০৬:৪৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩০ নভেম্বর ২০২৫
সচিবালয়ের ৯ তলায় আগুন, দ্রুত নিভানো হয়েছে রয়টার্সের প্রতিবেদন: বাংলাদেশের বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া সংকটাপন্ন অবস্থায়, নির্বাসিত ছেলে বললেন—দেশে ফেরা তার নিয়ন্ত্রণে নয় খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা অপরিবর্তিত রয়েছে: রিজভী ডিসেম্বর ২০২৫-এর জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতে পেট্রোল ও ডিজেলের নতুন দাম ঘোষণা, দাম বেড়েছে সব ধরনের প্রতিটির রংপুর-নীলফামারী রুটে অনির্দিষ্টকালের জন্য বাস চলাচল বন্ধ খালেদা জিয়ার দ্রুত সুস্থতা কামনায় ঢাকেশ্বরী মন্দিরে বিশেষ প্রার্থনা জামায়াতের নায়েবে আমির হলেন এটিএম আজহার লাইনচ্যুতির চার ঘণ্টা পর সিলেটের রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক কেন কিছু ক্রিকেটারকে বিপিএলের নিলাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হলো বঞ্চনার অভিযোগে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মানববন্ধন

জিন্নাহর ফেডারেল কোর্ট ছিল এক সেতু: ২৭তম সংশোধনী সেই সেতুটি পুড়িয়ে দিল

জিন্নাহর সংকীর্ণ, সংবিধান-নির্দিষ্ট এখতিয়ারসহ একটি ফেডারেল কোর্টের প্রতি পছন্দ মূলত ছিল রাজনৈতিক প্রয়োজনের ফল—সংবিধানগত দর্শনের নয়।

পাকিস্তানে ২৭তম সংশোধনীর ঘোষণায় দেশের সাংবিধানিক কাঠামোতে এক স্পষ্ট বিচ্ছেদ ঘটেছে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা বড় ধরনের কাটছাঁটের মুখে পড়েছে।

মৌলিক অধিকার প্রয়োগের এখতিয়ার এবং আমাদের সাংবিধানিক শৃঙ্খলার মূল প্রশ্নগুলোর উপর সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, ফলে যে আদালত একসময় আমাদের মৌলিক স্বাধীনতার সর্বোচ্চ প্রহরী ছিল, এখন ‘সুপ্রিম’ বিশেষণে মূলত নামমাত্র মর্যাদাই অবশিষ্ট আছে।

তবে উপমহাদেশে ফেডারেল কোর্ট প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন এই প্রথম নয়।


সর্বভারতীয় ফেডারেশনের জন্য

১৯৩৫ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট Government of India Act প্রণয়ন করে। এর নানা নতুনত্বের মধ্যে অন্যতম ছিল—নবীন ভারতীয় ফেডারেশনের জন্য একটি ফেডারেল কোর্ট প্রতিষ্ঠা। প্রথমবারের মতো ভারতেই উচ্চ আদালতগুলোর নির্দিষ্ট কিছু আপিল শুনানির জন্য একটি উচ্চতর আদালত প্রতিষ্ঠিত হলো।

কিন্তু নতুন আদালতটির এখতিয়ার ইচ্ছাকৃতভাবেই সংকীর্ণ রাখা হয়েছিল: এর কাজ ছিল ফেডারেশনের স্থাপত্যগত কাঠামো থেকে উদ্ভূত বিরোধ—অর্থাৎ কেন্দ্র, প্রদেশ ও দেশীয় রাজ্যগুলোর মধ্যে ক্ষমতা-বণ্টন সংক্রান্ত বিবাদ নিষ্পত্তি করা। মৌলিক অধিকার তখন বিচারযোগ্য রূপে অস্তিত্বই রাখত না, তাই সেগুলো বলবৎ করার কোনো ভূমিকা ছিল না। আদালতটি ছিল যুক্তরাজ্যের প্রিভি কাউন্সিলের অধীনস্থ, যা শেষ কথা বলত।

ফেডারেল কোর্ট গঠনের তাগিদ মূলত ১৯৩০-এর দশকের সর্বভারতীয় ফেডারেশন প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা থেকে আসে। ধারণাটি ১৯৩০ থেকে ১৯৩২ সালের রাউন্ড টেবিল সম্মেলনগুলোতে আকার পায়—যেখানে ব্রিটিশ ভারত এবং দেশীয় রাজ্যগুলোর প্রতিনিধিরা আত্মশাসনের রূপরেখা তৈরি করতে একত্র হয়েছিলেন।

