০৮:২৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০১ জানুয়ারী ২০২৬
নগদের ইতিহাসে সর্বোচ্চ লেনদেন, ২০২৫ সালে প্রায় সাড়ে তিন লাখ কোটি টাকার মাইলফলক জামায়াত আমিরের সঙ্গে তারেক রহমানের সাক্ষাৎ, খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে সমবেদনা ইসলামী ব্যাংকে এক হাজার প্রশিক্ষণ সহকারী কর্মকর্তার বরণ শীর্ষ উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী হিসেবে পুনর্নিয়োগ পেলেন অধ্যাপক সায়েদুর রহমান অর্থনৈতিক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ায় ইরানে বিপ্লবী গার্ডের এক স্বেচ্ছাসেবক নিহত সঞ্চয়পত্রের সুদ কমলো, নতুন বছরে সংকটে মধ্যবিত্ত ও অবসরপ্রাপ্তরা জয়শঙ্করের সঙ্গে একান্ত বৈঠক নয়, শোকের মুহূর্তে সৌজন্য রক্ষা করেছে সবাই: পররাষ্ট্র উপদেষ্টা নিউইয়র্কের রাজনীতিতে মুসলিমদের উত্থান, মামদানির জয়ে শহরের ক্ষমতার মানচিত্রে নতুন অধ্যায় শান্তির পথে কঠিন বাঁক, নতুন বছরে রাশিয়া–ইউক্রেন সংঘাত আরও জটিল ভারতীয় রুপির নতুন বছরে হোঁচট, তিন বছরে সবচেয়ে বড় বার্ষিক পতনের ছায়া

ভাসানচরে রোহিঙ্গা পাঠানো স্থগিত, ভবিষ্যৎ কী?

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পরভাসানচরে রোহিঙ্গাদের পাঠানো বন্ধ আছে বলে মঙ্গলবার ডিডাব্লিউকে জানিয়েছেন রোহিঙ্গা শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মিজানুর রহমান৷

আর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের শরণার্থী বিষয়ক সেলের প্রধান মো. নাজমুল আবেদীন ডিডাব্লিউকে বলেন, ‘‘নানা কারণে ভাসানচরে রোহিঙ্গা শরণার্থী পাঠানো (রিলোকেট) এখন বন্ধ আছে৷ এখন এই ক্যাম্পই বন্ধ করে দেয়া হবে, নাকি রিলোকেট আবার শুরু হবে, কোনো বিষয়েই সরকার এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি৷ তবে দুইটি বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে৷ নানা পর্যায়ে কথা হচ্ছে৷”

রোহিঙ্গা বিষয়ক কমিশনার মিজানুর রহমান জানান, নতুন করে আবার সেখানে রোহিঙ্গাদের পাঠানো হবে কী না তা সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে৷ তিনি বলেন, ‘‘ভাসানচর একটি দ্বীপ৷ ওখানে পরিস্থিতি ভালো থাকার কোনো কারণ নেই৷ প্রথম সমস্যা হচ্ছে যোগাযোগের সমস্যা৷ রোগীদের চিকিৎসা সংকট প্রবল৷ কারণ তাদের নোয়াখালী সদর হাসপাতালে পাঠাতে হয়৷ সেটা খুব কঠিন৷ জ্বালানি সংকট প্রবল৷ মাসে ছয় হাজার এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার লাগে৷ কিন্তু আমাদের হাতে আছে সাড়ে তিন হাজার৷ এগুলো পাঠানো এবং এনজিওদের মাধ্যমে দেয়াও একটা কঠিন কাজ৷ ৫০ শতাংশ ঘাটতি আছে৷”

‘‘সেখানে তাদের সেবা দিতে কক্সবাজারের ক্যাম্পের চেয়ে বেশি ব্যয় হয়৷ মাথাপিছু ৩০ শতাংশ বেশি খরচ হয়৷ ফান্ড ক্রাইসিস তো আছেই৷ সেটা ভাসানচর, কক্সবাজার সবখানেই,” বলে জানান তিনি৷

