১০:৪৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
ফেনীতে ‘ডাক্তার’ উপাধি ব্যবহার করে বিতর্কে জামায়াত প্রার্থী, আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে কারণ দর্শানোর নোটিশ তারেকের অঙ্গীকার: ক্ষমতায় গেলে ফিরবে বিডিআর নাম, সেনাবাহিনী হবে না রাজনৈতিক স্বার্থের হাতিয়ার ব্রাহ্মণবাড়িয়া–১ আসনে আচরণবিধি লঙ্ঘন, বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীর জরিমানা গণতন্ত্রের মুখোশে সাংবাদিক দমন, বাড়ছে দুর্নীতির অন্ধকার সহায়তা প্রাপ্ত মৃত্যুর পথে আমেরিকার বড় মোড়, এক তৃতীয়াংশ মানুষের সামনে নতুন আইন ইরানের ক্ষমতার কাঠামো ভাঙার প্রশ্নে নতুন সমীকরণ, পরিবর্তনের পথে গণভোটের আহ্বান নতুন একক গানে আরও ব্যক্তিগত পথে নিক জোনাস চিকিৎসার খোঁজে চীনে বিদেশিদের ঢল, কম খরচে দ্রুত সেবায় বাড়ছে মেডিকেল পর্যটন বিজ্ঞান বাজেটে কংগ্রেসের প্রতিরোধ, ট্রাম্পের কাটছাঁট পরিকল্পনায় ধাক্কা কলম্বিয়ার সাবেক সেনাদের বিদেশযুদ্ধে টান, ঝুঁকি বাড়াচ্ছে অস্থির ভবিষ্যৎ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে হাতের কাজের ভবিষ্যৎ নিরাপদ

বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারে বদলে যাচ্ছে চাকরির মানচিত্র। যেখানে একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিকে নিরাপদ ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা মনে করা হতো, সেখানে এখন তরুণদের বড় একটি অংশ ভিন্ন পথ বেছে নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে কারিগরি ও হাতে-কলমে শেখা পেশা।

বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়ার সিদ্ধান্ত
উত্তর ক্যারোলাইনায় বেড়ে ওঠা জ্যাকব পামার ছোটবেলা থেকেই ভাবতেন হাতে-কলমে কাজ মানেই নোংরা ও কম মর্যাদার পেশা। কিন্তু করোনাকালে দীর্ঘ অনলাইন পড়াশোনার অভিজ্ঞতা তাঁকে বুঝিয়ে দেয়, বিশ্ববিদ্যালয় জীবন তাঁর জন্য নয়। প্রথম বর্ষ শেষ না করেই পড়াশোনা ছেড়ে তিনি বিদ্যুৎকারিগরের প্রশিক্ষণে নামেন। কয়েক বছরের মধ্যেই নিজের ব্যবসা গড়ে তোলেন। মাত্র তেইশ বছর বয়সে তাঁর নিজস্ব গুদাম, গাড়ি ও জনপ্রিয় ভিডিও চ্যানেল রয়েছে। চলতি বছরে তাঁর আয়ের পরিমাণ এক লাখ পঞ্চান্ন হাজার ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাবে বলে তিনি আশা করছেন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে তাঁর কোনো দুশ্চিন্তা নেই। তাঁর ভাষায়, তথ্যকেন্দ্র আর উন্নত প্রযুক্তি স্থাপনায় তারের কাজ তো মানুষের হাতেই করতে হবে। এই বাস্তবতা তাঁকে দিয়েছে আত্মবিশ্বাস ও কাজের নিশ্চয়তা।

ডিগ্রির প্রতি আস্থাহীনতা
একা নন জ্যাকব পামার। নতুন প্রজন্মের অনেক তরুণই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রাপ্তবয়স্কদের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ এখন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাকে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। কয়েক দশকে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের চার বছরের পড়াশোনার খরচ দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। অনেকের অভিযোগ, এই শিক্ষায় বাস্তব জীবনের প্রয়োজনীয় দক্ষতা শেখানো হয় না।

একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারে অনেক প্রতিষ্ঠানে নতুন স্নাতকদের নিয়োগ কমে গেছে। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, স্নাতক তরুণদের একটি বড় অংশ পড়াশোনা শেষ করেও নিজেদের যোগ্যতার নিচের কাজে আটকে যাচ্ছে, এবং একবার সেখানে ঢুকলে দীর্ঘদিন সেই অবস্থাতেই রয়ে যাচ্ছে।

