জীবন নিয়ে আশাহীনতা তৈরি হয়, তাহলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

পরিবার, বন্ধু, শোক-সহায়তা গোষ্ঠী এবং নিজের যত্ন নেওয়ার অভ্যাসও এই সময়ে সহায়ক হতে পারে।

গ্রহণযোগ্যতা: ‘সব ঠিক হয়ে গেছে’—এমন নয়

গ্রহণযোগ্যতা মানে এই নয় যে প্রিয়জনের মৃত্যু মেনে নিয়ে মানুষটি আর কষ্ট পাবেন না। বরং এর অর্থ হতে পারে—নতুন বাস্তবতাকে ধীরে ধীরে স্বীকার করে তার সঙ্গে জীবনকে মানিয়ে নেওয়া।

কেউ হয়তো বুঝতে পারেন, এখন তাকে একা থাকতে হচ্ছে। আগের মতো ফোন করার মতো বাবা-মা, ভাই-বোন বা জীবনসঙ্গী আর নেই। এই বাস্তবতাকে স্বীকার করা মানেই প্রিয় মানুষটির প্রতি ভালোবাসা শেষ হয়ে যাওয়া নয়।

শোক বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রহণযোগ্যতা একবারে ঘটে যাওয়া কোনো চূড়ান্ত পর্যায়ও নয়। জীবনের বিভিন্ন মুহূর্তে মানুষ বারবার নতুন করে বাস্তবতাকে গ্রহণ করতে পারেন—শেষকৃত্য, জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকী, কোনো পুরোনো জায়গায় যাওয়া কিংবা প্রিয়জনের কোনো স্মৃতি হঠাৎ মনে পড়ার সময়।

শোকের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই

শোকের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো—এর কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। কয়েক সপ্তাহ, কয়েক মাস বা এক বছর পরেই শোক শেষ হয়ে যাবে—এমন কোনো সার্বজনীন নিয়ম নেই।

প্রিয়জনের মৃত্যু যদি স্থায়ী বাস্তবতা হয়, তাহলে তার অনুপস্থিতির অনুভূতিও জীবনের কোনো না কোনো অংশে থেকে যেতে পারে। সময়ের সঙ্গে পরিবর্তনটা হতে পারে কষ্টের ধরনে।

শোক বিশেষজ্ঞ ডেভিড কেসলার বলেছেন, লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রিয় মানুষটিকে ভুলে যাওয়া বা কষ্ট পুরোপুরি মুছে ফেলা নয়; বরং এমন এক পর্যায়ে পৌঁছানো, যখন তাকে মনে করলে কষ্টের পাশাপাশি ভালোবাসা ও সুন্দর স্মৃতিও বেশি জায়গা করে নিতে পারে।

‘ভুলে যাওয়া’ নয়, নতুন বাস্তবতার সঙ্গে বেঁচে থাকা

শোককে অনেক সময় ‘কাটিয়ে ওঠা’ বা ‘ভুলে যাওয়া’র ভাষায় ব্যাখ্যা করা হয়। কিন্তু শোক-বিশেষজ্ঞদের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি হলো, মানুষ আসলে প্রিয়জনের মৃত্যু থেকে পুরোপুরি ‘মুক্ত’ হয়ে যায় না। বরং সেই ক্ষতিকে নিজের জীবনের অংশ হিসেবে গ্রহণ করে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে এগিয়ে যেতে শেখে।

এই প্রক্রিয়ায় কখনো দুঃখ থাকবে, কখনো স্বস্তি, কখনো ভালো স্মৃতি, আবার কখনো হঠাৎ তীব্র কষ্ট ফিরে আসতে পারে। এগুলো পরস্পরবিরোধী নয়।

তবে শোক এতটাই তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী হলে যে তা দৈনন্দিন জীবন, সম্পর্ক, কাজ কিংবা সামাজিক যোগাযোগে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি করে, তখন পেশাদার সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন।

আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন ‘প্রলংড গ্রিফ ডিসঅর্ডার’ বা দীর্ঘস্থায়ী শোকজনিত সমস্যাকে একটি স্বীকৃত মানসিক স্বাস্থ্যগত অবস্থা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে প্রিয়জনের মৃত্যু অন্তত এক বছর আগে এবং শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে অন্তত ছয় মাস আগে ঘটতে হয়—তারপরও যদি তীব্র ও স্থায়ী শোকের কারণে জীবনে পুনরায় যুক্ত হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, তাহলে বিশেষজ্ঞের মূল্যায়ন প্রয়োজন হতে পারে।

