০৯:৪৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ জানুয়ারী ২০২৬
সংখ্যালঘু ও মব সহিংসতা: জানুয়ারি ২০২৬-এ আতঙ্ক, ভাঙচুর আর বিচারহীনতার ছায়া জানুয়ারিতে হেফাজতে ও কারাগারে ১৯ প্রাণহানি খসড়া মিডিয়া অধ্যাদেশকে ‘স্বাধীন গণমাধ্যমের উপহাস’ বলে আখ্যা দিল টিআইবি বিশ্বকাপ অনিশ্চয়তায় জার্সি উন্মোচন স্থগিত করল পিসিবি কোটা বাতিলের দাবিতে গাজীপুরে রেললাইন ও সড়ক অবরোধ করলেন ডিপ্লোমা প্রকৌশলীরা নির্বাচনের ফল ঘোষণায় ১২ ঘণ্টার বেশি দেরি মানেই অসৎ উদ্দেশ্যের ইঙ্গিত: মির্জা আব্বাস শিরোনাম: ৫৪ বছর ধরে বাংলাদেশ লুটপাটের শিকার, এবার নির্বাচনে জামায়াতকে সুযোগ দেওয়ার আহ্বান: মিয়া গোলাম পরওয়ার চট্টগ্রাম বন্দরে এনসিটি ইজারা পরিকল্পনার প্রতিবাদে অচল কার্যক্রম স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে বিএনপির ‘ধানের শীষে’ ভোট দেওয়ার আহ্বান তারেক রহমানের চট্টগ্রামে কারাবন্দী আওয়ামী লীগ নেতার মৃত্যু

‘ঠান্ডায় খাও, জ্বরে উপোস’—প্রচলিত ধারণার পেছনের আসল সত্য

প্রাচীন প্রবাদ না বৈজ্ঞানিক সত্য?

অনেকের কাছেই প্রচলিত একটি প্রবাদ—‘ঠান্ডায় খাও, জ্বরে উপোস’। অর্থাৎ, সর্দি লাগলে খেতে হবে বেশি, আর জ্বর এলে খাবার থেকে বিরত থাকতে হবে। কিন্তু এই ধারণা কি সত্যিই বিজ্ঞানসম্মত? চিকিৎসকরা বলছেন, এটি মূলত একটি পুরনো লোককথা, যার পক্ষে কোনো দৃঢ় বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

টেক্সাস সাউথওয়েস্টার্ন মেডিকেল সেন্টারের ফ্যামিলি মেডিসিন বিভাগের প্রধান ড. ডেভিড স্নাইডার বলেন, “এই ধারণাটি বেশ জনপ্রিয় হলেও এর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। শরীরের প্রতিরোধব্যবস্থা ঠিক রাখতে সঠিক পুষ্টিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”

পুষ্টি কেন জরুরি

ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিবিদ ও ইমিউনোলজির সহকারী অধ্যাপক বেঞ্জামিন হারেল বলেন, “এই ধারণাটি যুক্তিহীন। কারণ অনেক সময় একজনের একসঙ্গে ঠান্ডা ও জ্বর দুটোই হতে পারে। তখন কীভাবে একদিকে খাবে, অন্যদিকে উপোস করবে?”

জনস হপকিনস ইউনিভার্সিটির মেডিসিন সহকারী অধ্যাপক ড. গীতা সুদ বলেন, যারা দীর্ঘদিন পুষ্টিহীনতায় ভোগেন বা গুরুতর ভিটামিন-খনিজের অভাবে থাকেন, তাদের সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করা কঠিন হয়ে পড়ে। উদাহরণস্বরূপ, অপুষ্টিতে ভোগা মানুষের শরীরে রোগ প্রতিরোধকারী কোষের উৎপাদন কমে যায়। তবে তিনি আরও বলেন, “যদি আপনার পুষ্টি ঠিক থাকে, তবে অসুস্থ অবস্থায় বিশেষ কোনো খাবার খাওয়া বা না খাওয়ায় তেমন পার্থক্য হয় না।”

