(গিডিয়ন রাচম্যানকে দেয়া ইউনুসের বিশেষ সাক্ষাতকার)
সারাংশ:
১. এই আন্দোলনকারীদের প্রথমে সরকার পতনের উদ্দেশ্য ছিল না। ওরা ছিল একদম নির্দোষ ধরনের একটা আন্দোলনে, নিজেদের কাজ আর ভবিষ্যৎ নিয়ে। এর কোনও কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ছিল না।
২. ওদের সামনে বলছি—তোমরা ওই সরকারকে প্রশংসায় ভাসিয়েছ, “বাংলাদেশের দ্রুত প্রবৃদ্ধি!”—কিন্তু সব ছিল ভুয়া হিসাব।
৩. আমি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও বলেছি—সব বছর ধরে তোমরা তো আগের সরকারকে সমর্থন করেছ, নানা পুরস্কার দিয়েছ। কেন? কোন ব্যবস্থার ভিত্তিতে?
৪. নেপালে জলবিদ্যুতের বিরাট সম্ভাবনা আছে—পরিষ্কার শক্তি। শুধু ভারতের মাত্র ৪০ মাইল পথ পার হয়ে সংযোগ আনতে হবে। আমরা চাই এ অঞ্চলের অর্থনীতি বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান আর ভারতের পূর্বাঞ্চলকে নিয়ে গড়ে উঠুক। ওরা আমাদের সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করবে।

গিডিয়ন রাচম্যান:
হ্যালো এবং স্বাগতম দ্য রাচম্যান রিভিউ-তে। আমি গিডিয়ন রাচম্যান, ফাইনান্সিয়াল টাইমসের চিফ ফোরেন অ্যাফেয়ার্স কমেন্টেটর। এই সপ্তাহের পডকাস্টের বিষয় বাংলাদেশ, বিশ্বের অষ্টম সর্বাধিক জনবহুল দেশ। আমার অতিথি হলেন মহাম্মদ ইউনুস—৮৪ বছর বয়সী নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী এবং বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন নেতা। যারা গত গ্রীষ্মে শেখ হাসিনার সরকারকে উৎখাত করেছিল সেই ছাত্ররা বলছে তারা চায় একটা নতুন বাংলাদেশ। কিন্তু সত্যিই কি দেশটি স্থিতিশীল হয়ে এগিয়ে যেতে পারবে?
গত জুলাই ও আগস্ট মাসে বাংলাদেশের ছাত্র ও সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ শেখ হাসিনার সরকারকে উৎখাত করে। ২০০৯ সাল থেকে দেশ শাসন করা শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ছিল।
একজন বিক্ষোভকারীর কণ্ঠ:
ওরা নির্বিচারে মানুষ হত্যা করছে। মানুষকে কারাগারে ঢোকাচ্ছে, নির্যাতন করছে। একই সঙ্গে আপনারা দেখছেন, বাংলাদেশের মানুষ কিভাবে সাহস নিয়ে রাস্তায় নেমে এসেছে। তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে—তারা বসে থাকবে না, যুদ্ধ না করে হাল ছেড়ে দেবে না।
গিডিয়ন রাচম্যান:
চলতি বিক্ষোভের মোড় ঘুরে যায় কথিত ‘জুলাই হত্যাকাণ্ডের’ পর। ধারণা করা হয় সেসময়ে এক হাজারেরও বেশি বিক্ষোভকারী, যাদের অনেকেই শিশু, নিহত হয়েছিল। শেখ হাসিনা উৎখাত হওয়ার পর, ছাত্র বিক্ষোভকারীরা মহাম্মদ ইউনুসকে অনুরোধ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পরিচালনা করতে। তিনি এখন দেশটিকে স্থিতিশীল করার চেষ্টা করছেন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছেন। এর একটি অপ্রত্যাশিত প্রভাব হয়েছে ব্রিটেনে, যেখানে শেখ হাসিনার ভাগনি টিউলিপ সিদ্দিক, যিনি এক সময় সরকারের মন্ত্রী ছিলেন, পদত্যাগ করেছেন।
