০৭:৪৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬
এশীয় বাজারে এলএনজি দরে বড় পতন, যুক্তরাষ্ট্রের রেকর্ড রপ্তানি ও চীনের আমদানি কৌশলে চাপ গ্রিনল্যান্ডে সেনা বাড়াচ্ছে ডেনমার্ক, যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মধ্যেই কৌশলগত প্রস্তুতি গ্রিনল্যান্ড কেন ওয়াশিংটনের লক্ষ্য, আর কেন ইউরোপ এখন অসহায় প্রাচীন ভারতে গণিতচর্চা (পর্ব-৩৫২) আবুধাবিতে স্থলভাগে তেল আবিষ্কার, ভারতের জ্বালানি কূটনীতিতে নতুন মাইলফলক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় মলিয়েরের হাস্যরস? প্যারিসে মঞ্চে নতুন নাটকের চমক পেঁয়াজ রাখার ভুলেই নষ্ট হচ্ছে রান্নাঘরের ভরসা, জানুন সঠিক সংরক্ষণের সহজ উপায় চীনের শুল্কমুক্ত দ্বীপের গল্পে বৈশ্বিক বার্তা, বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ছায়া চিকিৎসায় হতাশা, ভরসা খুঁজছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় শিক্ষা আন্দোলনের আড়ালে সংঘর্ষ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস ভাঙচুর

ইউরোপ অ্যামেরিকার চেয়েও বাংলাদেশে দাম বেশি

  • Sarakhon Report
  • ০৯:২৯:০৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ অক্টোবর ২০২৪
  • 95

সিপিডি মনে করে, ২০১৯ সাল থেকে বাংলাদেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি অস্বাভাবিক পর্যায়ে রয়েছে৷ অনেক দিন ধরে এটা ৯-১০ শতাংশে রয়েছে

হারুন উর রশীদ স্বপন

বাংলাদেশে কোনো কোনো ভোগ্যপণ্যের দাম এখন ইউরোপ-অ্যামেরিকার চেয়েও বেশি৷ কোনো পণ্যের দাম গত পাঁচ বছরের ৩০০ শতাংশের চেয়েও বেশি বেড়েছে৷ ফলে বাংলাদেশে ভোগ্যপণ্যও এখন বিলাসী পণ্যে পরিণত হয়েছে৷

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) “বাংলাদেশ অর্থনীতি ২০২৩-২৪ : তৃতীয় অন্তর্বর্তীকালীন পর্যালোচনা” শীর্ষক ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশের গত পাঁচ বছরের নিত্যপণ্যের বাজার পরিস্থিতি তুলে ধরেছে৷ সিপিডি মনে করে, ২০১৯ সাল থেকে বাংলাদেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি অস্বাভাবিক পর্যায়ে রয়েছে৷ অনেক দিন ধরে এটা ৯-১০ শতাংশে রয়েছে৷ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখাতে না পারা সরকারের বড় ব্যর্থতা৷ বাজার মনিটরিং ব্যবস্থায় বড় দুর্বলতা আছে৷

গবেষণা পত্রটি উস্থাপন করে সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, “মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে শ্রীলঙ্কাকে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও ইতোমধ্যে দেশটি তা নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছে  এবং বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে এখন শ্রীলঙ্কার চেয়ে পিছিয়ে৷”

সিপিডি মনে করে, ২০২০-২১ অর্থবছরে করোনাভাইরাস মহামারিতে অর্থনীতিতে যে সংকট তৈরি হয়েছিল, পরের বছর কিছুটা কমে এলেও সঙ্গে যোগ হয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতি৷ এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নীতির দুর্বলতা, সুশাসনের অভাব ও প্রয়োজনীয় সংস্কারের ব্যর্থতা৷ এগুলো ধারাবাহিকভাবে চলেছে৷

বিশ্লেষকরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখাই এখন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ৷ এর জন্য অর্থনীতির নীতি কাঠামো যেমন আছে তেমনি বাজার ব্যবস্থাপনা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়৷ এইসব বিষয়ে সরকারের দীর্ঘ মেয়াদে কোনো পরিকল্পনা আছে বলে মনে হয়না৷