Rush Medical Center seeks to become first U.S. hospital to move to 5G | Fierce Healthcare

রাশ ইউনিভার্সিটি মেডিকেল সেন্টারের ফ্যামিলি মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ড. মাইকেল হ্যানাক বলেন, “অসুস্থ অবস্থায় ফল ও শাকসবজির মতো পুষ্টিকর খাবার শরীরের প্রয়োজনীয় শক্তি জোগাতে সাহায্য করে। বিশেষত, জ্বরে শরীরের অতিরিক্ত শক্তির দরকার হয়।”

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, “যদি এক-দুই দিন ক্ষুধা না লাগে, জোর করে খেতে হবে না। শরীর তখনও, নিজের সঞ্চিত শক্তি ব্যবহার করে টিকে থাকতে পারে। তবে অতিরিক্ত দুর্বল লাগলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।”

ভিটামিন, খনিজ ও ঘরোয়া উপায়

ড. সুদ বলেন, অতিরিক্ত ভিটামিন বা খনিজ সাপ্লিমেন্ট নেওয়া দ্রুত সেরে ওঠাতে সহায়ক—এমন প্রমাণও নেই। যদিও কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, ঠান্ডা শুরু হওয়ার আগে বা শুরুতেই জিঙ্ক গ্রহণ করলে অসুস্থতার সময়কাল সামান্য কমতে পারে, তবে সব গবেষণায় একই ফল পাওয়া যায়নি।

ভিটামিন ‘সি’ যে ঠান্ডা প্রতিরোধ করতে পারে—এমন ধারণাও ভুল প্রমাণিত হয়েছে। তবে মধু কাশি উপশমে কিছুটা কার্যকর। ২০২১ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক উভয়ের ক্ষেত্রেই মধু কাশির তীব্রতা ও ঘনত্ব কমাতে সহায়তা করে। মধু সরাসরি খাওয়া হোক বা দুধ, কফি কিংবা সিরাপের সঙ্গে মিশিয়ে—সব ক্ষেত্রেই উপকার পাওয়া গেছে।

রক্তে অতিরিক্ত শর্করা ও সংক্রমণ

Feed a Cold, Starve a Fever': Is It True?

ড. সুদ আরও বলেন, যাদের রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেশি (বিশেষত ডায়াবেটিসের রোগীরা), তাদের শরীর সংক্রমণ প্রতিরোধে বেশি সময় নেয়। কারণ, উচ্চ মাত্রার রক্তশর্করা ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি বাড়িয়ে দেয়। তাই ডায়াবেটিস রোগীদের খাদ্য নিয়ন্ত্রণ আরও জরুরি।

অসুস্থ অবস্থায় তরল গ্রহণ কেন জরুরি

সব বিশেষজ্ঞই একমত—অসুস্থ অবস্থায় শরীরের জলীয় ভারসাম্য বজায় রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ঠান্ডা লাগলে শরীর থেকে মিউকাসের মাধ্যমে অতিরিক্ত তরল বেরিয়ে যায়। পর্যাপ্ত পানি পান করলে মিউকাস পাতলা হয়, ফলে নাক বন্ধ ভাব কমে।

ড. হ্যানাক বলেন, “সাধারণত দিনে দুই থেকে চার লিটার তরল গ্রহণ করা উচিত। অ্যালকোহল থেকে দূরে থাকা ভালো, কারণ এটি শরীরকে ডিহাইড্রেট করে।”

জ্বর হলে শরীর ঘাম বা ডায়রিয়ার মাধ্যমে প্রচুর তরল হারায়। তাই ইলেকট্রোলাইটযুক্ত পানীয় শরীরের হারানো খনিজ পূরণে সহায়ক। ড. সুদ পরামর্শ দেন, “যদি জ্বর ১০৩ ডিগ্রির ওপরে যায়, বা হৃদরোগ বা খিঁচুনি সমস্যা থাকে, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে এবং যদি প্রয়োজনে এসিটামিনোফেন বা আইবুপ্রোফেনের মতো ওষুধ ব্যবহার করতে হয়, তবে তা চিকিৎসকের নির্দেশেই করা উচিত।”

