বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় দুই লাখ মানুষ নতুন করে ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজন সময়মতো পরীক্ষা, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং বিভাগীয় পর্যায়ে সমান চিকিৎসা–সুবিধা নিশ্চিত করা। শুরুতেই রোগ ধরা পড়লে বেশিরভাগ ক্যান্সারই নিরাময়যোগ্য।
ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত দুই দিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল ক্যান্সার কংগ্রেস’-এর সমাপনী অনুষ্ঠানে বিশেষজ্ঞরা বলেন—বাংলাদেশে ক্যান্সার এখন নীরব সংকট। দেরিতে শনাক্ত হওয়া, চিকিৎসা–অবকাঠামোর অভাব এবং চিকিৎসায় বৈষম্যের কারণে মৃত্যুহার বাড়ছে।
কংগ্রেসটি আয়োজন করে অনকোলজি ক্লাব বাংলাদেশ, যেখানে দেশি–বিদেশি চিকিৎসক ও গবেষকরা ক্যান্সার প্রতিরোধ ও সাশ্রয়ী চিকিৎসা নিয়ে পরামর্শ দেন।
বাংলাদেশে ক্যান্সারের বর্তমান চিত্র:
বিশেষজ্ঞদের হিসাবে, দেশে প্রতি বছর প্রায় ১ লাখ ৮৪ হাজার নতুন ক্যান্সার রোগী শনাক্ত হয়।
কিন্তু দেশে মাত্র ২৯টি রেডিওথেরাপি ইউনিট কার্যকরভাবে চালু রয়েছে, যা দেশের বিশাল রোগীসংখ্যার তুলনায় অনেক কম।
ফলে—
সময়ে চিকিৎসা না পেয়ে মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে,
শহর–গ্রাম বৈষম্য স্পষ্ট হয়ে উঠছে,
চিকিৎসা–খরচ বেড়ে যাচ্ছে এবং বহু রোগী চিকিৎসা না নিয়েই হাল ছেড়ে দিচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মূল বার্তা:
প্রতিরোধই সেরা পথ—আগেভাগে রোগ ধরা পড়লে ক্যান্সার নিরাময়ের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
বিভাগীয় পর্যায়ে ক্যান্সার সেন্টার স্থাপন জরুরি, যাতে সবার জন্য চিকিৎসা সহজলভ্য হয়।
নিয়মিত স্ক্রিনিং ও রেফারাল নেটওয়ার্ক চালু করলে বহু রোগীকে প্রাথমিক অবস্থায় শনাক্ত করা যাবে।
ক্যান্সার চিকিৎসা ব্যয়বহুল, তাই দরিদ্রদের জন্য সরকারি সহায়তা ও ইনশিওরেন্স সুবিধা বাড়াতে হবে।
জনসচেতনতা, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতি সম্ভব নয়।

ক্যান্সার প্রতিরোধে যা জরুরি:
নিয়মিত পরীক্ষা
প্রতি বছর অন্তত একবার শরীর পরীক্ষা করা, বিশেষ করে স্তন, সার্ভিক্স, ফুসফুস ও কোলন–ক্যান্সারের ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের।
পরিবারে ক্যান্সারের ইতিহাস থাকলে বাড়তি সতর্কতা জরুরি।
সুস্থ জীবনযাপতামাক ও অ্যালকোহল পরিহার, সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা, নিয়মিত ব্যায়াম করা।
মানসিক চাপ কমানো এবং পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা।
সচেতনতা বৃদ্ধি:
স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্য ক্যাম্প ও স্কুল–কলেজে ক্যান্সার বিষয়ক তথ্য প্রচার।
গণমাধ্যমে প্রচারণা ও প্রাথমিক পরামর্শ কেন্দ্র স্থাপন।
চিকিৎসা ব্যবস্থায় যা করতে হবে:
প্রতিটি বিভাগে আধুনিক রেডিওথেরাপি ও কেমোথেরাপি ইউনিট স্থাপন।
জেলা–উপজেলায় রেফারাল প্রোটোকল চালু করা।
রেডিয়েশন অনকোলজি ও মেডিকেল ফিজিক্সে প্রশিক্ষিত জনবল বৃদ্ধি।
জাতীয় ক্যান্সার রেজিস্ট্রি হালনাগাদ করে তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা করা।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতা:
কংগ্রেসে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত ও সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশের চিকিৎসক ও গবেষকরা অংশ নেন।
তারা বলেন—বাংলাদেশে যৌথ গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি স্থানান্তরের মাধ্যমে ক্যান্সার চিকিৎসা ব্যবস্থায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করা সম্ভব।
অংশগ্রহণ ও পরিসর:
দুই দিনব্যাপী এই কংগ্রেসে ছিল ১৬টি সেশন, উপস্থাপিত হয় ৩১টি গবেষণা প্রবন্ধ।
অংশ নেন প্রায় ১,২০০ জন চিকিৎসক, গবেষক ও স্বাস্থ্যকর্মী।
দেশীয় প্রেক্ষাপটে কার্যকর ও সাশ্রয়ী সমাধান খুঁজতে নীতি–সংলাপ ও কেস–স্টাডি সেশন অনুষ্ঠিত হয়।
সামনের পরিকল্পনা:
আগামী এক বছরের মধ্যে প্রতিটি বিভাগে অতিরিক্ত রেডিওথেরাপি ইউনিট স্থাপন।
উচ্চঝুঁকির রোগে স্ক্রিনিং রোডম্যাপ তৈরি ও নিয়মিত ফলো–আপ ব্যবস্থা।
যন্ত্রপাতির মাননিয়ন্ত্রণ (QA) ও নিরাপত্তা প্রটোকল কঠোরভাবে বাস্তবায়ন।
চিকিৎসা–ব্যয় সহনীয় করতে ইনশিওরেন্স ও সহায়তা প্যাকেজ চালু।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যান্সারকে হারাতে হলে এখনই সচেতনতা ও প্রতিরোধকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
প্রতিরোধ, স্ক্রিনিং, সাশ্রয়ী চিকিৎসা ও প্রশিক্ষিত জনবল—এই চারটি দিকেই জোর দিলে ক্যান্সার–সংকট অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
সময়মতো পরীক্ষা, সচেতনতা আর সমান চিকিৎসা–সুবিধাই হাজারো প্রাণ বাঁচানোর চাবিকাঠি।
#ক্যান্সারপ্রতিরোধ #স্বাস্থ্যসচেতনতা #বাংলাদেশস্বাস্থ্য #অনকোলজিক্লাব #সারাক্ষণরিপোর্ট
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