আমি গত সপ্তাহে দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে মহাম্মদ ইউনুসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। বাংলাদেশ অন্তর্বর্তীকালীন নেতার কথা শোনার আগে সংক্ষেপে বলি, আমরা তখন এক ভীড়ভাট্টার কফি লাউঞ্জে বসেছিলাম, তাই কিছু পটভূমির শব্দ পাওয়া যাবে। তবে দয়া করে শোনার চেষ্টা করুন। মহাম্মদ ইউনুস এক অসাধারণ মানুষ, আর তিনি এখন এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতিতে। তিনি প্রথমে বললেন গত গ্রীষ্মের সেই গণআন্দোলনটি তিনি কীভাবে দেখেন।

মহাম্মদ ইউনুস:
এটি বাংলাদেশে ঘটেছে, মানব ইতিহাসের প্রায় অনন্য এক ঘটনা—কারণ এই আন্দোলনকারীদের প্রথমে সরকার পতনের উদ্দেশ্য ছিল না। ওরা ছিল একদম নির্দোষ ধরনের একটা আন্দোলনে, নিজেদের কাজ আর ভবিষ্যৎ নিয়ে। এর কোনও কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ছিল না।
গিডিয়ন রাচম্যান:
তাহলে এটা কীভাবে এত বড় হলো? ওরা কি গ্রাফিতি বিপ্লবের মাধ্যমে জেগে উঠেছিল?
মহাম্মদ ইউনুস:
গ্রাফিতি পরে এসেছে। যখন বিক্ষোভ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়, ছেলেমেয়েরা রাস্তার ধারে, শহরের দেয়ালে আঁকতে শুরু করে। মাইলের পর মাইল রঙের ছোঁয়া। এরা শিল্পী নয়, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী। কিন্তু কী অসাধারণ ছবি আর ভাবনা! সেটিই এই আন্দোলনকে অনন্য করেছে। এখানে কোনও রাজনীতিক নেতা ছিল না, কোনও তাত্ত্বিক কাঠামো ছিল না। শুধু বলছিল—“এই সরকারকে আমরা চাই না। এরা আমাদের সবকিছু কেড়ে নিয়েছে।”
একটা চিঠি আমাকে খুব স্পর্শ করেছিল। একটা ১২ বছরের ছেলে তার মায়ের কাছে চিঠি লিখে ঘরে রেখে গেছে: “মা, তুমি আমাকে বিক্ষোভে যেতে দিবে না। কিন্তু আমার বন্ধুরা সেখানে গিয়ে আন্দোলন করছে, অনেকে নিহত হয়েছে। আমি ঘরে বসে থাকতে লজ্জা পাই। আমি কাপুরুষ হতে চাই না। আমি আমার দেশের জন্য দাঁড়াতে চাই। আমি যাচ্ছি। তুমি আশীর্বাদ করো। যদি আমার কিছু হয়, আমি আর ফিরতে নাও পারি—তবে আমায় ক্ষমা করো।” সে সত্যিই আর ফিরে আসেনি।
আপনি বুঝতেই পারছেন, ওদের আবেগ কত গভীর। এত অদ্ভুত এক সংহতি গড়ে উঠল যে ছোটরা রাস্তায় গেলে বাবা-মায়েরা প্রথমে বাধা দিত, পরে তারাই সন্তানের সাথে যোগ দিত। মা-বাবারা সন্তানের পাশে দাঁড়াত যাতে ওরা নিরাপদ থাকে। ফলে ধীরে ধীরে এটা সবার আন্দোলনে পরিণত হয়, মানুষের ঢল নামে। শেষদিনে লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের দিকে এগিয়ে যায়।
গিডিয়ন রাচম্যান:
আর আপনি তখন কোথায় ছিলেন?