 Allama Iqbal (centre; right in his characteristic headgear) sitting alongside Quaid-i-Azam Mohammad Ali Jinnah at the Round Table Conference in London (above). | Photo: The Allama Iqbal Collection

সম্মেলনগুলো সাইমন কমিশনের ১৯৩০ সালের রিপোর্টের ধারাবাহিকতা ছিল। ওই রিপোর্টে বলা হয়—যে কোনো অর্থবহ সংবিধানিক সমাধান চাইলে দেশীয় রাজ্যগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। কিন্তু কমিশনে কোনো ভারতীয় সদস্য না থাকায় ব্যাপক বিতর্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

মুসলিম লীগ ও কংগ্রেস উভয়ই রিপোর্টটি প্রত্যাখ্যান করে। নেহরু নিজস্ব একটি প্রতিবেদন দিলেও মুসলিমদের উদ্বেগ সমাধানে ব্যর্থ হন। ফলে জিন্নাহ তাঁর “চৌদ্দ দফা” প্রকাশ্যে আনেন—যেখানে ফেডারেল কাঠামো, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন, সংখ্যালঘু সুরক্ষা এবং দেশীয় রাজ্যগুলোর অবস্থান নিয়ে ধারাবাহিক প্রস্তাব ছিল।

তখন ভারতের প্রতিটি প্রদেশের উচ্চ আদালতগুলো কার্যত সর্বোচ্চ আদালত হিসেবেই কাজ করত। দেশীয়ভাবে কোনো সুপ্রিম কোর্ট ছিল না—তাদের ওপরে কেবল দূরবর্তী প্রিভি কাউন্সিল।

এই কারণেই ১৯৩০ সালের প্রথম রাউন্ড টেবিল সম্মেলনে একটি সর্বোচ্চ আদালত বা ফেডারেল আদালত প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা স্বাভাবিকভাবেই আলোচনায় উঠে আসে। লর্ড চ্যান্সেলর জন স্যাঙ্কে মন্তব্য করেন—কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও আমেরিকার মতো যে কোনো ফেডারেশনের কেন্দ্রে একটি ফেডারেল কোর্ট থাকা আবশ্যক।

১৯৩১ সালের দ্বিতীয় রাউন্ড টেবিল সম্মেলনের ফেডারেল স্ট্রাকচার কমিটিতে মূল কাজ এগোয়। প্রতিনিধিরা একমত হন—নতুন সংবিধানের ব্যাখ্যা এবং ফেডারেল কাঠামো থেকে উদ্ভূত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য একটি নতুন আদালত প্রয়োজন।

তবে ভিন্নমত ছিল—এই নতুন আদালত কি সাধারণ আপিলও শুনবে, নাকি কেবল ফেডারেল বিষয়াদি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকবে? কারও মতে সব আপিল এক প্রতিষ্ঠানে কেন্দ্রীভূত করা উচিত, অন্যদের মতে সীমিত এখতিয়ার দিয়ে ধীরে ধীরে শুরু করাই বুদ্ধিমানের কাজ।


রাজনৈতিক প্রয়োজন

এই আলোচনায় জিন্নাহ ছিলেন পরিমিত ও অনুসন্ধিৎসু অংশগ্রহণকারী। তাঁর বক্তব্যগুলো দেখায়—তিনি সর্বভারতীয় ফেডারেশনের নাজুক রাজনৈতিক স্থাপত্য নিয়ে গভীরভাবে চিন্তিত ছিলেন। তিনি বলেন—“যে প্রশ্নটি আমরা বিবেচনা করছি, তা একেবারেই ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে… কারণ আমরা এখন সর্বভারতীয় ফেডারেশনের ভিত্তিতেই এগোচ্ছি।”

