বিশ্ব অর্থনীতির আকাশে নানা আশঙ্কার মেঘ জমেছে। বাজেট ঘাটতি, ঋণের বোঝা, রাজনৈতিক অস্থিরতা—সব মিলিয়ে অনেকেই বলছেন, ডলারের দিন শেষের পথে। চীন নাকি ডলারকে সরিয়ে নিজস্ব মুদ্রাকে সামনে আনতে চাইছে, এমন কথাও শোনা যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, এই গল্পের বড় অংশই ভ্রান্ত। ডলার এখনো বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থার কেন্দ্রে অটলভাবে দাঁড়িয়ে আছে।
ডলার পতনের গল্প কেন ছড়াচ্ছে
ওয়াশিংটনের নীতিগত টানাপোড়েন, বাড়তে থাকা ঋণ এবং বাজেট ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মার্কিন ট্রেজারি বন্ড দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হলেও রাজনৈতিক অস্থিরতা অনেককে শঙ্কিত করেছে। ফেডারেল রিজার্ভের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক, বৈদেশিক নীতিতে কড়াকড়ি—এসব বিষয় ডলারের ভাবমূর্তিতে আঁচড় ফেলেছে।
তবু বাস্তব চিত্র ভিন্ন

সব কথার পরও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর রিজার্ভে ডলারের অংশ এখনো সবচেয়ে বেশি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক লেনদেনে ডলারের অংশ প্রায় ষাট শতাংশের কাছাকাছি স্থির রয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এখনো বিপুল পরিমাণ মার্কিন ট্রেজারি বন্ড কিনছেন। তথ্য বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশি মালিকানাধীন ট্রেজারির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
চীন ও বিকল্প মুদ্রার প্রশ্ন
চীন স্বর্ণ মজুত বাড়িয়েছে এবং নিজেদের মুদ্রার ব্যবহার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাড়ানোর চেষ্টা করছে। রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি লেনদেনেও ডলার ছাড়া পথ নেওয়া হয়েছে। ডিজিটাল মুদ্রার ধারণাও সামনে এসেছে। তবে বৈশ্বিক আস্থার প্রশ্নে এখনো ডলারই এগিয়ে। পুঁজি অবাধে প্রবেশ ও প্রস্থান করতে না পারলে এবং বাজারনির্ভর বিনিময় হার নিশ্চিত না হলে কোনো মুদ্রাই সহজে আস্থা অর্জন করতে পারে না।
ইউরোপ ও অন্য অর্থনীতির সীমাবদ্ধতা

ইউরোপীয় অঞ্চল অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হলেও তাদের আর্থিক কাঠামো খণ্ডিত। জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উত্থান এবং ধীর প্রবৃদ্ধি বড় চ্যালেঞ্জ। জাপান ও ব্রিটেনও উচ্চ ঋণ ও নিম্ন প্রবৃদ্ধির সমস্যায় জর্জরিত। ফলে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজতে গেলে রপ্তানিকারক, আমদানিকারক, বিনিয়োগকারী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর বড় অংশ এখনো ডলারের দিকেই ঝুঁকছে।
প্রযুক্তি কি পাল্টে দেবে সমীকরণ
ডলারভিত্তিক স্থিতিশীল মুদ্রা এবং নতুন আর্থিক প্রযুক্তি বরং ডলারের ব্যবহার আরও বাড়াতে পারে। ডিজিটাল রূপ সুবিধা বাড়ালেও আস্থার প্রশ্নে বড় পরিবর্তন আনতে পারেনি। আস্থা, স্বচ্ছতা ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান—এই তিন ভিত্তির ওপরই একটি মুদ্রার আধিপত্য টিকে থাকে, যেখানে ডলার এখনো এগিয়ে।
শেষ কথা
ডলারকে ঘিরে আতঙ্কের গল্প যতই ছড়াক, বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। প্রতিদ্বন্দ্বী অর্থনীতিগুলো নিজেদের কাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে না পারলে ডলারের বিকল্প তৈরি সহজ হবে না। তাই আপাতত ডলারের আধিপত্য ভাঙার গল্পের চেয়ে তার স্থায়িত্বই বেশি স্পষ্ট।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















