নিজেকে ভালো রাখার চর্চা এখন বিশ্বজুড়ে বড় শিল্প। বই, কোচিং, থেরাপি, ধ্যান—সব মিলিয়ে ‘ভাল থাকা’ যেন ব্যক্তিগত একক অভিযাত্রা। কিন্তু এই স্বনির্ভরতার উল্লাসের ভেতরেই বাড়ছে একাকিত্ব, উদ্বেগ আর মানসিক ভাঙন। প্রশ্ন উঠছে, কেবল নিজের যত্নেই কি সুস্থতা পূর্ণ হয়, নাকি অন্যের জন্য কিছু না করলে সেই সুস্থতা ফাঁপা থেকে যায়।
নিজেকে সাহায্যের জগৎ, অন্যকে ভুলে যাওয়া সমাজ
দৈনন্দিন জীবনে সবকিছুই এখন নিজে নিজে করা যায়। দোকানে স্বয়ংক্রিয় কাউন্টার, মন খারাপ হলে বন্ধু নয় পর্দা, সম্পর্কের পরামর্শে মানুষের বদলে যন্ত্র। সুবিধা বেড়েছে, কিন্তু সম্পর্কের উষ্ণতা কমেছে। ফল হিসেবে একাকিত্ব বাড়ছে, মানসিক অস্বস্তি তীব্র হচ্ছে।

পরিসংখ্যান বলছে অন্য কথা
বিশ্বজুড়ে উদ্বেগজনিত সমস্যায় ভোগা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। একই সঙ্গে আত্মোন্নয়ন ও সুস্থতা–সংক্রান্ত বাজারও দ্রুত ফুলে উঠছে। তরুণ প্রজন্মের বড় অংশ ‘মননশীলতা’কে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, থেরাপি গ্রহণও বেড়েছে। তবু কেন এত চেষ্টা করেও মানসিক স্বস্তি মিলছে না—এই প্রশ্নটাই এখন কেন্দ্রে।
সব অনুভূতিকে অসুখ বানানোর ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন, প্রতিটি অস্বস্তিকে রোগ হিসেবে ব্যাখ্যা করলে উল্টো ক্ষতি হতে পারে। নিজের সমস্যাকে স্থায়ী অসুখ ভাবলে আচরণ ও আত্মপরিচয়ে এমন পরিবর্তন আসে, যা কষ্ট আরও বাড়িয়ে তোলে। সচেতনতা জরুরি, কিন্তু অতিরিক্ত রোগীকরণ বিপদজনক।

সেবার আনন্দ হারিয়ে যাচ্ছে
ধর্ম ও সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত ছিল অন্যের সেবার ভাবনা। বিশ্বাস ছিল, মানুষের সেবা মানেই বৃহত্তর কল্যাণের সঙ্গে যুক্ত থাকা। সময়ের সঙ্গে সেই চর্চা ক্ষীণ হয়েছে। স্বেচ্ছাসেবায় যুক্ত মানুষের সংখ্যা কমেছে, যদিও বহু মানুষ সমাজে অবদান রাখতে চান—পথটা খুঁজে পান না।
অন্যের জন্য কিছু করলে মনও হালকা হয়
যাঁরা নিয়মিত স্বেচ্ছাসেবায় যুক্ত, তাঁদের অভিজ্ঞতা ভিন্ন কথা বলে। অন্যের কষ্টের পাশে দাঁড়ালে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত হয়, নিজের দুশ্চিন্তা সাময়িক দূরে সরে যায়। আত্মসম্মান গড়ে ওঠে কাজের ভেতর দিয়ে। নিজের ভাল লাগা তখন আর একক প্রকল্প থাকে না, হয়ে ওঠে ভাগাভাগির অনুভূতি।

বাজারের বাইরে জীবনের মানে
সুস্থতা কি কেবল বাজারের মাপে ধরা যাবে? নাকি মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, সেবার ছোট কাজ, সময় দেওয়ার মধ্যেই আছে প্রকৃত ভারসাম্য? হয়তো ‘ভাল থাকা’কে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে—নিজেকে ভালো রাখার পাশাপাশি অন্যের পাশে দাঁড়ানোর চর্চা ফিরিয়ে এনে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