শোকের মধ্যেও অর্থ খুঁজে পাওয়া

ডেভিড কেসলার পরে শোকের পাঁচ ধাপের সঙ্গে ‘অর্থ খোঁজা’কে একটি অতিরিক্ত ধারণা হিসেবে যুক্ত করেন। তার নিজের ছেলের মৃত্যুর পর তিনি উপলব্ধি করেন, শুধু বাস্তবতাকে মেনে নেওয়াই সবসময় যথেষ্ট নয়; মানুষ কখনো কখনো নিজের ক্ষতির মধ্য থেকেও জীবনের নতুন অর্থ খুঁজে নিতে চায়।

এই অর্থ খোঁজার ধরন সবার ক্ষেত্রে আলাদা হতে পারে। কেউ প্রিয়জনের স্মৃতি ধরে রাখতে কোনো সামাজিক কাজে যুক্ত হতে পারেন, কেউ গবেষণায় অর্থ দিতে পারেন, কেউ অন্য মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারেন, আবার কেউ নিজের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ কোনো পরিবর্তন আনতে পারেন।

এতে প্রিয়জন হারানোর কষ্ট মুছে যায় না। তবে সেই কষ্টের সঙ্গে নতুনভাবে বেঁচে থাকার একটি পথ তৈরি হতে পারে।

সবশেষে, শোকের কোনো একক ‘সঠিক’ পথ নেই। কেউ দ্রুত কোনো অনুভূতি থেকে বেরিয়ে আসবেন, কেউ একই অনুভূতিতে বারবার ফিরে যাবেন। কেউ কাঁদবেন, কেউ চুপ থাকবেন, কেউ রাগ করবেন, আবার কেউ প্রথম দিকে প্রায় স্বাভাবিক থাকবেন। এসব পার্থক্যই মানুষের শোকের স্বাভাবিক বৈচিত্র্যের অংশ।

প্রিয়জনকে হারানোর পর লক্ষ্য সবসময় ‘আগের মতো হয়ে যাওয়া’ নয়। বরং ক্ষতিকে জীবনের অংশ করে নিয়ে, স্মৃতি ও ভালোবাসাকে সঙ্গে রেখে, ধীরে ধীরে নতুন বাস্তবতার মধ্যে সামনে এগিয়ে যাওয়াই হতে পারে শোকের দীর্ঘ পথের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রাচীন দাবানল থেকেই কি মৃৎপাত্র তৈরির ধারণা? আগুন ও ভূমিধসের নতুন রহস্য

শোকের পাঁচ ধাপ: প্রিয়জন হারানোর পর মন কীভাবে সামলায়, কীভাবে এগোনো যায়

০২:১০:২৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রিয়জনের মৃত্যু মানুষের পরিচিত পৃথিবীটাকেই যেন হঠাৎ বদলে দেয়। শোকের সেই সময়ে অনেকের মনে হতে পারে, এই কষ্টের কোনো শেষ নেই। কেউ হতবাক হয়ে যান, কেউ রাগে ভেঙে পড়েন, কেউ বারবার ভাবেন—আর একটু আগে কিছু করলে হয়তো মানুষটিকে বাঁচানো যেত। আবার কেউ গভীর বিষণ্নতায় ডুবে যান, কিংবা ধীরে ধীরে নতুন বাস্তবতাকে মেনে নিতে শেখেন।

শোকের এই অভিজ্ঞতাকে বোঝাতে সবচেয়ে পরিচিত ধারণাগুলোর একটি হলো ‘শোকের পাঁচ ধাপ’। ১৯৬৯ সালে সুইস-আমেরিকান মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এলিজাবেথ কুবলার-রস তার On Death and Dying বইয়ে মৃত্যুপথযাত্রী রোগীদের মৃত্যুকে মেনে নেওয়ার অভিজ্ঞতা ব্যাখ্যা করতে এই কাঠামো তুলে ধরেন। পাঁচটি ধাপ হলো—অস্বীকার, রাগ, দর-কষাকষি, বিষণ্নতা ও গ্রহণযোগ্যতা।

