০৯:৫৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬
হাঙ্গেরির প্রেসিডেন্টকে অপসারণে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ, রাজনৈতিক উত্তেজনা তুঙ্গে ট্রাম্পের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের রায়, যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তে আশ্রয়প্রার্থীদের ফেরানোর পথ খুলল রাশিয়ার যুব ফুটবল দলের ফেরার ইঙ্গিত, নতুন টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণের পথ খুলছে ফিফা ডা. এ বি এম আবদুল্লাহর ইমেরিটাস অধ্যাপক পদ বাতিল, বেতন-ভাতা ফেরতের নির্দেশ সিরাজগঞ্জে যমুনার স্রোতে ভেসে প্রাণ গেল দুই মাদ্রাসাছাত্রের খেলাপি ঋণের চাপে ‘মোট শকে’ ব্যাংকিং খাত, সংসদে রেজা কিবরিয়ার কঠোর সমালোচনা ৪৩তম বিসিএসের নন-ক্যাডার মেধাতালিকা ৬০ দিনের মধ্যে প্রকাশের নির্দেশ হাইকোর্টের চুয়াডাঙ্গায় বাড়ির গ্রিলে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে এসএসসি পরীক্ষার্থীর মৃত্যু খাগড়াছড়িতে অস্ত্র-গুলিসহ আটক ৩ ইউপিডিএফ কর্মী তালেবান বিধিনিষেধে কর্মসংস্থান সংকুচিত, ব্যবসার পথে আফগান নারীরা

দুর্গন্ধযুক্ত ডুরিয়ান: এশিয়ার কৃষি অর্থনীতির নতুন ক্রেজ

  • Sarakhon Report
  • ০১:২৬:৪৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২০ জুন ২০২৪
  • 170

সারাক্ষন ডেস্ক

১৫ বছর আগে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্গন্ধযুক্ত ফল বিক্রি করার জন্য একটি কোম্পানি শুরু করার আগে এরিক চ্যান একটি ভাল বেতনের চাকরি করতেন। সেখানে তার কাজ ছিলো স্যাটেলাইট ও রোবটের জন্য কোড লেখা । তিনি যখন পেশা পরিবর্তন করেন, তার পরিবার ও বন্ধুরা হতবাক হয়ে যায়। পৃথিবীর এই সবচেয়ে দুর্গন্ধ যুক্ত ফল ডুরিয়ানের নাম অনেকেই জানেন।  ডুরিয়ান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় শুধু একটি ফল নয় তাদের স্থানীয় সংস্কৃতির একটি প্রিয় অংশও।  আবার এখানে এটা প্রচুর পরিমাণে উৎপাদিতও হয়। ডুরিয়ান সাধারণত একটি রাগবি বলের আকারের হয় অর্থাত ফুটবলের থেকে কিছুটা ছোট।  এ ফল থেকে এমন এক দুর্গন্ধ  বের হয় যার জন্যে বেশিরভাগ হোটেল খাদ্য হিসেবে শুধু নয়, এ ফল নিয়ে ঢোকাও নিষিদ্ধ।

 

যখন মিস্টার চ্যান তার দেশ মালয়েশিয়ায় তার স্টার্টআপ শুরু করেছিলেন,  সে সময় ডুরিয়ান সস্তা ছিল।  এবং প্রায়শই ট্রাকের পিছন থেকে বিক্রি করা হত। তারপর, চীন খুব বড়ভাবে ডুরিয়ানের স্বাদ গ্রহণ করতে শুরু করে।

গত বছর, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে চীনে ডুরিয়ান রফতানি করা হয়েছে ৬.৭ বিলিয়ন ডলার।  ২০১৭ থেকে এই রফতানি বারো গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সারা বিশ্ব থেকে যত ডুরিয়ান রফতানি করা হয় তার সবই  কিনছে চায়না। সবচেয়ে বড় রপ্তানিকারী দেশ হল থাইল্যান্ড; মালয়েশিয়া এবং ভিয়েতনাম । বর্তমানে এ ব্যবসা এত দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে — একটি থাই কোম্পানি এই বছর একটি প্রাথমিক পাবলিক অফারিং পরিকল্পনা করছে — এবং কিছু ডুরিয়ান চাষী কোটিপতি হয়ে গেছেন। মিস্টার চ্যান তাদের মধ্যে একজন। সাত বছর আগে, তিনি তার কোম্পানির একটি নিয়ন্ত্রণমূলক শেয়ার বিক্রি করেছিলেন । তার এই কোম্পানি মূলত বিস্কুট, আইসক্রিম এবং এমনকি পিজ্জার জন্য ডুরিয়ান পেস্ট উৎপাদন করে। সাত বছর আগের তার সেই শেয়ারের মূল্য এখন ৪.৫ মিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ,  অর্থাত তার প্রাথমিক বিনিয়োগের প্রায় ৫০ গুণ বেশি।

মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুর থেকে ৯০ কিলোমিটার দূরে রাওবের মত ছোট্ট একটি শহরেরদরিদ্র ডুরিয়ান চাষীরা এখন ডুরিয়ান বিক্রি করে  তাদের ঘরগুলো কাঠ থেকে ইটের ঘরে পরিবর্তন করেছে। এমনকি তারা তাদের সন্তানদের বিদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানোর সামর্থ্যও অর্জন করেছে।

ডুরিয়ান রপ্তানির উত্থান বিশ্ব অর্থনীতিতে চীনা ভোক্তাদের আর্থিক শক্তির একটি পরিমাপও, যদিও অন্যান্য পরিমাপে, মূল ভূখণ্ডের অর্থনীতি সংগ্রাম করছে। যখন এশিয়ার ১.৪ বিলিয়ন মানুষের একটি ক্রমবর্ধমান ধনী দেশ কোনো কিছুর স্বাদ গ্রহণ করে, তখন এশিয়ার পুরো অঞ্চলগুলি সেই চাহিদা পূরণের জন্য পুনর্গঠিত হয়। ভিয়েতনামের  রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যম গত মাসে জানিয়েছে যে কৃষকরা ডুরিয়ানের জন্য জায়গা করতে কফি গাছ কেটে ফেলছে। গত এক দশকে থাইল্যান্ডে ডুরিয়ান বাগানের জমির পরিমাণ দ্বিগুণ হয়েছে। মালয়েশিয়ায়, রাওবের বাইরের পাহাড়ে জঙ্গলে চীনের এই ফলের প্রতি আকাঙ্ক্ষা মেটাতে চাষাবাদের জন্য জমি প্রস্তুত করতে মাটিকে সমান করা হচ্ছে। মালয়েশিয়ার কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ সাবু মনে করেন, ডুরিয়ান মালয়েশিয়ার জন্য নতুন অর্থনৈতিক উত্থানের অংশ হবে।

এবং এই ডুরিয়ান অর্থনীতির প্রতিযোগীতা এ পর্যায়ে গেছে যে আরও গাছ লাগানোর প্রতিযোগিতা নিয়েএক ধরনের উত্তেজনা দেখা যাচ্ছে । ডুরিয়ান বাগানগুলি নিয়ে জমির বিরোধ দেখা দিয়েছে। কিছু রাস্তার পাশে বাগানগুলি কুণ্ডলিত রেজার তার দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। “চোরদের শাস্তি দেওয়া হবে,” একটি হাতকড়া আঁকা ছবি সহ রাওবের একটি বাগানের বাইরে একটি সাইনবোর্ডে লেখা ছিল।  বর্তমানে চীন শুধুমাত্র একটি ক্রেতা নয়- চীন থাইল্যান্ডের ডুরিয়ান প্যাকিং এবং লজিস্টিক ব্যবসায় বিনিয়োগও করছে। ইতিমধ্যেই, চীনা অর্থ প্রায় ৭০ শতাংশ ডুরিয়ানের পাইকারি এবং লজিস্টিক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে,  বলে জানান, থাইল্যান্ডের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একজন বিশেষজ্ঞ আৎ পিসানওয়ানিচ। থাইল্যান্ডের নিজস্ব পাইকারি ডুরিয়ান কোম্পানিগুলি “ভবিষ্যতে অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে,” তিনি মে মাসে একটি সংবাদ সম্মেলনে এমন কথাও  বলেছিলেন।

