এআই অবতার নিয়ে অভিনেতাদের দ্বিধা
মার্কিন অভিনেতা স্কট জ্যাকমেইনসহ একদল শিল্পী টিকটকের কাছে নিজেদের চেহারা ব্যবহারের লাইসেন্স বিক্রি করেছিলেন। কিন্তু পরে তাঁরা দেখেন, তাঁদের “ডিজিটাল অবতার” বিভিন্ন বিজ্ঞাপনে ব্যবহার হচ্ছে—যার মধ্যে কিছু একেবারেই তাঁদের ব্যক্তিগত সত্তা ও অভ্যাসের সঙ্গে মেলে না। জ্যাকমেইনের অবতারকে দেখা গেছে স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলতে, যদিও তিনি ভাষাটি জানেন না।
জ্যাকমেইন বলেন, তিনি মূলত টিকটকের মতো একটি বড় প্ল্যাটফর্মে কাজের সুযোগ পেয়ে আনন্দিত হয়েছিলেন, কিন্তু এখন আফসোস হচ্ছে। তাঁর মতে, প্রযুক্তি যত দ্রুত এগোচ্ছে, ততই অভিনেতাদের নিজেদের ইমেজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাচ্ছে।
টিকটকের এআই বিজ্ঞাপন কৌশল
টিকটক গত বছর বিজ্ঞাপনে ব্যবহারের জন্য এআই অবতারের সুযোগ চালু করে। ছোট ব্যবসাগুলো বিশেষভাবে উপকৃত হচ্ছে, কারণ এটি সময় ও অর্থ সাশ্রয় করে। টিকটকের বিজ্ঞাপন টুলে বর্তমানে বয়স, লিঙ্গ বা জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে বিভিন্ন ধরনের অবতার বেছে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
কানস-এ অনুষ্ঠিত বিজ্ঞাপন সম্মেলনে কোম্পানিটি জানায়, এআই অবতার ছোট ব্যবসার কাছে বিশেষভাবে আকর্ষণীয়। কারণ এতে পেশাদার অভিনেতার প্রয়োজন হয় না, বিজ্ঞাপন তৈরি সহজ ও দ্রুত হয়।

স্বল্প পারিশ্রমিকে বিক্রি হওয়া চেহারা
অনেক অভিনেতা তুলনামূলক কম পারিশ্রমিক পেয়েছেন। জ্যাকমেইনকে দেওয়া হয়েছিল মাত্র ৭৫০ ডলার ও বে এরিয়ায় একটি সফরের খরচ। অন্যদের মধ্যে কেউ কেউ ৫০০ ডলার থেকে এক হাজার ডলারেরও কম পেয়েছেন। এমনকি এক অভিনেতা দাবি করেছেন, তাঁর অবতারকে এমন বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করা হয়েছে যা তাঁকে বিব্রত করেছে।
তাদের চুক্তিতে রয়্যালটির কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। ফলে বিজ্ঞাপন যতবারই ব্যবহার করা হোক না কেন, তারা এককালীন অল্প টাকা ছাড়া আর কিছুই পান না।
আইনগত ও নৈতিক দোটানা
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অবতারের ব্যবহার ভবিষ্যতে নানা জটিল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। কারও অবতার এমন পণ্য প্রচার করতে পারে, যা তিনি ঘৃণা করেন, বা এমন রাজনৈতিক বার্তা দিতে পারে, যা তাঁর ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিরুদ্ধে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁদের আইনি লড়াইয়ের সুযোগ সীমিত।
টিকটকের বাইরে ছড়িয়ে পড়া বিজ্ঞাপন
অভিনেতারা ভেবেছিলেন তাঁদের অবতার শুধু টিকটকেই ব্যবহার হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, এগুলো ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম এমনকি ইউটিউবেও ছড়িয়ে পড়েছে। জ্যাকমেইন জানান, তাঁর অবতারকে এক পর্যায়ে পুরুষদের জন্য তথাকথিত স্বাস্থ্যসাপ্লিমেন্টের বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করা হয়, যা টিকটকের নীতিরও লঙ্ঘন ছিল।

অন্য প্ল্যাটফর্মেও এআই অবতার
শুধু টিকটক নয়, গুগল, ভোগসহ বড় প্রযুক্তি ও মিডিয়া প্রতিষ্ঠানগুলোও এখন বিজ্ঞাপনে এআই অবতার ব্যবহার করছে। এতে ভ্রমণ, শুটিং বা প্রোডাকশনের খরচ কমছে। কিন্তু এতে বাস্তব অভিনেতাদের কাজের সুযোগও কমে যাচ্ছে।
শিল্পীদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া
কিছু শিল্পী বিষয়টিকে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছেন। যেমন ট্রেসি ফেটার বলেন, তাঁর চিত্রকর্ম বহুবার প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো অনুমতি ছাড়াই ব্যবহার করেছে। তাই টিকটক থেকে অল্প হলেও টাকা পাওয়া ভালো। তবে অনেকে বিষয়টিকে “কিছুটা ভয়ের” বা “অস্বস্তিকর” বলে মনে করছেন।
উপসংহার
এআই প্রযুক্তি দ্রুত বিজ্ঞাপনের জগতে পরিবর্তন আনছে। ব্যবসার খরচ কমছে, কিন্তু শিল্পীরা তাঁদের পরিচয় ও সত্তা হারাচ্ছেন। অভিনেতাদের জন্য এটি এক অনিশ্চিত ও দ্বিধাজনক সময়, যেখানে তাদেরকে স্বল্প অর্থে নিজেদের ডিজিটাল রূপ বিক্রি করতে হচ্ছে।
প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, ততই প্রশ্ন জাগছে—মানুষ কি নিজের চেহারার উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারবে, নাকি তা হয়ে উঠবে কেবল একেকটি কোম্পানির বিজ্ঞাপন সামগ্রী?
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