মহাম্মদ ইউনুস:
আমি তখন প্যারিসে। প্যারিস অলিম্পিক আয়োজন নিয়ে কাজ করছিলাম—আমি তাদেরকে সামাজিক একটি অলিম্পিকের ধারণা দিচ্ছিলাম। কারণ আমার কাছে খেলাধুলা শুধুই বিনোদন নয়, এটা বিশাল সামাজিক শক্তি। সারা বিশ্ব থেকে মানুষকে এক জায়গায় আনে।
গিডিয়ন রাচম্যান:
তারপর কীভাবে ফোন পেলেন আর দেশে ফিরলেন?

মহাম্মদ ইউনুস:
সেই দিনই প্রথম ফোন আসে। আমি তখন ছোট এক অপারেশনের জন্য হাসপাতালে ছিলাম। প্রতিদিন ফোনে দেশের খবর দেখছিলাম। ওরা বলল, “তিনি (শেখ হাসিনা) চলে গেছেন। এখন আমাদের একটা সরকার দরকার। আপনি সরকার গঠন করুন।” আমি বললাম, “না, আমি পারব না। আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না, জড়াতেও চাই না।”
গিডিয়ন রাচম্যান:
কোন গ্রুপের কাছ থেকে ফোন আসে?
মহাম্মদ ইউনুস:
ছাত্রদের কাছ থেকে। আমি ওদের কাউকে চিনতাম না। ওদের বোঝানোর চেষ্টা করলাম, “তোমরা অন্য কাউকে খুঁজে নাও। বাংলাদেশে ভালো নেতা আছে।” ওরা বলল, “না, না, না। আপনাকেই আসতে হবে। আমরা আর কাউকে পাই না।” বললাম, “আরো চেষ্টা করো।” ওরা বলল, “আমাদের সময় নেই। ২৪ ঘণ্টা সময় নিতে পারেন, তারপর আবার ফোন দেব।” ২৪ ঘণ্টা পর ফোন করে বলল, “না, আমরা চেষ্টা করেছি, পাইনি। আপনাকেই ফিরতে হবে।” শেষমেশ বললাম, “তোমরা তো জীবন দিয়ে আন্দোলন করেছ। তোমাদের রক্ত ঝরছে। এ অবস্থায় হয়তো আমারও কিছু করা উচিত, আমার ইচ্ছে না থাকলেও। এখন সরকার গঠন করতে হবে, তাই না?” ওরা বলল, “হ্যাঁ, ঠিক তাই।” তারপর আর কিছু বলল না।
দু’ঘণ্টা পরে এক নার্স ফুলের তোড়া নিয়ে এলো আমার কাছে। আমি বললাম, “এটা কেন?” ও বলল, “আপনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, আমরা জানতাম না।” আমি অবাক হয়ে বললাম, “মাত্র ওদের সাথে কথা হয়েছে, তুমি জানলে কীভাবে?” ও বলল, “টিভি, পত্রিকা সব জায়গায় প্রচার হচ্ছে আপনি প্রধানমন্ত্রী।” আমি তো স্তম্ভিত! আরেকটু পরে হাসপাতালের পরিচালক এলেন, ফুলের তোড়া দিয়ে অভিনন্দন জানালেন। বললেন, “আপনি আমাদের নতুন প্রধানমন্ত্রী।”
তারপর হাসপাতাল আমাকে বলল বিকাল পর্যন্ত থাকতে হবে। আমি হাসপাতালের পরিচালককে বললাম, “ওরা তো আমাকে ডাকছে। আপনি আমার ট্রাভেল arrangments করতে পারেন?” তিনি বললেন, “অবশ্যই, আপনি প্রধানমন্ত্রী, আপনাকে সাহায্য করাই আমাদের কর্তব্য।” তো ওরা মেডিকেশনসহ সব প্রস্তুতি করল। সেই রাত পেরিয়ে সকালে ফরাসি সেনাবাহিনীর একটা দল এল আমাকে এয়ারপোর্টে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আমি ভাবছিলাম, ‘কী হচ্ছে আমার সঙ্গে!’