চীনা এই চাহিদা গত এক দশকে ডুরিয়ানের দাম পনেরো গুণ বাড়িয়ে দিয়েছ। যার ফলে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় ভোক্তাদের হতাশ করেছে, তারা আর আগের মত ডুরিয়ান খেতে পারছে না। বরং দেখছে বন্য এবং গ্রামীন বাগানে বেড়ে ওঠা একটি সহজলভ্য ফল থেকে রপ্তানির জন্য একটি বিলাসবহুল পণ্য হয়ে উঠছে তাদের অতি পরিচিত ডুরিয়ান।

দেশগুলি এমন একটি ফল রপ্তানি করছে যা তাদের পরিচয় এবং সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, বিশেষ করে মালয়েশিয়ায়, যেখানে এটি তাদের অনেক জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতীয় প্রতীক। “ঈশ্বর আমাদের ডুরিয়ানের আকাঙ্ক্ষা দিয়েছেন,” বলেছেন মালয়েশিয়ার চলচ্চিত্র পরিচালক এবং রাজনৈতিক কর্মী হিশামুদ্দিন রাইস। সম্পূর্ণ একটি ডুরিয়ান বেশ কয়েকজনে মিলে খাওয়া, যা বেশিরভাগ লোকেরজন্যে একটি বিশেষ বিষয়, বাস্তবে যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় একটি সামাজিক ঘটনা বা অনেকটা উতসব। একটি ডুরিয়ান খোলার জন্য একটি  ধারালো ছুরি বা কুঠার আনা সব মিলে বিষয়টি উত্সবমুখীযা অনেক সংস্কৃতিতে একটি ভাল ওয়াইন যেমন ভাগ করা হয় বন্ধুদের একত্রিত করে তেমনিই। মিস্টার হিশামুদ্দিন উল্লেখ করেছেন যে তাদের সংস্কৃতির অংশ এটা এমনই যদি একজন মালয় লোক ডুরিয়ান পছন্দ না করে তবে এটি একটি ট্র্যাজেডি। ফলটি এমনকি দেশের আর্থিক লেক্সিকনেও এমবেড করা হয়েছে: একটি অর্থের জন্য মালয় শব্দটি হল ডুরিয়ান রুনতুহ, একটি শব্দ যা ডুরিয়ান মাটিতে পতিত হওয়ার আনন্দদায়ক চিত্রও প্রদান করে।

চীনা প্রবৃদ্ধির ফলে ডুরিয়ান সরবরাহ লাইন পুনর্গঠিত হচ্ছে। ফলটিকে একটি ট্রাকের পিছনে কুয়ালালামপুর, সিঙ্গাপুর বা ব্যাংককের মতো আঞ্চলিক গন্তব্যে সরবরাহ করা তুলনামূলকভাবে সহজ। কিন্তু গ্রীষ্মমন্ডলীয় ফলটি গুয়াংজু, বেইজিং এবং তার বাইরেও পাঠানো, বিশেষ করে যখন ফলটি পাকা এবং সবচেয়ে সুস্বাদু, তখন বিপজ্জনক হতে পারে। ফলের শক্তিশালী গন্ধ একটি গ্যাস লিকের মতো হতে পারে। ডুরিয়ান উদ্রেকিত জরুরী অবস্থার অনেক উদাহরণের মধ্যে একটি ছিল ২০১৯ সালে, যখন একটি বোয়িং ৭৬৭ যাত্রীবাহী জেটটি ডুরিয়ানের চালান সহ ভ্যাঙ্কুভার, ব্রিটিশ কলম্বিয়া থেকে উড়েছিল। কানাডিয়ান নিয়ন্ত্রকদের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টেক অফের পরপরই পাইলট এবং ক্রু “বিমান জুড়ে একটি শক্তিশালী গন্ধ লক্ষ্য করেছেন”। প্লেনের সমস্যা নিয়ে আশঙ্কা করে পাইলটরা অক্সিজেন মাস্ক বেঁধে বিমানবন্দর নিয়ন্ত্রণের সাথে যোগাযোগ করেন যে তাদের জরুরিভাবে অবতরণ করতে হবে। মাটিতে নামার পর, দুর্গন্ধের উৎস হিসাবে ডুরিয়ানটি পাওয়া যায়। মালয়েশিয়া শিপিংয়ের আগে ফলটি হিমায়িত করে পরিবহন সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করছে। এই প্রক্রিয়ার অন্যতম একজন ছিলেন আনা টিও,বাস্তবে তিনি  একজন প্রাক্তন ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট যিনি তার ভ্রমণের সময় লক্ষ্য করেছিলেন যে বিদেশে ডুরিয়ান পাওয়া যায় না। তিনি তার এয়ারলাইন চাকরি ছেড়ে একটি ভাড়া করা গুদামে ক্রায়োজেনিক হিমায়িত কৌশলগুলির সাথে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছিলেন, সপ্তাহান্তে ডুরিয়ান খামারে তার সন্তানদের নিয়ে যান। তিনি দেখতে পেয়েছেন যে ডুরিয়ান হিমায়িত করলে তার গন্ধ কমে শেলফ লাইফ দীর্ঘায়িত হয়।