মিজানুর রহমান বলেন, ‘‘ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের নিয়ে আরো সমস্যা আছে৷ তারা অবৈধভাবে সমুদ্রে যাচ্ছে৷ অবৈধভাবে কাঁকড়া ধরছে৷ এটা নিয়ে মৎস্য বিভাগের আপত্তি আছে৷ আবার সাগরে নোয়াখালীর জেলেদের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের প্রায়ই সংঘাত হয়৷”

তিনি জানান, ‘‘সুযোগ পেলেই রোহিঙ্গারা ভাসানচর থেকে পালিয়ে যান৷ এখন পর্যন্ত সাত হাজার জন পালিয়ে গেছেন৷ তাদের নতুন ঠিকানা চিহ্নিত করার কাজ চলছে৷ আসলে রোহিঙ্গারা ভাসানচরে থাকতে চান না৷ আর তাদের সেখানে রাখাও বেশ ঝামেলার৷ সরকারের একটা প্রজেক্ট ছিলো ‘গো এন্ড ফ্রি ভিজিট’ নামের৷ এই প্রজেক্টের আওতায় তারা কক্সবাজারে গিয়ে আত্মীয়স্বজনের সাথে দেখা করে আবার ফিরে আসতে পারতেন৷ কিন্তু এই প্রজেক্টে কোনো ফান্ড নেই অনেক দিন ধরে৷ ফলে ভাসানচরের রোহিঙ্গারা এখন আর ভাসানচরের বাইরে যেতে পারেন না৷”

ভাসানচরের রোহিঙ্গারা যা বলছেন

শুরুর দিকেই কক্সবাজার রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে স্বেচ্ছায় ভাসানচরে গিয়েছেন এরকম দুইজন রোহিঙ্গা শরণার্থীর সঙ্গে কথা বলতে পেরেছে ডিডাব্লিউ৷ তাদের একজন কেফায়েত উল্লাহ৷ তিনি প্রায় চার বছর ধরে এই ক্যাম্পে আছেন৷ তার চার ছেলে-মেয়ে৷ তিনি ওয়াশ ভলান্টিয়ার হিসাবে চাকরিও করছেন৷ এখানে আসার আগে তিনি কক্সবাজারের শ্যামলপুর ক্যাম্পে থাকতেন৷

কেফায়েত উল্লাহ বলেন, ‘‘আট মাস আগে কক্সবাজার ক্যাম্পে আমার মা মারা যান৷ আমি মায়ের লাশ দেখার জন্য কক্সবাজার যাওয়ার জন্য আবেদন করেছিলাম৷ কিন্তু যেতে পারিনি৷ আমাকে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়নি৷”

‘‘আর এখানে এখন আমার মেয়েটির পড়ার সুযোগ নেই৷ সে নবম শ্রেণিতে উঠৈছে৷ কিন্তু এখানকার যে স্কুল তাতে ওই শ্রেণিতে পড়ার সুযোগ নেই৷ রান্নার গ্যাস (সিলিন্ডারের এলপিজি) ঠিকমতো পাওয়া যায় না৷ ফলে সবসময় রান্নাও হয় না৷ আর চিকিৎসাকেন্দ্র তেমন ভালো নয়৷ প্রথম দিকে যে খাবার দেয়া হতো তার চেয়ে এখন খারাপ অবস্থা,” বলে জানান তিনি৷

এক প্রশ্নের জবাবে কেফায়েত উল্লাহ বলেন, ‘‘আমি এখানে থাকতে চাই না৷ কক্সবাজারের ক্যাম্পে চলে যেতে চাই৷ কিন্তু সেটা কাউকে এখনো বলিনি৷ কাকে বলব বুঝতে পারছি না৷”

ভাসানচরের আরেকজন রোহিঙ্গা শরণার্থীসায়েদ আলমও প্রায় চার বছর আগেই কক্সবাজার থেকে ভাসানচরে যান৷ স্ত্রী ও তিন ছেলে মেয়ে নিয়ে তার পাঁচজনের পরিবার৷ ভাসানচরে একটি এনজিওর ভলান্টিয়ার হিসাবে কাজ করছেন৷

সায়েদ আলম বলেন, ‘‘প্রথমদিকে যেভাবে রেশন দেয়া হতো এখন আর সেরকম দেয়া হয় না৷ ফলে খাবারের সমস্যা৷ খাবার পানি আছে, পানি বিশুদ্ধ করার ট্যাবলেট দিয়ে খেতে হয়৷”

