রিলায়েন্সের সিদ্ধান্ত: রাশিয়ান তেল আমদানি পুরোপুরি বন্ধ
ভারতের সর্ববৃহৎ রাশিয়ান তেল ক্রেতা রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ ঘোষণা করেছে যে তারা আর রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি করবে না। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন নিষেধাজ্ঞার কারণে বৃহস্পতিবার থেকে গুজরাটের জামনগর রিফাইনারিতে রাশিয়া থেকে তেল আনা বন্ধ করা হয়েছে। কোম্পানি জানিয়েছে, ১ ডিসেম্বর থেকে তাদের রিফাইনারি থেকে যেসব তেলজাত পণ্য রফতানি হবে, সেগুলো আর রাশিয়ান তেল থেকে তৈরি হবে না।
এই ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্র-ভারত বাণিজ্য আলোচনায় দীর্ঘদিনের জটিলতা কমাতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। আগস্ট মাসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়ান তেল কেনার অভিযোগে ভারতের ওপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিলেন। এতে করে ভারতের ওপর মোট শুল্ক বেড়ে দাঁড়ায় ৫০ শতাংশ—বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ হার।
যুক্তরাষ্ট্র-ভারত বাণিজ্য আলোচনায় বড় ধরনের ছাড়
রিলায়েন্সের এই সিদ্ধান্তকে ওয়াশিংটন গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছে। হোয়াইট হাউসের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, রাশিয়ান তেল থেকে সরে আসা ভারতের সিদ্ধান্তকে যুক্তরাষ্ট্র “সঠিক পথে অগ্রগতি” হিসেবে বিবেচনা করছে।

ট্রাম্প প্রশাসন বারবার বলেছে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ভারতের রাশিয়ান তেল কেনা বন্ধ করাই বাণিজ্য চুক্তি এগিয়ে নেওয়ার প্রধান শর্ত। ট্রাম্প এমনকি এই যুদ্ধকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে “মোদির যুদ্ধ” বলেও উল্লেখ করেছেন।
রিলায়েন্সের মালিক মুকেশ আম্বানি—মোদির ঘনিষ্ঠ এবং এশিয়ার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি। রিলায়েন্স ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে অন্তত ৩৩ বিলিয়ন ডলারের রাশিয়ান তেল কিনেছে, যা ওই সময় রাশিয়ার মোট তেল রফতানির প্রায় ৮ শতাংশ।
রাশিয়ান তেল কেনার ইতিহাস: দ্রুত উত্থান
ইউক্রেন যুদ্ধের আগে রিলায়েন্স খুব সামান্য পরিমাণ রাশিয়ান তেল কিনত। তবে জি-৭ ও ইইউ যখন রাশিয়ান তেলের দাম সর্বোচ্চ ৬০ ডলার নির্ধারণ করে, তখন পশ্চিমা দেশগুলোই ভারতকে ডিসকাউন্ট মূল্যে রাশিয়ার তেল কিনতে উৎসাহিত করেছিল, যাতে বাজারে সরবরাহ স্থিতিশীল থাকে।
২০২১ সালে রিলায়েন্স মাত্র ৮৫ মিলিয়ন ডলারের রাশিয়ান তেল কিনেছিল।
২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫.৫ বিলিয়ন ডলারে।
২০২৩ সালে এই ক্রয় সর্বোচ্চ ১১.৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।
২০২৪ সালে ক্রয় কমে দাঁড়ায় ৯.৮ বিলিয়ন ডলারে।
২০২৫ সালের ১২ আগস্ট পর্যন্ত রিলায়েন্স ইতোমধ্যে ৬.২ বিলিয়ন ডলারের রাশিয়ান তেল কিনে ফেলেছিল।

গত বছর রিলায়েন্স রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি রসনেফ্টের সঙ্গে ১০ বছরের চুক্তি করেছিল—যেখানে প্রতিদিন ৫ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহের কথা ছিল। এই চুক্তির বার্ষিক মূল্য প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার।
কঠোর নিষেধাজ্ঞা: রসনেফ্ট ও লুকোয়েলের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইইউর নতুন চাপ
ইউক্রেনে শান্তি আলোচনা স্থগিত হয়ে পড়ায় ট্রাম্প প্রশাসন এই অক্টোবর মাসে রসনেফ্ট ও লুকোয়েলকে সরাসরি নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও একইভাবে তাদের নিষেধাজ্ঞা কঠোর করে। এই পরিস্থিতিতে রিলায়েন্স দ্রুত রাশিয়ান তেল থেকে সরে আসতে বাধ্য হয় এবং কোম্পানি জানায়—তারা নির্ধারিত সময়ের আগেই এই পরিবর্তন সম্পন্ন করেছে।
ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ: নতুন উৎস থেকে তেল সংগ্রহ
দক্ষিণ এশিয়া বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, রিলায়েন্সের সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি বড় “ইঙ্গিতপূর্ণ পদক্ষেপ”। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, রিলায়েন্সকে এখন দ্রুতই বিকল্প উৎস খুঁজে নিতে হবে—মধ্যপ্রাচ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রই সম্ভাব্য বিকল্প।
তার ভাষায়, “এত বড় ঘাটতি এত দ্রুত পূরণ করা রিলায়েন্সের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে। এটি কোম্পানির জন্য যথেষ্ট কঠিন একটি ধাক্কা।”
# রাশিয়া_ভারত_তেল আমদানি_বিদেশনীতি_বাণিজ্য_যুক্
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