জিন্নাহর প্রধান উদ্বেগ ছিল দেশীয় রাজ্যগুলো নিয়ে—তারা কোনোভাবেই চাইছিল না যে তাদের সাধারণ দেওয়ানি মামলাও ফেডারেল কোর্টে আপিল হোক। জিন্নাহ বলেন—যে আদালতে ভারতের এক-তৃতীয়াংশ অঞ্চলই নিজেদের বিচার সোপর্দ করতে রাজি নয়, সেই আদালতের বিস্তৃত আপিল এখতিয়ার থাকা বাস্তবসম্মত নয়।

তবে তিনি যোগ করেন—তিনি ব্যক্তি হিসেবে সবসময়ই একটি সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠার পক্ষে ছিলেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন—

“ব্যক্তিগতভাবে বলছি, আমি সবসময় সুপ্রিম কোর্টের পক্ষপাতী ছিলাম… ১৯২১ সাল থেকেই এ প্রশ্নে আলোচনা হয়েছে, এবং আমরা বহুবার আইনসভার মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছি। কিন্তু তখন পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল—আমরা তখন কেবল ব্রিটিশ ভারতকে বিবেচনায় রাখছিলাম, এবং আজকের মতো জটিলতা তখন ছিল না।”

এখানেই জিন্নাহর কৌশল পরিষ্কার হয়ে ওঠে। তিনি সংকীর্ণ এখতিয়ারযুক্ত ফেডারেল কোর্টের ধারণা গ্রহণ করেছিলেন রাজনৈতিক প্রয়োজনের কারণে, যাতে দেশীয় রাজ্যগুলো ফেডারেশনে যোগ দিতে সায় দেয়। তারা কখনোই একটি পূর্ণাঙ্গ আপিল আদালতের অধীনে আসতে রাজি হতো না।

অতএব সীমিত এখতিয়ার ফেডারেল কোর্ট ছিল একটি অস্থায়ী সমঝোতা—রাষ্ট্র গঠনের জটিল বাস্তবতায় দেশীয় রাজ্যগুলোকে আলোচনার টেবিলে ধরে রাখার একটি উপায়। কিন্তু জিন্নাহর লক্ষ্য ছিল স্পষ্টঃ একসময় ভারতের নিজস্ব একটি পূর্ণাঙ্গ সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠা করা, যা প্রিভি কাউন্সিলের বিকল্প হবে।

কমিটির আলোচনা যত এগিয়েছে, জিন্নাহ ততই স্পষ্টভাবে বলেছেন—শুরুতে ফেডারেল কোর্টকে শুধু সংবিধান-সংক্রান্ত “মূল এখতিয়ার”-এ সীমাবদ্ধ রাখা উচিত, যাতে বৃহত্তর ফেডারেশন গঠনের সমঝোতা নষ্ট না হয়। তিনি বলেন—

“আপনি হয়তো অবাক হবেন, কিন্তু আমাদের এই কাঠামোটিকে তিন ভাগে ভাগ করে এগোতে হবে… ফেডারেল কোর্টকে সংবিধানসংক্রান্ত মামলাতেই সীমাবদ্ধ রাখতে হবে।”

Jinnah, justice and the law

চূড়ান্ত লক্ষ্য

কিন্তু জিন্নাহ এই সীমিত সূচনাকে সঙ্গে সঙ্গেই বৃহত্তর ভবিষ্যতের দিকে যুক্ত করেন। তিনি একটি ধারাবাহিক রূপকল্প দেন—

১. প্রথমে সংকীর্ণ ফেডারেল কোর্ট
২. এরপর প্রিভি কাউন্সিলের সমমানের দেওয়ানি আপিল এখতিয়ারসহ পূর্ণাঙ্গ সুপ্রিম কোর্ট
৩. পরে অপরাধ-সংক্রান্ত আপিল এখতিয়ার
৪. এবং শেষ পর্যন্ত এমন একটি শীর্ষ আদালত, যেটিকে দেশীয় রাজ্যগুলোও স্বেচ্ছায় গ্রহণ করবে

তিনি বলেন—

“আমরা প্রিভি কাউন্সিলের সমমর্যাদার এখতিয়ারসহ একটি আলাদা সুপ্রিম কোর্টের ধারণা বিকশিত করি… এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সুপ্রিম কোর্ট দেশীয় রাজ্যগুলোর আস্থাও অর্জন করবে।”