ড. হ্যানাকের মতে, ঠান্ডা বা হালকা জ্বরের ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা হলো বিশ্রাম ও পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ। তিনি বলেন, “বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শরীর নিজে থেকেই সেরে ওঠে। তাই হয়তো সবচেয়ে উপযুক্ত প্রবাদ হবে—‘সময়ই সব ক্ষত সারায়,’।”

 

#স্বাস্থ্য_পরামর্শ #জ্বর_ও_ঠান্ডা #পুষ্টি #খাদ্য_ও_রোগপ্রতিরোধ #সারাক্ষণ_রিপোর্ট

জনপ্রিয় সংবাদ

সংখ্যালঘু ও মব সহিংসতা: জানুয়ারি ২০২৬-এ আতঙ্ক, ভাঙচুর আর বিচারহীনতার ছায়া

‘ঠান্ডায় খাও, জ্বরে উপোস’—প্রচলিত ধারণার পেছনের আসল সত্য

০৩:৩৯:৫৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ নভেম্বর ২০২৫

প্রাচীন প্রবাদ না বৈজ্ঞানিক সত্য?

অনেকের কাছেই প্রচলিত একটি প্রবাদ—‘ঠান্ডায় খাও, জ্বরে উপোস’। অর্থাৎ, সর্দি লাগলে খেতে হবে বেশি, আর জ্বর এলে খাবার থেকে বিরত থাকতে হবে। কিন্তু এই ধারণা কি সত্যিই বিজ্ঞানসম্মত? চিকিৎসকরা বলছেন, এটি মূলত একটি পুরনো লোককথা, যার পক্ষে কোনো দৃঢ় বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

টেক্সাস সাউথওয়েস্টার্ন মেডিকেল সেন্টারের ফ্যামিলি মেডিসিন বিভাগের প্রধান ড. ডেভিড স্নাইডার বলেন, “এই ধারণাটি বেশ জনপ্রিয় হলেও এর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। শরীরের প্রতিরোধব্যবস্থা ঠিক রাখতে সঠিক পুষ্টিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”

পুষ্টি কেন জরুরি

ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিবিদ ও ইমিউনোলজির সহকারী অধ্যাপক বেঞ্জামিন হারেল বলেন, “এই ধারণাটি যুক্তিহীন। কারণ অনেক সময় একজনের একসঙ্গে ঠান্ডা ও জ্বর দুটোই হতে পারে। তখন কীভাবে একদিকে খাবে, অন্যদিকে উপোস করবে?”

জনস হপকিনস ইউনিভার্সিটির মেডিসিন সহকারী অধ্যাপক ড. গীতা সুদ বলেন, যারা দীর্ঘদিন পুষ্টিহীনতায় ভোগেন বা গুরুতর ভিটামিন-খনিজের অভাবে থাকেন, তাদের সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করা কঠিন হয়ে পড়ে। উদাহরণস্বরূপ, অপুষ্টিতে ভোগা মানুষের শরীরে রোগ প্রতিরোধকারী কোষের উৎপাদন কমে যায়। তবে তিনি আরও বলেন, “যদি আপনার পুষ্টি ঠিক থাকে, তবে অসুস্থ অবস্থায় বিশেষ কোনো খাবার খাওয়া বা না খাওয়ায় তেমন পার্থক্য হয় না।”

Rush Medical Center seeks to become first U.S. hospital to move to 5G | Fierce Healthcare

রাশ ইউনিভার্সিটি মেডিকেল সেন্টারের ফ্যামিলি মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ড. মাইকেল হ্যানাক বলেন, “অসুস্থ অবস্থায় ফল ও শাকসবজির মতো পুষ্টিকর খাবার শরীরের প্রয়োজনীয় শক্তি জোগাতে সাহায্য করে। বিশেষত, জ্বরে শরীরের অতিরিক্ত শক্তির দরকার হয়।”

