০৪:২২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
সরকারী ব্যয় বাড়ানো ও দেশকে দেউলিয়া হবার পথে নিয়ে যাবার বিরুদ্ধে ইন্দোনেশিয়ার রাজপথে তীব্র ছাত্র আন্দোলন সিঙ্গাপুরের আবর্জনা ব্যবস্থার ৬০ বছরের শিক্ষা: প্রযুক্তি বদলেছে, মানুষের অভ্যাস কতটা বদলেছে? এক দশকের মোড় ঘুরে গেল: টিভি-সংবাদপত্রকে পেছনে ফেলে বিশ্বের প্রধান সংবাদমাধ্যম এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা: শান্তির আশা নাকি নতুন অনিশ্চয়তার সূচনা? বিশ্বকাপের উন্মাদনায় এক হচ্ছে বিশ্ব, ফুটবলের ভাষায় গড়ে উঠছে সম্মান ও সহমর্মিতা সৃজনশীলতা চাই, কিন্তু কতটা সহনশীল আমরা? সিঙ্গাপুরে শিল্পচর্চা নিয়ে নতুন বিতর্ক জাপানের নগর উন্নয়ন প্রকল্পে বড় ধাক্কা, ব্যয় বৃদ্ধি ও শ্রমিক সংকটে থমকে যাচ্ছে একের পর এক পরিকল্পনা এশিয়াজুড়ে ডেঙ্গু প্রতিরোধে ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগ, ছয় আঞ্চলিক সংস্থার চুক্তি ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি চুক্তি: স্বস্তির বার্তা পেলেও বেশি সুবিধায় থাকতে পারে ইরান সিঙ্গাপুরে চাকরির বাজারে চাপ বাড়ছে, ছাঁটাই সর্বোচ্চ পর্যায়ে; ডিগ্রিধারীদের উদ্বেগ বেশি

পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের স্মৃতিকথা (পর্ব-১২৭)

  • Sarakhon Report
  • ১১:০০:৫৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৫
  • 118

স্কুলের পথে

ফরিদপুর কাছারিতে একটি লোক ভালো নারকেলের বরফি বিক্রয় করিত। সেই নারকেলের বরফি খাইতে যেন কেমন? একদিন দারুণ ক্ষুধার সময় নিজের পাঠ্যবই বাঁধা দিয়া দুই আনার বরফি কিনিয়া খাইলাম। কিন্তু কোথায় পাইব পয়সা? কি করিয়া ধার শোধ করিব? কাছারির পথে আর যাই না। বহুদিন পরে বাড়ি হইতে কোনো জিনিস বাজারে বিক্রি করিয়া দুই আনা সংগ্রহ করিয়া দোকানির নিকটে গেলাম। দোকানি বলিল, “তোমার দেখা না পাইয়া বইগুলি ছিঁড়িয়া ঠোঙা তৈরি করিয়াছি।” আমি মাথায় হাত দিয়া বসিলাম। বই না হইলে আমি কেমন করিয়া পরীক্ষার পড়া করিব? কয়েকদিন পর আমার বইপত্রের অনুসন্ধান করিতে আসিয়া আমার পিতা এই বই খোয়ানোর কাহিনী জানিতে পারিলেন। তিনি আমাকে অনেক বকাবকি করিয়া বইগুলি আবার কিনিয়া দিলেন।

বাড়ি আসিয়া প্রায়ই ডাল-ভাত অথবা শাক-ভাত খাইতাম। সন্ন্যাসীর ভক্ত হইয়া সেই যে আমি মাছ-মাংস পেঁয়াজ-রসুন খাওয়া ছাড়িয়া দিলাম, এখনও সেই কৃষ্ণসাধনা চলিতেছে। ডাল সিদ্ধ হইলে তাহাকে লবণ, মরিচ মিশাইয়া খুঁটিয়া মা তাহার খানিকটা আমার জন্য রাখিয়া দিতেন। বাকিটাকে পেঁয়াজ, রসুন মিশাইয়া আর-আর সকলের জন্য ডাল রান্না করিতেন। সারাদিন পর বাড়ি আসিয়া খাওয়ার পরে সাত রাজ্যের ঘুম আসিয়া আমাকে পাইয়া বসিত। তবু পাঠ্যবইগুলি সামনে মেলিয়া ভালো ছেলের মতোই পড়িতে বসিতাম।

কখন যে ঘুমাইয়া পড়িতাম টেরও পাইতাম না। ভোর না হইতেই আমার পিতা আমাকে জাগাইয়া দিয়া নামাজ পড়িতে বসিতেন। মুখ-হাত ধুইয়া এক সাজি মুড়ি চিবাইয়া বই খুলিয়া বসিতাম। সকালে মাত্র ঘণ্টা দুই সময় আছে। তার পরেই স্কুলে যাইতে হইবে। রাত্রে পড়া করি নাই। অত অল্প সময়ের মধ্যে সব পড়া তৈরি হইত না। বাড়িতে করণীয় অঙ্কগুলিও করা হইত না। ট্রানস্লেশনও লেখা হইত না। নয়টা বাজিতেই স্নান খাওয়া সারিয়া স্কুলে যাইবার জন্য প্রস্তুত হইতাম। আমাদের বাড়ি হইতে শহরে যাওয়ার রাস্তায় বর্ষার দিনে হাঁটুসমান কাদা হইত। সেই কাদা ঠেলিয়া দুই মাইল পথ। তারপর শহরের পাকা রাস্তা। ছাতি ছিল না। বৃষ্টি-বাদলের দিনে জামাকাপড় ভিজিয়া যাইত।