কমিটির কাজের শেষ দিকে জিন্নাহ জোর দিয়ে বলেন—ফেডারেল কোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের পৃথকীকরণ কেবল অস্থায়ী—ফেডারেশন গঠনের প্রয়োজনেই এটি করা হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত ভারতকে তার নিজের সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এগোতেই হবে—যেমন অন্যান্য ডমিনিয়ন করেছে। কোনো জাতি চিরদিন প্রিভি কাউন্সিলের সঙ্গে বাঁধা থাকতে পারে না।

তিনি বলেন—

“সবচেয়ে বড় কথা, আমি বুঝতে পারি না ভারত তার নিজস্ব সুপ্রিম কোর্টের আকাঙ্ক্ষা কেন পোষণ করবে না। অন্যান্য ডমিনিয়নের আছে—তাহলে আমাদের কেন নয়?”


ধারণার স্থায়িত্ব

যদিও রাউন্ড টেবিল সম্মেলন বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রশ্নে ব্যর্থ হয়, ফেডারেল কোর্টের ধারণা টিকে থাকে। এটি ব্রিটিশ সরকারের হোয়াইট পেপারে অন্তর্ভুক্ত হয়, পরে যৌথ সংসদীয় কমিটিতে পর্যালোচনা হয় এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৩৫ সালের আইনেও প্রবেশ করে।

কমিটি এখতিয়ার–সংঘাত এড়াতে সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠা স্থগিত রাখে, তবে সময়ের সঙ্গে ফেডারেল কোর্টের ক্ষমতা বাড়ানোর সুপারিশ করে। ইতিমধ্যে এই ধারণাই পাকিস্তানের ১৯৫৬ সালের সংবিধানে সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরি করে—যার ক্ষমতা ছিল মৌলিক অধিকার প্রয়োগ এবং উচ্চ আদালতগুলো থেকে আসা সাধারণ আপিল শুনানি।

রাউন্ড টেবিল সম্মেলনে জিন্নাহর সংকীর্ণ ফেডারেল কোর্ট গ্রহণ ছিল তাই একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা—ফেডারেশন গঠনের স্বার্থে নেওয়া। তাঁর চূড়ান্ত উদ্দেশ্য ছিল একটি প্রকৃত, পূর্ণাঙ্গ, সার্বভৌম সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠা।

তার প্রস্তাবগুলো দেখায়—তিনি এমন একজন রাষ্ট্রনায়ক, যিনি বৈচিত্র্যময় উপমহাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়ানো দীর্ঘস্থায়ী প্রতিষ্ঠান গঠনের দিকে মনোযোগী ছিলেন। তার লক্ষ্য ছিল ঐক্য সৃষ্টি ও স্থায়িত্ব তৈরি—বিদ্যমান প্রতিষ্ঠান ভেঙে ফেলা নয়।

জনপ্রিয় সংবাদ

সচিবালয়ের ৯ তলায় আগুন, দ্রুত নিভানো হয়েছে

জিন্নাহর ফেডারেল কোর্ট ছিল এক সেতু: ২৭তম সংশোধনী সেই সেতুটি পুড়িয়ে দিল

০৫:২৭:৪৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩০ নভেম্বর ২০২৫

জিন্নাহর সংকীর্ণ, সংবিধান-নির্দিষ্ট এখতিয়ারসহ একটি ফেডারেল কোর্টের প্রতি পছন্দ মূলত ছিল রাজনৈতিক প্রয়োজনের ফল—সংবিধানগত দর্শনের নয়।

পাকিস্তানে ২৭তম সংশোধনীর ঘোষণায় দেশের সাংবিধানিক কাঠামোতে এক স্পষ্ট বিচ্ছেদ ঘটেছে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা বড় ধরনের কাটছাঁটের মুখে পড়েছে।

মৌলিক অধিকার প্রয়োগের এখতিয়ার এবং আমাদের সাংবিধানিক শৃঙ্খলার মূল প্রশ্নগুলোর উপর সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, ফলে যে আদালত একসময় আমাদের মৌলিক স্বাধীনতার সর্বোচ্চ প্রহরী ছিল, এখন ‘সুপ্রিম’ বিশেষণে মূলত নামমাত্র মর্যাদাই অবশিষ্ট আছে।

তবে উপমহাদেশে ফেডারেল কোর্ট প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন এই প্রথম নয়।


