হঠাৎ সম্পর্কের অবনতি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক হঠাৎ করে গুরুতর সংকটে পড়েছে। প্রায় দুই দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত একসাথে চীনের প্রভাব মোকাবিলা করার কৌশল নিয়েছিল। কিন্তু এখন সেই অংশীদারিত্ব দুর্বল হয়ে পড়ছে, যা বেইজিং ও মস্কোর জন্য স্বস্তির বিষয়।
বাণিজ্য নিয়ে বড় বিরোধ
প্রধান উত্তেজনার উৎস হলো বাণিজ্য। ওয়াশিংটন ভারতের কৃষি খাত উন্মুক্ত করার জন্য চাপ দিচ্ছে এবং শুল্ক বাড়ানোর হুমকি দিয়েছে। আলোচনায় অগ্রগতি না হওয়ায় ট্রাম্প ৬ আগস্ট ঘোষণা দেন, ২৭ আগস্ট থেকে ভারতীয় পণ্যে মার্কিন শুল্ক দ্বিগুণ করে ৫০ শতাংশ করা হবে। যুক্তি হিসেবে তিনি দেখান—ভারতের বিপুল পরিমাণে রুশ অপরিশোধিত তেল আমদানি।
এ ঘোষণায় ক্ষুব্ধ মোদি বলেন, তিনি কখনো আপস করবেন না। ভারত কড়া অবস্থানে থাকবে। জানা গেছে, ট্রাম্প সমঝোতার জন্য বারবার ফোন করলেও মোদি তা রিসিভ করেননি। এতে উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
দুই দশকের সম্পর্কের মাইলফলক
২০০৮ সালে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ভারতের সঙ্গে ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তি করেন, যা ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরু করে। এরপর থেকে কূটনীতি ও নিরাপত্তা খাতে সহযোগিতা বাড়তে থাকে।
২০২০ সালে ভারত-চীন সীমান্তে সংঘর্ষের সময় ট্রাম্প প্রশাসন ভারতকে নজিরবিহীন সামরিক সহায়তা দেয়। মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহার করে ভারত চীনা সেনাদের গতিবিধি রিয়েল-টাইমে জানতে সক্ষম হয়। একই সময়ে ‘কোয়াড’ কাঠামোও সক্রিয় হয়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া অংশ নেয়।
চীন নীতি নিয়ে অস্বস্তি
ভারতের কূটনীতিকরা মনে করেন, দ্বন্দ্ব শুধু শুল্কে সীমাবদ্ধ নয়। মূল সমস্যা হলো চীনকে ঘিরে দুই দেশের দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা। ভারত চীনের সামরিক হুমকি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের দৃঢ় সহযোগিতা চায়। কিন্তু ট্রাম্প অনেক সময় কঠোর বক্তব্য দিলেও আবার প্রশংসা বা ছাড় দিয়ে দেন। তিনি প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের প্রতি খোলাখুলি প্রশংসা করেন এবং চীনের জন্য উন্নত সেমিকন্ডাক্টর রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা আংশিকভাবে শিথিল করেন।
ভারতের ক্ষোভ আরও বাড়ে যখন দেখা যায়, রাশিয়ার তেল আমদানিতে চীনও ভারতের মতো অবস্থায় থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র কেবল ভারতের ওপরই শাস্তিমূলক শুল্ক চাপাচ্ছে।
মোদির কূটনৈতিক কৌশল
আগস্টের শেষে সাত বছর পর প্রথমবার চীন সফরে যাবেন মোদি। তিনি সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও) সম্মেলনে অংশ নেবেন। আনুষ্ঠানিকভাবে এ ভ্রমণ সম্মেলনের জন্য হলেও, বিশ্লেষকদের মতে, এটি চীনের সঙ্গে উত্তেজনা প্রশমনের কৌশল।
ভারতের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিবশঙ্কর মেনন বলেন, “ভারতের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো—ট্রাম্প চীনের সঙ্গে বড় কোনো বাণিজ্য চুক্তি করে ফেলতে পারেন, আর এতে ভারত একা পড়ে যাবে।”
পাকিস্তান প্রসঙ্গে ক্ষোভ
ট্রাম্পের আরেকটি পদক্ষেপও মোদিকে ক্ষুব্ধ করেছে। মে মাসে তিনি দাবি করেন, তাঁর মধ্যস্থতায় ভারত-পাকিস্তান সংঘাত থেমে গেছে। কিন্তু নয়াদিল্লি বলে, তা আসলে পাকিস্তানের অস্ত্রশক্তির ভয়ে যুদ্ধবিরতিতে রাজি হওয়ার ফল, ট্রাম্পের কোনো ভূমিকা নয়।
আরও বিতর্ক সৃষ্টি হয় জুনে, যখন ট্রাম্প পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে হোয়াইট হাউসে লাঞ্চে আমন্ত্রণ জানান। ভারত একে নিজেদের প্রতি অবমাননা হিসেবে দেখে।
কোয়াডে ভবিষ্যৎ পরীক্ষার মুহূর্ত
চলতি বছর ভারতের আয়োজনে কোয়াড সম্মেলনে ট্রাম্প ও মোদির মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ আসবে। সেখানেই সম্পর্ক মেরামতের চেষ্টা হতে পারে। তবে অতীতের মতো আস্থা ও ঘনিষ্ঠতা ফিরিয়ে আনা সহজ হবে না।
ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক দুর্বল হলে কোয়াড কাঠামোও ভেঙে পড়তে পারে। এতে চীনের আগ্রাসী নীতি মোকাবিলা করা আরও কঠিন হয়ে উঠবে। জাপান দীর্ঘদিন ধরে কোয়াডকে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের মূল শক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে চাপ দিয়ে আসছে।
বৈশ্বিক প্রভাব
বিশ্লেষক মানীশ চাঁদ বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র-ভারত কৌশলগত সহযোগিতা চীনের প্রভাব নিয়ন্ত্রণে অপরিহার্য। কিন্তু ট্রাম্প যদি ভারতকে শুল্ক ও রাশিয়া-সম্পর্কিত বিষয়ে চাপে রাখেন, তাহলে কোয়াড দুর্বল হবে এবং চীনকে ঠেকানোর প্রচেষ্টা ভেস্তে যাবে।”
কোয়াড দুর্বল হলে চীন আরও সাহসী হয়ে উঠতে পারে, আর রাশিয়াও লাভবান হবে। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও তাদের অংশীদারদের জন্য এটি হবে এক অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি।
ট্রাম্প-মোদি দ্বন্দ্ব: চীনের প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার নতুন হুমকি
-
সারাক্ষণ রিপোর্ট - ১১:৫১:১২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৫
- 64
জনপ্রিয় সংবাদ
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















