বিশ্বসাহিত্যের অনন্য কথাকার, উপন্যাসিক ও ভ্রমণলেখক সিস নোটেবুম আর নেই। স্মৃতি, গল্পবিন্যাস এবং মানুষের জীবনের বিচ্ছিন্ন টুকরোকে শিল্পে রূপ দেওয়া এই ডাচ লেখক ১১ ফেব্রুয়ারি স্পেনের মেনোরকা দ্বীপের সান লুইসে নিজ বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯২ বছর।
আমস্টারডামে তাঁর প্রকাশনা সংস্থা দে বেজিগে বিজ তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে। সাহিত্যে দীর্ঘ ছয় দশকের বেশি সময় ধরে তিনি ছিলেন পরীক্ষামূলক আখ্যানরীতির এক স্বতন্ত্র কণ্ঠ।
আখ্যানের ভেতরে আখ্যান
সিস নোটেবুমের উপন্যাসে প্রচলিত কাহিনি, চরিত্র বা গঠন খুব একটা গুরুত্ব পায় না। বরং তিনি বারবার প্রশ্ন তুলেছেন, একটি জীবনকে কীভাবে গল্পে ধরা যায়। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘রিচুয়ালস’ এবং ‘দ্য ফলোয়িং স্টোরি’ তাঁকে নেদারল্যান্ডসে সাহিত্য নায়কের মর্যাদা দেয়।
‘রিচুয়ালস’-এ তিনটি জীবনের ছেদবিন্দু দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন স্মৃতি কতটা বিচ্ছিন্ন ও ভাঙাচোরা হতে পারে। চরিত্রের মনে জমে থাকা খণ্ডচিত্র, অপ্রাসঙ্গিক বস্তু আর অসম্পূর্ণ অভিজ্ঞতাই সেখানে হয়ে ওঠে আখ্যানের মূল উপাদান।

পরে ‘ইন দ্য ডাচ মাউন্টেনস’-এ গল্পের ভেতরে গল্পের বিন্যাসে তিনি নতুন মাত্রা যোগ করেন। আর ‘দ্য ফলোয়িং স্টোরি’ উপন্যাসে মৃত্যুর পরের বয়ানে তিনি গল্প বলার ধারণাকেই উল্টে দেন।
কবিতাই ছিল ভরকেন্দ্র
নোটেবুম নিজেই বলেছিলেন, তাঁর সমস্ত লেখার কেন্দ্রে রয়েছে কবিতা। ভাষার সূক্ষ্ম বোধ ও দর্শনচিন্তা তাঁর উপন্যাসকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। তাঁর গদ্য অনেক সময় কবিতার মতোই সংক্ষিপ্ত, ঘন ও ইঙ্গিতপূর্ণ।
সমালোচকেরা তাঁকে সম্ভাব্য নোবেলজয়ী হিসেবেও উল্লেখ করেছেন বহুবার। যদিও তাঁর সব কাজ ইংরেজিতে অনূদিত হয়নি, জার্মান ও ফরাসিসহ নানা ভাষায় তাঁর রচনা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
শৈশবের অস্থিরতা থেকে বিশ্বভ্রমণ

১৯৩৩ সালের ৩১ জুলাই নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগ শহরে জন্ম নেন কর্নেলিস ইয়োহানেস ইয়াকোবাস মারিয়া নোটেবুম। শৈশবে পরিবারে ভাঙন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পিতার মৃত্যু এবং একের পর এক ক্যাথলিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা তাঁর মনে গভীর ছাপ ফেলে।
১৯৫১ সালে বাড়ি ছেড়ে ব্যাংকে কাজ শুরু করেন। পরে স্ক্যান্ডিনেভিয়া ও ফ্রান্সে হিচহাইকিং ভ্রমণ তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘ফিলিপ অ্যান্ড দ্য আদার্স’-এর ভিত্তি গড়ে দেয়। বইটি ১৯৫৭ সালে অ্যান ফ্রাঙ্ক পুরস্কার লাভ করে।
এরপর দীর্ঘ সময় তিনি নিয়মিত ভ্রমণ করেন এবং পত্রিকায় ভ্রমণকাহিনি লেখেন। তাঁর মতে, পৃথিবীই ছিল তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়, আর ভ্রমণ ছিল আত্মশিক্ষার পথ।
ভ্রমণগাথার বিস্তৃতি
উপন্যাসের পাশাপাশি ভ্রমণবিষয়ক বইয়েও তিনি সমান স্বচ্ছন্দ। স্পেনের ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে লেখা ‘রোডস টু সান্তিয়াগো’, নানা দেশের অভিজ্ঞতা নিয়ে ‘নোম্যাডস হোটেল’ এবং ভেনিস নিয়ে তাঁর বিশদ গ্রন্থ পাঠকমহলে সমাদৃত হয়।

১৯৭৯ সাল থেকে আলোকচিত্রী সিমোনে সাসেন তাঁর জীবনের সঙ্গী ছিলেন। ২০১৬ সালে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এর আগে তাঁর একটি বিবাহ বিচ্ছেদে শেষ হয়।
জীবনের শেষ পর্যন্ত নোটেবুম বিশ্বাস করতেন, পরিকল্পনার চেয়ে অভিজ্ঞতাই বড়। তাঁর ভাষায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েননি, পৃথিবীই ছিল তাঁর মঠ।
স্মৃতি, ভ্রমণ ও অস্তিত্বের প্রশ্ন নিয়ে যে সাহিত্যভুবন তিনি নির্মাণ করেছেন, তা দীর্ঘদিন পাঠকের মনে প্রতিধ্বনিত হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