কারিগরি পেশার উত্থান
এই প্রেক্ষাপটে বাড়ছে কারিগরি পেশার প্রতি আগ্রহ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তরুণ মিস্ত্রি, পাইপ বসানো কর্মী কিংবা বিদ্যুৎকারিগরের দৈনন্দিন কাজের ভিডিও লাখো মানুষ দেখছে। যুক্তরাষ্ট্রে কমিউনিটি কলেজগুলোতে কারিগরি ও দুই বছরের প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে ভর্তি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। শিক্ষানবিশ কর্মীর সংখ্যাও গত এক দশকে দ্বিগুণের বেশি হয়েছে।

আয়ের হিসাবেও এই পেশাগুলো পিছিয়ে নেই। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ে স্নাতকদের আয় তুলনামূলক বেশি হলেও অনেক কারিগরি পেশায় শীর্ষ কর্মীরা বছরে এক লাখ ডলারের বেশি আয় করছেন। উন্নত উৎপাদন, প্রতিরক্ষা ও আধুনিক শিল্পখাতে দক্ষ কর্মীর তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে চিপ শিল্পে হাজার হাজার কারিগরি পদের জন্য লোক পাওয়া যাচ্ছে না।

দক্ষতার সংকট ও সমাধানের পথ
যুক্তরাজ্যেও একই চিত্র। সেখানে দক্ষ ওয়েল্ডারের বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে, অথচ বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে প্রতিরক্ষা শিল্পে এই দক্ষতার চাহিদা বাড়ছে। সমস্যা হলো, এখনো অনেক পরিবার ও সমাজে হাতে-কলমে কাজকে কম মর্যাদার চোখে দেখা হয়। শিক্ষাব্যবস্থা, শিল্পখাত ও সরকারের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে সুইজারল্যান্ডের মতো দেশের উদাহরণ সামনে আসছে, যেখানে মাধ্যমিক শিক্ষার পর অধিকাংশ শিক্ষার্থী কারিগরি প্রশিক্ষণে যায় এবং প্রয়োজনে আবার একাডেমিক ধারায় ফিরে আসার সুযোগ পায়। এই নমনীয় ব্যবস্থাই তাদের সফলতার মূল।

ডিগ্রি ও কাজ একসঙ্গে
তাৎক্ষণিক সমাধান হিসেবে জনপ্রিয় হচ্ছে ডিগ্রি শিক্ষানবিশ কর্মসূচি। এতে শিক্ষার্থীরা কাজ করতে করতেই বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি অর্জন করছে। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো এই মডেলে সফলতা পাচ্ছে। তরুণ কর্মীরা ঋণের বোঝা ছাড়াই পড়াশোনা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা দুটোই পাচ্ছেন, আর প্রতিষ্ঠানগুলো পাচ্ছে প্রয়োজনীয় দক্ষ জনশক্তি।

সব মিলিয়ে স্পষ্ট হচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে ভবিষ্যৎ নিরাপদ রাখতে শুধু ডিগ্রি নয়, বাস্তব দক্ষতাই হয়ে উঠছে সবচেয়ে বড় শক্তি

জনপ্রিয় সংবাদ

ফেনীতে ‘ডাক্তার’ উপাধি ব্যবহার করে বিতর্কে জামায়াত প্রার্থী, আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে কারণ দর্শানোর নোটিশ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে হাতের কাজের ভবিষ্যৎ নিরাপদ

০৩:১৮:৪৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ২১ ডিসেম্বর ২০২৫

বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারে বদলে যাচ্ছে চাকরির মানচিত্র। যেখানে একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিকে নিরাপদ ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা মনে করা হতো, সেখানে এখন তরুণদের বড় একটি অংশ ভিন্ন পথ বেছে নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে কারিগরি ও হাতে-কলমে শেখা পেশা।

বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়ার সিদ্ধান্ত
উত্তর ক্যারোলাইনায় বেড়ে ওঠা জ্যাকব পামার ছোটবেলা থেকেই ভাবতেন হাতে-কলমে কাজ মানেই নোংরা ও কম মর্যাদার পেশা। কিন্তু করোনাকালে দীর্ঘ অনলাইন পড়াশোনার অভিজ্ঞতা তাঁকে বুঝিয়ে দেয়, বিশ্ববিদ্যালয় জীবন তাঁর জন্য নয়। প্রথম বর্ষ শেষ না করেই পড়াশোনা ছেড়ে তিনি বিদ্যুৎকারিগরের প্রশিক্ষণে নামেন। কয়েক বছরের মধ্যেই নিজের ব্যবসা গড়ে তোলেন। মাত্র তেইশ বছর বয়সে তাঁর নিজস্ব গুদাম, গাড়ি ও জনপ্রিয় ভিডিও চ্যানেল রয়েছে। চলতি বছরে তাঁর আয়ের পরিমাণ এক লাখ পঞ্চান্ন হাজার ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাবে বলে তিনি আশা করছেন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে তাঁর কোনো দুশ্চিন্তা নেই। তাঁর ভাষায়, তথ্যকেন্দ্র আর উন্নত প্রযুক্তি স্থাপনায় তারের কাজ তো মানুষের হাতেই করতে হবে। এই বাস্তবতা তাঁকে দিয়েছে আত্মবিশ্বাস ও কাজের নিশ্চয়তা।

