ডিজিটাল বিভ্রান্তি ও ভুয়া তথ্যের চ্যালেঞ্জের মধ্যে শিক্ষায় আসল চালিকাশক্তি হলো শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সম্পর্ক।
যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাটে বিশেষ শিক্ষার শিক্ষক হিসেবে আমার প্রথম চাকরিতে আমি ষষ্ঠ শ্রেণির একদল শিক্ষার্থীকে পড়াতাম। তাদের বয়স ছিল ১১ থেকে ১২ বছর, প্রায় সবাই ছেলে। প্রথম বছরের শেষদিকে আমি বুঝতে পারি, কিছু একটা বদলে গেছে। আগে যে বিশৃঙ্খল আচরণ নিয়ে আমাকে চিন্তিত থাকতে হতো, তা আর নেই। শিক্ষার্থীরা মনোযোগী হয়েছে, শিখছে আগ্রহ নিয়ে। এই পরিবর্তনের পেছনে কোনো নতুন শিক্ষণ কৌশল ছিল না। মূল কারণ ছিল বিশ্বাস।
শিক্ষার্থীরা যখন বুঝতে পারল যে আমি তাদের ভালো চাই এবং আমিও তাদের দায়িত্বশীল আচরণের ওপর আস্থা রাখি, তখন শিক্ষকতা ও শেখার পরিবেশ সবার জন্যই নিরাপদ হয়ে উঠল। কঠিন কাজগুলোতে যথাযথ মনোযোগ ও আবেগী সহায়তা দিয়ে পাশে থাকার মধ্য দিয়ে এই সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।

সেটা ছিল আশির দশক। তখন ইন্টারনেট ছিল না, বিভ্রান্তিও কম ছিল। আজকের দিনে শিক্ষকদের কাজ অনেক কঠিন। শিক্ষার্থীদের দৃষ্টিভঙ্গি এখন গড়ে উঠছে অ্যালগরিদম ও প্রভাবশালীদের মাধ্যমে। ভুল তথ্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্য নতুন কিছু নয়, কিন্তু এখন তা এক আঙুলের ছোঁয়ায় পৌঁছে যাচ্ছে কিশোরদের কাছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চ্যাটবট অনেক সময় বেড়ে ওঠার সংকটে থাকা কিশোরদের কাছে বিচারহীন পরামর্শদাতার মতো হয়ে উঠছে।
এই প্রেক্ষাপটে অনেক তরুণ যেন মানবিক সম্পর্ক থেকে সরে যাচ্ছে, বিশেষ করে প্রাপ্তবয়স্কদের সঙ্গে। কিন্তু আমাদের গবেষণা বলছে ভিন্ন কথা। শিক্ষার্থীরা বারবার জানায়, তারা প্রাপ্তবয়স্কদের সঙ্গে সত্যিকারের সম্পর্ক চায়। এমন সময়ে, যখন তাদের মনোযোগ ডিভাইসের লাগাতার উত্তেজনায় ছড়িয়ে পড়ছে, তখন এই চাহিদা আরও প্রবল। এ কারণেই শিক্ষকের ভূমিকা আজ এতটা গুরুত্বপূর্ণ। চারপাশের অসংখ্য শব্দের ভিড়ে একজন শিক্ষকের সঙ্গে উষ্ণ ও বিশ্বাসভিত্তিক সম্পর্ক শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ, যা তাদের এই জটিল পৃথিবী বুঝতে সাহায্য করে।
সবচেয়ে ভালো পরিস্থিতিতে, শিক্ষার্থীরা অনলাইনে এমন কিছু দেখলে যা তাদের বিভ্রান্ত বা অস্থির করে, তারা শিক্ষক বা পরামর্শদাতার কাছে এসে বলতে পারে, এটা বুঝতে আমাকে সাহায্য করুন। এই ধরনের বিশ্বাসই শেখার ভিত্তি গড়ে তোলে।
এই সম্পর্ককে অনেক সময় নিরাপদ ভিত্তি বলা হয়। এমন একটি ভিত্তি যা শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস দেয় নতুন কিছু অনুসন্ধান ও নিজের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার, আবার পরিস্থিতি কঠিন বা অনিশ্চিত হলে সমর্থনও দেয়। তবে এই সম্পর্ক আদেশ দিয়ে তৈরি করা যায় না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মানুষ হিসেবে বোঝা ও সম্মান দেওয়ার মাধ্যমেই তা গড়ে তুলতে হয়, নিয়ন্ত্রণ বা শুধরে দেওয়ার মাধ্যমে নয়।
সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দেওয়ার মানসিকতা