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, “যদি এক-দুই দিন ক্ষুধা না লাগে, জোর করে খেতে হবে না। শরীর তখনও, নিজের সঞ্চিত শক্তি ব্যবহার করে টিকে থাকতে পারে। তবে অতিরিক্ত দুর্বল লাগলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।”

ভিটামিন, খনিজ ও ঘরোয়া উপায়

ড. সুদ বলেন, অতিরিক্ত ভিটামিন বা খনিজ সাপ্লিমেন্ট নেওয়া দ্রুত সেরে ওঠাতে সহায়ক—এমন প্রমাণও নেই। যদিও কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, ঠান্ডা শুরু হওয়ার আগে বা শুরুতেই জিঙ্ক গ্রহণ করলে অসুস্থতার সময়কাল সামান্য কমতে পারে, তবে সব গবেষণায় একই ফল পাওয়া যায়নি।

ভিটামিন ‘সি’ যে ঠান্ডা প্রতিরোধ করতে পারে—এমন ধারণাও ভুল প্রমাণিত হয়েছে। তবে মধু কাশি উপশমে কিছুটা কার্যকর। ২০২১ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক উভয়ের ক্ষেত্রেই মধু কাশির তীব্রতা ও ঘনত্ব কমাতে সহায়তা করে। মধু সরাসরি খাওয়া হোক বা দুধ, কফি কিংবা সিরাপের সঙ্গে মিশিয়ে—সব ক্ষেত্রেই উপকার পাওয়া গেছে।

রক্তে অতিরিক্ত শর্করা ও সংক্রমণ

Feed a Cold, Starve a Fever': Is It True?

ড. সুদ আরও বলেন, যাদের রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেশি (বিশেষত ডায়াবেটিসের রোগীরা), তাদের শরীর সংক্রমণ প্রতিরোধে বেশি সময় নেয়। কারণ, উচ্চ মাত্রার রক্তশর্করা ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি বাড়িয়ে দেয়। তাই ডায়াবেটিস রোগীদের খাদ্য নিয়ন্ত্রণ আরও জরুরি।

অসুস্থ অবস্থায় তরল গ্রহণ কেন জরুরি

সব বিশেষজ্ঞই একমত—অসুস্থ অবস্থায় শরীরের জলীয় ভারসাম্য বজায় রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ঠান্ডা লাগলে শরীর থেকে মিউকাসের মাধ্যমে অতিরিক্ত তরল বেরিয়ে যায়। পর্যাপ্ত পানি পান করলে মিউকাস পাতলা হয়, ফলে নাক বন্ধ ভাব কমে।

ড. হ্যানাক বলেন, “সাধারণত দিনে দুই থেকে চার লিটার তরল গ্রহণ করা উচিত। অ্যালকোহল থেকে দূরে থাকা ভালো, কারণ এটি শরীরকে ডিহাইড্রেট করে।”

জ্বর হলে শরীর ঘাম বা ডায়রিয়ার মাধ্যমে প্রচুর তরল হারায়। তাই ইলেকট্রোলাইটযুক্ত পানীয় শরীরের হারানো খনিজ পূরণে সহায়ক। ড. সুদ পরামর্শ দেন, “যদি জ্বর ১০৩ ডিগ্রির ওপরে যায়, বা হৃদরোগ বা খিঁচুনি সমস্যা থাকে, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে এবং যদি প্রয়োজনে এসিটামিনোফেন বা আইবুপ্রোফেনের মতো ওষুধ ব্যবহার করতে হয়, তবে তা চিকিৎসকের নির্দেশেই করা উচিত।”

ড. হ্যানাকের মতে, ঠান্ডা বা হালকা জ্বরের ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা হলো বিশ্রাম ও পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ। তিনি বলেন, “বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শরীর নিজে থেকেই সেরে ওঠে। তাই হয়তো সবচেয়ে উপযুক্ত প্রবাদ হবে—‘সময়ই সব ক্ষত সারায়,’।”

 

#স্বাস্থ্য_পরামর্শ #জ্বর_ও_ঠান্ডা #পুষ্টি #খাদ্য_ও_রোগপ্রতিরোধ #সারাক্ষণ_রিপোর্ট