রাহুল গান্ধীর অভিযোগ
ভারতের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। বেঙ্গালুরুর মহাদেবপুরা এলাকায় তিনি এমন উদাহরণ দেখান যেখানে ভোটার তালিকায় শূন্য নম্বরের বাড়ি, ৮০ জনের পরিবারের নামে ভোটার, এমনকি অদ্ভুত নামে নিবন্ধিত ভোটারের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। তার দাবি, এসবই ছিল বৃহৎ মাত্রার ভোট চুরির অংশ, যার মাধ্যমে বিজেপি গত বছরের জাতীয় নির্বাচন জিতেছে।
একটি বিস্তারিত উপস্থাপনায় রাহুল গান্ধী বলেন, হাজার হাজার এমন উদাহরণ রয়েছে এবং ভারতের নির্বাচন কমিশন (ইসিআই) এসব অনিয়মে বিজেপির সঙ্গে যোগসাজশ করেছে।
ইসিআইর বিরুদ্ধে চাপ
আগেই সমালোচনার মুখে থাকা ইসিআই এই অভিযোগের পর আরও বিতর্কে পড়েছে। চলতি বছরের ২৪ জুন বিহারে বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধন কার্যক্রম শুরু করে ইসিআই, যেখানে নভেম্বরের আগে নির্বাচন হওয়ার কথা। সাধারণত এ ধরনের সংশোধন প্রক্রিয়া খুবই বিরল—বিহারে শেষবার হয়েছিল ২০০৩ সালে। এবার হঠাৎ করে ঘোষণা দিয়ে অল্প সময়ে ১৩ কোটি মানুষের এই রাজ্যে প্রক্রিয়াটি শেষ করার উদ্যোগ নেয় কমিশন।
এই পর্যালোচনায় ৬৫ লাখ ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়, যা মোট ভোটারের প্রায় ৮.৩ শতাংশ। ইসিআই ব্যাখ্যা দিয়েছে, মৃত ভোটার, পুনরাবৃত্ত নাম ও অভিবাসনের কারণে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে বিরোধীরা বলছে, এটি ভোটার বঞ্চনার কৌশল।
কড়া ভাষায় পাল্টা জবাব
অভিযোগের মুখে ইসিআই আরও কঠোর অবস্থান নেয়। ১৭ আগস্ট প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার রাহুল গান্ধীকে আলটিমেটাম দেন। তিনি যেন শপথপত্র আকারে আদালতে প্রমাণ দেন অথবা দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চান। তিনি বলেন, “তৃতীয় কোনো পথ নেই।”
গণতন্ত্রের সুনাম নিয়ে প্রশ্ন
দীর্ঘদিন ধরে ইসিআইকে ভারতের গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে দেখা হয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রতিষ্ঠানটি প্রশংসিত হয়েছে। সুইডেনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ভি-ডেম ইনস্টিটিউটের সূচকে দীর্ঘদিন ধরে ভারতের নির্বাচনী প্রক্রিয়া প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে এগিয়ে ছিল। কিন্তু গত দশকে এই সূচকে ভারতের অবস্থান ক্রমেই খারাপ হয়েছে। ভোটার তালিকার অনিয়ম, রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়া—এসব কারণে সুনাম ক্ষুণ্ণ হয়েছে।
বিজেপির আধিপত্য ও নিরপেক্ষতা হারানো
২০১৪ সাল থেকে বিজেপি ভারতের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ক্ষমতায়। এর আগে জোট রাজনীতির যুগে সব দলের স্বার্থেই ইসিআই সমান সুযোগ রাখত। কিন্তু একদলীয় আধিপত্যের এই সময়ে কমিশনের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ।
উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়, নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ হয় এমন একটি প্যানেলের মাধ্যমে যেখানে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা এবং সরকারের আরেকজন মন্ত্রী থাকেন। সুপ্রিম কোর্ট একসময় সুপারিশ করেছিল যে, এখানে ভারতের প্রধান বিচারপতিকে অন্তর্ভুক্ত করা হোক, কিন্তু সরকার তা উপেক্ষা করে।
এছাড়া বিরোধীদের অভিযোগ, আচরণবিধি প্রয়োগও পক্ষপাতমূলক। বিজেপি নেতাদের, এমনকি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিরও উসকানিমূলক ভাষণ উপেক্ষা করেছে কমিশন।
স্বাধীন কিন্তু পুরোপুরি ন্যায়সংগত নয়
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মিলান বৈষ্ণবের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ভারতে নির্বাচন এখনো “স্বাধীন” হলেও সবসময় “ন্যায়সংগত” নয়।
রাহুল গান্ধী এই ইস্যুতে আন্দোলন শুরু করেছেন। ১৭ আগস্ট তিনি বিহারে “ভোটার অধিকার যাত্রা” শুরু করেন, যার লক্ষ্য জনগণকে তাদের ভোটাধিকার বিষয়ে সচেতন করা। বিরোধী দলগুলো এমনকি নির্বাচন কমিশনারকে অভিশংসনের প্রস্তাবও তুলেছে। তবে এর জন্য সংসদের অনুমোদন প্রয়োজন, যেখানে বিজেপি ও তার মিত্ররা স্বচ্ছন্দ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ভোগ করছে।
বিজেপির পাল্টা অভিযোগ
অন্যদিকে বিজেপি এইসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন আখ্যা দিয়েছে। কংগ্রেসকেই তারা উল্টো ভোট চুরির অভিযোগে অভিযুক্ত করেছে। বিজেপি সংসদ সদস্য অনুরাগ ঠাকুর বলেন, সন্দেহজনক ভোটার তৈরি করে কংগ্রেস নিজেই অনিয়ম করেছে।
ভারতের নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু?
-
সারাক্ষণ রিপোর্ট - ১১:১৪:৩৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৫
- 47
জনপ্রিয় সংবাদ




















