০৬:১৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫
দ্বিতীয় ঝড়ের মুখে ফিলিপাইনের পূর্বাঞ্চল, নতুন করে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ মুক্তিযুদ্ধকে খাটো করার অপচেষ্টা ও অন্তবর্তী সরকারের ভূমিকা পরিচালক রব রেইনার ও স্ত্রী’র মৃত্যু: ‘সম্ভাব্য হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে তদন্ত শুরু সিক্রেট সান্তা উপহারে নতুন ধারা: ছোট, ব্যবহারযোগ্য, ‘গুড এনাফ’ পছন্দ সাবেক জাপানি প্রতিরক্ষা প্রধানকে ঘিরে চীনের ‘কাউন্টারমেজার’, টোকিওতে নিরাপত্তা বিতর্ক আরও তীব্র নতুন ভূরাজনৈতিক দাবার ছক এআই ইমেজ জেনারেটর ‘খারাপ’ হয়েই কীভাবে আরও কার্যকর হচ্ছে বৃষ্টিবিঘ্নিত অনূর্ধ্ব-১৯ এশিয়া কাপে ভারতের কাছে ৯০ রানে হার পাকিস্তানের সিডনির বন্ডি বিচে হনুকা অনুষ্ঠানে হামলা, সন্ত্রাস তদন্তে নিরাপত্তা জোরদার কানাডায় ‘টার্গেটেড’ হামলায় পাঞ্জাবের দুই যুবক গুলিতে নিহত

হলি আর্টিজান জঙ্গি হামলায় নিহত ইতালীয় নাগরিকদের পরিচয়, শোক, আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে ঢাকার গুলশান-২ নম্বর এলাকার অভিজাত হলি আর্টিজান বেকারিতে ভয়াবহ জঙ্গি হামলা হয়। ১২ ঘণ্টার নজিরবিহীন জিম্মি সংকট শেষে ‘থান্ডারবোল্ট’ অভিযানের মাধ্যমে সেনা কমান্ডোরা জিম্মিদের উদ্ধার করেন। এ ঘটনায় ১৭ বিদেশিসহ ২০ জন সাধারণ মানুষ নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ৯ জন ছিলেন ইতালীয় নাগরিক—যাদের হত্যাকাণ্ড শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বকে কাঁদিয়েছিল।

ইতালীয় নিহতদের পরিচয় ও সংক্ষিপ্ত প্রোফাইল

১. ক্লাউডিয়া মারিয়া ডিআন্তোনা (Claudia Maria D’Antona)
• বয়স: ৫৬
• পেশা: টেক্সটাইল কোম্পানির ঢাকাস্থ প্রতিনিধি
• পরিবার: স্বামী ক্রিশ্চিয়ানো ডি’আন্তোনা, যিনি হামলার সময় প্রাণে বেঁচে যান
• পরিচিতি: বাংলাদেশে ২০ বছরের বেশি কাজের অভিজ্ঞতা; অত্যন্ত পেশাদার ও সবার প্রিয়।

২. ক্রিস্তিয়ান রোসি (Cristian Rossi)
• বয়স: ৪৭
• পেশা: টেক্সটাইল ব্যবসায়ী
• পরিবার: স্ত্রী ও দুটি কন্যাসন্তান
• পরিচিতি: মোদেনা থেকে আসা; সৎ, মৃদুভাষী, দায়বদ্ধ বাবা।

 

৩. মারিয়া রিভোলতা (Maria Rivolta)
• বয়স: ৩৪
• পেশা: ব্যবসায় প্রতিনিধি
• পরিবার: অবিবাহিত
• পরিচিতি: তরুণ, দক্ষ, সাহসী; কাজের প্রতি ভীষণ নিষ্ঠাবান।

৪. আদেলে পুগলিসি (Adele Puglisi)
• বয়স: ৫৪
• পেশা: টেক্সটাইল ক্রেতা
• পরিচিতি: সিসিলির বাসিন্দা; স্থানীয়দের সঙ্গে দারুণ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন।

৫. নাদিয়া বেনেদেত্তি (Nadia Benedetti)
• বয়স: ৫২
• পেশা: টেক্সটাইল ব্যবসায়ী
• পরিবার: ইতালিতে স্বামী-সন্তান
• পরিচিতি: সদা হাসিখুশি; বহু বছর ধরে বাংলাদেশে ব্যবসা করতেন।

