মিয়ানমার সংকট
মিয়ানমারের সামনে থাকা সাধারণ নির্বাচনকে ঘিরে দেশজুড়ে উৎসাহ অনেকটাই নিস্তেজ হয়ে গেছে। নতুন করে জারি হওয়া কঠোর আইন, বিরোধীদের দমন-পীড়ন, চলমান গৃহযুদ্ধ এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে মানুষ আগ্রহ হারাচ্ছে। রাজনৈতিক সমাবেশে অংশগ্রহণ কম, বিতর্ক নেই বললেই চলে, আর জনগণের মনোযোগ ভোটের চেয়ে যুদ্ধের ভবিষ্যৎ ঘিরে উদ্বেগেই বেশি।
নির্বাচন ঘিরে ভয়ের পরিবেশ
জুলাইয়ে নতুন করে পাস হওয়া নির্বাচনী সুরক্ষা আইনকে অনেকেই ভয় দেখানোর অস্ত্র হিসেবে দেখছেন। এই আইন অনুযায়ী, নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে সমালোচনা করলে ২০ বছর কারাদণ্ড থেকে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট থেকে কমপক্ষে ৯৪ জনকে এই আইনে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে অন্তত চারজন শিশু।
সমালোচনার মুখে সামরিক সরকার সম্প্রতি ৩,০৮৫ রাজনৈতিক বন্দিকে মুক্তি দিয়েছে এবং আরও ৫,৫০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার করেছে।
ধাপে ধাপে নির্বাচন, কিন্তু অর্ধেক দেশ অশান্ত
৩৩০টি টাউনশিপের মধ্যে ৫৬টি নিরাপত্তাজনিত কারণে ভোটের বাইরে রাখা হয়েছে।
প্রথম দফা নির্বাচন ২৮ ডিসেম্বর ১০২টি টাউনশিপে, দ্বিতীয় দফা ১১ জানুয়ারি ১০০টি টাউনশিপে হবে। তৃতীয় ধাপ দ্বিতীয় দফার দুই সপ্তাহ পর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।
পশ্চিমা দেশগুলো, জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই নির্বাচনকে ভুয়া বলে অভিহিত করেছে। সমালোচনার জবাবে ক্ষমতাসীন জেনারেল মিন অং হ্লাইং গত সপ্তাহে বেলারুশের প্রেসিডেন্টকে স্বাগত জানিয়ে নিজের বৈধতা বাড়ানোর চেষ্টা করেন।
এএসইএনের অবস্থান
ফিলিপাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, এএসইএন মনে করে—২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর যে গৃহযুদ্ধ আরও বেড়েছে, তা না থামলে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না।
এএসইএন পর্যবেক্ষক পাঠানোর পরিকল্পনাও করছে না।
বিরোধী দল ছাড়া একঘেয়ে প্রচার
৫৭টি রাজনৈতিক দল প্রার্থী দিয়েছে, কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে লড়ছে মাত্র ছয়টি দল।
বেশিরভাগ বড় দল, বিশেষ করে অং সান সুচির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি), নির্বাচন থেকে বাদ পড়েছে।
২০২৩ সালে এনএলডিকে জোরপূর্বক বাতিল করে দেওয়া হয়।
একজন ইয়াঙ্গুনবাসী বলেন, প্রচারে কোনো উত্তেজনা নেই।
তিনি বলেন, “যেসব দল মাঠে নেমেছে, তাদের প্রতিশ্রুতিগুলো খুব দুর্বল। তারা কথা বলতে ভয় পায়।”
নতুন প্রার্থীদের আশা ও বাস্তবতা
পিপলস পাইওনিয়ার পার্টির প্রার্থী হ্টেট হ্টেট সো উ বলেন,
“ভোট না দিলে এমন কাউকে জেতাতে সাহায্য করা হবে যাকে মানুষ পছন্দ করে না। তাই অন্তত মানুষ ভোট দিতে যাক—যে দলকেই চাই না কেন।”
আগে খাদ্য ব্যবসায় যুক্ত এই ৩৬ বছর বয়সী নারী বলেন, তিনি রাজনীতি না জানলেও মানুষের দুঃখ–দুর্দশা দেখেই নির্বাচনে এসেছেন।
“আমি গরীবদের পাশে থাকতে চাই। যেখানেই থাকি, দায়িত্ব পালন করাই আমার লক্ষ্য,” তিনি বলেন।
অন্যদিকে, ২০২০ সালের নির্বাচনে বিজয়ী এনএলডির এক সাবেক এমপি বলেন,
“এ সবই কেবল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ধোঁকা দেওয়ার অভিনয়।
এটি একতরফা ক্ষমতা দখলের চেষ্টা—জনগণের স্বার্থ এখানে নেই। মানুষ এই ফল মানবে না।”
যুদ্ধের ভয়, ভোটে আগ্রহ কম
মধ্য মিয়ানমারের যুদ্ধক্ষেত্রে কাজ করা এক সাংবাদিক বলেন,
“মানুষ ভোট নিয়ে নয়, যুদ্ধ থামবে কি না—এটা নিয়েই বেশি আলোচনায়।
নির্বাচনের সময় যত এগিয়ে আসছে, হামলাও বাড়ছে। এটাই বড় আতঙ্ক।”
একজন সফল ব্যবসায়ী তবে আশা দেখছেন যে নির্বাচনের পর বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে কিছু শিথিলতা আসতে পারে।
তরুণদের আশা ভঙ্গ
রাজনৈতিক অস্থিরতা, ধ্বংসপ্রায় অর্থনীতি, শিক্ষা ও চাকরি সংকট—এসব কারণে তরুণরা দেশ ছাড়ছে।
২০২৪ সালে বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ আইন জারি হওয়ার পর যুবদের দেশত্যাগ আরও বেড়েছে।
পড়াশোনার জন্য প্রতিবেশী দেশে যাওয়া এক তরুণ বলেন,
“মিয়ানমারে থাকা মানে সব সময় ভয় নিয়ে বাঁচা—গ্রেপ্তার, লুটপাট, মাদক খাইয়ে দেওয়া—যে কোনো কিছু হতে পারে।
অর্থ থাকলেও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, ন্যায়ের আশাও নেই।
এ অবস্থায় ভবিষ্যৎ ভাবার সুযোগই নেই।”
মানুষের অনাগ্রহ, ভয়, অনিশ্চয়তা ও গৃহযুদ্ধ—সবকিছুর মধ্যে মিয়ানমারের নির্বাচন এক নিস্তরঙ্গ প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে।
বিরোধীরা নেই, স্বাধীন মত প্রকাশ নেই, আর নাগরিকদের আশা ক্ষীণ।
এই নির্বাচন আদৌ কোনো পরিবর্তন আনতে পারবে কি না—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
#MyanmarElection #MilitaryRule #ASEAN #CivilWar #HumanRights #MyanmarCrisis #Democracy ##Myanmar #Election2025 #SarakKhonReport
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















