টোকিওর নিহোনবাশি বাণিজ্যিক এলাকা আজও জাপানের অর্থনৈতিক স্মৃতির প্রতীক। বাইরে থেকে দেখলে অনেকেরই মনে হয়, জাপানি ব্র্যান্ডগুলো ধীরে ধীরে চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছে উজ্জ্বলতা হারাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতার ভেতরে ঢুকলে দেখা যায় ভিন্ন এক ছবি। ভোক্তা পণ্যের পরিচিত নামের আড়ালে জাপানের বহু ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান নীরবে দখল করে নিয়েছে এমন সব বৈশ্বিক ক্ষেত্র, যেগুলো ছাড়া আধুনিক প্রযুক্তি প্রায় অচল।
রান্নাঘর থেকে চিপ প্রযুক্তির কেন্দ্রবিন্দু
সাধারণভাবে সস ও উমামি মসলার জন্য পরিচিত আজিনোমোটো এখন কেবল রান্নাঘরের নাম নয়। নব্বইয়ের দশকে খাদ্য উৎপাদন উপপণ্য নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটি তৈরি করে অতি সূক্ষ্ম এক বিশেষ ফিল্ম। এই উপাদান আজ আধুনিক সেমিকন্ডাক্টর ও ডেটা সেন্টারের প্রসেসরে অপরিহার্য। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুগে চিপের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই প্রযুক্তিও দ্রুত প্রসার পাচ্ছে। খাদ্যই যেখানে মূল ব্যবসা, সেখান থেকেই জন্ম নিয়েছে এক বৈশ্বিক প্রযুক্তি আধিপত্য।

উপকরণের বিজ্ঞানেই লুকিয়ে ভবিষ্যৎ
এই প্রবণতা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ নয়। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের জন্য পরিচিত একটি কোম্পানি সেমিকন্ডাক্টর খোদাই প্রক্রিয়ার জন্য বিশুদ্ধ রাসায়নিক সরবরাহ করছে। সিরামিক দিয়ে যাত্রা শুরু করা আরেকটি প্রতিষ্ঠান আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও পঞ্চম প্রজন্মের যোগাযোগ প্রযুক্তির জন্য উন্নত প্যাকেজিং উপকরণ তৈরি করছে। ভোক্তা চোখে এসব নাম পরিচিত হলেও তাদের আসল শক্তি লুকিয়ে আছে উপকরণ বিজ্ঞান ও সূক্ষ্ম প্রকৌশলে।
অবকাঠামো ও পরিবেশে নতুন ভূমিকা
গৃহস্থালি পরিচর্যার পণ্যে পরিচিত একটি প্রতিষ্ঠান প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে এমন এক উপাদান তৈরি করছে, যা রাস্তা ও ফুটপাতকে আরও টেকসই করে তোলে। সাবান ও ডিটারজেন্ট তৈরির সময় অর্জিত পৃষ্ঠতল বিজ্ঞানই এখানে হয়ে উঠেছে পরিবেশবান্ধব অবকাঠামোর ভিত্তি। এতে একদিকে কমছে বর্জ্য, অন্যদিকে বাড়ছে সড়কের স্থায়িত্ব।
ক্যামেরা হারিয়ে চিকিৎসায় পুনর্জন্ম
ফিল্ম ক্যামেরার যুগ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক প্রতিষ্ঠানের সামনে অস্তিত্ব সংকট দেখা দেয়। কিন্তু কিছু জাপানি কোম্পানি সেই সংকটকে সুযোগে রূপ দেয়। ইমেজিং প্রযুক্তির অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তারা চিকিৎসা যন্ত্রে বিশ্বনেতৃত্ব গড়ে তোলে। আজ এন্ডোস্কোপ থেকে শুরু করে এক্স-রে ও স্ক্যানিং যন্ত্রে এসব প্রতিষ্ঠানের দখল চোখে পড়ার মতো।
স্বাস্থ্য সচেতনতায় নতুন দিগন্ত
মহামারির পর স্বাস্থ্য ও সুস্থতার দিকে মানুষের ঝোঁক বাড়ায় খাবার ও পানীয় প্রস্তুতকারকরাও বদলাতে শুরু করেছে নিজেদের পথ। চকলেট ও বিস্কুটের জন্য পরিচিত একটি ব্র্যান্ড এখন বাদাম দুধের মতো স্বাস্থ্যকর পণ্য বাজারে আনছে। আলু চিপস প্রস্তুতকারক আরেকটি প্রতিষ্ঠান অন্ত্রস্বাস্থ্যের বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ব্যক্তিগত খাদ্য সেবা দিচ্ছে। এমনকি বীয়ার প্রস্তুতকারকরা গাঁজন প্রক্রিয়ার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ওষুধ ও জীবপ্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।
বৈশ্বিক সরবরাহে জাপানের নীরব নির্ভরতা
বিশেষজ্ঞদের মতে, জাপানের এই নীরব রূপান্তরই তাদের প্রকৃত শক্তি। দৈনন্দিন জীবনে চোখে না পড়লেও আধুনিক বিশ্বের বহু গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের ভেতরে রয়েছে জাপানি উপকরণ। জটিল ও নকল করা কঠিন এসব খাতে নেতৃত্ব ধরে রেখে দেশটি বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে এক অনিবার্য নির্ভরতার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে
সারাক্ষণ রিপোর্ট 