কুয়ালালামপুরের একটি শহরতলিতে, মিসেস টিওএর প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি হের্নানে ২০০ জনেরও বেশি কর্মচারী কাজ করেন, যা হিমায়িত ডুরিয়ান পাশাপাশি মোচি এবং অন্যান্য ডুরিয়ান পণ্য রপ্তানি করে। বিপরীতে, থাইল্যান্ড বছরের পর বছর ধরে হিমায়িত পাত্রে তাজা ডুরিয়ান পাঠাচ্ছে। থাই ডুরিয়ান শিল্পটি কম্বোডিয়ার সীমানার কাছাকাছি চান্তাবুরি প্রদেশে কেন্দ্রীভূত। ফসল কাটার শীর্ষ মরসুমে, মে ও জুন মাসে, সর্বত্র ডুরিয়ানের স্তূপ দেখা যায়। চান্তাবুরি জুড়ে প্যাকিং হাউসগুলি প্রতিদিন প্রায় ১,০০০ শিপিং কন্টেইনার ডুরিয়ান পাঠায়, ডুরিয়ান ট্র্যাফিক জ্যাম তৈরি করে। কিছু কন্টেইনার ডুরিয়ান ট্রেন নামে একটি পণ্যবাহী রেল পরিষেবাতে লোড করা হয় যা চীন এবং থাইল্যান্ডকে সংযুক্ত করে একটি ট্র্যাক ব্যবহার করে।  চীন থাইল্যান্ডকে সংযুক্ত করে ইতোমধ্যে একটি উচ্চ গতির রেল তৈরি করেছে। চায়নায় ডুরিয়ানের চাহিদা এত বেশি যে, কন্টেইনারগুলি প্রায়ই থাইল্যান্ডে খালি ফিরে আসে — দ্রুত চীনের উদ্দেশ্যে আরও ডুরিয়ান দিয়ে পুনরায় লোড করার জন্য। স্পিড ইন্টার ট্রান্সপোর্টের প্রধান অপারেটিং অফিসার জিয়াওলিং প্যান, ব্যাংককে অবস্থিত একটি কোম্পানি যারা ডুরিয়ান পাঠানোর জন্য আমেরিকান তৈরি হিমায়িত কন্টেইনার ব্যবহার করে। তাদের প্যাকিং হাউসে, ডুরিয়ানগুলিকে একটি লেজারের নীচে পাঠানো হয় যা প্রতিটি ফলের ত্বকে একটি সিরিয়াল নম্বর খোদাই করে। চীনের খুচরা বিক্রেতারা এই ফলের উত্স জানতে চান। মিসেস প্যান দক্ষিন চীনের  ন্যানিং-এ জন্মগ্রহণ করেছিলেন, এবং কলেজে পড়ার জন্য থাইল্যান্ডে গিয়েছিলেন। তিনি প্রথম ডুরিয়ান গাছ ও ডুরিয়ান ফলতে দেখেন থাইল্যান্ডে -এর আগে কখনও দেখেননি। প্লাটিনাম ফ্রুটস, একটি কোম্পানি যা ডুরিয়ান বিশেষজ্ঞ এবং এই বছর থাই স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত করার পরিকল্পনা করছে, যা ডুরিয়ান শিল্পের জন্য প্রথম।