এভাবে আমি বাংলাদেশে ফিরি। সেদিন পুরো দেশ অপেক্ষায় ছিল আমার প্লেনটা কখন নামবে। আমি আসি একটা সাধারণ ফ্লাইটে। বিমানবন্দরে নেমে সবাইকে শান্ত থাকতে বলি, একতা বজায় রাখতে বলি। সেখান থেকেই সব শুরু।

গিডিয়ন রাচম্যান:
আপনি এখন দায়িত্বে। কোথা থেকে শুরু করলেন? প্রধান অগ্রাধিকারের বিষয় কী?
মহাম্মদ ইউনুস:
প্রথমে ওরা বলল, “আপনি মন্ত্রিসভা গঠন করুন।” ভাবলাম, কাকে নেব? কারণ শপথ নিতে হবে। তাই প্রথমে নিজের বাসায় গেলাম, তারপর প্রেসিডেন্ট প্যালেসে। এত দ্রুত সবকিছু ঘটছিল। কী করব, কীভাবে শুরু করব—এসব চিন্তা করার ফুরসতও নেই।
গিডিয়ন রাচম্যান:
এত কিছুর পর আজকের দিনে এসে আপনার প্রধান অগ্রাধিকার কী?
মহাম্মদ ইউনুস:
প্রথম অগ্রাধিকার হল অর্থনীতিকে আবার সচল করা। পুরো অর্থনীতি প্রায় ধ্বংসের পথে ছিল। আপনারা জানেন, সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন রীতিমতো ডাকাতি চালিয়েছে। সব লুটে নিয়েছে। ব্যাংকে টাকা নেই, কারণ অস্ত্রের জোরে ব্যাংকের পরিচালক বোর্ডগুলো সরিয়ে নিজেদের লোক বসিয়েছে। তারপর নিজেদের বন্ধুদের নামে বিশাল অঙ্কের ঋণ দিচ্ছে, যা ফেরত দেওয়ার দরকার নেই—কাগজপত্রে আছে কিন্তু আদায় নেই।
এইভাবে ১৭ বিলিয়ন ডলারের মতো অর্থ ব্যাংকিং খাত থেকে লুট হয়েছে। আমাদের হিসাব অনুযায়ী, গড়ে প্রতি বছর ১৬ বিলিয়ন ডলার দেশের বাইরে গেছে। তাই এখনকার অর্থনীতি একেবারে ফাঁপা। আমরা সবচেয়ে চিন্তিত ছিলাম তৈরি পোশাক শিল্প নিয়ে, যেটা আমাদের মূল ভিত্তি। যদি সেটাও বন্ধ হয়ে যেত, বাংলাদেশ ধ্বংস হয়ে যেত। সৌভাগ্যবশত আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বিশ্বাস হারায়নি। তারা থেকে গেছে, কারখানাগুলো চলছে। আমাদের রফতানি আয় বাড়ছে। এটা স্বস্তির খবর।
আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে গিয়েছিল। হঠাৎই রেমিট্যান্স বাড়তে শুরু করল। যেটা আমাদের বাঁচিয়েছে। আমাদের অনেক দেনা আছে—আগের সরকারের আমলে নেওয়া—যেগুলো সময়মতো শোধ করতে হবে। এটা বিরাট চাপ। কীভাবে শোধ করব?