সর্বভারতীয় ফেডারেশনের জন্য

১৯৩৫ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট Government of India Act প্রণয়ন করে। এর নানা নতুনত্বের মধ্যে অন্যতম ছিল—নবীন ভারতীয় ফেডারেশনের জন্য একটি ফেডারেল কোর্ট প্রতিষ্ঠা। প্রথমবারের মতো ভারতেই উচ্চ আদালতগুলোর নির্দিষ্ট কিছু আপিল শুনানির জন্য একটি উচ্চতর আদালত প্রতিষ্ঠিত হলো।

কিন্তু নতুন আদালতটির এখতিয়ার ইচ্ছাকৃতভাবেই সংকীর্ণ রাখা হয়েছিল: এর কাজ ছিল ফেডারেশনের স্থাপত্যগত কাঠামো থেকে উদ্ভূত বিরোধ—অর্থাৎ কেন্দ্র, প্রদেশ ও দেশীয় রাজ্যগুলোর মধ্যে ক্ষমতা-বণ্টন সংক্রান্ত বিবাদ নিষ্পত্তি করা। মৌলিক অধিকার তখন বিচারযোগ্য রূপে অস্তিত্বই রাখত না, তাই সেগুলো বলবৎ করার কোনো ভূমিকা ছিল না। আদালতটি ছিল যুক্তরাজ্যের প্রিভি কাউন্সিলের অধীনস্থ, যা শেষ কথা বলত।

ফেডারেল কোর্ট গঠনের তাগিদ মূলত ১৯৩০-এর দশকের সর্বভারতীয় ফেডারেশন প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা থেকে আসে। ধারণাটি ১৯৩০ থেকে ১৯৩২ সালের রাউন্ড টেবিল সম্মেলনগুলোতে আকার পায়—যেখানে ব্রিটিশ ভারত এবং দেশীয় রাজ্যগুলোর প্রতিনিধিরা আত্মশাসনের রূপরেখা তৈরি করতে একত্র হয়েছিলেন।

 Allama Iqbal (centre; right in his characteristic headgear) sitting alongside Quaid-i-Azam Mohammad Ali Jinnah at the Round Table Conference in London (above). | Photo: The Allama Iqbal Collection

সম্মেলনগুলো সাইমন কমিশনের ১৯৩০ সালের রিপোর্টের ধারাবাহিকতা ছিল। ওই রিপোর্টে বলা হয়—যে কোনো অর্থবহ সংবিধানিক সমাধান চাইলে দেশীয় রাজ্যগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। কিন্তু কমিশনে কোনো ভারতীয় সদস্য না থাকায় ব্যাপক বিতর্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

মুসলিম লীগ ও কংগ্রেস উভয়ই রিপোর্টটি প্রত্যাখ্যান করে। নেহরু নিজস্ব একটি প্রতিবেদন দিলেও মুসলিমদের উদ্বেগ সমাধানে ব্যর্থ হন। ফলে জিন্নাহ তাঁর “চৌদ্দ দফা” প্রকাশ্যে আনেন—যেখানে ফেডারেল কাঠামো, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন, সংখ্যালঘু সুরক্ষা এবং দেশীয় রাজ্যগুলোর অবস্থান নিয়ে ধারাবাহিক প্রস্তাব ছিল।

তখন ভারতের প্রতিটি প্রদেশের উচ্চ আদালতগুলো কার্যত সর্বোচ্চ আদালত হিসেবেই কাজ করত। দেশীয়ভাবে কোনো সুপ্রিম কোর্ট ছিল না—তাদের ওপরে কেবল দূরবর্তী প্রিভি কাউন্সিল।

এই কারণেই ১৯৩০ সালের প্রথম রাউন্ড টেবিল সম্মেলনে একটি সর্বোচ্চ আদালত বা ফেডারেল আদালত প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা স্বাভাবিকভাবেই আলোচনায় উঠে আসে। লর্ড চ্যান্সেলর জন স্যাঙ্কে মন্তব্য করেন—কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও আমেরিকার মতো যে কোনো ফেডারেশনের কেন্দ্রে একটি ফেডারেল কোর্ট থাকা আবশ্যক।

১৯৩১ সালের দ্বিতীয় রাউন্ড টেবিল সম্মেলনের ফেডারেল স্ট্রাকচার কমিটিতে মূল কাজ এগোয়। প্রতিনিধিরা একমত হন—নতুন সংবিধানের ব্যাখ্যা এবং ফেডারেল কাঠামো থেকে উদ্ভূত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য একটি নতুন আদালত প্রয়োজন।