৬. ভিনসেনজো ডিঅ্যালেস্ত্রো (Vincenzo D’Allestro)
• বয়স: ৪৬
• পেশা: টেক্সটাইল ক্রেতা
• পরিচিতি: ইতালিতে বাংলাদেশের পোশাক খাতের পরিচিত মুখ।

৭. সিমোনা মন্টি (Simona Monti)
• বয়স: ৩৩
• পেশা: গার্মেন্ট ক্রেতা
• পরিচিতি: সন্তানসম্ভবা ছিলেন; দুই সপ্তাহ পর দেশে ফিরে সন্তান জন্মদানের কথা ছিল।

৮. মার্কো টন্ডাত (Marco Tondat)
• বয়স: ৩৯
• পেশা: টেক্সটাইল ক্রেতা
• পরিচিতি: ফ্রিউলির বাসিন্দা; বন্ধুবৎসল, প্রাণোচ্ছল।

৯. ক্লদিও কাপেল্লি (Claudio Cappelli)
• বয়স: ৪৫
• পেশা: টেক্সটাইল ব্যবসায়ী
• পরিচিতি: শ্রমজীবী পিতার সন্তান; ব্যবসার সুবাদে বাংলাদেশে নিয়মিত আসতেন।

পরিবার ও স্বজনদের মন্তব্য

  • ক্লাউডিয়া ডি’আন্তোনার স্বামী ক্রিশ্চিয়ানো বলেন, “বাংলাদেশ আমাদের দ্বিতীয় বাড়ি ছিল। ওরা সন্ত্রাসের শিকার হয়েছে,মানুষ হিসেবে নয়।”
    • সিমোনা মন্টির বাবা বলেন, “আমার মেয়ে মা হতে যাচ্ছিল। সন্ত্রাসীরা আমার নাতিরও প্রাণ নিয়েছে।”
    • নাদিয়া বেনেদেত্তির ভাই বলেন, “ও নিঃশর্ত ভালোবাসা ছড়িয়ে দিত। বাংলাদেশ ওর দ্বিতীয় বাড়ি হয়ে উঠেছিল।”

আন্তর্জাতিক মিডিয়ার শোক ও প্রতিবেদন

  • BBCলিখেছিল:“Nine Italians who were among the 20 victims in Dhaka’s worst terrorist attack were targeted for being foreigners in a venue popular with diplomats.”
    • The Guardian বলেছিল: “The Italian textile industry lost experts who spent decades building ties in Bangladesh’s garment boom.”
    • La Repubblica (ইতালি): “Un massacro di innocenti, lavoratori che volevano solo costruire ponti tra i mondi.” (একটি নিষ্পাপ হত্যাকাণ্ড—যারা কেবল দুই বিশ্বের মধ্যে সেতু গড়তে চেয়েছিল।

বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া ও সম্মান

  • ঘটনার পরপরই বাংলাদেশ সরকার নিহতদের স্মরণে আনুষ্ঠানিক শোক প্রকাশ করে।
    •প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্যক্তিগতভাবে ইতালির প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করে সমবেদনা জানান।
    • সরকার ঢাকায় ইতালীয় দূতাবাসের সঙ্গে সমন্বয় করে নিহতদের মরদেহ দ্রুত ইতালিতে পাঠায়।
    • ২০১৭ সালে গুলশান-২–এর সেই স্থানে নিহতদের নামে স্থাপিত স্মৃতিফলক উদ্বোধন করা হয়, যাতে ইতালীয় নাগরিকদের নাম উল্লিখিত।

এই বছরের (২০২৫) মৃত্যুবার্ষিকী পালন

  • ১ জুলাই ২০২৫-এ ঢাকায় ইতালীয় দূতাবাসে এক শোকানুষ্ঠান হয়।
    •বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি ও ঢাকাস্থ ডিএমপির কর্মকর্তারা পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন।
    • গুলশানের পুনর্গঠিত সেই স্থানটি এখনও এক শান্ত, নীরব উদ্যান হিসেবে সংরক্ষিত; বিদেশি নাগরিকরা সেখানে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে যান।