সেই ভিজা জামাকাপড় গায়েই শুকাইত। চৈত্র, বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ মাসের প্রখর রৌদ্রে এত পথ হাঁটিয়াই স্কুলে যাওয়া-আসা করিতাম। এজন্য কেহই আমার প্রতি এতটুকুও সহানুভূতি দেখাইত না। আমার ফুপাতো ভাই মোহন মোল্লার বাড়ি ছিল শহর হইতে পাঁচ মাইল দূরে রঘুয়াপাড়া গ্রামে। সেখান হইতে তাহার ছেলে কমিরুদ্দীন রোজ স্কুলে আসিত। তাহাদের বাড়িতে একটি ছেলে জায়গির থাকিত। সেও অতদূর হইতে স্কুলে আসিত। এ ছেলেটির নাম ছিল লতিফ। খুব গরিব লোকের ছেলে। পড়াশুনা করিবার কি তার আগ্রহ। প্রতিদিন দশ মাইল রাস্তা স্কুলের পথে আসা-যাওয়া করিয়া তাহার অতটুকু বালক-জীবনের সমস্ত শক্তি নিঃশেষিত হইয়া যাইত। কিন্তু তবু পড়া ছাড়িত না। আমি, কমিরুদ্দীন আর লতিফ তিনজনে বসিয়া কতরকম আলাপ-আলোচনাই না করিতাম। লতিফ বলিত, “দেখ ভাই। স্কুলের পড়া না পারিলে মাস্টারেরা আমাকে মারেন।

পরীক্ষায় ফেল করিলে অভিভাবকেরা গাল দেন। কিন্তু কেহই আমাকে পড়া শিখাইয়া দেন না। যদি শহরে থাকিতে পারিতাম, ক্লাসের ভালো ছাত্রদের বাড়ি যাইয়া পড়া শিখিয়া লইতাম। এতদূরে থাকিয়া তাহাও পারি না। কিন্তু পড়িয়া আমাকে পাশ করিতেই হইবে। লেখাপড়া জানিয়া যাঁহারা বড় বড় চাকরি পাইয়া নানা সুযোগ-সুবিধা অধিকার করিয়াছেন, আমাকে তাঁহাদের সমকক্ষ হইতে হইবে।”

কেরোসিনের কুপি জ্বালাইয়া লতিফ রাত বারোটা পর্যন্ত পড়িত। কিন্তু পড়িলে কি হইবে?

যে ভুলের জন্য সে গত বৎসর ফেল করিয়াছিল, সেই ভুলই সে বারবার পড়িয়া অভ্যাস করিত। আগামী বৎসর ফেল করিতে তাহার কোনোই বেগ পাইতে হইত না। এমনি করিয়া কয়েক বৎসর ফেল করিয়া লতিফ যে কোথায় চলিয়া গেল আজ ভালো করিয়া মনে পড়িতেছে না।

চলবে…

জনপ্রিয় সংবাদ

সরকারী ব্যয় বাড়ানো ও দেশকে দেউলিয়া হবার পথে নিয়ে যাবার বিরুদ্ধে ইন্দোনেশিয়ার রাজপথে তীব্র ছাত্র আন্দোলন

পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের স্মৃতিকথা (পর্ব-১২৭)

১১:০০:৫৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৫

স্কুলের পথে

ফরিদপুর কাছারিতে একটি লোক ভালো নারকেলের বরফি বিক্রয় করিত। সেই নারকেলের বরফি খাইতে যেন কেমন? একদিন দারুণ ক্ষুধার সময় নিজের পাঠ্যবই বাঁধা দিয়া দুই আনার বরফি কিনিয়া খাইলাম। কিন্তু কোথায় পাইব পয়সা? কি করিয়া ধার শোধ করিব? কাছারির পথে আর যাই না। বহুদিন পরে বাড়ি হইতে কোনো জিনিস বাজারে বিক্রি করিয়া দুই আনা সংগ্রহ করিয়া দোকানির নিকটে গেলাম। দোকানি বলিল, “তোমার দেখা না পাইয়া বইগুলি ছিঁড়িয়া ঠোঙা তৈরি করিয়াছি।” আমি মাথায় হাত দিয়া বসিলাম। বই না হইলে আমি কেমন করিয়া পরীক্ষার পড়া করিব? কয়েকদিন পর আমার বইপত্রের অনুসন্ধান করিতে আসিয়া আমার পিতা এই বই খোয়ানোর কাহিনী জানিতে পারিলেন। তিনি আমাকে অনেক বকাবকি করিয়া বইগুলি আবার কিনিয়া দিলেন।