৮৮৮ প্লাটিনাম ফ্রুটসের প্রধান নির্বাহী নাতাক্রিট ইমস্কুলের বক্তব্য স্পষ্ট করে চান্তাবুরিতে বর্তমানে এই শিল্পের বৃদ্ধি কেমন হয়েছে- দুই দশক আগে এ  প্রদেশে ১০টি ডুরিয়ান প্যাকিং হাউস ছিল — আজ তা  ৬’শ হয়েছে। এর পরেই নিশ্চয়ই আর কোন প্রশ্ন থাকে না কী হারে ডুরিয়ান যাচ্ছে চায়নায়। আর তারা কীভাবে দুর্গন্ধ যুক্ত এই সুস্বাদু ফলটির আস্বাদ নিচ্ছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

হাঙ্গেরির প্রেসিডেন্টকে অপসারণে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ, রাজনৈতিক উত্তেজনা তুঙ্গে

দুর্গন্ধযুক্ত ডুরিয়ান: এশিয়ার কৃষি অর্থনীতির নতুন ক্রেজ

০১:২৬:৪৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২০ জুন ২০২৪

সারাক্ষন ডেস্ক

১৫ বছর আগে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্গন্ধযুক্ত ফল বিক্রি করার জন্য একটি কোম্পানি শুরু করার আগে এরিক চ্যান একটি ভাল বেতনের চাকরি করতেন। সেখানে তার কাজ ছিলো স্যাটেলাইট ও রোবটের জন্য কোড লেখা । তিনি যখন পেশা পরিবর্তন করেন, তার পরিবার ও বন্ধুরা হতবাক হয়ে যায়। পৃথিবীর এই সবচেয়ে দুর্গন্ধ যুক্ত ফল ডুরিয়ানের নাম অনেকেই জানেন।  ডুরিয়ান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় শুধু একটি ফল নয় তাদের স্থানীয় সংস্কৃতির একটি প্রিয় অংশও।  আবার এখানে এটা প্রচুর পরিমাণে উৎপাদিতও হয়। ডুরিয়ান সাধারণত একটি রাগবি বলের আকারের হয় অর্থাত ফুটবলের থেকে কিছুটা ছোট।  এ ফল থেকে এমন এক দুর্গন্ধ  বের হয় যার জন্যে বেশিরভাগ হোটেল খাদ্য হিসেবে শুধু নয়, এ ফল নিয়ে ঢোকাও নিষিদ্ধ।

 

যখন মিস্টার চ্যান তার দেশ মালয়েশিয়ায় তার স্টার্টআপ শুরু করেছিলেন,  সে সময় ডুরিয়ান সস্তা ছিল।  এবং প্রায়শই ট্রাকের পিছন থেকে বিক্রি করা হত। তারপর, চীন খুব বড়ভাবে ডুরিয়ানের স্বাদ গ্রহণ করতে শুরু করে।

গত বছর, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে চীনে ডুরিয়ান রফতানি করা হয়েছে ৬.৭ বিলিয়ন ডলার।  ২০১৭ থেকে এই রফতানি বারো গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সারা বিশ্ব থেকে যত ডুরিয়ান রফতানি করা হয় তার সবই  কিনছে চায়না। সবচেয়ে বড় রপ্তানিকারী দেশ হল থাইল্যান্ড; মালয়েশিয়া এবং ভিয়েতনাম । বর্তমানে এ ব্যবসা এত দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে — একটি থাই কোম্পানি এই বছর একটি প্রাথমিক পাবলিক অফারিং পরিকল্পনা করছে — এবং কিছু ডুরিয়ান চাষী কোটিপতি হয়ে গেছেন। মিস্টার চ্যান তাদের মধ্যে একজন। সাত বছর আগে, তিনি তার কোম্পানির একটি নিয়ন্ত্রণমূলক শেয়ার বিক্রি করেছিলেন । তার এই কোম্পানি মূলত বিস্কুট, আইসক্রিম এবং এমনকি পিজ্জার জন্য ডুরিয়ান পেস্ট উৎপাদন করে। সাত বছর আগের তার সেই শেয়ারের মূল্য এখন ৪.৫ মিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ,  অর্থাত তার প্রাথমিক বিনিয়োগের প্রায় ৫০ গুণ বেশি।

মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুর থেকে ৯০ কিলোমিটার দূরে রাওবের মত ছোট্ট একটি শহরেরদরিদ্র ডুরিয়ান চাষীরা এখন ডুরিয়ান বিক্রি করে  তাদের ঘরগুলো কাঠ থেকে ইটের ঘরে পরিবর্তন করেছে। এমনকি তারা তাদের সন্তানদের বিদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানোর সামর্থ্যও অর্জন করেছে।

ডুরিয়ান রপ্তানির উত্থান বিশ্ব অর্থনীতিতে চীনা ভোক্তাদের আর্থিক শক্তির একটি পরিমাপও, যদিও অন্যান্য পরিমাপে, মূল ভূখণ্ডের অর্থনীতি সংগ্রাম করছে। যখন এশিয়ার ১.৪ বিলিয়ন মানুষের একটি ক্রমবর্ধমান ধনী দেশ কোনো কিছুর স্বাদ গ্রহণ করে, তখন এশিয়ার পুরো অঞ্চলগুলি সেই চাহিদা পূরণের জন্য পুনর্গঠিত হয়। ভিয়েতনামের  রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যম গত মাসে জানিয়েছে যে কৃষকরা ডুরিয়ানের জন্য জায়গা করতে কফি গাছ কেটে ফেলছে। গত এক দশকে থাইল্যান্ডে ডুরিয়ান বাগানের জমির পরিমাণ দ্বিগুণ হয়েছে। মালয়েশিয়ায়, রাওবের বাইরের পাহাড়ে জঙ্গলে চীনের এই ফলের প্রতি আকাঙ্ক্ষা মেটাতে চাষাবাদের জন্য জমি প্রস্তুত করতে মাটিকে সমান করা হচ্ছে। মালয়েশিয়ার কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ সাবু মনে করেন, ডুরিয়ান মালয়েশিয়ার জন্য নতুন অর্থনৈতিক উত্থানের অংশ হবে।

এবং এই ডুরিয়ান অর্থনীতির প্রতিযোগীতা এ পর্যায়ে গেছে যে আরও গাছ লাগানোর প্রতিযোগিতা নিয়েএক ধরনের উত্তেজনা দেখা যাচ্ছে । ডুরিয়ান বাগানগুলি নিয়ে জমির বিরোধ দেখা দিয়েছে। কিছু রাস্তার পাশে বাগানগুলি কুণ্ডলিত রেজার তার দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। “চোরদের শাস্তি দেওয়া হবে,” একটি হাতকড়া আঁকা ছবি সহ রাওবের একটি বাগানের বাইরে একটি সাইনবোর্ডে লেখা ছিল।  বর্তমানে চীন শুধুমাত্র একটি ক্রেতা নয়- চীন থাইল্যান্ডের ডুরিয়ান প্যাকিং এবং লজিস্টিক ব্যবসায় বিনিয়োগও করছে। ইতিমধ্যেই, চীনা অর্থ প্রায় ৭০ শতাংশ ডুরিয়ানের পাইকারি এবং লজিস্টিক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে,  বলে জানান, থাইল্যান্ডের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একজন বিশেষজ্ঞ আৎ পিসানওয়ানিচ। থাইল্যান্ডের নিজস্ব পাইকারি ডুরিয়ান কোম্পানিগুলি “ভবিষ্যতে অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে,” তিনি মে মাসে একটি সংবাদ সম্মেলনে এমন কথাও  বলেছিলেন।

চীনা এই চাহিদা গত এক দশকে ডুরিয়ানের দাম পনেরো গুণ বাড়িয়ে দিয়েছ। যার ফলে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় ভোক্তাদের হতাশ করেছে, তারা আর আগের মত ডুরিয়ান খেতে পারছে না। বরং দেখছে বন্য এবং গ্রামীন বাগানে বেড়ে ওঠা একটি সহজলভ্য ফল থেকে রপ্তানির জন্য একটি বিলাসবহুল পণ্য হয়ে উঠছে তাদের অতি পরিচিত ডুরিয়ান।