একদিকে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করতে হবে। অন্যদিকে জনগণকে জানাতে হবে আমরা কী করছি। কারণ আগের সরকার সব সংস্থাকে ধ্বংস করেছে, তাই আমাদের সংস্কারের দিকে যেতে হবে। আমরা ১৫টি সংস্কার কমিশন গঠন করেছি—সংবিধান সংস্কার, নির্বাচন পদ্ধতি সংস্কার, বিচারব্যবস্থা, মানবাধিকার, পুলিশ প্রশাসন—ইত্যাদি নিয়ে। আমরা ৯০ দিনের সময়সীমা দিয়েছিলাম। বেশিরভাগ রিপোর্ট এ মাসে দেওয়ার কথা। কারো কারো একটু সময় বেশি লাগছে, এক-দুই সপ্তাহ। ইতোমধ্যে পাঁচটি কমিশনের রিপোর্ট পেয়েছি। সব পেয়ে তারপর আমরা একটি ঐক্যমত্য কমিশন গঠন করব—সেখানে সবার সুপারিশ একত্রীকরণ হবে। তারপর আমরা একটি ‘জুলাই চার্টার’ (গত বছরের শিক্ষার্থীদের যে জুলাই বিপ্লব) প্রকাশ করব। এটাই হবে দেশের ঐতিহাসিক নথি—যেখানে আমরা সবাই একমত। সবাই সই করবে।

তারপর ঠিক করব কী কী নির্বাচনের আগেই বাস্তবায়ন করা হবে, আর কী কী পরের সরকারের সময়ে। আমরা নির্বাচন-তারিখ ঘোষণা করেছি। একটা এই বছরের শেষের দিকে, আরেকটা বিকল্প হলো আগামী বছরের মাঝামাঝি। রাজনীতিবিদরা দ্রুত নির্বাচন চায়, বলছে “আগে নির্বাচন হোক, তারপর বাকি সংস্কার।”
আমি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও বলেছি—সব বছর ধরে তোমরা তো আগের সরকারকে সমর্থন করেছ, নানা পুরস্কার দিয়েছ। কেন? কোন ব্যবস্থার ভিত্তিতে?
গিডিয়ন রাচম্যান:
এখানে দাভোসে যেসব ব্যাংকার-উদ্যোক্তা রয়েছেন, তারাই তো আগের সরকারকে সুবিধা দিয়েছিলেন।
মহাম্মদ ইউনুস:
হ্যাঁ, তারা সবাই এখানে। ওদের সামনে বলছি—তোমরা ওই সরকারকে প্রশংসায় ভাসিয়েছ, “বাংলাদেশের দ্রুত প্রবৃদ্ধি!”—কিন্তু সব ছিল ভুয়া হিসাব।
গিডিয়ন রাচম্যান:
চুরি যাওয়া অর্থ ফেরত পাওয়া যাবে বলে মনে করেন?
মহাম্মদ ইউনুস:
আমরা সেজন্যই কাজ করছি। কিন্তু এটা কঠিন। কার হাতে দায়িত্ব দেব? যদি সেই লোক আবার ওদের হাত করে ফেলে? সুতরাং বিশ্বস্ত কেউ চাই। ওরা বিদেশে বাড়ি কিনেছে, সম্পদ করছে, কোম্পানিতে বিনিয়োগ করছে, ব্যাংকে টাকা জমিয়েছে। ইংল্যান্ডে টিউলিপ সিদ্দিকের ঘটনার কথাও তো উঠে এসেছে।
গিডিয়ন রাচম্যান:
হ্যাঁ।
মহাম্মদ ইউনুস:
হ্যাঁ, এটাও একই চক্রের অংশ।
গিডিয়ন রাচম্যান:
আপনার কি মনে হয় ব্রিটিশ সরকার জানত না, নাকি তারা জেনেও না জানার ভান করেছে?