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শোকের এই পাঁচ ধাপকে সবার জন্য নির্দিষ্ট বা ধারাবাহিক নিয়ম হিসেবে দেখা ঠিক নয়। গবেষক ও শোক-বিশেষজ্ঞদের অনেকেই এই মডেলের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ও সরলীকরণের সমালোচনা করেছেন। কুবলার-রস নিজেও এটিকে সবার শোকের অভিজ্ঞতার কঠোর নিয়ম হিসেবে উপস্থাপন করতে চাননি।

শোক বিশেষজ্ঞ ডেভিড কেসলারের ব্যাখ্যায়, মানুষ কখনো অস্বীকার থেকে রাগে, আবার রাগ থেকে গভীর বিষণ্নতায় যেতে পারেন; পরে আবার আগের কোনো অনুভূতিতে ফিরে আসতে পারেন। একটি অনুভূতি কয়েক মিনিট বা কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হতে পারে, আবার দীর্ঘ সময়ও থাকতে পারে।

অস্বীকার: বাস্তবতাকে মেনে নিতে না পারা

প্রিয়জনের মৃত্যুর পর প্রথম প্রতিক্রিয়াগুলোর একটি হতে পারে অস্বীকার বা অবিশ্বাস। মানুষটি সত্যিই আর নেই—এই বাস্তবতাটি মন একবারে পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারে না।

Five Things About the 'Five Stages of Grief' - What's Your Grief

এটি সবসময় অসুস্থ বা ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া নয়। আকস্মিক ও তীব্র কষ্ট থেকে মনকে সাময়িকভাবে রক্ষা করার একটি উপায় হিসেবেও এটি কাজ করতে পারে। ধীরে ধীরে বাস্তবতাটি উপলব্ধি করার সুযোগ দেয়।

তবে কেউ যদি বাস্তবতাকে দীর্ঘদিন পুরোপুরি অস্বীকার করে দৈনন্দিন জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন, তখন কাছের মানুষের সহায়তা কিংবা পেশাদার সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে।

রাগ: কষ্টের আরেক প্রকাশ

মৃত্যুর পর রাগও খুব স্বাভাবিক অনুভূতি হতে পারে। এই রাগ কারও ওপর, নিজের ওপর, চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর, মৃত্যুর কারণের ওপর, এমনকি নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস বা ভাগ্যের ওপরও হতে পারে।

শোক বিশেষজ্ঞদের মতে, রাগ অনেক সময় গভীর কষ্ট প্রকাশের একটি মাধ্যম। প্রিয়জনকে হারানোর পর যে অসহায়ত্ব ও শূন্যতা তৈরি হয়, রাগ সেটিকে সাময়িকভাবে একটি নির্দিষ্ট দিকে কেন্দ্রীভূত করতে পারে।

এর সঙ্গে অপরাধবোধ ও নিজেকে দোষ দেওয়ার প্রবণতাও যুক্ত হতে পারে। ‘আমি যদি আরও আগে বুঝতাম’, ‘আরও কিছু করলে হয়তো মানুষটি বেঁচে যেত’—এ ধরনের চিন্তা শোকের মধ্যে খুব সাধারণ।

রাগ প্রকাশের ক্ষেত্রে নিজের বা অন্যের ক্ষতি না করে নিরাপদ উপায় বেছে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। হাঁটা বা দৌড়ানো, ব্যায়াম, লেখা, কারও সঙ্গে কথা বলা কিংবা শোক নিয়ে কাজ করা সহায়ক হতে পারে।

দর-কষাকষি: ‘যদি এমন হতো…’

শোকের আরেকটি পরিচিত অনুভূতি হলো দর-কষাকষি। এতে মানুষ বারবার অতীতের ঘটনা নিয়ে ভাবতে পারেন—‘যদি আমি সেদিন অন্য সিদ্ধান্ত নিতাম’, ‘যদি আরও আগে হাসপাতালে নিয়ে যেতাম’, ‘যদি শেষবার আরেকটু কথা বলতাম’।

