বেয়ারহ্যান্ডস তাদের দ্বিতীয় শোরুম খুলেছে তাকাশিমায়া শপিং সেন্টারে। সিঙ্গাপুরের এই ফ্যাশন লেবেল শুধু পোশাক ও অ্যাক্সেসরিজ তৈরি করে না—উদ্বাস্তু ও আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা কারিগরদের কাজের সুযোগ দিয়ে তাদের জীবনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করে। প্রতিটি পণ্যই গড়ে ওঠে দক্ষ কারিগরদের হাতে।
নতুন স্টোরে স্টাইল ও গল্পের সমন্বয়
বেয়ারহ্যান্ডসের নতুন স্টোর সাজানো হয়েছে কাঠের অভিনব নকশায় এবং মাস্টার্ড রঙের আকর্ষণীয় দেওয়ালে। দোকানে পাওয়া যায় স্টাইলিশ লিনেন পোশাক, রঙিন প্রিন্ট, টেনসেল ফ্যাব্রিকের প্যান্ট এবং হস্তনির্মিত ব্যাগ—সবই দক্ষ কারিগরদের হাতে তৈরি।
পোশাকের কেয়ার লেবেলে থাকা কিউআর কোড স্ক্যান করলে পাওয়া যায় সেই পণ্যের নির্মাতার ব্যক্তিগত গল্প। যেমন—হালকা নীল রঙের একটি ড্রেস তৈরি করেছেন মালয়েশিয়ায় বসবাসরত আফগান উদ্বাস্তু জাহরা এক্স। ব্র্যান্ডের প্রায় ৯৫ শতাংশ পোশাকই তৈরি করেন এই উদ্বাস্তু টেইলার কমিউনিটির সদস্যরা। সাম্প্রতিক সময়ে জনপ্রিয় হওয়া বোনা পাউচ তৈরি করেন যুদ্ধবিধ্বস্ত মিয়ানমারের চর্মশিল্পী কারিগররা।
মিশন-ভিত্তিক ব্র্যান্ডের বৃদ্ধি
সহ-প্রতিষ্ঠাতা শেনেল গো ও জারমেইন লায় জানান, ছয় বছর ধরে তাদের মূল লক্ষ্য ছিল প্রান্তিক মানুষের জীবিকা নিশ্চিত করা। ব্র্যান্ডটি অনলাইনে শুরু হয়েছিল ২০১৯ সালে এবং প্রথম ফিজিক্যাল স্টোর খোলে ২০২৩ সালে ফুনান মলে। এরপর ২০২৫ সালের ১৪ নভেম্বর তাকাশিমায়া আউটলেট উদ্বোধনের মাধ্যমে ব্যবসা আরও প্রসারিত হয়।
লায় জানান, এই কয়েক বছরে তাদের আয় তিন গুণ বেড়েছে এবং ই-মেইল সাবস্ক্রাইবারও তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। নতুন স্টোরে প্রস্তুত পোশাক বিক্রি হলেও চাইলে ক্রেতারা ডিআইওয়াই কর্নারে অর্ডার-অনুযায়ী পোশাক তৈরির সুবিধাও পাচ্ছেন।
৬ থেকে ২১০ ডলার পর্যন্ত দামের কারণে বিভিন্ন ধরনের ক্রেতার কাছে বেয়ারহ্যান্ডসের পণ্য আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। বিশেষ করে ২৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সী গ্রাহকদের কাছে ব্র্যান্ডটি অত্যন্ত জনপ্রিয়—যা সামাজিক উদ্যোক্তাদের জন্য বিরল সাফল্য।

ফ্যাশনের চেয়ে বড় উদ্দেশ্য
বেয়ারহ্যান্ডস শুধু একটি ফ্যাশন ব্র্যান্ড নয়—এটি সামাজিক প্রভাব তৈরির একটি উদ্যোগ। প্রতিষ্ঠাতাদের ভাষায়, তাদের আগ্রহ ফ্যাশনের চেয়ে বেশি মানুষের জীবনে অর্থবহ পরিবর্তন আনা।
তারা সবচেয়ে বেশি গর্ব করেন আফগান উদ্বাস্তু মি. জামশিদের কথা। ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন বেয়ারহ্যান্ডসের প্রধান টেইলার। তার দক্ষতা ও আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়ে ব্র্যান্ডটি পোশাক ডিজাইন থেকে মার্কেটিং পর্যন্ত সব খরচ বহন করে। পরে তিনিই মালয়েশিয়ায় উদ্বাস্তু টেইলারদের প্রথম দল গঠনে সহায়তা করেন।
বর্তমানে জামশিদ অস্ট্রেলিয়ার স্থায়ী বাসিন্দা। জাতিসংঘে তার পুনর্বাসন আবেদনে বেয়ারহ্যান্ডস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এরপর আরও তিনজন উদ্বাস্তু টেইলার পুনর্বাসনের সুযোগ পেয়েছেন।
জারমেইন আবেগ নিয়ে বলেন, “এই কাজটিই আমাদের অস্তিত্বের কারণ।”
শেনেল গো যোগ করেন, “অর্থপূর্ণ কাজ মানুষের জীবনে মর্যাদা, আত্মবিশ্বাস এবং পরিবারের জন্য সহায়তার সুযোগ তৈরি করে—এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী।”
বেয়ারহ্যান্ডসের পথচলা
শুরুর দিকে ব্র্যান্ডটি প্রায় ২০০ জন কারিগরের সঙ্গে কাজ করত—যাদের অনেকেই ছিলেন নতুন। এখন তারা সংখ্যার চেয়ে মান এবং প্রভাবকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। বর্তমানে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মিয়ানমার ও ফিলিপাইনে মোট ৩০ জন দক্ষ কারিগরের সঙ্গে কাজ করছে বেয়ারহ্যান্ডস।
সিঙ্গাপুরে তারা কাজ দেয় একক মাদের এবং স্থানীয় বধির কমিউনিটিকে। প্রতিষ্ঠাতাদের মতে, এসব কারিগরের দক্ষতা ও প্রতিশ্রুতি ব্র্যান্ডকে আরও শক্তিশালী করেছে।
দুই প্রতিষ্ঠাতাই জীবনের শুরুতে ভিন্ন পেশার স্বপ্ন দেখেছিলেন—লায় হতে চেয়েছিলেন ইন্টেরিয়র ডিজাইনার, আর গো হতে চেয়েছিলেন চিকিৎসক। কিন্তু কিশোর বয়সে বিদেশে স্বেচ্ছাসেবী অভিজ্ঞতা তাদের জীবনদর্শন বদলে দেয়।
লায় বলেন, সুখ শুধু বস্তুগত সাফল্যে সীমাবদ্ধ নয়। গো বলেন, “আমি সচ্ছল পরিবারে বড় হয়েছি। কিন্তু যাদের জন্ম ভিন্ন পরিবেশে, তারা কেন ন্যূনতম প্রয়োজনেও বঞ্চিত হবে? কিছু না করা অন্যায় মনে হয়েছে।”
স্টোরের ঠিকানা
বেয়ারহ্যান্ডস
ব্লক: B2-10A/11
তাকাশিমায়া শপিং সেন্টার, নিগি আন্ন সিটি
৩৯১ অরচার্ড রোড, সিঙ্গাপুর
সময়: প্রতিদিন সকাল ১০টা–রাত ৯:৩০টা
#Barehands #SingaporeFashion #SocialImpact #RefugeeArtisans
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















