বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান উত্তাপের মধ্যে প্রাচীন গ্রিসের এক নগররাষ্ট্র আবারও আলোচনায়। ইসরায়েলের গাজা হামলা ঘিরে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ার সময় দেশটির প্রধানমন্ত্রী এক ভাষণে ‘সুপার স্পার্টা’ ভাবনার কথা তুলে ধরেন। আত্মনির্ভরতা, সামরিক দৃঢ়তা আর বাইরের দুনিয়ার প্রতি অনাস্থাকে সামনে রেখে তিনি এমন এক সমাজ কল্পনা করেন, যা প্রাচীন স্পার্টার মতো কঠোর ও আত্মকেন্দ্রিক। একই সঙ্গে তিনি এথেন্সের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যও রাখতে চান বলে জানান। এই বক্তব্যই নতুন করে বিতর্ক উসকে দেয়।
স্পার্টা কল্পনার রাজনৈতিক ব্যবহার
স্পার্টা শব্দটি শুধু ইতিহাসের অংশ নয়, আধুনিক রাজনীতির প্রতীকে পরিণত হয়েছে। অনেক ডানপন্থী ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলন নিজেদের শক্তি ও আত্মরক্ষার প্রতীক হিসেবে স্পার্টাকে তুলে ধরছে। সীমান্ত কঠোরতা, সামরিক বাজেট বৃদ্ধি আর বহির্বিশ্ব থেকে সরে আসার প্রবণতার সঙ্গে এই ভাবনার মিল খুঁজে পাচ্ছেন বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, বিশ্বায়নের গতি কমে যাওয়া আর নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার দুর্বলতার সময়ে ‘স্পার্টান মানসিকতা’ অনেকের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
ইতিহাস বনাম রাজনৈতিক কল্পকাহিনি
ইতিহাসবিদেরা মনে করিয়ে দেন, বাস্তব স্পার্টা আজকের কল্পনার মতো ছিল না। তারা পুরোপুরি আত্মনির্ভরশীল ছিল না, বরং অনেক সময় অন্য শক্তির ওপর নির্ভর করেছিল। সমাজব্যবস্থা ছিল কঠোর ও বৈষম্যমূলক, যেখানে অল্পসংখ্যক যোদ্ধা শ্রেণি সুবিধা ভোগ করত এবং বিপুল সংখ্যক মানুষ ছিল দাসত্বের শৃঙ্খলে। নারীদের কিছু স্বাধীনতা থাকলেও রাষ্ট্রটি নিষ্ঠুরতার জন্য কুখ্যাত ছিল। তাই একে আদর্শ রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরা ইতিহাসের সরলীকরণ বলে মনে করেন গবেষকেরা।
পশ্চিমা রাজনীতি ও স্পার্টার প্রতীক
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে ডানপন্থী আন্দোলনে স্পার্টার প্রতীক বারবার ফিরে আসে। কিছু চরমপন্থী গোষ্ঠী স্লোগান, প্রতীক ও পৌরাণিক গল্পে স্পার্টাকে ব্যবহার করছে নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের হাতিয়ার হিসেবে। ইউরোপে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিরাপত্তা উদ্বেগ বেড়ে যাওয়ায় বিভিন্ন সরকারও প্রতিরক্ষা খাতে জোর দিচ্ছে। এতে রাজনৈতিক বর্ণালী ভিন্ন হলেও সামরিক প্রস্তুতির ভাষা ক্রমে জোরালো হচ্ছে।

ইতিহাস থেকে শেখার সীমা
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাচীন ইতিহাসের রূপক ব্যবহার করা যায়, কিন্তু তা থেকে সরাসরি আধুনিক নীতির নকশা বানানো বিপজ্জনক। স্পার্টা ও এথেন্সের তুলনা আজকের বিশ্বে টানাপোড়েন বোঝাতে সহায়ক হতে পারে, তবে বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। ইতিহাসের কিছু দিক বেছে নিয়ে বর্তমান রাজনীতিতে ন্যায্যতা দেওয়া আসলে বক্তার দৃষ্টিভঙ্গিই বেশি প্রকাশ করে।
এই প্রেক্ষাপটে স্পার্টা আবারও বিশ্ব আলোচনায়। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়, ইতিহাসের কঠোর এক অধ্যায়কে আদর্শ বানিয়ে কি সত্যিই আধুনিক বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