OpenLeadership - Five stages of grief - Tom McCallum - UK Leadership

এই পর্যায়ে অনুশোচনা ও অপরাধবোধ প্রবল হতে পারে। মানুষ কখনো কখনো নিজের সঙ্গে এমন এক ধরনের মানসিক সমঝোতা করার চেষ্টা করেন, যাতে মনে হয় পরিস্থিতিটি হয়তো অন্যভাবে ঘটতে পারত।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, জীবনে অনেক ঘটনা আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে। অতীতের প্রতিটি সিদ্ধান্তকে নতুন করে বিচার করতে থাকলে শোক আরও ভারী হয়ে উঠতে পারে।

বিষণ্নতা: অনুপস্থিতির গভীর বাস্তবতা

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রিয়জনের অনুপস্থিতি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। তখন গভীর দুঃখ, একাকিত্ব, আগ্রহ হারিয়ে ফেলা কিংবা দৈনন্দিন জীবন থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার মতো অনুভূতি দেখা দিতে পারে।

শোকের গভীরতা সবার ক্ষেত্রে একই সময়ে আসে না। কেউ মৃত্যুর পরপরই ভেঙে পড়েন, আবার কেউ প্রথম কয়েক মাস তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক থাকার পর অনেক পরে তীব্র দুঃখ অনুভব করতে পারেন।

এর একটি কারণ হতে পারে, শুরুর দিকে বাস্তবতাকে পুরোপুরি উপলব্ধি না করা। পরে যখন ধীরে ধীরে বোঝা যায় যে প্রিয় মানুষটি আর ফিরে আসবেন না, তখন শোকের গভীরতা নতুন করে অনুভূত হতে পারে।

তবে শোকের সময় গভীর দুঃখ অনুভব করলেই সেটিকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অর্থে বিষণ্নতার রোগ হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। কেউ যদি দীর্ঘদিন ধরে তীব্র কষ্টে থাকেন, দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হয় বা জীবন নিয়ে আশাহীনতা তৈরি হয়, তাহলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

পরিবার, বন্ধু, শোক-সহায়তা গোষ্ঠী এবং নিজের যত্ন নেওয়ার অভ্যাসও এই সময়ে সহায়ক হতে পারে।

গ্রহণযোগ্যতা: ‘সব ঠিক হয়ে গেছে’—এমন নয়

গ্রহণযোগ্যতা মানে এই নয় যে প্রিয়জনের মৃত্যু মেনে নিয়ে মানুষটি আর কষ্ট পাবেন না। বরং এর অর্থ হতে পারে—নতুন বাস্তবতাকে ধীরে ধীরে স্বীকার করে তার সঙ্গে জীবনকে মানিয়ে নেওয়া।

কেউ হয়তো বুঝতে পারেন, এখন তাকে একা থাকতে হচ্ছে। আগের মতো ফোন করার মতো বাবা-মা, ভাই-বোন বা জীবনসঙ্গী আর নেই। এই বাস্তবতাকে স্বীকার করা মানেই প্রিয় মানুষটির প্রতি ভালোবাসা শেষ হয়ে যাওয়া নয়।

শোক বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রহণযোগ্যতা একবারে ঘটে যাওয়া কোনো চূড়ান্ত পর্যায়ও নয়। জীবনের বিভিন্ন মুহূর্তে মানুষ বারবার নতুন করে বাস্তবতাকে গ্রহণ করতে পারেন—শেষকৃত্য, জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকী, কোনো পুরোনো জায়গায় যাওয়া কিংবা প্রিয়জনের কোনো স্মৃতি হঠাৎ মনে পড়ার সময়।

শোকের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই

শোকের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো—এর কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। কয়েক সপ্তাহ, কয়েক মাস বা এক বছর পরেই শোক শেষ হয়ে যাবে—এমন কোনো সার্বজনীন নিয়ম নেই।

প্রিয়জনের মৃত্যু যদি স্থায়ী বাস্তবতা হয়, তাহলে তার অনুপস্থিতির অনুভূতিও জীবনের কোনো না কোনো অংশে থেকে যেতে পারে। সময়ের সঙ্গে পরিবর্তনটা হতে পারে কষ্টের ধরনে।

শোক বিশেষজ্ঞ ডেভিড কেসলার বলেছেন, লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রিয় মানুষটিকে ভুলে যাওয়া বা কষ্ট পুরোপুরি মুছে ফেলা নয়; বরং এমন এক পর্যায়ে পৌঁছানো, যখন তাকে মনে করলে কষ্টের পাশাপাশি ভালোবাসা ও সুন্দর স্মৃতিও বেশি জায়গা করে নিতে পারে।