মহাম্মদ ইউনুস:
সেই প্রশ্নই আমাদের। কীভাবে তারা জানবে না? টিউলিপ তো দুর্নীতি-বিরোধী মন্ত্রী ছিল। অথচ সে-ই এসবের সঙ্গে জড়িত। পুরো পরিবার জড়িত ছিল, শুধু টিউলিপ নন। যারাই তাদের আত্মীয়-পরিজন, সবাই টাকার পাহাড় গড়েছে।
গিডিয়ন রাচম্যান:
আর শেখ হাসিনা এখনো দিল্লিতে আছেন।
মহাম্মদ ইউনুস:
তিনি দিল্লিতে। আমরা বলেছি, “আপনি কী করবেন ঠিক করুন। আইন অনুযায়ী আপনাকে অর্থ ফিরিয়ে দিতে হবে। একই সঙ্গে, আপনি যতদিন দিল্লিতে থাকবেন, অনুগ্রহ করে বাংলাদেশকে আক্রমণাত্মক কথা বলা বন্ধ করুন।” তিনি সংবাদমাধ্যমের সামনে নানা মিথ্যা প্রচারণা চালাচ্ছেন। ভারত সরকার বলছে, “এটা আমাদের কাজ নয়, মিডিয়া করছে।” কিন্তু সেটাও খুবই বিরূপ। যেমন—শিরোনাম করা হচ্ছে, “ইউনুস সন্ত্রাসী, তিনি পাকিস্তানে প্রশিক্ষিত, তিনি বাংলাদেশে তালেবানি শাসন গড়তে চান, আমেরিকানরা তাকে পাঠিয়েছে।” এমন আজগুবি অপপ্রচার।
গিডিয়ন রাচম্যান:
আন্তর্জাতিক মহল, বিশেষ করে ইউরোপীয়দের কাছ থেকে আপনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কী সাহায্য চান?
মহাম্মদ ইউনুস:
ইউরোপীয়রা আমাদের ব্যাপারে চমৎকার সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে। আমি এতটা আশাই করিনি। ওরা দিল্লি থেকে তাদের সব কূটনীতিককে ডেকে এনেছে ঢাকায়। তারা খুব প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এর চেয়ে বেশি আর কী চাই!
গিডিয়ন রাচম্যান:
আইএমএফ, বিশ্বব্যাংকের সঙ্গেও কথা বলেছেন?
মহাম্মদ ইউনুস:
হ্যাঁ, কথা হয়েছে। ওরা খুব সহায়ক। আগের সরকারের সময় যেসব শর্ত পূরণ হয়নি, আমরা বলেছি, “দুঃখিত, আমরা দায় নিতে চাই না, তবে যথাসাধ্য চেষ্টা করব।” এটা তো আমাদের বড় সুযোগ—বাংলাদেশকে ঠিক করার ঐতিহাসিক সুযোগ। একইসঙ্গে এটা বিশ্বের জন্যও বড় সুযোগ।

গিডিয়ন রাচম্যান:
নির্বাচন নিয়ে একটা প্রশ্ন করব। অন্য একটা বৈঠকে সিরিয়ানরা বলছিল, ওদের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা। দ্রুত নির্বাচন করলে আবার বিভাজন তৈরি হতে পারে। আপনারা কী ভাবছেন?
মহাম্মদ ইউনুস:
দেখুন, আমি সবসময় জাতীয় ঐক্য রক্ষা করার কথা বলছি। সেটাই অগ্রাধিকার। একটা সম্ভাবনা হল, ছাত্ররাই একটা রাজনৈতিক দল তৈরি করবে। মন্ত্রিসভায় আমি তিনজন ছাত্রনেতাকে নিয়েছি। যারা জীবন দিয়েছে, তারা বোঝাতে পারবে তারা কেন জীবন দিয়েছে। ওরা ভালো কাজ করছে। ওদের মধ্যে আলোচনা হচ্ছে—“আমরা নিজেরাই না হয় একটা দল বানাই।” আমি বলি, “একটাও আসন পাবে না বলে ভয় পাচ্ছ? তোমাদের তো সবাই চিনে!” ওরা চেষ্টা করুক না। হতে পারে দল গঠন করতে গিয়ে ওরা ভেঙে যাবে। রাজনীতিকরা ওদের মধ্যে ঢুকে পড়তে পারে। তবে সেটাই এখনকার বাস্তবতা।
গিডিয়ন রাচম্যান:
ভারতের পক্ষ থেকে একটা যুক্তি শুনি—“বাংলাদেশ নাজুক, ইউনুস নিরাপদ নাও হতে পারেন, ইসলামী জঙ্গিরা ক্ষমতা দখল করবে।” আপনি কী ভাবছেন?