চিনির দাম ইউরোপঅ্যামেরিকার চেয়ে বেশি

সিপিডি বলছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নে এক কেজি চিনির দাম বাংলাদেশি মুদ্রায় ৩৯ টাকা৷ আর যুক্তরাষ্ট্রে ৯৬ টাকা৷ অথচ বাংলাদেশে এক কেজি চিনির দাম ১৩০ টাকা৷ গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশে চিনির দাম ১৫২ শতাংশ বেড়েছে৷ আর রসুনের দাম বেড়েছে ৩১০ শতাংশ৷ পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ১৬৪ শতাংশ৷ আদা ২০৫ শতাংশ৷

মসুর ডাল ৯৫, আটা ৪০-৫৪, ময়দা ৬০, গুঁড়া দুধ ৪৬-৮০, পেঁয়াজ ১৬৪ ভাগ বেড়েছে৷ শুকনা মরিচের দাম দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে৷  খোলা সয়াবিন ৮৪, বোতলজাত সয়াবিন ৫৬ ও পামঅয়েলের দাম ১০৬ শতাংশ বেড়েছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় অনেক বেশি৷

মিনিকেট চালের দাম বেড়েছে ১৭ শতাংশ, পাইজামের ১৫ ও মোটা চালের ৩০ শতাংশ৷ থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের চেয়ে দেশে এখন চালের দাম বেশি৷

খাবারের পিছনে ব্যয় বেশি

সিপিডির প্রতিবেদনে ১৭টি দেশের মানুষের মাথাপিছু জিডিপি এবং খাবারের পেছনে মাথাপিছু খরচের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়৷ এতে দেখা যায়, ওই সব দেশের মধ্যে বাংলাদেশে মানুষের মাথাপিছু জিডিপি সবচেয়ে কম, সাত হাজার ৮০৫ ডলার৷ অথচ খাবারের পেছনে ওই ১৭ দেশের মধ্যে বাংলাদেশে মাথাপিছু খরচ সবচেয়ে বেশি, ৯২৪ ডলার৷ তালিকার অন্য ১৬টি দেশ হলো ইরান, ভারত, লাওস, শ্রীলঙ্কা, উজবেকিস্তান, আলজেরিয়া, ভিয়েতনাম, টিউনিশিয়া, বলিভিয়া, মরক্কো, ইরাক, ইন্দোনেশিয়া, কলম্বিয়া, ব্রাজিল, জর্ডান ও দক্ষিণ আফ্রিকা৷ আয় কম কিন্তু খাবারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করতে হয় বাংলাদেশের মানুষকে ৷

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েন অব বাংলাদেশের(ক্যাব)  সভাপতি গোলাম রহমান বলেন , “বাজার নিয়ে আমরা  কথা বলছি কিন্তু সেটা অনুযায়ী কোনো বাজার ব্যবস্থাপনা দেখছিনা৷ আর এটা শুধু বাজার ব্যবস্থাপনা নয়, পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করে৷ সবখানেই দুর্বলতা দেখতে পাচ্ছি৷ আর আমরা সাধারণ মানুষ এর চাপ বহন করছি৷”

তার কথা, “করোনা ও ইউক্রেন যুদ্ধের পর মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বিশ্বের অনেক দেশ অনেক ব্যবস্থা নিয়েছে৷ তার সুফল তারা পাচ্ছে৷ আমরা তখন ব্যবস্থা নেইনি৷ আমরা উল্টোটা করেছি৷ আমরা যখন ব্যবস্থা নিই তখন আর সময় থাকেনা৷”

সমস্যা কোথায়

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, “বাংলাদেশে আমরা দীর্ঘদিন ধরেই দেখছি বাজারকে মেন্যুপুলেট করা হচ্ছে৷ এটা কোনেভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছেনা৷ ফলে এখানে অব্যাহতভাবে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে৷”

