১১:৩৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
স্কুলে সহিংসতা ঠেকাতে আগে বদলাতে হবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি জেন জি-র ‘ফ্রেন্ডস’ বানানোর চেষ্টা চলছে, কিন্তু কেন তা অসম্ভব সঙ্কুচিত পোশাক কি নষ্ট না করেই আগের মাপে ফেরানো সম্ভব? ডায়মন্ড লিগের ফাইনালে তৃতীয় অ্যামি হান্ট, দুর্দান্ত ছন্দে ছুটছেন ব্রিটিশ তারকা মারাঠি না জানলে ঝুঁকিতে লাইসেন্স, মহারাষ্ট্রে ট্যাক্সি ও অটোরিকশাচালকদের মিলল আরও এক বছর বয়স বাড়লেই জীবন থেমে যায় না, বরং আসে নিজের মতো বাঁচার স্বাধীনতা: প্রু লেইথ দাঁতের চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পথে বজ্রপাতে আহত, ‘ভয়াবহ’ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন নিউইয়র্কের যুবক পেন্টাগনের নিয়ন্ত্রণ কি হারাচ্ছেন পিট হেগসেথ? আফ্রিকার প্রকৃত আয়তন তুলে ধরা মানচিত্রের পক্ষে জাতিসংঘের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত সন্তান হত্যার মামলায় রায় হয়নি, লিন্ডসে ক্ল্যান্সিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে তীব্র বিতর্ক

আন্তর্জাতিক বই আমদানিতে শুল্কারোপ: জ্ঞানের দরজায় দেয়াল, খুলছে কি?

উঁচু শুল্কের বাস্তবত

বাংলাদেশের জাতীয় শুল্ক তালিকা (২০২৪-২৫ অর্থবছর) অনুযায়ী ‘Printed Books, Brochures, Leaflets’ (এইচএস ৪৯০১১০০০) আমদানিতে মোট করভার পৌঁছেছে ৭৩.৯৬ শতাংশএর মধ্যে কাস্টমস ডিউটি ২৫%সম্পূরক শুল্ক ১০%ভ্যাট ১৫%অগ্রিম আয়কর ৫%-সহ একাধিক স্তরের কর ধরা রয়েছে। তুলনামূলকভাবে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা-সংক্রান্ত লাইনে (এইচএস ৪৯০১৯৯১০) করভার মাত্র ১০% রাখা হলেও সাধারণ পাঠকের হাতে পৌঁছাতে হয় যে ‘Other books’ শাখাসেখানে মোট করভার ১৫.২৫% থেকে ৩৯.৪০% পর্যন্ত।

কতটা প্রভাব পড়ছে বাজারে?

• সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD)-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ বলছে৭৩.৯৬% মোট করভার বইয়ের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে গড়ে দ্বিগুণেরও বেশিযা SDG-৪ (সবার জন্য গুণগত শিক্ষা) অর্জনে বড় বাধা সৃষ্টি করছে।

• ২০২৪-এর বাজেট বিশ্লেষণেও একই হার উল্লেখ করে সতর্ক করা হয়েছে যে উচ্চ শুল্ক বই ক্রয়ে মধ্যবিত্ত পরিবারের উপর অতিরিক্ত চাপ’ তৈরি করছে।

• ঢাকার শীর্ষস্থানীয় প্রকাশকদের সঙ্গে কথা বলে মতে ২০২৩-এ বিক্রি ১৫-৩৫% কমে গেছেক্রেতারা আনন্দদায়ক বা অনুবাদ সাহিত্য থেকে সরে যাচ্ছেন। ২০২৪-২৫ এই হার আরো বেশি

সীমিত সম্ভাবনাবিস্তৃত ক্ষতি

মূল্যস্ফীতি বনাম পাঠকবৃত্ত

উচ্চ কাগজ-দাম ও ডলার সংকটের সঙ্গে ৭৪%-এর কাছাকাছি শুল্ক বইয়ের চূড়ান্ত মূল্য বাড়িয়ে দিচ্ছে প্রায় ১.৮ গুণ। এর ফলে আন্তর্জাতিক গবেষণাদার্শনিক বা সমসাময়িক সাহিত্যের অনুবাদসবই সীমিত সার্কেলে আটকে যাচ্ছে।