তবে ভিন্নমত ছিল—এই নতুন আদালত কি সাধারণ আপিলও শুনবে, নাকি কেবল ফেডারেল বিষয়াদি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকবে? কারও মতে সব আপিল এক প্রতিষ্ঠানে কেন্দ্রীভূত করা উচিত, অন্যদের মতে সীমিত এখতিয়ার দিয়ে ধীরে ধীরে শুরু করাই বুদ্ধিমানের কাজ।


রাজনৈতিক প্রয়োজন

এই আলোচনায় জিন্নাহ ছিলেন পরিমিত ও অনুসন্ধিৎসু অংশগ্রহণকারী। তাঁর বক্তব্যগুলো দেখায়—তিনি সর্বভারতীয় ফেডারেশনের নাজুক রাজনৈতিক স্থাপত্য নিয়ে গভীরভাবে চিন্তিত ছিলেন। তিনি বলেন—“যে প্রশ্নটি আমরা বিবেচনা করছি, তা একেবারেই ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে… কারণ আমরা এখন সর্বভারতীয় ফেডারেশনের ভিত্তিতেই এগোচ্ছি।”

জিন্নাহর প্রধান উদ্বেগ ছিল দেশীয় রাজ্যগুলো নিয়ে—তারা কোনোভাবেই চাইছিল না যে তাদের সাধারণ দেওয়ানি মামলাও ফেডারেল কোর্টে আপিল হোক। জিন্নাহ বলেন—যে আদালতে ভারতের এক-তৃতীয়াংশ অঞ্চলই নিজেদের বিচার সোপর্দ করতে রাজি নয়, সেই আদালতের বিস্তৃত আপিল এখতিয়ার থাকা বাস্তবসম্মত নয়।

তবে তিনি যোগ করেন—তিনি ব্যক্তি হিসেবে সবসময়ই একটি সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠার পক্ষে ছিলেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন—

“ব্যক্তিগতভাবে বলছি, আমি সবসময় সুপ্রিম কোর্টের পক্ষপাতী ছিলাম… ১৯২১ সাল থেকেই এ প্রশ্নে আলোচনা হয়েছে, এবং আমরা বহুবার আইনসভার মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছি। কিন্তু তখন পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল—আমরা তখন কেবল ব্রিটিশ ভারতকে বিবেচনায় রাখছিলাম, এবং আজকের মতো জটিলতা তখন ছিল না।”

এখানেই জিন্নাহর কৌশল পরিষ্কার হয়ে ওঠে। তিনি সংকীর্ণ এখতিয়ারযুক্ত ফেডারেল কোর্টের ধারণা গ্রহণ করেছিলেন রাজনৈতিক প্রয়োজনের কারণে, যাতে দেশীয় রাজ্যগুলো ফেডারেশনে যোগ দিতে সায় দেয়। তারা কখনোই একটি পূর্ণাঙ্গ আপিল আদালতের অধীনে আসতে রাজি হতো না।

অতএব সীমিত এখতিয়ার ফেডারেল কোর্ট ছিল একটি অস্থায়ী সমঝোতা—রাষ্ট্র গঠনের জটিল বাস্তবতায় দেশীয় রাজ্যগুলোকে আলোচনার টেবিলে ধরে রাখার একটি উপায়। কিন্তু জিন্নাহর লক্ষ্য ছিল স্পষ্টঃ একসময় ভারতের নিজস্ব একটি পূর্ণাঙ্গ সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠা করা, যা প্রিভি কাউন্সিলের বিকল্প হবে।

কমিটির আলোচনা যত এগিয়েছে, জিন্নাহ ততই স্পষ্টভাবে বলেছেন—শুরুতে ফেডারেল কোর্টকে শুধু সংবিধান-সংক্রান্ত “মূল এখতিয়ার”-এ সীমাবদ্ধ রাখা উচিত, যাতে বৃহত্তর ফেডারেশন গঠনের সমঝোতা নষ্ট না হয়। তিনি বলেন—