দেশগুলি এমন একটি ফল রপ্তানি করছে যা তাদের পরিচয় এবং সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, বিশেষ করে মালয়েশিয়ায়, যেখানে এটি তাদের অনেক জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতীয় প্রতীক। “ঈশ্বর আমাদের ডুরিয়ানের আকাঙ্ক্ষা দিয়েছেন,” বলেছেন মালয়েশিয়ার চলচ্চিত্র পরিচালক এবং রাজনৈতিক কর্মী হিশামুদ্দিন রাইস। সম্পূর্ণ একটি ডুরিয়ান বেশ কয়েকজনে মিলে খাওয়া, যা বেশিরভাগ লোকেরজন্যে একটি বিশেষ বিষয়, বাস্তবে যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় একটি সামাজিক ঘটনা বা অনেকটা উতসব। একটি ডুরিয়ান খোলার জন্য একটি  ধারালো ছুরি বা কুঠার আনা সব মিলে বিষয়টি উত্সবমুখীযা অনেক সংস্কৃতিতে একটি ভাল ওয়াইন যেমন ভাগ করা হয় বন্ধুদের একত্রিত করে তেমনিই। মিস্টার হিশামুদ্দিন উল্লেখ করেছেন যে তাদের সংস্কৃতির অংশ এটা এমনই যদি একজন মালয় লোক ডুরিয়ান পছন্দ না করে তবে এটি একটি ট্র্যাজেডি। ফলটি এমনকি দেশের আর্থিক লেক্সিকনেও এমবেড করা হয়েছে: একটি অর্থের জন্য মালয় শব্দটি হল ডুরিয়ান রুনতুহ, একটি শব্দ যা ডুরিয়ান মাটিতে পতিত হওয়ার আনন্দদায়ক চিত্রও প্রদান করে।

চীনা প্রবৃদ্ধির ফলে ডুরিয়ান সরবরাহ লাইন পুনর্গঠিত হচ্ছে। ফলটিকে একটি ট্রাকের পিছনে কুয়ালালামপুর, সিঙ্গাপুর বা ব্যাংককের মতো আঞ্চলিক গন্তব্যে সরবরাহ করা তুলনামূলকভাবে সহজ। কিন্তু গ্রীষ্মমন্ডলীয় ফলটি গুয়াংজু, বেইজিং এবং তার বাইরেও পাঠানো, বিশেষ করে যখন ফলটি পাকা এবং সবচেয়ে সুস্বাদু, তখন বিপজ্জনক হতে পারে। ফলের শক্তিশালী গন্ধ একটি গ্যাস লিকের মতো হতে পারে। ডুরিয়ান উদ্রেকিত জরুরী অবস্থার অনেক উদাহরণের মধ্যে একটি ছিল ২০১৯ সালে, যখন একটি বোয়িং ৭৬৭ যাত্রীবাহী জেটটি ডুরিয়ানের চালান সহ ভ্যাঙ্কুভার, ব্রিটিশ কলম্বিয়া থেকে উড়েছিল। কানাডিয়ান নিয়ন্ত্রকদের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টেক অফের পরপরই পাইলট এবং ক্রু “বিমান জুড়ে একটি শক্তিশালী গন্ধ লক্ষ্য করেছেন”। প্লেনের সমস্যা নিয়ে আশঙ্কা করে পাইলটরা অক্সিজেন মাস্ক বেঁধে বিমানবন্দর নিয়ন্ত্রণের সাথে যোগাযোগ করেন যে তাদের জরুরিভাবে অবতরণ করতে হবে। মাটিতে নামার পর, দুর্গন্ধের উৎস হিসাবে ডুরিয়ানটি পাওয়া যায়। মালয়েশিয়া শিপিংয়ের আগে ফলটি হিমায়িত করে পরিবহন সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করছে। এই প্রক্রিয়ার অন্যতম একজন ছিলেন আনা টিও,বাস্তবে তিনি  একজন প্রাক্তন ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট যিনি তার ভ্রমণের সময় লক্ষ্য করেছিলেন যে বিদেশে ডুরিয়ান পাওয়া যায় না। তিনি তার এয়ারলাইন চাকরি ছেড়ে একটি ভাড়া করা গুদামে ক্রায়োজেনিক হিমায়িত কৌশলগুলির সাথে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছিলেন, সপ্তাহান্তে ডুরিয়ান খামারে তার সন্তানদের নিয়ে যান। তিনি দেখতে পেয়েছেন যে ডুরিয়ান হিমায়িত করলে তার গন্ধ কমে শেলফ লাইফ দীর্ঘায়িত হয়।