প্রকাশক-বই ব্যবসায়ীদের টিকে থাকার লড়াই

অগ্রিম আয়কর (AIT) ও সারচার্জ দিতে গিয়ে বই আমদানিকারকের কমিশন মার্জিন নেমে এসেছে ৩-৫%-এ (পূর্বের গড় ১০-১২% থেকে)। অনেক বাণিজ্যিক প্রকাশক এখন বিদেশি শিরোনাম আনতে দ্বিধায় পড়ছেনফলে বাজারে অননুমোদিত পিডিএফ বা পাইরেটেড সংস্করণ বেড়েছে – রাজস্ব যেমন হারাচ্ছেতেমনি লেখক-অনুবাদকরাও ন্যায্য সম্মানী থেকে বঞ্চিত।

পাঠক-শিক্ষকদের সীমিত রেফারেন্স

ইংলিশ-মিডিয়াম স্কুলে বিদেশি টেক্সট-বইয়ের ওপরই করভার ৭৩.৯৬%। বিদ্যালয়গুলো বলছেবই প্রতি গড় বাড়তি ব্যয় ৩০-৪০% – ফলে গার্ডিয়ানদের ফি বাড়ছেআর অনেক স্কুল পুরনো সংস্করণ বা ফটোকপি দিয়ে চালাচ্ছে।

মৌলবাদী মানস গঠনের নীরব সহায়ক

ইউনেস্কোর ‘Preventing Violent Extremism through Education’ নির্দেশনায় বলা হয়েছে – বৈচিত্র্যপূর্ণসমালোচনামূলক ভাবনার অনুশীলন ও গ্লোবাল সিটিজেনশিপ শেখানো না গেলে শিক্ষাব্যবস্থা উল্টো বহিষ্কারমুখী বিশ্বদৃষ্টিকে জোরদার করতে পারে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেবিদেশি ইতিহাসধর্মতত্ত্ব বা দার্শনিক গ্রন্থের মূল্য বেড়ে যাওয়ায় ছাত্র-যুবাদের পাঠভ্যাস ক্রমে সীমিত হচ্ছে স্থানীয়প্রায়-একঘেয়ে ধারায়সেই শূন্যস্থানে সক্রিয় মৌলবাদী গোষ্ঠী বিনা খরচে অনলাইন পিডিএফলিফলেট বা প্রচারপুস্তিকা সরবরাহ করছে। পরিণামে –

• সমালোচনামুখী পাঠের বদলে একমাত্রিক ব্যাখ্যা জনপ্রিয় হচ্ছে,
• ভিন্নমত ও বৈচিত্র্য সম্পর্কে জানার সুযোগ কমে যাচ্ছে,
• উগ্র বা ষড়যন্ত্রময় বয়ান প্রশ্নহীনভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক মৌলবাদী হামলা-সংক্রান্ত গবেষণাতেও (যেমন অধ্যাপক আবুল বারকাতের ‘Fundamentalism in Bangladesh’) দেখা যায়, “সীমিত পাঠ-বাস্তবতা ও গুরুভক্তি নির্ভর ব্যাখ্যা-শিক্ষা মৌলবাদকে পুষ্ট করে”—যা বহুমূল্য বিদেশি বই সহজলভ্য না হলে আরও ঘনীভূত হয়।

জনপ্রিয় সংবাদ

স্কুলে সহিংসতা ঠেকাতে আগে বদলাতে হবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি

আন্তর্জাতিক বই আমদানিতে শুল্কারোপ: জ্ঞানের দরজায় দেয়াল, খুলছে কি?

০৪:৩৬:১৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ জুলাই ২০২৫

উঁচু শুল্কের বাস্তবত

বাংলাদেশের জাতীয় শুল্ক তালিকা (২০২৪-২৫ অর্থবছর) অনুযায়ী ‘Printed Books, Brochures, Leaflets’ (এইচএস ৪৯০১১০০০) আমদানিতে মোট করভার পৌঁছেছে ৭৩.৯৬ শতাংশএর মধ্যে কাস্টমস ডিউটি ২৫%সম্পূরক শুল্ক ১০%ভ্যাট ১৫%অগ্রিম আয়কর ৫%-সহ একাধিক স্তরের কর ধরা রয়েছে। তুলনামূলকভাবে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা-সংক্রান্ত লাইনে (এইচএস ৪৯০১৯৯১০) করভার মাত্র ১০% রাখা হলেও সাধারণ পাঠকের হাতে পৌঁছাতে হয় যে ‘Other books’ শাখাসেখানে মোট করভার ১৫.২৫% থেকে ৩৯.৪০% পর্যন্ত।

কতটা প্রভাব পড়ছে বাজারে?

• সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD)-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ বলছে৭৩.৯৬% মোট করভার বইয়ের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে গড়ে দ্বিগুণেরও বেশিযা SDG-৪ (সবার জন্য গুণগত শিক্ষা) অর্জনে বড় বাধা সৃষ্টি করছে।

• ২০২৪-এর বাজেট বিশ্লেষণেও একই হার উল্লেখ করে সতর্ক করা হয়েছে যে উচ্চ শুল্ক বই ক্রয়ে মধ্যবিত্ত পরিবারের উপর অতিরিক্ত চাপ’ তৈরি করছে।

• ঢাকার শীর্ষস্থানীয় প্রকাশকদের সঙ্গে কথা বলে মতে ২০২৩-এ বিক্রি ১৫-৩৫% কমে গেছেক্রেতারা আনন্দদায়ক বা অনুবাদ সাহিত্য থেকে সরে যাচ্ছেন। ২০২৪-২৫ এই হার আরো বেশি

সীমিত সম্ভাবনাবিস্তৃত ক্ষতি

মূল্যস্ফীতি বনাম পাঠকবৃত্ত

উচ্চ কাগজ-দাম ও ডলার সংকটের সঙ্গে ৭৪%-এর কাছাকাছি শুল্ক বইয়ের চূড়ান্ত মূল্য বাড়িয়ে দিচ্ছে প্রায় ১.৮ গুণ। এর ফলে আন্তর্জাতিক গবেষণাদার্শনিক বা সমসাময়িক সাহিত্যের অনুবাদসবই সীমিত সার্কেলে আটকে যাচ্ছে।

প্রকাশক-বই ব্যবসায়ীদের টিকে থাকার লড়াই

অগ্রিম আয়কর (AIT) ও সারচার্জ দিতে গিয়ে বই আমদানিকারকের কমিশন মার্জিন নেমে এসেছে ৩-৫%-এ (পূর্বের গড় ১০-১২% থেকে)। অনেক বাণিজ্যিক প্রকাশক এখন বিদেশি শিরোনাম আনতে দ্বিধায় পড়ছেনফলে বাজারে অননুমোদিত পিডিএফ বা পাইরেটেড সংস্করণ বেড়েছে – রাজস্ব যেমন হারাচ্ছেতেমনি লেখক-অনুবাদকরাও ন্যায্য সম্মানী থেকে বঞ্চিত।

পাঠক-শিক্ষকদের সীমিত রেফারেন্স

ইংলিশ-মিডিয়াম স্কুলে বিদেশি টেক্সট-বইয়ের ওপরই করভার ৭৩.৯৬%। বিদ্যালয়গুলো বলছেবই প্রতি গড় বাড়তি ব্যয় ৩০-৪০% – ফলে গার্ডিয়ানদের ফি বাড়ছেআর অনেক স্কুল পুরনো সংস্করণ বা ফটোকপি দিয়ে চালাচ্ছে।

মৌলবাদী মানস গঠনের নীরব সহায়ক

ইউনেস্কোর ‘Preventing Violent Extremism through Education’ নির্দেশনায় বলা হয়েছে – বৈচিত্র্যপূর্ণসমালোচনামূলক ভাবনার অনুশীলন ও গ্লোবাল সিটিজেনশিপ শেখানো না গেলে শিক্ষাব্যবস্থা উল্টো বহিষ্কারমুখী বিশ্বদৃষ্টিকে জোরদার করতে পারে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেবিদেশি ইতিহাসধর্মতত্ত্ব বা দার্শনিক গ্রন্থের মূল্য বেড়ে যাওয়ায় ছাত্র-যুবাদের পাঠভ্যাস ক্রমে সীমিত হচ্ছে স্থানীয়প্রায়-একঘেয়ে ধারায়সেই শূন্যস্থানে সক্রিয় মৌলবাদী গোষ্ঠী বিনা খরচে অনলাইন পিডিএফলিফলেট বা প্রচারপুস্তিকা সরবরাহ করছে। পরিণামে –

• সমালোচনামুখী পাঠের বদলে একমাত্রিক ব্যাখ্যা জনপ্রিয় হচ্ছে,
• ভিন্নমত ও বৈচিত্র্য সম্পর্কে জানার সুযোগ কমে যাচ্ছে,
• উগ্র বা ষড়যন্ত্রময় বয়ান প্রশ্নহীনভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক মৌলবাদী হামলা-সংক্রান্ত গবেষণাতেও (যেমন অধ্যাপক আবুল বারকাতের ‘Fundamentalism in Bangladesh’) দেখা যায়, “সীমিত পাঠ-বাস্তবতা ও গুরুভক্তি নির্ভর ব্যাখ্যা-শিক্ষা মৌলবাদকে পুষ্ট করে”—যা বহুমূল্য বিদেশি বই সহজলভ্য না হলে আরও ঘনীভূত হয়।