হলি আর্টিজান হামলা শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, সমগ্র বিশ্বের কাছে জঙ্গি সন্ত্রাসের নির্মমতা ও ঘৃণার এক প্রতীক হয়ে আছে। এই হামলায় ইতালীয় নাগরিকদের মৃত্যু বিশেষ করে হৃদয়বিদারক, কারণ তারা ছিলেন বন্ধুপ্রতিম মানুষ, যারা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছিলেন। তাঁদের স্মৃতি আমাদের সহনশীলতা, শান্তি ও মানবতার পক্ষে দাঁড়াতে প্রেরণা দেয়।

জনপ্রিয় সংবাদ

দ্বিতীয় ঝড়ের মুখে ফিলিপাইনের পূর্বাঞ্চল, নতুন করে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ

হলি আর্টিজান জঙ্গি হামলায় নিহত ইতালীয় নাগরিকদের পরিচয়, শোক, আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

০৫:০০:৩৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ৫ জুলাই ২০২৫

২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে ঢাকার গুলশান-২ নম্বর এলাকার অভিজাত হলি আর্টিজান বেকারিতে ভয়াবহ জঙ্গি হামলা হয়। ১২ ঘণ্টার নজিরবিহীন জিম্মি সংকট শেষে ‘থান্ডারবোল্ট’ অভিযানের মাধ্যমে সেনা কমান্ডোরা জিম্মিদের উদ্ধার করেন। এ ঘটনায় ১৭ বিদেশিসহ ২০ জন সাধারণ মানুষ নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ৯ জন ছিলেন ইতালীয় নাগরিক—যাদের হত্যাকাণ্ড শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বকে কাঁদিয়েছিল।

ইতালীয় নিহতদের পরিচয় ও সংক্ষিপ্ত প্রোফাইল

১. ক্লাউডিয়া মারিয়া ডিআন্তোনা (Claudia Maria D’Antona)
• বয়স: ৫৬
• পেশা: টেক্সটাইল কোম্পানির ঢাকাস্থ প্রতিনিধি
• পরিবার: স্বামী ক্রিশ্চিয়ানো ডি’আন্তোনা, যিনি হামলার সময় প্রাণে বেঁচে যান
• পরিচিতি: বাংলাদেশে ২০ বছরের বেশি কাজের অভিজ্ঞতা; অত্যন্ত পেশাদার ও সবার প্রিয়।

২. ক্রিস্তিয়ান রোসি (Cristian Rossi)
• বয়স: ৪৭
• পেশা: টেক্সটাইল ব্যবসায়ী
• পরিবার: স্ত্রী ও দুটি কন্যাসন্তান
• পরিচিতি: মোদেনা থেকে আসা; সৎ, মৃদুভাষী, দায়বদ্ধ বাবা।

 

৩. মারিয়া রিভোলতা (Maria Rivolta)
• বয়স: ৩৪
• পেশা: ব্যবসায় প্রতিনিধি
• পরিবার: অবিবাহিত
• পরিচিতি: তরুণ, দক্ষ, সাহসী; কাজের প্রতি ভীষণ নিষ্ঠাবান।

৪. আদেলে পুগলিসি (Adele Puglisi)
• বয়স: ৫৪
• পেশা: টেক্সটাইল ক্রেতা
• পরিচিতি: সিসিলির বাসিন্দা; স্থানীয়দের সঙ্গে দারুণ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন।

৫. নাদিয়া বেনেদেত্তি (Nadia Benedetti)
• বয়স: ৫২
• পেশা: টেক্সটাইল ব্যবসায়ী
• পরিবার: ইতালিতে স্বামী-সন্তান
• পরিচিতি: সদা হাসিখুশি; বহু বছর ধরে বাংলাদেশে ব্যবসা করতেন।

৬. ভিনসেনজো ডিঅ্যালেস্ত্রো (Vincenzo D’Allestro)
• বয়স: ৪৬
• পেশা: টেক্সটাইল ক্রেতা
• পরিচিতি: ইতালিতে বাংলাদেশের পোশাক খাতের পরিচিত মুখ।