‘‘আমার তো এখানে চাকরি আছে ফলে আমার তেমন সমস্যা নেই৷ তবে অনেকেই সমসায় আছেন৷ আর আমরা চাইলেও এখন ক্যাম্পের বাইরে যেতে পারি না৷ আমার সবাই এখানে, ফলে আমার কোনো সমস্যা হচ্ছে না৷ তবে অনেকের আত্মীয়স্বজন কক্সবাজারে আছেন৷ তাদের সমস্যা হচ্ছে,” বলে জানান তিনি৷

এক প্রশ্নের জবাবে সায়েদ আলম বলেন, ‘‘আমার সবাই এখানেই আছে৷ সেই দিক দিয়ে আমি ভালো আছি৷ এখানেই থাকতে চাই৷ তবে কেউ কেউ এখানে থাকতে চান না৷ কক্সবাজারে ফিরে যেতে চান৷”

‘একটি গোষ্ঠী বা বাহিনীকে লাভবান করতে প্রকল্প’

রোহিঙ্গা বিষয়ক গবেষক রেজাউর রহমান লেনিন ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘শুরুতেই আমরা ভাসানচরে রোহিঙ্গা ক্যাম্প করার বিরোধিতা করেছিলাম৷ আসলে ওটা একটা কারাগারের মতো৷ যাদের ওখানে নেয়া হয়েছে তাদের কাউকে ভুল বুঝিয়ে আবার কাউকে জোর করে নেয়া হয়েছে৷ সরকার যতই বলুক স্বেচ্ছায় তার গিয়েছে, তা ঠিক নয়৷”

তিনি বলেন, ‘‘ওই জনমানবহীন বিচ্ছিন্ন দ্বীপে শরণার্থী ক্যাম্পকরার কোনো যুক্তি ছিলো না৷ তারা অন্যান্য সমস্যার পাশাপাশি বন্যাসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হন৷ আসলে কোনো একটি গোষ্ঠী বা বাহিনীকে আর্থিকভাবে লাভবান করতে সরকারের বিশাল পরিমাণ টাকা খরচ করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে৷ তাতে ওই গোষ্ঠী লাভবান হয়েছে৷”

‘‘আমার মনে হয় এখন ভাসানচর ক্যাম্প বন্ধ করে দিয়ে রোহিঙ্গাদের কক্সবাজারের ক্যাম্পে ফিরিয়ে আনা উচিত৷ কিন্তু তাতেও নতুন করে পরিকল্পনা লাগবে৷ তাদের কোথায় আশ্রয় দেয়া হবে তার পরিকল্পনা লাগবে,” বলেন তিনি৷

ভাসানচর থেকে রোহিঙ্গাদের পালিয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে লেনিন বলেন, ‘‘সাত হাজার পালিয়ে গেছেন বলে বলা হচ্ছে৷ কিন্তু এটা ঠিক নয়৷ তাদের অনেকেই কারাগারে আছেন৷”

ভাসানচরে কাজ করা এনজিও কর্মকর্তার বক্তব্য

ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের সেবাদানকারী এনজিওগুলোর একটির প্রধান নির্বাহী নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডয়চে ভেলেকে জানান, ‘‘ভাসানচর একটি ব্যয়বহুল প্রকল্প, যদিও সরকার ও ইউএন সেটা প্রকাশ্যে বলে না৷ ইউএন-এর কোনো টিম যদি ভাসানচরে যায় তাহলে সেটাকে তারা ইউএন মিশন হিসাবে দেখে৷ বাইরে ইউএন মিশনের জন্য যেরকম খরচ হয় তাদের জন্যও একই খরচ ও ব্যবস্থাপনা রাখতে হয়৷”

‘‘আর ওখানে পুলিশ ও কোস্ট গার্ড নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করে৷ কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ভাসানচর থেকেরোহিঙ্গারা বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে যায়৷ তারা ওখানে আসলে থাকতে চান না৷ কারণ কক্সবাজার থেকে যারা ভাসানচরে গিয়েছেন তারা বেশি সুযোগ সুবিধা পাবে ভেবেছিলেন, কিন্তু তারা সেই হিসাবে কম সুবিধা পাচ্ছেন৷ আর তাদের বিচ্ছিন্নভাবে থাকতে হয়৷”

