লিভারপুল সম্মেলনের আগে আতঙ্ক
ব্রিটিশ অর্থমন্ত্রী রেচেল রিভসকে লেবার পার্টির সম্মেলনের আগে বড় চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে। এমপিরা বাজেটে অতিরিক্ত বরাদ্দ চাইবে, লবিস্টরা কর বৃদ্ধি ঠেকাতে তদবির করবে। তবে সবচেয়ে বড় চাপ আসছে আন্তর্জাতিক বন্ড বাজার থেকে। সামান্য আর্থিক অব্যবস্থাপনার ইঙ্গিতেই ব্যবসায়ীরা সুদের হার আরও উঁচুতে তুলতে প্রস্তুত।
সুদের হার বেড়েছে দ্রুত
১০ বছরের ব্রিটিশ সরকারি বন্ড বা ‘গিল্ট’-এর সুদের হার এখন প্রায় ৪.৮ শতাংশে, যেখানে ২০২০ সালে তা ছিল মাত্র ০.২ শতাংশ। জি-৭ ধনী দেশের মধ্যে এটি সবচেয়ে বেশি। ঋণের সুদ মেটাতে ব্যয় পাঁচ বছরে দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শুধু সুদেই খরচ হবে ১১১ বিলিয়ন পাউন্ড—যা শিক্ষা বাজেটের চেয়েও বেশি।
বিরোধীদলীয় নেতা কেমি বাডেনক রিভসকে দায়ী করে বলেছেন, এটি তাঁর “অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার মূল্য”। যদিও সত্যি বলতে গেলে শুধু সরকারি অপচয় নয়, আরও দুটি বড় কারণ এ পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

স্থায়ী মুদ্রাস্ফীতি ও কঠিন সুদনীতি
প্রথম কারণ হলো ব্রিটেনে দীর্ঘস্থায়ী মুদ্রাস্ফীতি। আগস্ট পর্যন্ত এক বছরে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৩.৮ শতাংশে, যেখানে ইউরো অঞ্চলে তা মাত্র ২ শতাংশ। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড (BOE) সুদের হার রেখেছে ৪ শতাংশে—ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দ্বিগুণ। ফলে স্বল্পমেয়াদি বন্ডের হারও বেশি থাকছে।
বড় সমস্যা হলো দীর্ঘমেয়াদি প্রত্যাশা। জরিপে দেখা গেছে, ব্রিটিশরা আগামী ৫ থেকে ১০ বছরে গড় মুদ্রাস্ফীতি ৩.৯ শতাংশ হবে বলে ধরে নিচ্ছে। এর মানে ভবিষ্যতেও উচ্চ সুদের হার বজায় থাকবে, যা দীর্ঘমেয়াদি বন্ডের হার বাড়াচ্ছে।
বৈশ্বিক মূলধনের ঘাটতি
দ্বিতীয় কারণ হলো বৈশ্বিক মূলধনের সংকট। গত এক বছরে চীন ও জার্মানির মতো দেশও ঋণ নিয়েছে বেশি, একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) খাত বিনিয়োগের বড় অংশ শুষে নিচ্ছে। ফলে বিশ্বব্যাপী সুদের হার বাড়ছে।
ব্রিটেনে পরিস্থিতি আরও জটিল, কারণ ট্রেজারি নতুন ঋণ তুলছে আর ব্যাংক অব ইংল্যান্ড পুরনো বন্ড বিক্রি করছে। মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ ও ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেখানে শুধু মেয়াদোত্তীর্ণ বন্ড প্রতিস্থাপন বন্ধ করেছে, সেখানে BOE সরাসরি বিক্রি করছে।
একসময় দেশীয় পেনশন ফান্ড এসব বন্ড কিনত, কিন্তু এখন তারা বাজার থেকে সরে যাচ্ছে। ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরাই প্রধান ক্রেতা—যারা বৈশ্বিক বাজারের ওঠানামার প্রতি অনেক বেশি সংবেদনশীল। অর্থনৈতিক দায়িত্বশীলতা দপ্তরের (OBR) হিসেবে, পেনশন ফান্ডের সরে যাওয়া দীর্ঘমেয়াদে গড় সুদ প্রায় ০.৮ শতাংশ বাড়াবে।

রিভসের আর্থিক শৃঙ্খলার চ্যালেঞ্জ
রিভসের হাতে নিয়ন্ত্রণের তৃতীয় বিষয় হলো আর্থিক শৃঙ্খলা। ধনী দেশগুলো ক্রমশ ঋণের ভারে জর্জরিত হচ্ছে, বিনিয়োগকারীদের বড় দুশ্চিন্তা এখানেই। আমেরিকা জিডিপির ৬.১ শতাংশ ঘাটতিতে চলছে, ফ্রান্সও ৫.৫ শতাংশ ঘাটতিতে।
রিভস প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ২০২৯-৩০ সালের মধ্যে ঘাটতি কমিয়ে জিডিপির ২.১ শতাংশে নামাবেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা সন্দিহান। কারণ, তাঁর পরিকল্পনা নির্ভর করছে কল্যাণ ভাতা কমানো, কম ঋণখরচ ও উচ্চ উৎপাদনশীলতার ওপর—যা বাস্তবসম্মত নয়। গবেষণা সংস্থা ক্যাপিটাল ইকনমিকসের হিসেবে ঘাটতি হতে পারে ২৮ বিলিয়ন পাউন্ড পর্যন্ত, যা মেটাতে কর বাড়ানো বা ব্যয় কমানো ছাড়া উপায় নেই।
বাজারের অস্থির স্মৃতি
আমেরিকা ও ফ্রান্সের তুলনায় ব্রিটেনের অবস্থান ছোট হলেও ঝুঁকি বেশি। ফ্রান্সের পাশে আছে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক, আমেরিকার ভরসা ডলার। কিন্তু ব্রিটেন একা। এর সঙ্গে আছে ২০২২ সালের লিজ ট্রাসের “মিনি বাজেট”-এর খারাপ স্মৃতি, যা বাজারকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। তাই এখন ব্যবসায়ীরা আরও সতর্ক।

ভবিষ্যতের সম্ভাবনা
বিশ্বব্যাপী বন্ড বাজার ধস নামবেই এমন নয়। মুদ্রাস্ফীতি কমলে সুদের হারও নামতে পারে। কিন্তু লেবার সরকার বরাবরই আশাবাদী পূর্বাভাসে বাজি ধরছে, বিপজ্জনক দিকগুলো উপেক্ষা করছে। যদি নভেম্বরের বাজেটে রিভস দৃঢ় আর্থিক পরিকল্পনা উপস্থাপন করতে পারেন, তবে ব্রিটেন সম্ভাব্য সংকট থেকে রক্ষা পেতে পারে। অন্যথায়, বাজারের ক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দুতে পড়ে যেতে পারে যুক্তরাজ্য।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