“আপনি হয়তো অবাক হবেন, কিন্তু আমাদের এই কাঠামোটিকে তিন ভাগে ভাগ করে এগোতে হবে… ফেডারেল কোর্টকে সংবিধানসংক্রান্ত মামলাতেই সীমাবদ্ধ রাখতে হবে।”

Jinnah, justice and the law

চূড়ান্ত লক্ষ্য

কিন্তু জিন্নাহ এই সীমিত সূচনাকে সঙ্গে সঙ্গেই বৃহত্তর ভবিষ্যতের দিকে যুক্ত করেন। তিনি একটি ধারাবাহিক রূপকল্প দেন—

১. প্রথমে সংকীর্ণ ফেডারেল কোর্ট
২. এরপর প্রিভি কাউন্সিলের সমমানের দেওয়ানি আপিল এখতিয়ারসহ পূর্ণাঙ্গ সুপ্রিম কোর্ট
৩. পরে অপরাধ-সংক্রান্ত আপিল এখতিয়ার
৪. এবং শেষ পর্যন্ত এমন একটি শীর্ষ আদালত, যেটিকে দেশীয় রাজ্যগুলোও স্বেচ্ছায় গ্রহণ করবে

তিনি বলেন—

“আমরা প্রিভি কাউন্সিলের সমমর্যাদার এখতিয়ারসহ একটি আলাদা সুপ্রিম কোর্টের ধারণা বিকশিত করি… এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সুপ্রিম কোর্ট দেশীয় রাজ্যগুলোর আস্থাও অর্জন করবে।”

কমিটির কাজের শেষ দিকে জিন্নাহ জোর দিয়ে বলেন—ফেডারেল কোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের পৃথকীকরণ কেবল অস্থায়ী—ফেডারেশন গঠনের প্রয়োজনেই এটি করা হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত ভারতকে তার নিজের সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এগোতেই হবে—যেমন অন্যান্য ডমিনিয়ন করেছে। কোনো জাতি চিরদিন প্রিভি কাউন্সিলের সঙ্গে বাঁধা থাকতে পারে না।

তিনি বলেন—

“সবচেয়ে বড় কথা, আমি বুঝতে পারি না ভারত তার নিজস্ব সুপ্রিম কোর্টের আকাঙ্ক্ষা কেন পোষণ করবে না। অন্যান্য ডমিনিয়নের আছে—তাহলে আমাদের কেন নয়?”


ধারণার স্থায়িত্ব

যদিও রাউন্ড টেবিল সম্মেলন বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রশ্নে ব্যর্থ হয়, ফেডারেল কোর্টের ধারণা টিকে থাকে। এটি ব্রিটিশ সরকারের হোয়াইট পেপারে অন্তর্ভুক্ত হয়, পরে যৌথ সংসদীয় কমিটিতে পর্যালোচনা হয় এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৩৫ সালের আইনেও প্রবেশ করে।

কমিটি এখতিয়ার–সংঘাত এড়াতে সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠা স্থগিত রাখে, তবে সময়ের সঙ্গে ফেডারেল কোর্টের ক্ষমতা বাড়ানোর সুপারিশ করে। ইতিমধ্যে এই ধারণাই পাকিস্তানের ১৯৫৬ সালের সংবিধানে সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরি করে—যার ক্ষমতা ছিল মৌলিক অধিকার প্রয়োগ এবং উচ্চ আদালতগুলো থেকে আসা সাধারণ আপিল শুনানি।

রাউন্ড টেবিল সম্মেলনে জিন্নাহর সংকীর্ণ ফেডারেল কোর্ট গ্রহণ ছিল তাই একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা—ফেডারেশন গঠনের স্বার্থে নেওয়া। তাঁর চূড়ান্ত উদ্দেশ্য ছিল একটি প্রকৃত, পূর্ণাঙ্গ, সার্বভৌম সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠা।

তার প্রস্তাবগুলো দেখায়—তিনি এমন একজন রাষ্ট্রনায়ক, যিনি বৈচিত্র্যময় উপমহাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়ানো দীর্ঘস্থায়ী প্রতিষ্ঠান গঠনের দিকে মনোযোগী ছিলেন। তার লক্ষ্য ছিল ঐক্য সৃষ্টি ও স্থায়িত্ব তৈরি—বিদ্যমান প্রতিষ্ঠান ভেঙে ফেলা নয়।