কুয়ালালামপুরের একটি শহরতলিতে, মিসেস টিওএর প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি হের্নানে ২০০ জনেরও বেশি কর্মচারী কাজ করেন, যা হিমায়িত ডুরিয়ান পাশাপাশি মোচি এবং অন্যান্য ডুরিয়ান পণ্য রপ্তানি করে। বিপরীতে, থাইল্যান্ড বছরের পর বছর ধরে হিমায়িত পাত্রে তাজা ডুরিয়ান পাঠাচ্ছে। থাই ডুরিয়ান শিল্পটি কম্বোডিয়ার সীমানার কাছাকাছি চান্তাবুরি প্রদেশে কেন্দ্রীভূত। ফসল কাটার শীর্ষ মরসুমে, মে ও জুন মাসে, সর্বত্র ডুরিয়ানের স্তূপ দেখা যায়। চান্তাবুরি জুড়ে প্যাকিং হাউসগুলি প্রতিদিন প্রায় ১,০০০ শিপিং কন্টেইনার ডুরিয়ান পাঠায়, ডুরিয়ান ট্র্যাফিক জ্যাম তৈরি করে। কিছু কন্টেইনার ডুরিয়ান ট্রেন নামে একটি পণ্যবাহী রেল পরিষেবাতে লোড করা হয় যা চীন এবং থাইল্যান্ডকে সংযুক্ত করে একটি ট্র্যাক ব্যবহার করে।  চীন থাইল্যান্ডকে সংযুক্ত করে ইতোমধ্যে একটি উচ্চ গতির রেল তৈরি করেছে। চায়নায় ডুরিয়ানের চাহিদা এত বেশি যে, কন্টেইনারগুলি প্রায়ই থাইল্যান্ডে খালি ফিরে আসে — দ্রুত চীনের উদ্দেশ্যে আরও ডুরিয়ান দিয়ে পুনরায় লোড করার জন্য। স্পিড ইন্টার ট্রান্সপোর্টের প্রধান অপারেটিং অফিসার জিয়াওলিং প্যান, ব্যাংককে অবস্থিত একটি কোম্পানি যারা ডুরিয়ান পাঠানোর জন্য আমেরিকান তৈরি হিমায়িত কন্টেইনার ব্যবহার করে। তাদের প্যাকিং হাউসে, ডুরিয়ানগুলিকে একটি লেজারের নীচে পাঠানো হয় যা প্রতিটি ফলের ত্বকে একটি সিরিয়াল নম্বর খোদাই করে। চীনের খুচরা বিক্রেতারা এই ফলের উত্স জানতে চান। মিসেস প্যান দক্ষিন চীনের  ন্যানিং-এ জন্মগ্রহণ করেছিলেন, এবং কলেজে পড়ার জন্য থাইল্যান্ডে গিয়েছিলেন। তিনি প্রথম ডুরিয়ান গাছ ও ডুরিয়ান ফলতে দেখেন থাইল্যান্ডে -এর আগে কখনও দেখেননি। প্লাটিনাম ফ্রুটস, একটি কোম্পানি যা ডুরিয়ান বিশেষজ্ঞ এবং এই বছর থাই স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত করার পরিকল্পনা করছে, যা ডুরিয়ান শিল্পের জন্য প্রথম।

৮৮৮ প্লাটিনাম ফ্রুটসের প্রধান নির্বাহী নাতাক্রিট ইমস্কুলের বক্তব্য স্পষ্ট করে চান্তাবুরিতে বর্তমানে এই শিল্পের বৃদ্ধি কেমন হয়েছে- দুই দশক আগে এ  প্রদেশে ১০টি ডুরিয়ান প্যাকিং হাউস ছিল — আজ তা  ৬’শ হয়েছে। এর পরেই নিশ্চয়ই আর কোন প্রশ্ন থাকে না কী হারে ডুরিয়ান যাচ্ছে চায়নায়। আর তারা কীভাবে দুর্গন্ধ যুক্ত এই সুস্বাদু ফলটির আস্বাদ নিচ্ছে।