ডলার নিয়ে বিতর্ক
মার্কিন ডলারকে ঘিরে আলোচনা প্রায়শই জটিল ও বিমূর্ত হয়ে ওঠে। অনেক সময় এটিকে শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে রাখা নোট হিসেবে দেখা হয়, যা যুক্তরাষ্ট্রকে অতিরিক্ত অর্থনৈতিক ক্ষমতা দেয় বলে মনে করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা আরও গভীর—বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতায় ডলারের ভবিষ্যৎ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।
ট্রাম্পের শুল্কনীতি ও ডলারের অস্বাভাবিক আচরণ
২০২৫ সালের ২ এপ্রিল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আমদানি পণ্যে ব্যাপক শুল্ক আরোপ করেন। অর্থনীতির পাঠ্যবই বলছে, এতে ডলার শক্তিশালী হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে ডলার উল্টো ৮ শতাংশ পড়ে যায় এবং শেয়ারবাজার, বন্ডবাজার একসঙ্গে পতনের মুখে পড়ে—যা সাধারণত উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোতে ঘটে। এতে বিনিয়োগকারীদের আতঙ্ক বাড়ে।
রগফের বিশ্লেষণ: ‘Our Dollar, Your Problem’
আইএমএফ–এর সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ কেনেথ রগফ তাঁর নতুন বইয়ে দেখিয়েছেন, ডলার আধিপত্য যুক্তরাষ্ট্রকে সুদ কমাতে, বিনিয়োগ বাড়াতে এবং সঙ্কটকালে সহজে ঋণ নিতে সহায়তা করে। পাশাপাশি এটি যুক্তরাষ্ট্রকে নিষেধাজ্ঞার শক্তিশালী অস্ত্রও দেয়। তবে রগফের মতে, ডলারের ধীরে ধীরে পতন অবশ্যম্ভাবী, যদিও এটি এখনও আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থার কেন্দ্রেই থাকবে।
ডলারের ইতিহাস: ব্রেটন উডস থেকে আজ
১৯৪৪ সালে ব্রেটন উডস চুক্তিতে ডলারকে স্বর্ণের সঙ্গে বাঁধা হয় এবং বিশ্ব মুদ্রা হিসেবে গড়ে ওঠে। ১৯৭১ সালে প্রেসিডেন্ট নিক্সন স্বর্ণ–ভিত্তিক ব্যবস্থা শেষ করেন। এরপরও ডলার আন্তর্জাতিক অর্থনীতির কেন্দ্র হয়ে থাকে। আজও বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের প্রায় ৫৯ শতাংশ ডলারভিত্তিক, যদিও ২০০০ সালে এ হার ছিল ৭০ শতাংশের ওপরে।
আন্তর্জাতিক লেনদেনে ডলারের ভূমিকা
ডলার কেবল রিজার্ভ মুদ্রা নয়, এটি বিশ্বব্যাপী আর্থিক লেনদেনের প্রাণশক্তি। বৈশ্বিক রপ্তানির অর্ধেকেরও বেশি এবং বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের ৮৮ শতাংশে ডলার ব্যবহৃত হয়। নিউইয়র্কের ব্যাংক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এসব লেনদেন সম্পন্ন হয়। প্রতিদিন প্রায় ৫ ট্রিলিয়ন ডলার মুদ্রা ও ১ ট্রিলিয়ন ডলার মার্কিন ট্রেজারি বন্ড লেনদেন হয়।
প্রতিদ্বন্দ্বী মুদ্রার সীমাবদ্ধতা
ইয়েন, ইউরো বা চীনা ইউয়ান—কোনোটিই ডলারের বিকল্প হতে পারছে না। ইউরোর ঋণ সংকট, ইয়েনের সীমিত অর্থনীতি আর ইউয়ানের ওপর কড়া নিয়ন্ত্রণ একে বিশ্বমুদ্রা হতে বাধা দিচ্ছে। ফলে ডলার এখনও অপরাজেয়।
ডলারের সুবিধা: ‘Exorbitant Privilege’
ডলার আধিপত্য যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার প্রায় ০.৫ শতাংশ কম রাখে, যা বছরে প্রায় ১৮৫ বিলিয়ন ডলারের সাশ্রয়। পাশাপাশি সঙ্কটকালে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার সুযোগও তৈরি করে। এই সুবিধা যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপির প্রায় ১ শতাংশ সমান।
নিষেধাজ্ঞার অস্ত্র হিসেবে ডলার
ডলার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ইরান, রাশিয়া ও চীনের বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। ২০২২ সালে ইউক্রেন আক্রমণের পর রাশিয়ার ৩০০ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ জব্দ করা হয়। তবে রাশিয়া বিকল্প বাণিজ্য পথ খুঁজে নেয়, যা প্রমাণ করে ডলারের নিষেধাজ্ঞার ক্ষমতা কিছুটা ক্ষয় হচ্ছে।
চীনের প্রচেষ্টা ও সীমাবদ্ধতা
চীন নিজস্ব পেমেন্ট সিস্টেম (CIPS) চালু করেছে এবং বেশি বাণিজ্য ইউয়ানে করার চেষ্টা করছে। তবে ইউয়ানের আন্তর্জাতিক ব্যবহার মাত্র ৪.৫ শতাংশে আটকে আছে। পূর্ণ বিকল্প হতে হলে চীনকে মূলধন নিয়ন্ত্রণ শিথিল করতে হবে, যা আপাতত অসম্ভব।
ইউরোর সম্ভাবনা
ট্রাম্পের শুল্কনীতির ফলে ইউরোপ ডলারের বিকল্প গড়ে তুলতে আগ্রহী হয়েছে। ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান ক্রিস্টিন লাগার্দ ইউরোর আন্তর্জাতিক ব্যবহার বাড়াতে জোর দিচ্ছেন। এমনকি যৌথ ইউরোপীয় ঋণপত্র চালুর প্রস্তাবও সামনে এসেছে। তবে বাস্তবে এ পথে যেতে সময় লাগবে।
ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ডিজিটাল মুদ্রা
ক্রিপ্টোকারেন্সি মূলত আন্ডারগ্রাউন্ড অর্থনীতিতে কাজে লাগছে। স্থিতিশীল ডিজিটাল মুদ্রা বা সেন্ট্রাল ব্যাংক ডিজিটাল কারেন্সি কিছুটা কার্যকর হতে পারে, কিন্তু জাতীয় মুদ্রার ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এগুলো ডলারের বিকল্প নয়।
আসল ঝুঁকি: যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই
ডলারের সবচেয়ে বড় হুমকি বাইরের নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরের অস্থিরতা। ঋণের বোঝা, লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতি এবং ফেডারেল রিজার্ভের স্বাধীনতা হ্রাস—এসব ডলারের প্রতি আস্থা কমাতে পারে। ট্রাম্পের নীতিগত চাপ এবং তথ্য বিকৃতির অভিযোগ এ ঝুঁকিকে বাড়িয়ে দিয়েছে।
ডলারের আধিপত্য বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্রে রয়ে গেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র যদি ভেতর থেকে ভুল পদক্ষেপ নেয়, তবে এ অবস্থান দুর্বল হতে পারে। অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং আইনের শাসন ধরে রাখা ছাড়া ডলারের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত নয়। যেমন বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন গণতন্ত্র নিয়ে বলেছিলেন—ডলার আধিপত্যও থাকবে, যদি যুক্তরাষ্ট্র তা ধরে রাখতে পারে।
ডলারের ভবিষ্যৎ
-
সারাক্ষণ রিপোর্ট - ০২:১৬:৫৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৫
- 227
জনপ্রিয় সংবাদ
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