তার কথা, “নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার তুলনায় মানুষের আয় বাড়ছে না৷ আর খাদ্যপণ্যের দাম বেশি বাড়ায় এর প্রভাব পড়ছে কম আয়ের মানুষের ওপর৷  খাদ্য কিনতে গিয়েই তার আয় শেষ হয়ে যাচ্ছে৷  ফলে তারা কম খায় অথবা ঋণ করে৷ সে ঋণগ্রস্ত হয়৷ অন্যদিকে প্রয়োজনীয় খাদ্য না কিনতে পারায় অপুষ্টিতে ভোগে৷ এর প্রভাব স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা সবখানেই পড়ে৷”

তিনি বলেন,” বাজার থেকে একটি মহল অব্যবস্থাপনার সুযোগ নিয়ে কোটি কোটি টাকা আয় করছে৷ তাদের কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আনা হচ্ছেনা৷”

ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম ডয়চে ভেলেকে বলেন, “আমাদের এখানে কতিপয় বড় আমদানিকারক ও ব্যবসায়ী  বাজারে সরবরাহ চেইন নিয়ন্ত্রণ করে৷ ফলে পণ্যমূল্য তারাই নিয়ন্ত্রণ করে৷ দ্রব্য মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে এটা ভাঙতে হবে৷ আর তার জন্য প্রয়োজন দীর্ঘ মেয়াদে পরিকল্পনা৷”

তার কথা, “সরকার হয়তো আমদানি শুল্ক কমালো কিন্তু ওই পণ্যের আমদানিকারক একজন৷ ফলে দাম কমেনা৷ ওই আমদানি কারক লাভবান হয়৷ আবার কৃষিপণ্যে আমরা অনেক ইনফরমাল লেনদেন দেখি৷ আলুর মৌসুমে কিছু বিত্তশালী কোল্ড স্টোরেজে আলু কিনে রাখেন৷ আলুর দাম বেড়ে গেলে তারা শুধু স্লিপ বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা আয় করেন৷ এগুলো বন্ধ করতে হবে৷”

তিনি বলেন, “এই বাজারের সঙ্গে আমাদের অর্থনীতিতে সুনীতি এবং সুশাসনও দরকার৷ সরকার আইএমএফ-এর পরামর্শে হলেও এখন কিছু অর্থনৈতিক সংস্কার করছে৷ কিন্তু এর সুফল পেতে হলে পুরো নির্দেশনা মানতে হবে৷ তা না হলে এর সুফল পাওয়া যাবেনা৷ আমরা আগে দেখেছি কোনো সংস্কারই পূর্ণ হয়না৷ রাজনৈতিক কারণে সরকার প্রেসার গ্রুপের কাছে নতি স্বীকার করে৷”

“অর্থনৈতিক সংস্কার করার জন্য যে রাজনৈতিক সদিচ্ছা  এবং দৃঢ়তা দরকার তা আমি এখন পর্যন্ত সরকারের মধ্যে দেখছিনা.” বলেন এই অর্থনীতিবিদ৷

সরকারও জানে সিন্ডিকেটকিন্তু ধরবে কে?

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিপ্তরের মহাপরিচালক এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, “আমরা জানি বাজারে সিন্ডিকেট কাজ করে৷ তারা দাম বাড়িয়ে দেয়৷ আমরা এগুলোর কিছু চিহ্নিত করে ব্যবস্থাও নিয়েছি৷ কিন্তু সব তো আমরা পারিনা৷ আমাদের পর্যাপ্ত জনবলও নাই৷ আবার আইনও আমাদের সব দায়িত্ব দেয়নি৷ এরজন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয় আছে, প্রতিযোগিতা কমিশন আছে৷ কৃষি বিপণন অধিদপ্তর ২৯টি পণ্যের দাম ঠিক করে দিয়েছে৷ সেটা বাস্তবায়নের দায়িত্বও তাদের৷ আমাদের সরকার যা ঠিক করে দেয় তাই করতে পারি৷”

