জেলেনস্কির জন্য নতুন চাপ
গত ফেব্রুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে হোয়াইট হাউস থেকে এক ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে বের করে দেওয়া হয়েছিল। ১৮ আগস্ট তিনি ফেরার পর আশঙ্কা ছিল আরও ভয়াবহ কিছু ঘটতে পারে। কারণ তিন দিন আগেই ডোনাল্ড ট্রাম্প আলাস্কায় ভ্লাদিমির পুতিনকে অভ্যর্থনা দিয়ে বলেছিলেন, তিনি আর যুদ্ধবিরতির জন্য চাপ দেবেন না; বরং একটি পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তির পক্ষে। এতে ইউক্রেনকে দূরবর্তী কিছু অঞ্চল রাশিয়ার হাতে তুলে দিতে হবে, বিনিময়ে পুতিন প্রতিশ্রুতি দেবেন—তৃতীয়বার আর ইউক্রেন আক্রমণ করবেন না।
এই প্রেক্ষাপটে জেলেনস্কির জন্য ট্রাম্প পুতিনের চেয়েও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছেন। কারণ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট যদি চাপ দেন, ইউক্রেন তা প্রতিহত করার ক্ষমতা রাখে না। অনেকে আশঙ্কা করছিলেন, ট্রাম্প হয়তো একতরফা চুক্তি চাপিয়ে দেবেন। সৌভাগ্যক্রমে তা হয়নি। বৈঠকে তিনি ইউক্রেনের নিরাপত্তা নিশ্চয়তার কথাও তুলেছেন।
যুদ্ধক্ষেত্রে অচলাবস্থা
কূটনীতিতে নাটকীয়তা থাকলেও ময়দানে যুদ্ধ চলছে আগের মতোই। দক্ষিণ ও পূর্ব ইউক্রেনে লড়াই থামছে না। প্রতিরাতেই রুশ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র শহরগুলোতে আঘাত হেনে মানুষকে আতঙ্কিত করছে, অর্থনীতি ধ্বংস করছে আর রাজনীতিকে অস্থিতিশীল করছে।
রাশিয়ার সেনা হতাহতের সংখ্যা ইউক্রেনের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি হলেও রাশিয়ার জনবল বিশাল। ইউক্রেন ধীরে ধীরে ভূমি হারালেও তাদের প্রতিরক্ষা লাইন ভাঙা না গেলে পুতিনের কাঙ্ক্ষিত ভূমি দখল অসম্ভব। তার জন্য মাসের পর মাসে হাজার হাজার সৈন্য উৎসর্গ করতে হবে।
ট্রাম্পের অনিশ্চিত কূটনীতি
এই কারণে ট্রাম্পের দ্রুতগতির ও অনিশ্চিত কূটনৈতিক তৎপরতাই ইউক্রেনের জন্য বড় হুমকি। বৈঠকের মাঝপথে তিনি সরাসরি পুতিনকে ফোন করেন। ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, তিনি এখনও এমন এক সমঝোতার স্বপ্ন দেখেন, যা তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কার এনে দিতে পারে। ট্রাম্প চান, জেলেনস্কি দ্রুত পুতিনের সঙ্গে বসুন। যদি ভূমি ছাড়ার দাবি ওঠে, তবে জেলেনস্কি আবারও বিশাল চাপের মুখে পড়বেন।
ইউক্রেন ও ইউরোপের অচলাবস্থা
যদি জেলেনস্কি বা ইউরোপ এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন, ট্রাম্প যেকোনো সময় ইউক্রেনের অস্ত্র ও সামরিক গোয়েন্দা সহায়তা বন্ধ করে দিতে পারেন। তিনি ইউরোপের ওপর শুল্ক আরোপ করতে পারেন কিংবা ন্যাটো থেকে আমেরিকার সমর্থন প্রত্যাহারের হুমকি দিতে পারেন।
ডনবাসের যে অংশ রাশিয়া চায়, সেখানে ২ লাখ ৫০ হাজার মানুষ বসবাস করে। যুদ্ধ থামিয়ে যোগাযোগ লাইনে যুদ্ধবিরতির উদাহরণ আগেও আছে। কিন্তু এ লাইনগুলোই ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা সীমা, যেখানে তারা পরিখা, ‘ড্রাগনস টুথ’ ও দুর্গ স্থাপন করে প্রচুর সম্পদ ব্যয় করেছে। এগুলো হারালে ভবিষ্যতে প্রতিরক্ষা কঠিন হবে এবং পুতিনকে আবার আক্রমণের প্রলোভন জোগাবে।
নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নাকি ভাঁওতা?
ইউক্রেনের কাছে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ছাড় হতে পারে রাশিয়ার দখলে থাকা প্রায় ১৯% ভূখণ্ডকে অনানুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করা। কিন্তু বিনিময়ে কী পাওয়া যাবে? ট্রাম্প ও ইউরোপীয় নেতারা বলছেন, ইউক্রেনকে দেওয়া হবে “নিরাপত্তা নিশ্চয়তা”।
সমস্যা হলো, এর অর্থ অস্পষ্ট। সবচেয়ে শক্তিশালী নিশ্চয়তা হতে পারত পশ্চিমা সেনা সরাসরি রুশ হামলার মোকাবিলা করবে—কিন্তু তা নেই। ইউরোপ একটি “স্বেচ্ছাসেবী জোট” গঠনের চেষ্টা করছে, যারা ইউক্রেনে অবস্থান নেবে। কিন্তু এ বাহিনী রাশিয়ার সঙ্গে লড়াই করার মতো শক্তিশালী নয়। আর আমেরিকার সমর্থন ছাড়া এ বাহিনী কার্যত অর্থহীন।
ট্রাম্প বলছেন, ইউরোপীয়রা তার রাজনৈতিক সমর্থন পাবে, তবে কোনো সেনা নয়। কিন্তু তার ওপর ভরসা করা কতটা যৌক্তিক? তিনি পুতিনকে একসময় “কঠোর নিষেধাজ্ঞার” হুমকি দিয়েছিলেন, কিন্তু বৈঠকে গিয়ে সে কথাই তুলেননি। অস্ত্র সরবরাহের নিশ্চয়তা সম্পর্কেও তিনি নীরব।
ইউক্রেনের জন্য বাস্তবসম্মত পথ
সত্যিকারের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হলে ইউক্রেনের সেনাবাহিনীকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন ও অস্ত্র সরবরাহের অঙ্গীকার প্রয়োজন। ইউরোপীয় বাহিনী তার সমকক্ষ হতে পারবে না। বরং অকার্যকর শান্তিরক্ষী বাহিনী আনা হলে, আক্রমণের সময় যদি তা ব্যর্থ হয়, তবে সেটিই হবে ইউরোপের জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি—এবং পুতিনের সবচেয়ে বড় জয়।
ডোনাল্ডের কানে যুদ্ধ
-
সারাক্ষণ রিপোর্ট - ১১:০৮:৪১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৫
- 46
জনপ্রিয় সংবাদ




