বাড়ি আসিয়া প্রায়ই ডাল-ভাত অথবা শাক-ভাত খাইতাম। সন্ন্যাসীর ভক্ত হইয়া সেই যে আমি মাছ-মাংস পেঁয়াজ-রসুন খাওয়া ছাড়িয়া দিলাম, এখনও সেই কৃষ্ণসাধনা চলিতেছে। ডাল সিদ্ধ হইলে তাহাকে লবণ, মরিচ মিশাইয়া খুঁটিয়া মা তাহার খানিকটা আমার জন্য রাখিয়া দিতেন। বাকিটাকে পেঁয়াজ, রসুন মিশাইয়া আর-আর সকলের জন্য ডাল রান্না করিতেন। সারাদিন পর বাড়ি আসিয়া খাওয়ার পরে সাত রাজ্যের ঘুম আসিয়া আমাকে পাইয়া বসিত। তবু পাঠ্যবইগুলি সামনে মেলিয়া ভালো ছেলের মতোই পড়িতে বসিতাম।

কখন যে ঘুমাইয়া পড়িতাম টেরও পাইতাম না। ভোর না হইতেই আমার পিতা আমাকে জাগাইয়া দিয়া নামাজ পড়িতে বসিতেন। মুখ-হাত ধুইয়া এক সাজি মুড়ি চিবাইয়া বই খুলিয়া বসিতাম। সকালে মাত্র ঘণ্টা দুই সময় আছে। তার পরেই স্কুলে যাইতে হইবে। রাত্রে পড়া করি নাই। অত অল্প সময়ের মধ্যে সব পড়া তৈরি হইত না। বাড়িতে করণীয় অঙ্কগুলিও করা হইত না। ট্রানস্লেশনও লেখা হইত না। নয়টা বাজিতেই স্নান খাওয়া সারিয়া স্কুলে যাইবার জন্য প্রস্তুত হইতাম। আমাদের বাড়ি হইতে শহরে যাওয়ার রাস্তায় বর্ষার দিনে হাঁটুসমান কাদা হইত। সেই কাদা ঠেলিয়া দুই মাইল পথ। তারপর শহরের পাকা রাস্তা। ছাতি ছিল না। বৃষ্টি-বাদলের দিনে জামাকাপড় ভিজিয়া যাইত।

সেই ভিজা জামাকাপড় গায়েই শুকাইত। চৈত্র, বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ মাসের প্রখর রৌদ্রে এত পথ হাঁটিয়াই স্কুলে যাওয়া-আসা করিতাম। এজন্য কেহই আমার প্রতি এতটুকুও সহানুভূতি দেখাইত না। আমার ফুপাতো ভাই মোহন মোল্লার বাড়ি ছিল শহর হইতে পাঁচ মাইল দূরে রঘুয়াপাড়া গ্রামে। সেখান হইতে তাহার ছেলে কমিরুদ্দীন রোজ স্কুলে আসিত। তাহাদের বাড়িতে একটি ছেলে জায়গির থাকিত। সেও অতদূর হইতে স্কুলে আসিত। এ ছেলেটির নাম ছিল লতিফ। খুব গরিব লোকের ছেলে। পড়াশুনা করিবার কি তার আগ্রহ। প্রতিদিন দশ মাইল রাস্তা স্কুলের পথে আসা-যাওয়া করিয়া তাহার অতটুকু বালক-জীবনের সমস্ত শক্তি নিঃশেষিত হইয়া যাইত। কিন্তু তবু পড়া ছাড়িত না। আমি, কমিরুদ্দীন আর লতিফ তিনজনে বসিয়া কতরকম আলাপ-আলোচনাই না করিতাম। লতিফ বলিত, “দেখ ভাই। স্কুলের পড়া না পারিলে মাস্টারেরা আমাকে মারেন।

পরীক্ষায় ফেল করিলে অভিভাবকেরা গাল দেন। কিন্তু কেহই আমাকে পড়া শিখাইয়া দেন না। যদি শহরে থাকিতে পারিতাম, ক্লাসের ভালো ছাত্রদের বাড়ি যাইয়া পড়া শিখিয়া লইতাম। এতদূরে থাকিয়া তাহাও পারি না। কিন্তু পড়িয়া আমাকে পাশ করিতেই হইবে। লেখাপড়া জানিয়া যাঁহারা বড় বড় চাকরি পাইয়া নানা সুযোগ-সুবিধা অধিকার করিয়াছেন, আমাকে তাঁহাদের সমকক্ষ হইতে হইবে।”

কেরোসিনের কুপি জ্বালাইয়া লতিফ রাত বারোটা পর্যন্ত পড়িত। কিন্তু পড়িলে কি হইবে?

যে ভুলের জন্য সে গত বৎসর ফেল করিয়াছিল, সেই ভুলই সে বারবার পড়িয়া অভ্যাস করিত। আগামী বৎসর ফেল করিতে তাহার কোনোই বেগ পাইতে হইত না। এমনি করিয়া কয়েক বৎসর ফেল করিয়া লতিফ যে কোথায় চলিয়া গেল আজ ভালো করিয়া মনে পড়িতেছে না।

চলবে…