ইরানের অর্থনৈতিক সংকট ঘিরে শুরু হওয়া বিক্ষোভ নতুন মোড় নিয়েছে। বছরের শেষ প্রান্তে দক্ষিণ ইরানের একটি সরকারি ভবনে হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে শীর্ষ কৌঁসুলি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, অর্থনৈতিক দাবিকে অস্থিরতা বা সহিংসতায় রূপ দেওয়ার চেষ্টা হলে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
বাজার থেকে রাজপথে ক্ষোভের বিস্তার
রোববার তেহরানের সবচেয়ে বড় মোবাইল ফোন বাজারে দোকান বন্ধ রেখে ব্যবসায়ীদের প্রতিবাদ থেকেই এই আন্দোলনের সূত্রপাত। দ্রুতই সেই ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও। রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরের অন্তত দশটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা এতে অংশ নেয়। যদিও সংখ্যায় সীমিত, তবু আন্দোলন কেন্দ্রীয় তেহরানেই বেশি ঘনীভূত ছিল এবং শহরের অন্যান্য এলাকায় দোকানপাট স্বাভাবিকই ছিল।

ফাসায় সরকারি ভবনে হামলা
বুধবার দক্ষিণ ইরানের ফাসা শহরে প্রাদেশিক গভর্নরের দপ্তরের দরজা ও কাচ ভাঙচুর করা হয়। বিচার বিভাগের স্থানীয় প্রধান জানিয়েছেন, একদল মানুষ এই হামলা চালায়, তবে কীভাবে হামলা হয়েছে তা বিস্তারিত বলা হয়নি। এই ঘটনার প্রেক্ষাপটেই কেন্দ্রীয় সরকার কঠোর অবস্থানের বার্তা দেয়।
কৌঁসুলির বার্তা, সহিংসতায় ছাড় নেই
ইরানের শীর্ষ কৌঁসুলি বলেছেন, শান্তিপূর্ণ জীবিকা-সংক্রান্ত প্রতিবাদ সামাজিক বাস্তবতারই অংশ। তবে অর্থনৈতিক আন্দোলনকে নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি, সরকারি সম্পদ ধ্বংস বা বিদেশি ষড়যন্ত্রের হাতিয়ার বানানোর চেষ্টা হলে আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই বক্তব্যে একদিকে স্বীকৃতি, অন্যদিকে সতর্কতার স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে ।
নিষেধাজ্ঞা, মুদ্রাপতন আর নিত্যপ্রয়োজনের সংকট

দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় ইরানের অর্থনীতি চাপে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রিয়ালের মূল্য ব্যাপকভাবে কমে গেছে, এক বছরে ডলারের বিপরীতে যার পতন এক তৃতীয়াংশেরও বেশি। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। এক বিক্ষোভকারী বলেছেন, সবাই এখন একমুঠো রুটির জন্য লড়াই করছে।
শিক্ষাঙ্গনে পরিস্থিতি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ
ঠান্ডা আবহাওয়া ও জ্বালানি সাশ্রয়ের যুক্তিতে বুধবার ব্যাংক, স্কুল ও সরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। রাজধানীর কয়েকটি শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় আগামী সপ্তাহজুড়ে অনলাইন ক্লাস চালুর ঘোষণা দেয়। এর মধ্যেই বিক্ষোভে অংশ নেওয়া কয়েকজন শিক্ষার্থীকে আটক করে পরে ছেড়ে দেওয়ার তথ্যও আসে।
শিল্পীর কণ্ঠে আন্দোলনের ভাষা

প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা জাফর পানাহি এই আন্দোলনকে ইতিহাস এগিয়ে নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, যখন হারানোর কিছু থাকে না, তখন ভয়ও মিলিয়ে যায়, আর নীরবতা ভেঙে যায়। এই প্রতিবাদ মানুষের সম্মিলিত ইচ্ছাশক্তির প্রকাশ, যা থেমে থাকার নয়, সামনে এগোনোর ডাক দেয়।
আগের আন্দোলনের সঙ্গে তুলনা
বিশ্লেষকদের মতে, এই বিক্ষোভ এখনো দুই হাজার বাইশ সালের ব্যাপক আন্দোলনের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তবু অর্থনৈতিক হতাশা, মুদ্রাস্ফীতি ও দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞার চাপে জমে থাকা ক্ষোভ নতুন করে ইরানের রাজপথে প্রতিফলিত হচ্ছে, যা সরকার ও সমাজ উভয়ের জন্যই বড় সতর্কবার্তা।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