ঐ এনজিও কর্মকর্তা বলেন, ‘‘এখনতো সেখানে গ্যাস সিলিন্ডারেরও সংকট চলছে৷ আরো অনেক সংকট আছে৷ তারমধ্যে যোগাযোগ একটি বড় সংকট৷ ফলে এই ক্যাম্পটি টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে৷”

ভাসানচরের কথা

ভাসানচর ক্যাম্পটি নোয়াখালী জেলার অধীনে৷ সেখানে যেতে হলে চট্টগ্রাম হয়ে সমুদ্রপথে যেতে হয়৷ বঙ্গোপসাগরের উপকূল থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলায় পড়েছে দ্বীপটি৷

৪০ বর্গকিলোমিটার দ্বীপটিতে ১২০টি গুচ্ছ গ্রাম তৈরি করেছে সাবেক আওয়ামী লীগ সরকার৷ প্রকল্পটি সম্পন্ন করতে দুই হাজার ৩১২ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে৷ প্রকল্পে বানানো ঘরগুলো মাটির চার ফুট ওপরে কংক্রিটের ব্লক দিয়ে তৈরি করা হয়েছে৷ পুরো প্রকল্পটি ১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ বন্যা সুরক্ষা বাঁধের ভেতরে৷ এছাড়াও সেখানে আছে ১২০টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র- যা স্কুল, মেডিকেল সেন্টার এবং কমিউনিটি সেন্টার হিসেবে ব্যবহার করা হয়৷

ভাসানচর ক্যাম্পের দায়িত্বে নিয়োজিত অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মাহফুজার রহমান জানান, ‘‘এখন ৩৭ হাজারের বেশি শরণার্থী এই ক্যাম্পে অবস্থান করছেন৷ তাদের মধ্যে যারা এখান থেকে চলে গেছেন তাদের নতুন ঠিকানা নির্ধারণের চেষ্টা করা হচ্ছে৷”

তিনি জানান, ‘‘ক্যাম্পে সরকারের দিক থেকে ৬০০-এর বেশি লোক সেবা দিচ্ছে৷ ২২টি এনজিও এবং পাঁচটি ইউএন এজেন্সি মিলে আরো সাড়ে ৬০০ লোক সেবা দিচ্ছেন৷রোহিঙ্গাদের জন্য স্কুল, প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবাকেন্দ্র আছে৷ ভিতরে রোহিঙ্গাদের চলাচলের জন্য ৭০০ রিকশা ভ্যান আছে, যেগুলো রোহিঙ্গারাই চালান৷”

 

DW – 23.09.2025

জনপ্রিয় সংবাদ

নগদের ইতিহাসে সর্বোচ্চ লেনদেন, ২০২৫ সালে প্রায় সাড়ে তিন লাখ কোটি টাকার মাইলফলক

ভাসানচরে রোহিঙ্গা পাঠানো স্থগিত, ভবিষ্যৎ কী?

১১:৪৯:৩০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পরভাসানচরে রোহিঙ্গাদের পাঠানো বন্ধ আছে বলে মঙ্গলবার ডিডাব্লিউকে জানিয়েছেন রোহিঙ্গা শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মিজানুর রহমান৷

আর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের শরণার্থী বিষয়ক সেলের প্রধান মো. নাজমুল আবেদীন ডিডাব্লিউকে বলেন, ‘‘নানা কারণে ভাসানচরে রোহিঙ্গা শরণার্থী পাঠানো (রিলোকেট) এখন বন্ধ আছে৷ এখন এই ক্যাম্পই বন্ধ করে দেয়া হবে, নাকি রিলোকেট আবার শুরু হবে, কোনো বিষয়েই সরকার এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি৷ তবে দুইটি বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে৷ নানা পর্যায়ে কথা হচ্ছে৷”