তার কথা, “কোনো পণ্যের দাম বাড়ার যৌক্তিক কারণ থাকতে পারে৷ কিন্তু ওই পণ্যের পরতে পরতে মুনাফা লোভীরা ঢুকে দিয়ে দাম আরো বাড়িয়ে দেয়৷ তারা অতি মুনাফা করে৷ ভোক্তা অধিদপ্তর তো কোনো পণ্যের দাম ঠিক করে দেয়না৷ কেউ যদি যৌক্তিক দামের বেশি নেয় তখন আমরা ব্যবস্থা নিতে পারি৷ তবে যৌক্তিক দাম কোনটা তাও তো নির্ধারণ আমরা করি না৷”

ডিডাব্লিউ ডটকম

 

জনপ্রিয় সংবাদ

এশীয় বাজারে এলএনজি দরে বড় পতন, যুক্তরাষ্ট্রের রেকর্ড রপ্তানি ও চীনের আমদানি কৌশলে চাপ

ইউরোপ অ্যামেরিকার চেয়েও বাংলাদেশে দাম বেশি

০৯:২৯:০৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ অক্টোবর ২০২৪

হারুন উর রশীদ স্বপন

বাংলাদেশে কোনো কোনো ভোগ্যপণ্যের দাম এখন ইউরোপ-অ্যামেরিকার চেয়েও বেশি৷ কোনো পণ্যের দাম গত পাঁচ বছরের ৩০০ শতাংশের চেয়েও বেশি বেড়েছে৷ ফলে বাংলাদেশে ভোগ্যপণ্যও এখন বিলাসী পণ্যে পরিণত হয়েছে৷

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) “বাংলাদেশ অর্থনীতি ২০২৩-২৪ : তৃতীয় অন্তর্বর্তীকালীন পর্যালোচনা” শীর্ষক ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশের গত পাঁচ বছরের নিত্যপণ্যের বাজার পরিস্থিতি তুলে ধরেছে৷ সিপিডি মনে করে, ২০১৯ সাল থেকে বাংলাদেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি অস্বাভাবিক পর্যায়ে রয়েছে৷ অনেক দিন ধরে এটা ৯-১০ শতাংশে রয়েছে৷ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখাতে না পারা সরকারের বড় ব্যর্থতা৷ বাজার মনিটরিং ব্যবস্থায় বড় দুর্বলতা আছে৷

গবেষণা পত্রটি উস্থাপন করে সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, “মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে শ্রীলঙ্কাকে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও ইতোমধ্যে দেশটি তা নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছে  এবং বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে এখন শ্রীলঙ্কার চেয়ে পিছিয়ে৷”

সিপিডি মনে করে, ২০২০-২১ অর্থবছরে করোনাভাইরাস মহামারিতে অর্থনীতিতে যে সংকট তৈরি হয়েছিল, পরের বছর কিছুটা কমে এলেও সঙ্গে যোগ হয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতি৷ এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নীতির দুর্বলতা, সুশাসনের অভাব ও প্রয়োজনীয় সংস্কারের ব্যর্থতা৷ এগুলো ধারাবাহিকভাবে চলেছে৷

বিশ্লেষকরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখাই এখন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ৷ এর জন্য অর্থনীতির নীতি কাঠামো যেমন আছে তেমনি বাজার ব্যবস্থাপনা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়৷ এইসব বিষয়ে সরকারের দীর্ঘ মেয়াদে কোনো পরিকল্পনা আছে বলে মনে হয়না৷

চিনির দাম ইউরোপঅ্যামেরিকার চেয়ে বেশি

সিপিডি বলছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নে এক কেজি চিনির দাম বাংলাদেশি মুদ্রায় ৩৯ টাকা৷ আর যুক্তরাষ্ট্রে ৯৬ টাকা৷ অথচ বাংলাদেশে এক কেজি চিনির দাম ১৩০ টাকা৷ গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশে চিনির দাম ১৫২ শতাংশ বেড়েছে৷ আর রসুনের দাম বেড়েছে ৩১০ শতাংশ৷ পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ১৬৪ শতাংশ৷ আদা ২০৫ শতাংশ৷