৭. সিমোনা মন্টি (Simona Monti)
• বয়স: ৩৩
• পেশা: গার্মেন্ট ক্রেতা
• পরিচিতি: সন্তানসম্ভবা ছিলেন; দুই সপ্তাহ পর দেশে ফিরে সন্তান জন্মদানের কথা ছিল।

৮. মার্কো টন্ডাত (Marco Tondat)
• বয়স: ৩৯
• পেশা: টেক্সটাইল ক্রেতা
• পরিচিতি: ফ্রিউলির বাসিন্দা; বন্ধুবৎসল, প্রাণোচ্ছল।

৯. ক্লদিও কাপেল্লি (Claudio Cappelli)
• বয়স: ৪৫
• পেশা: টেক্সটাইল ব্যবসায়ী
• পরিচিতি: শ্রমজীবী পিতার সন্তান; ব্যবসার সুবাদে বাংলাদেশে নিয়মিত আসতেন।

পরিবার ও স্বজনদের মন্তব্য

  • ক্লাউডিয়া ডি’আন্তোনার স্বামী ক্রিশ্চিয়ানো বলেন, “বাংলাদেশ আমাদের দ্বিতীয় বাড়ি ছিল। ওরা সন্ত্রাসের শিকার হয়েছে,মানুষ হিসেবে নয়।”
    • সিমোনা মন্টির বাবা বলেন, “আমার মেয়ে মা হতে যাচ্ছিল। সন্ত্রাসীরা আমার নাতিরও প্রাণ নিয়েছে।”
    • নাদিয়া বেনেদেত্তির ভাই বলেন, “ও নিঃশর্ত ভালোবাসা ছড়িয়ে দিত। বাংলাদেশ ওর দ্বিতীয় বাড়ি হয়ে উঠেছিল।”

আন্তর্জাতিক মিডিয়ার শোক ও প্রতিবেদন

  • BBCলিখেছিল:“Nine Italians who were among the 20 victims in Dhaka’s worst terrorist attack were targeted for being foreigners in a venue popular with diplomats.”
    • The Guardian বলেছিল: “The Italian textile industry lost experts who spent decades building ties in Bangladesh’s garment boom.”
    • La Repubblica (ইতালি): “Un massacro di innocenti, lavoratori che volevano solo costruire ponti tra i mondi.” (একটি নিষ্পাপ হত্যাকাণ্ড—যারা কেবল দুই বিশ্বের মধ্যে সেতু গড়তে চেয়েছিল।

বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া ও সম্মান

  • ঘটনার পরপরই বাংলাদেশ সরকার নিহতদের স্মরণে আনুষ্ঠানিক শোক প্রকাশ করে।
    •প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্যক্তিগতভাবে ইতালির প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করে সমবেদনা জানান।
    • সরকার ঢাকায় ইতালীয় দূতাবাসের সঙ্গে সমন্বয় করে নিহতদের মরদেহ দ্রুত ইতালিতে পাঠায়।
    • ২০১৭ সালে গুলশান-২–এর সেই স্থানে নিহতদের নামে স্থাপিত স্মৃতিফলক উদ্বোধন করা হয়, যাতে ইতালীয় নাগরিকদের নাম উল্লিখিত।

এই বছরের (২০২৫) মৃত্যুবার্ষিকী পালন

  • ১ জুলাই ২০২৫-এ ঢাকায় ইতালীয় দূতাবাসে এক শোকানুষ্ঠান হয়।
    •বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি ও ঢাকাস্থ ডিএমপির কর্মকর্তারা পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন।
    • গুলশানের পুনর্গঠিত সেই স্থানটি এখনও এক শান্ত, নীরব উদ্যান হিসেবে সংরক্ষিত; বিদেশি নাগরিকরা সেখানে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে যান।

হলি আর্টিজান হামলা শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, সমগ্র বিশ্বের কাছে জঙ্গি সন্ত্রাসের নির্মমতা ও ঘৃণার এক প্রতীক হয়ে আছে। এই হামলায় ইতালীয় নাগরিকদের মৃত্যু বিশেষ করে হৃদয়বিদারক, কারণ তারা ছিলেন বন্ধুপ্রতিম মানুষ, যারা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছিলেন। তাঁদের স্মৃতি আমাদের সহনশীলতা, শান্তি ও মানবতার পক্ষে দাঁড়াতে প্রেরণা দেয়।