বৈশ্বিক বাজার—বিশেষত ইউরোপীয় ইউনিয়ন—নতুন বিধিনিয়ম চালু করায় বাংলাদেশকে জরুরি ভিত্তিতে জাতীয় পর্যায়ে পণ্যের ট্রেসিবিলিটি বা উৎস শনাক্তকরণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। সার্কুলার ইকোনমি, ডিজিটাল প্রোডাক্ট পাসপোর্ট (ডিপিপি), দায়িত্বশীল ব্যবসা পরিচালনা এবং টেকসইতা রিপোর্টিং—সবই এখন ইইউ বাজারে প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হয়ে উঠছে।
অনুষ্ঠানের পরিচিতি
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও জিআইজেড-এর এসটাইল-II প্রকল্পের সহযোগিতায় আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের নীতিগত বৈঠকের শিরোনাম ছিল ‘ইইউ বাজারে প্রবেশ ও টেকসইতা নিশ্চিত করতে জাতীয় ট্রেসিবিলিটি শক্তিশালীকরণ’। বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্ট (বিল্ড) ছিল অনুষ্ঠানটির গবেষণা ও থিম্যাটিক পার্টনার।
বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ ও ২০৩০ সালের প্রস্তুতি
মূল প্রবন্ধে ফেরদৌস আরা বেগম জানান, বাংলাদেশ–ইইউ বাণিজ্যের ৯২ শতাংশ তৈরি পোশাক খাতে হওয়ায় ইইউ গ্রীন ডিলের শর্তসমূহ ২০৩০ সালের মধ্যেই পূরণে প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।
তিনি জানান, তথ্য যাচাই, আন্তঃসংযোগ (ইন্টারঅপারেবিলিটি), প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং প্রাথমিক বাস্তবায়ন ব্যয়ের মতো চ্যালেঞ্জ এখনো বড় বাধা।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ভিয়েতনাম, চীন, জাপান, কোরিয়া ও ভারতে সরকারি-বেসরকারি যৌথ বিনিয়োগই শক্তিশালী ট্রেসিবিলিটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সবচেয়ে কার্যকর হয়েছে।
তিনি একটি জাতীয় ট্রেসিবিলিটি কৌশল গ্রহণের পাশাপাশি খাতভিত্তিক পদক্ষেপ, ঝুট খাতের ডিরেক্টরি তৈরি, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা, ডেটা অবকাঠামো সম্প্রসারণ ও গ্রিন ফাইন্যান্সিংয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।

বাণিজ্য সচিবের নির্দেশনা
মাহবুবুর রহমান জার্মানির উদাহরণ উল্লেখ করে বলেন, তথ্য বিনিময়ের জন্য একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা জরুরি। এ বিষয়ে উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তা চাওয়া হয়েছে।
তিনি জাতীয় ট্রেসিবিলিটি কৌশল খসড়া প্রণয়ন শুরু করার ঘোষণা দেন, যেখানে খাতভিত্তিক পাইলট প্রকল্প পরিচালনার পরিকল্পনাও থাকতে পারে। এসব প্রকল্প বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে এবং জিআইজেড-এর কারিগরি সহযোগিতায় বাস্তবায়ন করা হবে।
তিনি আরও একটি মাল্টি-স্টেকহোল্ডার ডায়ালগ প্ল্যাটফর্ম উদ্বোধন করেন, যা গুরুত্বপূর্ণ টেকসইতা বিষয়ক নীতিগত আলোচনা পরিচালনা করবে। পাশাপাশি ইপিবিকে ডেটা স্বচ্ছতা ও গভর্নেন্স বিষয়ে প্রকল্প নেওয়ার পরামর্শ দেন, যাতে রপ্তানিকারকদের ইউনিক আইডি পেতে সহায়তা করা যায়।
খাতভিত্তিক অগ্রগতি
বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও লেদার সেক্টর পাইলট কার্যক্রমগুলোর অগ্রগতি তুলে ধরে জানায়, বর্তমান কাজকে আরও বিস্তৃত করতে হবে। তৈরি পোশাক খাতে সাবকন্ট্রাক্ট ইউনিটসহ মধ্য ও নিম্নস্তরের কারখানাকে যুক্ত করা এবং চামড়া শিল্পে প্রাণী পর্যায় পর্যন্ত ট্রেসিবিলিটি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বিজিএমইএ পরিচালক শেখ এইচ এম মুস্তাফিজ বলেন, বিভিন্ন ব্র্যান্ড, ক্রেতা এবং ব্যক্তিগত পরামর্শকদের নানা ধরনের ডেটা চাহিদা উদ্যোক্তাদের সমস্যায় ফেলছে।
তিনি জানান, এখনো কোনো বৈশ্বিক বা অভিন্ন মানদণ্ড নেই। ফলে একটি একক জাতীয় মানদণ্ড তৈরি করলে ব্যয় কমবে এবং প্রক্রিয়া সহজ হবে।
জার্মান দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি ইয়ানিস হুসাইন জানান, ডেটা সংগ্রহ ও প্রস্তুতকরণ এবং প্রয়োজনীয় ডিজিটাল অবকাঠামো—দুটোই বড় চ্যালেঞ্জ এবং এগুলোর ব্যয় অনেক বেশি।

জাতীয় পর্যায়ের আলোচনার গুরুত্ব
সরকারি কর্মকর্তা, শিল্পনেতা, ব্যবসায়িক সংগঠন ও উন্নয়ন সহযোগীরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন। ক্রমবর্ধমান ইইউ বাজারের বিধিনিয়ম এবং এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে ট্রেসিবিলিটি এখন অত্যন্ত জরুরি বিধায় জাতীয় পর্যায়ে নীতিগত আলোচনার প্রয়োজনীয়তা সবাই তুলে ধরেন।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আব্দুর রহিম খান থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়ার উদাহরণ দিয়ে যথাযথ ডিউ ডিলিজেন্স নিশ্চিত করা এবং একটি জাতীয় প্রজেক্ট ইমপ্লিমেন্টেশন ইউনিট (পিআইইউ) গঠনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
পরিকল্পনা উইংয়ের যুগ্ম সচিব মোস্তফা জামাল হায়দার জানান, ট্রেসিবিলিটি ব্যবস্থা এলডিসি-পরবর্তী আলোচনায় বাংলাদেশকে আরও শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে।
অনুষ্ঠানে বিস্টি, বিসিএসআইআর, বিপিসি, ইআরডি, পরিকল্পনা কমিশনসহ বিভিন্ন সরকারী প্রতিষ্ঠান এবং টেক্সটাইল-অ্যাপারেল, চামড়া, মৎস্যসহ বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন এবং বক্তব্য রাখেন।
#tags #bangladesh #eu #trade #traceability
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















