দীর্ঘদিনের স্থবির আইন ফের আলোচনায়
দক্ষিণ কোরিয়ার বহুল আলোচিত বৈষম্যবিরোধী বিল আবারও জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং-এর লিঙ্গ সমতা মন্ত্রী পদে মনোনীত উন মিন-কিয়ং এই আইন পাসকে নিজের অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছেন।
২০০৭ সালে রো মূ-হিউন সরকারের সময় প্রথম প্রস্তাবিত এই বিলের লক্ষ্য ছিল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে আইনি জবাবদিহির আওতায় আনা, যাতে তারা লিঙ্গ, অক্ষমতা, বয়স, জাতিগত উৎস, বর্ণ, শারীরিক অবস্থা বা যৌন অভিমুখিতা নিয়ে বৈষম্যমূলক মন্তব্য বা সিদ্ধান্ত নিতে না পারে। বিলটি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উভয় প্রকার বৈষম্যকেই নিষিদ্ধ করে এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে শাস্তিমূলক ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা রাখে।
ধর্মীয় গোষ্ঠীর আপত্তি ও বিতর্ক
প্রায় দুই দশক ধরে বিলটি বিশেষ করে যৌন অভিমুখিতাকে অন্তর্ভুক্ত করার কারণে তীব্র বাধার সম্মুখীন হয়েছে। রক্ষণশীল ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো মনে করে, এটি তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ করবে এবং সমকামিতাকে কার্যত সমর্থন দেবে। ফলে বারবার এ নিয়ে তীব্র বিতর্কের কারণে আইনটি পাস আটকে যায়।

উন মিন-কিয়ং-এর বক্তব্য
আগস্ট ১৮ তারিখে অনুষ্ঠিত নিজের মনোনয়ন শুনানিতে উন মিন-কিয়ং বলেন, “সমাজের সব মানুষের অন্যায় বৈষম্যের বিরুদ্ধে সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য এ আইন অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে দুর্বল জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার রক্ষার জন্য এটি অপরিহার্য।”
তিনি আরও বলেন, এ নিয়ে ভুল ধারণা থাকতে পারে, তবে সংবিধান যে মৌলিক অধিকার নিশ্চয়তা দেয়, সেই দৃষ্টিকোণ থেকে আইনটি পুনর্বিবেচনা করা উচিত। তার মতে, “কারও প্রতি বৈষম্য করে সমাজের অন্য কেউ সুখী হয় না।”
বিদ্যমান আইন ও সীমাবদ্ধতা
বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ায় খণ্ড খণ্ড সেক্টরভিত্তিক কিছু আইন রয়েছে, যেগুলো রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বৈষম্য নিষিদ্ধ করে। তবে সেগুলো সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। ফলে একটি সর্বাত্মক বৈষম্যবিরোধী আইনের দাবি দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে।
২০০৭ সালের পর থেকে সাতবার এ ধরনের বিল প্রস্তাবিত হয়েছে, কিন্তু কোনোটিই কার্যকর হয়নি। সবগুলো হয় প্রত্যাহার করা হয়েছে, নয়তো বাতিল হয়েছে।

মানবাধিকার কমিশন ও সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপট
২০২০ সালের জুনে দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এই আইন প্রণয়নের সুপারিশ করে। এরপর ২১তম জাতীয় পরিষদের কয়েকজন সংসদ সদস্য চারটি বিল প্রস্তাব করেন, কিন্তু সেগুলোও মেয়াদ শেষে বাতিল হয়ে যায়।
প্রেসিডেন্ট লি নির্বাচনী প্রচারণার সময় বৈষম্যবিরোধী আইনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলেন। তবে তিনি মে মাসে জানান, আইনটি যদি নতুন করে বিভাজন তৈরি করে এবং সমাজে সংঘাত বাড়ায়, তবে সরকারের অন্যান্য জরুরি কাজ ব্যাহত হতে পারে। তাই এটি সতর্কভাবে প্রয়োগের আহ্বান জানান।
এলজিবিটিকিউ+ অধিকার নিয়ে উত্তেজনা
গত জুন মাসে সিউল কুইয়ার কালচার ফেস্টিভ্যালকে কেন্দ্র করে এলজিবিটিকিউ+ অধিকার নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। টানা তৃতীয়বারের মতো সিউল মেট্রোপলিটন সরকার আয়োজকদের সিউল প্লাজা ব্যবহার করার অনুমতি দেয়নি। তবুও ৩০ হাজার মানুষ উৎসবে যোগ দেন। অন্যদিকে, প্রায় ১৫ হাজার ধর্মীয় গোষ্ঠীর সদস্য পাল্টা সমাবেশ করে সমকামিতার বিরোধিতা করেন।
প্রায় ১৮ বছর ধরে বিলটি স্থগিত রয়েছে। এখন উন মিন-কিয়ং-এর প্রকাশ্য সমর্থন এটিকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। দক্ষিণ কোরিয়া কি সর্বাত্মক বৈষম্যবিরোধী আইন গ্রহণে প্রস্তুত—এ নিয়ে জাতীয় বিতর্ক আবারও তীব্রতর হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