রোহিঙ্গা বিষয়ক কমিশনার মিজানুর রহমান জানান, নতুন করে আবার সেখানে রোহিঙ্গাদের পাঠানো হবে কী না তা সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে৷ তিনি বলেন, ‘‘ভাসানচর একটি দ্বীপ৷ ওখানে পরিস্থিতি ভালো থাকার কোনো কারণ নেই৷ প্রথম সমস্যা হচ্ছে যোগাযোগের সমস্যা৷ রোগীদের চিকিৎসা সংকট প্রবল৷ কারণ তাদের নোয়াখালী সদর হাসপাতালে পাঠাতে হয়৷ সেটা খুব কঠিন৷ জ্বালানি সংকট প্রবল৷ মাসে ছয় হাজার এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার লাগে৷ কিন্তু আমাদের হাতে আছে সাড়ে তিন হাজার৷ এগুলো পাঠানো এবং এনজিওদের মাধ্যমে দেয়াও একটা কঠিন কাজ৷ ৫০ শতাংশ ঘাটতি আছে৷”

‘‘সেখানে তাদের সেবা দিতে কক্সবাজারের ক্যাম্পের চেয়ে বেশি ব্যয় হয়৷ মাথাপিছু ৩০ শতাংশ বেশি খরচ হয়৷ ফান্ড ক্রাইসিস তো আছেই৷ সেটা ভাসানচর, কক্সবাজার সবখানেই,” বলে জানান তিনি৷

মিজানুর রহমান বলেন, ‘‘ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের নিয়ে আরো সমস্যা আছে৷ তারা অবৈধভাবে সমুদ্রে যাচ্ছে৷ অবৈধভাবে কাঁকড়া ধরছে৷ এটা নিয়ে মৎস্য বিভাগের আপত্তি আছে৷ আবার সাগরে নোয়াখালীর জেলেদের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের প্রায়ই সংঘাত হয়৷”

তিনি জানান, ‘‘সুযোগ পেলেই রোহিঙ্গারা ভাসানচর থেকে পালিয়ে যান৷ এখন পর্যন্ত সাত হাজার জন পালিয়ে গেছেন৷ তাদের নতুন ঠিকানা চিহ্নিত করার কাজ চলছে৷ আসলে রোহিঙ্গারা ভাসানচরে থাকতে চান না৷ আর তাদের সেখানে রাখাও বেশ ঝামেলার৷ সরকারের একটা প্রজেক্ট ছিলো ‘গো এন্ড ফ্রি ভিজিট’ নামের৷ এই প্রজেক্টের আওতায় তারা কক্সবাজারে গিয়ে আত্মীয়স্বজনের সাথে দেখা করে আবার ফিরে আসতে পারতেন৷ কিন্তু এই প্রজেক্টে কোনো ফান্ড নেই অনেক দিন ধরে৷ ফলে ভাসানচরের রোহিঙ্গারা এখন আর ভাসানচরের বাইরে যেতে পারেন না৷”

ভাসানচরের রোহিঙ্গারা যা বলছেন

শুরুর দিকেই কক্সবাজার রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে স্বেচ্ছায় ভাসানচরে গিয়েছেন এরকম দুইজন রোহিঙ্গা শরণার্থীর সঙ্গে কথা বলতে পেরেছে ডিডাব্লিউ৷ তাদের একজন কেফায়েত উল্লাহ৷ তিনি প্রায় চার বছর ধরে এই ক্যাম্পে আছেন৷ তার চার ছেলে-মেয়ে৷ তিনি ওয়াশ ভলান্টিয়ার হিসাবে চাকরিও করছেন৷ এখানে আসার আগে তিনি কক্সবাজারের শ্যামলপুর ক্যাম্পে থাকতেন৷

কেফায়েত উল্লাহ বলেন, ‘‘আট মাস আগে কক্সবাজার ক্যাম্পে আমার মা মারা যান৷ আমি মায়ের লাশ দেখার জন্য কক্সবাজার যাওয়ার জন্য আবেদন করেছিলাম৷ কিন্তু যেতে পারিনি৷ আমাকে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়নি৷”