‘ভুলে যাওয়া’ নয়, নতুন বাস্তবতার সঙ্গে বেঁচে থাকা

শোককে অনেক সময় ‘কাটিয়ে ওঠা’ বা ‘ভুলে যাওয়া’র ভাষায় ব্যাখ্যা করা হয়। কিন্তু শোক-বিশেষজ্ঞদের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি হলো, মানুষ আসলে প্রিয়জনের মৃত্যু থেকে পুরোপুরি ‘মুক্ত’ হয়ে যায় না। বরং সেই ক্ষতিকে নিজের জীবনের অংশ হিসেবে গ্রহণ করে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে এগিয়ে যেতে শেখে।

এই প্রক্রিয়ায় কখনো দুঃখ থাকবে, কখনো স্বস্তি, কখনো ভালো স্মৃতি, আবার কখনো হঠাৎ তীব্র কষ্ট ফিরে আসতে পারে। এগুলো পরস্পরবিরোধী নয়।

তবে শোক এতটাই তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী হলে যে তা দৈনন্দিন জীবন, সম্পর্ক, কাজ কিংবা সামাজিক যোগাযোগে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি করে, তখন পেশাদার সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন।

আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন ‘প্রলংড গ্রিফ ডিসঅর্ডার’ বা দীর্ঘস্থায়ী শোকজনিত সমস্যাকে একটি স্বীকৃত মানসিক স্বাস্থ্যগত অবস্থা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে প্রিয়জনের মৃত্যু অন্তত এক বছর আগে এবং শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে অন্তত ছয় মাস আগে ঘটতে হয়—তারপরও যদি তীব্র ও স্থায়ী শোকের কারণে জীবনে পুনরায় যুক্ত হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, তাহলে বিশেষজ্ঞের মূল্যায়ন প্রয়োজন হতে পারে।

শোকের মধ্যেও অর্থ খুঁজে পাওয়া

ডেভিড কেসলার পরে শোকের পাঁচ ধাপের সঙ্গে ‘অর্থ খোঁজা’কে একটি অতিরিক্ত ধারণা হিসেবে যুক্ত করেন। তার নিজের ছেলের মৃত্যুর পর তিনি উপলব্ধি করেন, শুধু বাস্তবতাকে মেনে নেওয়াই সবসময় যথেষ্ট নয়; মানুষ কখনো কখনো নিজের ক্ষতির মধ্য থেকেও জীবনের নতুন অর্থ খুঁজে নিতে চায়।

এই অর্থ খোঁজার ধরন সবার ক্ষেত্রে আলাদা হতে পারে। কেউ প্রিয়জনের স্মৃতি ধরে রাখতে কোনো সামাজিক কাজে যুক্ত হতে পারেন, কেউ গবেষণায় অর্থ দিতে পারেন, কেউ অন্য মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারেন, আবার কেউ নিজের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ কোনো পরিবর্তন আনতে পারেন।

এতে প্রিয়জন হারানোর কষ্ট মুছে যায় না। তবে সেই কষ্টের সঙ্গে নতুনভাবে বেঁচে থাকার একটি পথ তৈরি হতে পারে।

সবশেষে, শোকের কোনো একক ‘সঠিক’ পথ নেই। কেউ দ্রুত কোনো অনুভূতি থেকে বেরিয়ে আসবেন, কেউ একই অনুভূতিতে বারবার ফিরে যাবেন। কেউ কাঁদবেন, কেউ চুপ থাকবেন, কেউ রাগ করবেন, আবার কেউ প্রথম দিকে প্রায় স্বাভাবিক থাকবেন। এসব পার্থক্যই মানুষের শোকের স্বাভাবিক বৈচিত্র্যের অংশ।

প্রিয়জনকে হারানোর পর লক্ষ্য সবসময় ‘আগের মতো হয়ে যাওয়া’ নয়। বরং ক্ষতিকে জীবনের অংশ করে নিয়ে, স্মৃতি ও ভালোবাসাকে সঙ্গে রেখে, ধীরে ধীরে নতুন বাস্তবতার মধ্যে সামনে এগিয়ে যাওয়াই হতে পারে শোকের দীর্ঘ পথের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।