মসুর ডাল ৯৫, আটা ৪০-৫৪, ময়দা ৬০, গুঁড়া দুধ ৪৬-৮০, পেঁয়াজ ১৬৪ ভাগ বেড়েছে৷ শুকনা মরিচের দাম দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে৷  খোলা সয়াবিন ৮৪, বোতলজাত সয়াবিন ৫৬ ও পামঅয়েলের দাম ১০৬ শতাংশ বেড়েছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় অনেক বেশি৷

মিনিকেট চালের দাম বেড়েছে ১৭ শতাংশ, পাইজামের ১৫ ও মোটা চালের ৩০ শতাংশ৷ থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের চেয়ে দেশে এখন চালের দাম বেশি৷

খাবারের পিছনে ব্যয় বেশি

সিপিডির প্রতিবেদনে ১৭টি দেশের মানুষের মাথাপিছু জিডিপি এবং খাবারের পেছনে মাথাপিছু খরচের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়৷ এতে দেখা যায়, ওই সব দেশের মধ্যে বাংলাদেশে মানুষের মাথাপিছু জিডিপি সবচেয়ে কম, সাত হাজার ৮০৫ ডলার৷ অথচ খাবারের পেছনে ওই ১৭ দেশের মধ্যে বাংলাদেশে মাথাপিছু খরচ সবচেয়ে বেশি, ৯২৪ ডলার৷ তালিকার অন্য ১৬টি দেশ হলো ইরান, ভারত, লাওস, শ্রীলঙ্কা, উজবেকিস্তান, আলজেরিয়া, ভিয়েতনাম, টিউনিশিয়া, বলিভিয়া, মরক্কো, ইরাক, ইন্দোনেশিয়া, কলম্বিয়া, ব্রাজিল, জর্ডান ও দক্ষিণ আফ্রিকা৷ আয় কম কিন্তু খাবারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করতে হয় বাংলাদেশের মানুষকে ৷

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েন অব বাংলাদেশের(ক্যাব)  সভাপতি গোলাম রহমান বলেন , “বাজার নিয়ে আমরা  কথা বলছি কিন্তু সেটা অনুযায়ী কোনো বাজার ব্যবস্থাপনা দেখছিনা৷ আর এটা শুধু বাজার ব্যবস্থাপনা নয়, পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করে৷ সবখানেই দুর্বলতা দেখতে পাচ্ছি৷ আর আমরা সাধারণ মানুষ এর চাপ বহন করছি৷”

তার কথা, “করোনা ও ইউক্রেন যুদ্ধের পর মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বিশ্বের অনেক দেশ অনেক ব্যবস্থা নিয়েছে৷ তার সুফল তারা পাচ্ছে৷ আমরা তখন ব্যবস্থা নেইনি৷ আমরা উল্টোটা করেছি৷ আমরা যখন ব্যবস্থা নিই তখন আর সময় থাকেনা৷”

সমস্যা কোথায়

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, “বাংলাদেশে আমরা দীর্ঘদিন ধরেই দেখছি বাজারকে মেন্যুপুলেট করা হচ্ছে৷ এটা কোনেভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছেনা৷ ফলে এখানে অব্যাহতভাবে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে৷”

তার কথা, “নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার তুলনায় মানুষের আয় বাড়ছে না৷ আর খাদ্যপণ্যের দাম বেশি বাড়ায় এর প্রভাব পড়ছে কম আয়ের মানুষের ওপর৷  খাদ্য কিনতে গিয়েই তার আয় শেষ হয়ে যাচ্ছে৷  ফলে তারা কম খায় অথবা ঋণ করে৷ সে ঋণগ্রস্ত হয়৷ অন্যদিকে প্রয়োজনীয় খাদ্য না কিনতে পারায় অপুষ্টিতে ভোগে৷ এর প্রভাব স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা সবখানেই পড়ে৷”