‘‘আর এখানে এখন আমার মেয়েটির পড়ার সুযোগ নেই৷ সে নবম শ্রেণিতে উঠৈছে৷ কিন্তু এখানকার যে স্কুল তাতে ওই শ্রেণিতে পড়ার সুযোগ নেই৷ রান্নার গ্যাস (সিলিন্ডারের এলপিজি) ঠিকমতো পাওয়া যায় না৷ ফলে সবসময় রান্নাও হয় না৷ আর চিকিৎসাকেন্দ্র তেমন ভালো নয়৷ প্রথম দিকে যে খাবার দেয়া হতো তার চেয়ে এখন খারাপ অবস্থা,” বলে জানান তিনি৷

এক প্রশ্নের জবাবে কেফায়েত উল্লাহ বলেন, ‘‘আমি এখানে থাকতে চাই না৷ কক্সবাজারের ক্যাম্পে চলে যেতে চাই৷ কিন্তু সেটা কাউকে এখনো বলিনি৷ কাকে বলব বুঝতে পারছি না৷”

ভাসানচরের আরেকজন রোহিঙ্গা শরণার্থীসায়েদ আলমও প্রায় চার বছর আগেই কক্সবাজার থেকে ভাসানচরে যান৷ স্ত্রী ও তিন ছেলে মেয়ে নিয়ে তার পাঁচজনের পরিবার৷ ভাসানচরে একটি এনজিওর ভলান্টিয়ার হিসাবে কাজ করছেন৷

সায়েদ আলম বলেন, ‘‘প্রথমদিকে যেভাবে রেশন দেয়া হতো এখন আর সেরকম দেয়া হয় না৷ ফলে খাবারের সমস্যা৷ খাবার পানি আছে, পানি বিশুদ্ধ করার ট্যাবলেট দিয়ে খেতে হয়৷”

‘‘আমার তো এখানে চাকরি আছে ফলে আমার তেমন সমস্যা নেই৷ তবে অনেকেই সমসায় আছেন৷ আর আমরা চাইলেও এখন ক্যাম্পের বাইরে যেতে পারি না৷ আমার সবাই এখানে, ফলে আমার কোনো সমস্যা হচ্ছে না৷ তবে অনেকের আত্মীয়স্বজন কক্সবাজারে আছেন৷ তাদের সমস্যা হচ্ছে,” বলে জানান তিনি৷

এক প্রশ্নের জবাবে সায়েদ আলম বলেন, ‘‘আমার সবাই এখানেই আছে৷ সেই দিক দিয়ে আমি ভালো আছি৷ এখানেই থাকতে চাই৷ তবে কেউ কেউ এখানে থাকতে চান না৷ কক্সবাজারে ফিরে যেতে চান৷”

‘একটি গোষ্ঠী বা বাহিনীকে লাভবান করতে প্রকল্প’

রোহিঙ্গা বিষয়ক গবেষক রেজাউর রহমান লেনিন ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘শুরুতেই আমরা ভাসানচরে রোহিঙ্গা ক্যাম্প করার বিরোধিতা করেছিলাম৷ আসলে ওটা একটা কারাগারের মতো৷ যাদের ওখানে নেয়া হয়েছে তাদের কাউকে ভুল বুঝিয়ে আবার কাউকে জোর করে নেয়া হয়েছে৷ সরকার যতই বলুক স্বেচ্ছায় তার গিয়েছে, তা ঠিক নয়৷”

তিনি বলেন, ‘‘ওই জনমানবহীন বিচ্ছিন্ন দ্বীপে শরণার্থী ক্যাম্পকরার কোনো যুক্তি ছিলো না৷ তারা অন্যান্য সমস্যার পাশাপাশি বন্যাসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হন৷ আসলে কোনো একটি গোষ্ঠী বা বাহিনীকে আর্থিকভাবে লাভবান করতে সরকারের বিশাল পরিমাণ টাকা খরচ করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে৷ তাতে ওই গোষ্ঠী লাভবান হয়েছে৷”

‘‘আমার মনে হয় এখন ভাসানচর ক্যাম্প বন্ধ করে দিয়ে রোহিঙ্গাদের কক্সবাজারের ক্যাম্পে ফিরিয়ে আনা উচিত৷ কিন্তু তাতেও নতুন করে পরিকল্পনা লাগবে৷ তাদের কোথায় আশ্রয় দেয়া হবে তার পরিকল্পনা লাগবে,” বলেন তিনি৷