মহাম্মদ ইউনুস:
আমি এমন কোনও লক্ষণ দেখি না। বিশেষ করে তরুণরা খুব সচেতন, ওদের মধ্যে কোনও উগ্র ধারণা নেই বা ক্ষমতালিপ্সা নেই। ওরা বুঝে গেছে রক্তের বিনিময়ে যা পেয়েছে, সেটা রক্ষা করতে হবে। নইলে আগের মতই কোনো চক্র এসে ক্ষমতা দখল করবে। আমার ধারণা, ওদের উদ্দেশ্য স্বচ্ছ।
গিডিয়ন রাচম্যান:
ভয়াবহ চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। সম্ভাবনাটা কী দেখেন?
মহাম্মদ ইউনুস:
এই সমস্যা মোকাবিলা করতেই হবে। পালিয়ে লাভ নেই, কারণ আমাদের অভ্যন্তরীণ-আন্তর্জাতিক ব্যাপক সমর্থন আছে। আর বাংলাদেশ এভাবে আন্তর্জাতিক সমর্থন কখনোই পায়নি। এটা আমাদের সুবর্ণ সময়। ব্যবহার করতে হবে। আমি যাকে বলি, “নতুন বাংলাদেশ” গড়তে হবে।
গিডিয়ন রাচম্যান:
অর্থনৈতিক খাতে আপনার ভবিষ্যৎ ভাবনা কী? পোশাক খাত তো মুখ্য—আর কী সম্ভাবনা রয়েছে?
মহাম্মদ ইউনুস:
ব্যবসায়ী আর বিনিয়োগকারীদের বলি, “বাংলাদেশ এক অভাবনীয় দেশ—অষ্টম বৃহত্তম জনসংখ্যা, অথচ ছোট্ট ভূখণ্ড। মানুষজন তরুণ। গড় বয়স ২৭। সবার হাতে মোবাইল, তারা আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি রাখে, যদিও বাংলাদেশে জন্মেছে। এরা ভিন্নভাবে ভাবে। তা-ই তো এই অভূতপূর্ব আন্দোলন ঘটাতে পেরেছে। আপনি চাইলে বাংলাদেশে কারখানা বসান, পরিচালনা করুন, আমরা শ্রম দিই। প্রযুক্তিপণ্য বানান, আমরা দক্ষতা দেখাই।”
এভাবেই তো তৈরি পোশাক শিল্প গড়ে উঠেছিল। গ্রাম থেকে আসা নারীরা প্রথমে সেলাই মেশিনও দেখেনি। অথচ আজ তারা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রফতানিকারক দেশের চালিকাশক্তি। তাদের দক্ষতা নিয়ে কারও সংশয় নেই।
এখন আমাদের নতুন জায়গা আছে, সেখানে কারখানা গড়তে পারবেন। যদি বিদ্যুতের সমস্যা হয়, আমরা তা সমাধান করব। কারণ নেপালে জলবিদ্যুতের বিরাট সম্ভাবনা আছে—পরিষ্কার শক্তি। শুধু ভারতের মাত্র ৪০ মাইল পথ পার হয়ে সংযোগ আনতে হবে। আমরা চাই এ অঞ্চলের অর্থনীতি বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান আর ভারতের পূর্বাঞ্চলকে নিয়ে গড়ে উঠুক। ওরা আমাদের সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করবে। আমাদের দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত আছে, আরো বন্দর বানাতে পারব। ফলে এ অঞ্চল মিলেই এক বিশাল অর্থনীতি হবে।
গিডিয়ন রাচম্যান:
এই ছিল বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন নেতা মহাম্মদ ইউনুসের সঙ্গে আমার দাভোসে কথোপকথন। এ পর্বের রাচম্যান রিভিউ এখানেই শেষ করছি। শুনে থাকার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আগামীতেও আমাদের সঙ্গে থাকুন।
Sarakhon Report 



