তিনি বলেন,” বাজার থেকে একটি মহল অব্যবস্থাপনার সুযোগ নিয়ে কোটি কোটি টাকা আয় করছে৷ তাদের কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আনা হচ্ছেনা৷”

ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম ডয়চে ভেলেকে বলেন, “আমাদের এখানে কতিপয় বড় আমদানিকারক ও ব্যবসায়ী  বাজারে সরবরাহ চেইন নিয়ন্ত্রণ করে৷ ফলে পণ্যমূল্য তারাই নিয়ন্ত্রণ করে৷ দ্রব্য মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে এটা ভাঙতে হবে৷ আর তার জন্য প্রয়োজন দীর্ঘ মেয়াদে পরিকল্পনা৷”

তার কথা, “সরকার হয়তো আমদানি শুল্ক কমালো কিন্তু ওই পণ্যের আমদানিকারক একজন৷ ফলে দাম কমেনা৷ ওই আমদানি কারক লাভবান হয়৷ আবার কৃষিপণ্যে আমরা অনেক ইনফরমাল লেনদেন দেখি৷ আলুর মৌসুমে কিছু বিত্তশালী কোল্ড স্টোরেজে আলু কিনে রাখেন৷ আলুর দাম বেড়ে গেলে তারা শুধু স্লিপ বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা আয় করেন৷ এগুলো বন্ধ করতে হবে৷”

তিনি বলেন, “এই বাজারের সঙ্গে আমাদের অর্থনীতিতে সুনীতি এবং সুশাসনও দরকার৷ সরকার আইএমএফ-এর পরামর্শে হলেও এখন কিছু অর্থনৈতিক সংস্কার করছে৷ কিন্তু এর সুফল পেতে হলে পুরো নির্দেশনা মানতে হবে৷ তা না হলে এর সুফল পাওয়া যাবেনা৷ আমরা আগে দেখেছি কোনো সংস্কারই পূর্ণ হয়না৷ রাজনৈতিক কারণে সরকার প্রেসার গ্রুপের কাছে নতি স্বীকার করে৷”

“অর্থনৈতিক সংস্কার করার জন্য যে রাজনৈতিক সদিচ্ছা  এবং দৃঢ়তা দরকার তা আমি এখন পর্যন্ত সরকারের মধ্যে দেখছিনা.” বলেন এই অর্থনীতিবিদ৷

সরকারও জানে সিন্ডিকেটকিন্তু ধরবে কে?

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিপ্তরের মহাপরিচালক এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, “আমরা জানি বাজারে সিন্ডিকেট কাজ করে৷ তারা দাম বাড়িয়ে দেয়৷ আমরা এগুলোর কিছু চিহ্নিত করে ব্যবস্থাও নিয়েছি৷ কিন্তু সব তো আমরা পারিনা৷ আমাদের পর্যাপ্ত জনবলও নাই৷ আবার আইনও আমাদের সব দায়িত্ব দেয়নি৷ এরজন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয় আছে, প্রতিযোগিতা কমিশন আছে৷ কৃষি বিপণন অধিদপ্তর ২৯টি পণ্যের দাম ঠিক করে দিয়েছে৷ সেটা বাস্তবায়নের দায়িত্বও তাদের৷ আমাদের সরকার যা ঠিক করে দেয় তাই করতে পারি৷”

তার কথা, “কোনো পণ্যের দাম বাড়ার যৌক্তিক কারণ থাকতে পারে৷ কিন্তু ওই পণ্যের পরতে পরতে মুনাফা লোভীরা ঢুকে দিয়ে দাম আরো বাড়িয়ে দেয়৷ তারা অতি মুনাফা করে৷ ভোক্তা অধিদপ্তর তো কোনো পণ্যের দাম ঠিক করে দেয়না৷ কেউ যদি যৌক্তিক দামের বেশি নেয় তখন আমরা ব্যবস্থা নিতে পারি৷ তবে যৌক্তিক দাম কোনটা তাও তো নির্ধারণ আমরা করি না৷”

ডিডাব্লিউ ডটকম