ভাসানচর থেকে রোহিঙ্গাদের পালিয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে লেনিন বলেন, ‘‘সাত হাজার পালিয়ে গেছেন বলে বলা হচ্ছে৷ কিন্তু এটা ঠিক নয়৷ তাদের অনেকেই কারাগারে আছেন৷”

ভাসানচরে কাজ করা এনজিও কর্মকর্তার বক্তব্য

ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের সেবাদানকারী এনজিওগুলোর একটির প্রধান নির্বাহী নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডয়চে ভেলেকে জানান, ‘‘ভাসানচর একটি ব্যয়বহুল প্রকল্প, যদিও সরকার ও ইউএন সেটা প্রকাশ্যে বলে না৷ ইউএন-এর কোনো টিম যদি ভাসানচরে যায় তাহলে সেটাকে তারা ইউএন মিশন হিসাবে দেখে৷ বাইরে ইউএন মিশনের জন্য যেরকম খরচ হয় তাদের জন্যও একই খরচ ও ব্যবস্থাপনা রাখতে হয়৷”

‘‘আর ওখানে পুলিশ ও কোস্ট গার্ড নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করে৷ কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ভাসানচর থেকেরোহিঙ্গারা বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে যায়৷ তারা ওখানে আসলে থাকতে চান না৷ কারণ কক্সবাজার থেকে যারা ভাসানচরে গিয়েছেন তারা বেশি সুযোগ সুবিধা পাবে ভেবেছিলেন, কিন্তু তারা সেই হিসাবে কম সুবিধা পাচ্ছেন৷ আর তাদের বিচ্ছিন্নভাবে থাকতে হয়৷”

ঐ এনজিও কর্মকর্তা বলেন, ‘‘এখনতো সেখানে গ্যাস সিলিন্ডারেরও সংকট চলছে৷ আরো অনেক সংকট আছে৷ তারমধ্যে যোগাযোগ একটি বড় সংকট৷ ফলে এই ক্যাম্পটি টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে৷”

ভাসানচরের কথা

ভাসানচর ক্যাম্পটি নোয়াখালী জেলার অধীনে৷ সেখানে যেতে হলে চট্টগ্রাম হয়ে সমুদ্রপথে যেতে হয়৷ বঙ্গোপসাগরের উপকূল থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলায় পড়েছে দ্বীপটি৷

৪০ বর্গকিলোমিটার দ্বীপটিতে ১২০টি গুচ্ছ গ্রাম তৈরি করেছে সাবেক আওয়ামী লীগ সরকার৷ প্রকল্পটি সম্পন্ন করতে দুই হাজার ৩১২ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে৷ প্রকল্পে বানানো ঘরগুলো মাটির চার ফুট ওপরে কংক্রিটের ব্লক দিয়ে তৈরি করা হয়েছে৷ পুরো প্রকল্পটি ১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ বন্যা সুরক্ষা বাঁধের ভেতরে৷ এছাড়াও সেখানে আছে ১২০টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র- যা স্কুল, মেডিকেল সেন্টার এবং কমিউনিটি সেন্টার হিসেবে ব্যবহার করা হয়৷

ভাসানচর ক্যাম্পের দায়িত্বে নিয়োজিত অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মাহফুজার রহমান জানান, ‘‘এখন ৩৭ হাজারের বেশি শরণার্থী এই ক্যাম্পে অবস্থান করছেন৷ তাদের মধ্যে যারা এখান থেকে চলে গেছেন তাদের নতুন ঠিকানা নির্ধারণের চেষ্টা করা হচ্ছে৷”

তিনি জানান, ‘‘ক্যাম্পে সরকারের দিক থেকে ৬০০-এর বেশি লোক সেবা দিচ্ছে৷ ২২টি এনজিও এবং পাঁচটি ইউএন এজেন্সি মিলে আরো সাড়ে ৬০০ লোক সেবা দিচ্ছেন৷রোহিঙ্গাদের জন্য স্কুল, প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবাকেন্দ্র আছে৷ ভিতরে রোহিঙ্গাদের চলাচলের জন্য ৭০০ রিকশা ভ্যান আছে, যেগুলো রোহিঙ্গারাই চালান৷”

 

DW – 23.09.2025