ডিগ্রির প্রতি আস্থাহীনতা
একা নন জ্যাকব পামার। নতুন প্রজন্মের অনেক তরুণই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রাপ্তবয়স্কদের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ এখন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাকে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। কয়েক দশকে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের চার বছরের পড়াশোনার খরচ দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। অনেকের অভিযোগ, এই শিক্ষায় বাস্তব জীবনের প্রয়োজনীয় দক্ষতা শেখানো হয় না।

একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারে অনেক প্রতিষ্ঠানে নতুন স্নাতকদের নিয়োগ কমে গেছে। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, স্নাতক তরুণদের একটি বড় অংশ পড়াশোনা শেষ করেও নিজেদের যোগ্যতার নিচের কাজে আটকে যাচ্ছে, এবং একবার সেখানে ঢুকলে দীর্ঘদিন সেই অবস্থাতেই রয়ে যাচ্ছে।

কারিগরি পেশার উত্থান
এই প্রেক্ষাপটে বাড়ছে কারিগরি পেশার প্রতি আগ্রহ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তরুণ মিস্ত্রি, পাইপ বসানো কর্মী কিংবা বিদ্যুৎকারিগরের দৈনন্দিন কাজের ভিডিও লাখো মানুষ দেখছে। যুক্তরাষ্ট্রে কমিউনিটি কলেজগুলোতে কারিগরি ও দুই বছরের প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে ভর্তি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। শিক্ষানবিশ কর্মীর সংখ্যাও গত এক দশকে দ্বিগুণের বেশি হয়েছে।

আয়ের হিসাবেও এই পেশাগুলো পিছিয়ে নেই। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ে স্নাতকদের আয় তুলনামূলক বেশি হলেও অনেক কারিগরি পেশায় শীর্ষ কর্মীরা বছরে এক লাখ ডলারের বেশি আয় করছেন। উন্নত উৎপাদন, প্রতিরক্ষা ও আধুনিক শিল্পখাতে দক্ষ কর্মীর তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে চিপ শিল্পে হাজার হাজার কারিগরি পদের জন্য লোক পাওয়া যাচ্ছে না।

দক্ষতার সংকট ও সমাধানের পথ
যুক্তরাজ্যেও একই চিত্র। সেখানে দক্ষ ওয়েল্ডারের বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে, অথচ বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে প্রতিরক্ষা শিল্পে এই দক্ষতার চাহিদা বাড়ছে। সমস্যা হলো, এখনো অনেক পরিবার ও সমাজে হাতে-কলমে কাজকে কম মর্যাদার চোখে দেখা হয়। শিক্ষাব্যবস্থা, শিল্পখাত ও সরকারের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে সুইজারল্যান্ডের মতো দেশের উদাহরণ সামনে আসছে, যেখানে মাধ্যমিক শিক্ষার পর অধিকাংশ শিক্ষার্থী কারিগরি প্রশিক্ষণে যায় এবং প্রয়োজনে আবার একাডেমিক ধারায় ফিরে আসার সুযোগ পায়। এই নমনীয় ব্যবস্থাই তাদের সফলতার মূল।

ডিগ্রি ও কাজ একসঙ্গে
তাৎক্ষণিক সমাধান হিসেবে জনপ্রিয় হচ্ছে ডিগ্রি শিক্ষানবিশ কর্মসূচি। এতে শিক্ষার্থীরা কাজ করতে করতেই বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি অর্জন করছে। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো এই মডেলে সফলতা পাচ্ছে। তরুণ কর্মীরা ঋণের বোঝা ছাড়াই পড়াশোনা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা দুটোই পাচ্ছেন, আর প্রতিষ্ঠানগুলো পাচ্ছে প্রয়োজনীয় দক্ষ জনশক্তি।

সব মিলিয়ে স্পষ্ট হচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে ভবিষ্যৎ নিরাপদ রাখতে শুধু ডিগ্রি নয়, বাস্তব দক্ষতাই হয়ে উঠছে সবচেয়ে বড় শক্তি