যেসব শিক্ষককে আমরা সবচেয়ে কার্যকর দেখি, তারা সম্পর্ককে দৈনন্দিন কাজের অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে দেখেন না। বরং এটিকেই তারা সম্পৃক্ততা ও শেখার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথ মনে করেন। ভালো বিষয় হলো, সম্পর্ক গড়তে আলাদা করে বেশি সময়ের প্রয়োজন নেই।
স্কুলের প্রতিটি দিনে বিশ্বাস তৈরির অসংখ্য ছোট মুহূর্ত থাকে। শিক্ষার্থীদের নাম ধরে সম্ভাষণ করা, কেউ মন খারাপ করলে তা লক্ষ করা, কিংবা ক্লাসে কোনো শিক্ষার্থীর আগ্রহের বিষয়টি তুলে ধরা—এসবই সেই সুযোগ।
আমি প্রতিদিন বাস থেকে শিক্ষার্থীরা নামার সময় বাইরে দাঁড়াতাম। এটি ছিল তাদের সঙ্গে কথা বলার ও অভিজ্ঞতা জানার দারুণ সুযোগ। একদিন ‘ই’ নামে এক শিক্ষার্থী, যার আচরণ ছিল চ্যালেঞ্জিং, বাস থেকে নেমে বেশ হাসিখুশি ছিল। ঠিক তখনই শ্রেণির জনপ্রিয় এক ছেলে তার জ্যাকেট নিয়ে কটূক্তি করল। সঙ্গে সঙ্গে ই-এর মুখ মলিন হয়ে গেল।
আমি সেখানে থাকায় তার কাছে গিয়ে বললাম, জ্যাকেটটি কত সুন্দর লাগছে, সে নিশ্চয়ই এটি নিয়ে গর্বিত, আর তাকে সেদিন দেখে ভালো লাগছে। তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, হাঁটার ভঙ্গিতেও প্রাণ ফিরে এল। ওই মুহূর্তে আমি তাকে ব্যক্তিগতভাবে বোঝাতে পেরেছিলাম যে তার কষ্ট আমি বুঝছি এবং সম্মানের সঙ্গে পাশে থাকব।
এই ধরনের ছোট ছোট যোগাযোগ এমন পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে এমনকি বিচ্ছিন্ন শিক্ষার্থীরাও নিজেদের দেখা ও মূল্যায়িত মনে করে। ফলে তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বদলে শিক্ষকের ওপর বেশি আস্থা রাখতে শেখে।

এটি সব বয়সের ক্ষেত্রেই সত্য। ছোট শিশুরা প্রাপ্তবয়স্কের কাছাকাছি থাকা ও শান্ত কণ্ঠে নিরাপত্তা খুঁজে পায়। কিশোরদের প্রয়োজন আশ্বাস যে তাদের মতামত গুরুত্বপূর্ণ, এমনকি প্রাপ্তবয়স্করা সবসময় একমত না হলেও। উভয় ক্ষেত্রেই মনোযোগ ধরে রাখার মূল চাবিকাঠি একটাই—বোঝা ও সম্মান পাওয়ার অনুভূতি।
শিক্ষার্থীর সক্ষমতায় আস্থা অগ্রগতির পথ খুলে দেয়
শিক্ষকদের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো পাঠদানের মধ্যেই এই বিশ্বাসকে বিস্তৃত করা। শুনতে অদ্ভুত লাগলেও, শিক্ষার্থীদের শেখার পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রণ দেওয়া—যা একটি নিরাপদ ও বিশ্বাসভিত্তিক শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের লক্ষণ—শিক্ষাগত অগ্রগতি বাড়ায়।
একটি প্রকল্পে আমি ও আমার সহকর্মীরা উচ্চ বিদ্যালয়ের ইতিহাস শিক্ষকদের সঙ্গে কাজ করেছি। আমরা তাদের উৎসাহ দিয়েছিলাম নিয়ন্ত্রণের বদলে কৌতূহল দিয়ে নেতৃত্ব দিতে। শিক্ষার্থীরা মনোযোগ হারালে তাদের অতিরিক্ত বাড়ির কাজ দিয়ে শাস্তি দেওয়া হয়নি। বরং তাদের পছন্দের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। সবাইকে একই প্রবন্ধ লেখার বদলে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের এমন একটি বিষয় বেছে নিতে পেরেছিল যা তাদের আগ্রহের।
শিক্ষকদের বিস্ময়ে, শিক্ষার্থীরা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি পরিশ্রম করেছে। এই প্রকল্প স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে, আগ্রহকে সম্মান জানালে প্রতিটি শিক্ষার্থীই উন্নত মানের কাজ করতে সক্ষম। সক্ষমতা থেকে আসে প্রেরণা।
রবার্ট পিয়ান্টা 



















